লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
দামেস্কের বিখ্যাত অলী মালেক ইবনে দীনার (র)। আল্লাহপ্রাপ্তির পথে যিনি ব্যায় করেছেন তাঁর সারাটি জীবন। তাঁর সমগ্র জীবনটিই অসংখ্য অলৌকিক কর্মকান্ডে ভরপুর। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে আমাদের এখনকার আয়োজন।
ধর্মযুদ্ধের বাসনা
মালেক ইবনে দীনার (র) এর বহুদিনের স্বপ্ন তিনি ধর্মযুদ্ধে অংশ নিবেন। হঠাৎ সে সুযোগ এসে গেলো। তিনি তো খুব খুশি। কিন্তু না, সুযোগটি হাতের মুঠোয় এসেও ধরা দিলো না। কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন তিনি। হৃদয়ে আঘাত পেলেন খুব। নিজের শরীরকেই এর জন্য দায়ী করতে লাগলেন তিনি। নিজেকেই নিজে ভৎর্সনা করতে লাগলেন। হঠাৎ দৈববাণী ভেসে এলো তাঁর কানে। বলা হলো, “অস্থির হয়ো না মালেক। যুদ্ধে না যাওয়াটাই তোমার জন্য ঠিক ছিল। তুমি যুদ্ধে গেলে শত্রুর হাতে বন্দী হতে এবং তারা তোমাকে দিয়ে অধর্ম করাতো। আল্লাহ তোমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।”
নাস্তিকের সাথে বিতর্ক
একবার এক নাস্তিকের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন মালেক ইবনে দীনার (র)। নাস্তিক বলছে নাস্তিক্যবাদই উত্তম আর মালেক ইবনে দীনার (র) বলছেন প্রভূপথই উত্তম। অবশেষে ফয়সালা হলো, দুজনাই আগুনে হাত রাখবেন। যার হাত অক্ষত থাকবে তার কথাই সঠিক। কথামতো কাজ হলো। দুজনাই হাত রাখলেন আগুনে। কিন্তু কারো হাতই পুড়লো না। সিদ্ধান্ত হলো, দুজনাই সঠিক। মনে মনে আহত হলেন মালেক ইবনে দীনার (র)। সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন তিনি। প্রভূকে বললেন, প্রভূ, অবশেষে তুমি আমাকে নাস্তিকের সমপর্যায়ভূক্ত করলে? প্রভূ জানালেন, “হে মালেক, নাস্তিক তোমার হাতের সাথে আগুনে হাত রেখেছিল। তোমার হাতের সম্মানে আগুনে তার হাতও পুড়েনি। যদি সে আলাদা ভাবে আগুনে হাত রাখতো তাহলে তার হাত পুড়ে যেতো।”
অত্যাচারী প্রতিবেশীর ঘটনা
এক মহল্লায় এক অত্যাচারী ব্যক্তি বাস করতো। প্রবল প্রতাপ আর ক্ষমতার অধিকারী ছিল সে। তার অত্যাচারে ঐ এলাকার সমস্ত লোকজন খুব দুঃখে-কষ্টে কালযাপন করতো। একবার ঐ এলাকার সমস্ত লোক মালেক ইবনে দীনার (র) এর কাছে এসে অনুরোধ করলেন, তিনি যেনো ঐ অত্যাচারী লোকটিকে উপদেশ দিয়ে সঠিক পথে আনেন। মালেক ইবনে দীনার (র) ঐ লোকটিকে অনেক উপদেশ দিলেন। কিন্তু তাতে কাজ তো হলোই না বরং তার অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে গেলো।
লোকজন আবার এসে ধরলেন মালেক ইবনে দীনার (র) কে। অগ্যতা মালেক ইবনে দীনার (র) আবার চললেন ঐ ব্যক্তিটির বাড়ির দিকে। পথিমধ্যে ঐশীবাণী শুনতে পেলেন তিনি। আল্লাহ বলছেন, “হে মালেক, তুমি আমার বন্ধুর প্রতি রাগ করো না আর বিরক্ত ও হয়ো না।” প্রচন্ড বিস্মিত হলেন মালেক ইবনে দীনার (র)। ছুটে চললেন সেই অত্যাচারী লোকটির বাড়ি। তাকে বললেন সব। সেও হতভম্ব। বিশ্বাস করতেও লোকটির কষ্ট হচ্ছে সে আল্লাহর বন্ধু। প্রচন্ড অনুতপ্ত হলেন লোকটি। বদলে গেলো হৃদয়। অন্ধকার হৃদয়ে মুহুর্তের মধ্যে জ্বলে উঠলো শত সূর্যের আলো। ভক্তিভরে তওবা করলেন তিনি। ফিরে এলেন ধর্মজগতে। সমস্ত ধন সম্পদ মানুষকে দান করে দিয়ে শুরু করলেন ধর্মপথ পরিক্রমণ। চলে গেলেন লোকালয় ছেড়ে।
অনেকদিন পর সেই লোকটির সাথে মালেক ইবনে দীনার (র) এর দেখা হলো মক্কায়। মালেক ইবনে দীনার (র) এর উপস্থিতিতে লোকটি গ্রামবাসী সহ সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা জানিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রাম
মালেক ইবনে দীনার (র) প্রবৃত্তির সাথে চালাতেন সার্বক্ষণিক জিহাদ। কঠোর জীবন সংগ্রামে কখনো নফসকে জয়ী হতে দেননি তিনি। খাবার দাবাড়ের ব্যাপারে তাঁর ছিল কঠোর সংযম। প্রায় সারাবছর রোযা রাখতেন। দু এক টুকরো শুকনো রুটি দিয়ে করতেন ইফতার। হঠাৎ একদিন তার মাংস খেতে খুব ইচ্ছা হলো। নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না তিনি। দোকান থেকে মাংস কিনলেন। বাড়ি আসার পথে মাংসের পোটলা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রান নিলেন তিনি। তারপর নিজেকে বললেন, “হে নফস, তোমার জন্য আজ এটুকুই ব্যাবস্থা করা গেলো।” মাংসের পুটলিটা এক ভিখারীকে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরলেন তিনি।
বসরা শহরের আগুন
একবার বসরা শহরে আগুন লাগলো। ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। মালেক ইবনে দীনার (র) কোনো এক ভবনের ছাদে দাড়িয়ে সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখছিলেন। দেখা গেলো, যাদের মালমত্র কম ও হালকা অথবা সাথে কোনো মালপত্র নেই, তারা বেড়িয়ে এলো সে ভয়াবহ আগুন থেকে। আর যারা বড় বড় মালপত্র বা বোঝা বহন করছিল, তারা আটকে গেলো আগুনে। মালেক ইবনে দীনার (র) বললেন, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহন করা উচিত। হাশরের মাঠে যাদের পাপের বোঝা যত কম থাকবে তারাই মুক্তি পাবে। আর যারা বড় বড় পাপের বোঝা বহন করবে তারাই আটকে যাবে।
কাবা ঘরে মুর্ছা যাওয়া
একবার কাবা ঘরে নামাজ আদায় কালে যখন সবাই পড়ছি লাব্বাইক ( হে আল্লাহ, আমি আপনার দরবারে হাজির) তখনই মালেক ইবনে দীনার মুর্ছা যান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক (র)। চেতনা ফিরলে ইমাম হযরত জাফর সাদিক (র) তাকে মুর্ছা যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। মালেক ইবনে দীনার (র) বলেন, আমার ভয় হয়, যখন আমি বলি “হে আল্লাহ আমি তোমার দরবারে হাজির”। যদি আল্লাহ জবাব দেন, তুমি আমার দরবারে দাসত্বের জন্য হাজির হওনি, তবে কি হবে? এই ভয়ে আমি মুর্ছা যাই।
মহিলার মোনাফেক সম্বোধন
একবার কোনো এক মহিলা মালেক ইবনে দীনার (র) কে মোনাফেক (কপট) বলে সম্বোধন করেন। তিনি মহিলাটিকে বলেন, “মাগো, দীর্ঘ বিশ বছরে একমাত্র তুমিই আমাকে আমার আসল নামটি ধরে ডাকলে।”
রচনাকাল – 18/08/2018
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী