লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
অজানাকে জানার আগ্রহ কম বেশী সকল মানুষের মধ্যেই রয়েছে। সেই আগ্রহ (ইচ্ছা ও আকাঙ্খা) পুরণের জন্য যুগযুগ ধরে মানুষ ছুটে চলেছে দুর্গম গীরি, কানুন ও মরু পথে । কত সাগর মহাসাগর পেড়িয়ে দেশ দেশান্তরে, নভোচারীগণ বিচরণ করছে গ্রহ গ্রহান্তরে । কত যুগ যুগান্তর ধ্যানস্থ ছিলেন যোগী মুনী ঋষীগণ শুধু-ই-মাত্র অজানাকে জানার কারণ । ধর্ম শাস্ত্র অধ্যায়ন ও গবেষণা করতে গেলে অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে নানা রকম অজানা প্রশ্নের উদয় হয় । তার মধ্য হতে সামান্য কয়েকটি প্রশ্নমূলক বিষয় কোরআন হাদিসের আলোকে পাঠক সমাজে তুলে ধরলাম ।
দলিল : আল্লাহ আসমান ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তার পর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। (সুরা আরাফ- আয়াত নং- ৫৪)।
জানার বিষয় – ১ : যখন আসমান ও যমীন, চন্দ্র, সূর্য্য দিন-রাত কিছুই ছিলনা তখন ছয় দিনের হিসাব কোন কোন দিন ধরে গণনা করা হ’ল?
দলিল : সুরা বাকারা- ১১৭নং আয়াত, সুরা আল কামার- ৫০নং আয়াত, সুরা-ইয়াসিন-৮২নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে আল্লাহ কোন কিছু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে শুধু “কুন” বললেই হয়ে যায়।
জানার বিষয় – ২ : তাহলে আসমান যমীন সৃষ্টি করতে “ছয় দিনের” দরকার হল কেন? ঐ দিন গুলির নামই বা কী কী?
দলিল : আল্লাহ বলেন, আমাকে উত্তম ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান কর। আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই ক্ষমা করব এবং জান্নাতে প্রবেশ করাব। (সুরা-মায়েদা-১২নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৩ : সুরা ইখলাছে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন – তবে বান্দার নিকট উত্তম ঋণ চাইলেন কেন? কর্জে হাসানা কি বস্তু এবং কিভাবে বান্দা আল্লাহকে কর্জে হাসানা প্রদান করবে?
দলিল : আমরা আসমান যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ – আমানত পেশ করে ছিলাম । কিন্তু তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হল। আর (আদম) মানুষ তা বহন করল। সে অত্যান্ত জালিম, খুবই মুর্খ বা অজ্ঞ। (সুরা আহযাব-৭২ নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৪ : আমানত বস্তু কি? আসমান যমীন পর্বত কেউ গ্রহণ করলনা একমাত্র আদম তা গ্রহণ করায় কোন দোষে জালিম ও অজ্ঞ বলা হল? খেয়ানত হতে আমানত রক্ষার উপায় কি?
দলিল : তোমরা সালাতকে হেফাজত কর বিশেষ করে মধ্যবর্তী (সালাতে ওছতা) সালাতকে। (সুরা বাকারা-২৩৮নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৫ : সালাতে ওছতা বা মধ্যবর্তী সালাত কাহাকে বলে এবং কিভাবে আদায় করতে হয়?
দলিল : সালাতে দায়েমুন অর্থাৎ সদা সর্বদা সালাতে মশগুল থাকতে বলা হয়েছে। (সুরা মারিজ ২৩ নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৬ : দায়েমুচ্ছালাত কাহাকে বলে? এবং কিভাবে সদা সর্বদা মশগুল থাকা যায়?
জানার বিষয় – ৭ : পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজে প্রথম দুই রাকাত সুরা ফাতিহার সাথে অন্য সুরা মিলায়ে পড়তে হয়। শেষের এক/দুই রাকাতে শুধু সুরা ফাতিহা চুপি চুপি পড়তে হয় কেন?
জানার বিষয় – ৮ : দুই ঈদের নামাজে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীর কখন হতে এবং কি কারণে ওয়াজিব হ’ল?
জানার বিষয় – ৯ : জানাযা নামাজে চার তাকবীর হওয়ার শরয়ী কারণ কী? সর্বপ্রথম কে কার জানাযা করেন?
জানার বিষয় – ১০ : কিয়াম, কঊদ, রুকু, সজুদ, তাসবীহ, তাহলিল তথা সালাত আদায়ের নিয়মাবলী একই রকম হওয়া সত্ত্বেও সালাতের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল নাম করণ করা হল কেন?
জানার বিষয় – ১১ : অযুব মধ্যে নির্দিষ্ট অঙ্গগুলি তিন বার করে ধৌত করা হয় কেন? তিন এর হাকিকত কি?
দলিল : আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সকল নিদর্শন ও স্বীয় চিহ্ন সমূহ বিশ্ব জগতেও মানব দেহে প্রকাশ করেছেন যেন সত্য প্রকাশ পায় গোপন না থাকে। অর্থাৎ যা আছে বিশ্ব ভ্রমান্ডে তা রয়েছে মানব ভান্ডে। (সুরা হামিম সাজদা ৫৩ নং আয়াত)।
জনার বিষয় – ১২ : আরশ, কুরছি, লৌহ কলম, বেহেস্ত, দোজখ, হুর, গেলেমান, খানায়ে কাবা, হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম এর নিদর্শন সমূহ মানব দেহে কোন্ কোন্ স্থানে ও কিভাবে রয়েছে?
দলিল : তিনিই (আল্লাহ) প্রথম ও শেষ প্রকাশ্য ও গোপন আর সব কিছুই জানেন। (সুরা হাদীদ ৩নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ১৩ : আল্লাহ যাহের বা প্রকাশ তিনি কি রূপে ও কিভাবে প্রকাশিত? চিনার পদ্ধতি কি?
দলিল : নিশ্চয়ই ইহা মহিমান্বিত কোরআন, যা গুপ্ত কিতাবে সংরক্ষিত আছে। যারা পবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ উহা স্পর্শ করতে পারে না। (সুরা ওয়াকিয়াহ্ ৭৭, ৭৮, ৭৯ নং আঃ)।
জানার বিষয় – ১৪ : গুপ্ত কিতাব বলতে আল্লাহ্ কোন্ কিতাব কে বুঝিয়েছেন? উহা কোথায় ও কিভাবে অবস্থিত?
দলিল : আল্লাহ হযরত মুসা (আঃ) কে পাঠালেন হযরত খেজের (আঃ) এর নিকট “ইলমেলাদুন্না” শিক্ষা করতে। (সুরা কাহাফ ৬০ আয়াত হতে ৮২ নং আয়াত পর্যন্ত দ্র:)।
জানার বিষয় – ১৫ : ইলমেলাদুন্না কোন ইলমকে বলে? কোথা হতে কিভাবে ইলমেলাদুন্না শিক্ষা করতে হবে?
দলিল : অতঃপর সালাত শেষ হলে (মসজিদে না বসে) তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় রিজিক অন্বেষণে, অনুগ্রহ পেতে আল্লাহকে স্মরন কর, যাতে তোমরা সফল কাম হও। (সুরা জুমুয়া-১০ নং)।
জানার বিষয় – ১৬ : উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা গেল নামাজ শেষে মসজিদে বসে থাকতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন । কিন্তু অনেক মসজিদে দেখা যায় নামাজ শেষে একদল লোক মসজিদে গোল বৈঠক দিয়ে বসে পড়ে বহুত ফায়দা বলে অপরকেও বসতে বলে, এ সকল বয়াণ ও কর্মকান্ড আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত কী-না?
জানার বিষয় – ১৭ : পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র পরিবারের হক আদায় না করে দেশ দেশান্তর ঘুরে ঘুরে মসজিদে মসজিদে থাকা খাওয়া ও রাত্রী যাপন করা প্রসঙ্গে কোরআন, হাদিস কি বলে?
দলিল : আল্লাহ্ মানুষের ঘাড়ের শিরার চেয়েও নিকটে (ক্বাফ-১৬ নং আয়াত)।
আল্লাহ মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসে আসা যাওয়া করেন (যারিয়াত-২১ নং আয়াত)।
তুমি যেখানে তিনি (আল্লাহ) সেখানেই আছেন (হাদীদ-৪ আঃ)।
আল্লাহর অবস্থান মানুষ ও তার ক্বলবের মধ্যে (আনফাল-২৪)।
জানার বিষয় – ১৮ : আল্লাহ এত নিকটে থাকতে মেরাজ রজনীতে মহানবী (সঃ) সাত আসমান পাড়ি দিয়ে উপরে গেলেন কেন? এবং তথায় ২৭ বছর অতিবাহিত হওয়ার রহস্য কি?
দলিল : আল্লাহ্ মানুষকে “কলমের” সাহায্যে শিক্ষা দিলেন। (সুরা আলাক ৪নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ১৯ : বর্তমান ব্যবহৃত কলম আবিস্কারের অনেক পূর্বে মানুষ সৃষ্টি। অতএব আল্লাহর ব্যবহৃত “কলম” কি বস্তু?
দলিল : তিনিই দয়াবান, শিক্ষা দেন কোরআন। (আর রহমান-১,২ নং)।
জানার বিষয় – ২০ : আমরা সাধারণত মসজিদ মাদ্রাসায় গিয়ে মানুষের নিকট হতে কোরআন শিক্ষা করি । তাহলে আল্লাহ্ কোথায় হতে কিভাবে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন?
দলিল : জায়নামাজে দাড়িয়ে বলা হয়- নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর মুখের দিকে মুখ ফিরালাম (আনয়াম-৭৯ নং)। সুরা বাকারা-১১৫ আয়াত ও সুরা আর রহমানের ২৭ আয়াত দ্বয়ে আল্লাহর মুখ মন্ডল বা চেহারার কথা উল্লেখ রয়েছে।
জানার বিষয় – ২১ : মহান আল্লাহর মুখ মন্ডল বা চেহারা কিরূপ? এবং কিভাবে দরশন করা যাবে?
দলিল : আল্লাহ আসমান ও যমীন সমূহের ‘নুর’ (সুরা নুর ৩৫ নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ২২ : নুরের অর্থ করেছে আলো, তাহলে ঐ ‘নুর’ সত্ত্বা আকার না নিরাকার? কিভাবে দরশন হবে?
দলিল : হাদিস শরীফের বর্ণনা : কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত প্রসঙ্গে একেকটি “হরফ” তেলাওয়াতের বিনিময়ে দশটি করে নেকী পাওয়া যাবে উল্লেখ রয়েছে।
জানার বিষয় – ২৩ : পবিত্র কোরআনে, নমরুদ, ফেরাউন, আবু লাহাব, ইবলিস, শয়তান, মুনাফেক ইত্যাদি নাম গুলি ও আরবী হরফে রয়েছে- কোরআন তেলাওয়াতের সময় ঐ নাম গুলির হরফে ও অনুরূপ নেকী পাওয়া যাবে কী-না? যদি নেকী হয় তাহলে তারা কাফের বা অপরাধী কেন?
দলিল : মৃত দেহ কবরে রেখে চল্লিশ কদম আসার পরই মনকির নকীর নামক দুই ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করে মৃতকে জীবিত করে সওয়াল জওয়াব শুরু করবে।
জানার বিষয় – ২৪ : যে সকল মৃত দেহ আগুনে পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল, পানিতে ডুবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল অর্থাৎ যাদের কবর হলনা তাদের ব্যাপারে চল্লিশ কদম এর হিসাব কেমনে হবে এবং সওয়াল জওয়াব কোথায় কিভাবে করবে?
হে আল্লাহ আমাদেরকে অজানাকে জানার জ্ঞান দান করুন।
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী