1.
প্রথম দিনের সূর্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্ত্বার নূতন আবির্ভাবে,
কে তুমি?
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম-সাগরতীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় –
কে তুমি?
পেল না উত্তর।
2.
মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘পূজারী দুয়ার খোলো,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে, পূজার সময় হ’ল!’
স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে আজ, রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ’, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি’ক সাত দিন!’
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
মসজিদে কাল শির্ণী আছিল, -অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্,
বলে, ‘বাবা, আমি ভূখা-ফাঁকা আছি, আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা- ‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভূখা আছ মর গে-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?
ভূখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল-‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত রুটি নিয়া, মসজিদে দিল তালা!
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে, বন্ধ করনি প্রভু।
তব মস্জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
কোথা চেঙ্গিস্, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের, যত তালা- দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ’ নাও জোর ক’রে কেড়ে-
যাহারা আনিল গ্রন্থ’- কেতাব, সেই মানুষেরে মেরে-
পূজিছে গ্রন্থ’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ’;-গ্রন্থ’ আনেনি মানুষ কোনো।