সুফিবাদ মানব আত্মার ঈশ্বরের প্রতি প্রগাঢ় প্রেম, অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি এবং ঐশী উপলব্ধির পথ। এই পথের এক অন্যতম শক্তিশালী উপাদান হলো সামা বা সুফি সংগীত—যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ায় কাওয়ালি রূপে পরিগ্রহ করে। এটি শুধু একধরনের সংগীত নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যার মাধ্যমে সাধক আত্মাকে ধ্বনি, রাগ ও কল্পনার মাধ্যমে নৈর্ব্যক্তিকতায় পৌঁছে দেয়।
সামা (سماع) শব্দের তাৎপর্য
আরবি ‘সামা’ শব্দের অর্থ “শোনা” বা “শ্রবণ”। তবে সুফি পরিভাষায় এটি হল এমন এক সংগীতানুষ্ঠান যা আল্লাহর স্মরণ, নবীজির প্রশংসা, এবং আত্মিক উপলব্ধির সাথে সম্পর্কিত। সুফি সাধকরা বিশ্বাস করেন, সঠিকভাবে পরিবেশিত সামা আত্মাকে ঈশ্বরের দিকে আকৃষ্ট করে ও অহংকে গলিয়ে দেয়।
সামা ও কাওয়ালির উৎপত্তি ও বিকাশ
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সুফি সামার সূচনা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটি কাওয়ালি রূপে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। চিশতিয়া তরিকার অন্যতম কর্ণধার হযরত খ্বাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ.) এবং তাঁর শিষ্য হযরত আমীর খুসরু (রহ.) কাওয়ালি ধারার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত। আমীর খুসরু পারসী, আরবি ও হিন্দবী ভাষায় এমন এক সঙ্গীতধারা গড়ে তোলেন যা আত্মার গভীরতম অনুভবকে জাগ্রত করে।
কুরআন ও হাদীসে সামার ভিত্তি
কুরআনের দৃষ্টিতে:
“আল্লাহর জিকর শুনলে তাদের হৃদয় কাঁপে…”
— সূরা আনফাল ৮:২
“তুমি যখন কুরআন পাঠ করো, তখন এক শ্রেণির মানুষ কান পেতে শোনে…”
— সূরা আহকাফ ৪৬:২৯
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা বোঝা যায় যে, ঈশ্বরীয় বাণী শ্রবণ একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যম।
হাদীসের দৃষ্টিতে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আওয়াজ দ্বারা কবিতাকে সুন্দর কর, কারণ সুন্দর আওয়াজ কুরআনের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে।”
— তিরমিযি, কিতাবুল ফাযায়েল
হযরত ওমর (রা) বলেন: “আমরা যখন সামরিক ক্লান্তি বা অন্তরগত বিষণ্ণতায় পড়তাম, তখন কবিতা বা সংগীত দ্বারা শক্তি ফিরে পেতাম।”
সুফি সাধকদের দৃষ্টিতে সামা
১. ইমাম গাযযালী (রহ.):
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহ্যাউ উলুমিদ্দিন-এ সামা’র বিষয়ে তিনি লিখেছেন—
“যে সংগীত অন্তরের অশান্তি দূর করে, আত্মাকে আল্লাহর প্রতি কেন্দ্রীভূত করে—তা হারাম নয় বরং একটি রূহানী শক্তি।”
২. জালালুদ্দিন রূমি (রহ.):
রূমির ঘূর্ণনৃত্য (সামা) তাঁর দেহ ও আত্মার মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের কাব্যিক প্রকাশ। তিনি বলেন—
“সামা হল আত্মার খাদ্য, যা হৃদয়কে স্বর্গের দরজার দিকে নিয়ে যায়।”
৩. হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহ.):
তিনি সামা ও কাওয়ালিকে একান্তভাবে চর্চা করতেন এবং বলেন—
“যখন প্রেমের গান হয়, আমি আর আমি থাকি না; তখন কেবল প্রেম থাকে।”
কাওয়ালির গঠন ও আধ্যাত্মিক অর্থ
কাওয়ালি হলো গানের একটি বিশেষ ধারাবাহিকতা যেখানে প্রথমে হাম্দ (আল্লাহর গুণগান), তারপর নাত (নবীর প্রশংসা), পরে সুফি প্রেম ও ঈশ্বরীয় মিলনের গান পরিবেশিত হয়। এই সংগীতের মধ্য দিয়ে সাধকরা নিম্নোক্ত পর্যায় পাড়ি দেন:
সম্মোহন (Transcendence)
তবসসুম (আত্ম-উন্মোচন)
ফানা (নৈর্ব্যক্তিকতা)
বাক্বা (ঈশ্বর-স্থায়ী অবস্থা)
রহস্যালাপ (Mystical Dialogue) ও সংগীত
সুফি কাওয়ালির সংগীতে যে রহস্যালাপ চলে, তা বহুমাত্রিক:
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার আলাপ (প্রেমিক ও প্রেয়সীর ভাষায়)
আত্মা ও রূহের মধ্যকার গূঢ় সংলাপ
রূপক অর্থে ‘মেহবুব’ (প্রেমিক) দ্বারা ঈশ্বরের সংকেত
‘শরাব’ বা ‘মদ’ দ্বারা ঈশ্বরীয় প্রেমের উন্মাদনা
‘মাতলাম’ অর্থাৎ নেশাগ্রস্ততা – ফানার অবস্থা
সামার বিরোধিতা ও সুফি জবাব
ইতিহাসে কিছু দল সংগীতকে হারাম ঘোষণা করলেও সুফিরা প্রতিউত্তরে বলেছেন:
সংগীত নিজে হারাম নয়, বরং সেটার উদ্দেশ্য ও প্রভাব বিবেচ্য।
যখন সংগীত আত্মাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, সেটি ইবাদতের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
উপসংহার
সুফিবাদে সামা ও কাওয়ালি একটি চেতনার সেতু—যা আত্মাকে দেহের কারাগার থেকে মুক্ত করে মহাবিশ্বের রহস্যে প্রবেশ করায়। সংগীত এখানে শুধু রুচির বিষয় নয়, বরং এক উচ্চতর আত্মিক অনুশীলন যা মানুষকে নিয়ে যায় প্রেম, ফানা ও ঐশিক মিলনের পথে। এ এক রহস্যময় আলাপ, যেখানে শব্দের মাধ্যমে আত্মা তার স্রষ্টাকে খোঁজে।
গ্রন্থপঞ্জি (References)
Al-Ghazali, Ihya Ulum al-Din, Vol. 2 (Book of Music and Ecstasy)
Annemarie Schimmel, Mystical Dimensions of Islam
Carl Ernst, Sufism: An Introduction to the Mystical Tradition of Islam
William Chittick, Sufism and Sufi Music
Qur’an: Surah Anfal 8:2, Surah Ahqaf 46:29
Sunan al-Tirmidhi, Hadith 2910
Amir Khusrow’s Poetry (Translated Selections)