আপন ফাউন্ডেশন

মহান ওলী হযরত মালেক দীনার রহ.

Date:

Share post:

হযরত মালেক দীনার (র) হযরত হাসান বসরী (র) এর সমসাময়িক। তিনিও একজন প্রথম সারির সাধক। তাঁর পিতা দাস ছিলেন। তাঁর নামের শেষের ‘দীনার’ কথাটি কিভাবে যুক্ত হয়, তাঁর একটি ইতিহাস আছে।

একবার হযরত মালেক দীনার (র) একখানি খেয়া নৌকায় নদী পার হচ্ছিলেন। মাঝনদী পেরিয়ে আসার পর মাঝি খেয়ার পয়সা চাইল । কিন্তু হযরত মালেক দীনার (র)-এর কাছে কোন পয়সা ছিল না। কাজেই খুব বিনীতভাবে তিনি তাঁর অক্ষমতা জানালেন। কিন্তু কে শোনে তার কথা! মাঝি বেশ নাছোড়বান্দা। পয়সার জন্য পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। মালেক দীনার (র) নিরূপায়। অরো বিনীত কণ্ঠে তিনি বললেন ভাই, আমার কাছে এক কানাকড়িও নেই । দয়া করে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও ।

আর যায় কোথা! মাঝি উত্তেজিত, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। অশ্লীল ভাষায় বলল, ব্যাটা, তোর যদি পয়সা নাই তো নৌকায় উঠতে কে বলল? বলতে বলতে মাঝি তাঁকে মারধর শুরু করল । আর মারের চোটে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরল। কিন্তু আবার সেই পয়সা চাওয়া। আবার সেই পয়সা না থাকার করুণ স্বীকৃতি। সেই কাকুতি-মিনতি, ক্ষমাপ্রার্থনা ইত্যাদি। কিন্তু মাঝির তখন জেদ চেপেছে। পয়সা না নিয়ে কিছুতেই সে লোকটাকে পার করে দেবে না। সে আরো নিমর্ম হয়ে উঠল। ঠিক করল, ব্যাটার হাত-পা বেঁধে নদীতে ছুঁড়ে ফেলা হবে। এ উদ্দেশ্যে সে একগাছি দড়ি হাতে নিয়ে তাঁকে বেঁধে ফেলার উদ্যোগ নিচ্ছে, এমন সময় দেখা গেল নদীর সব মাছ মুখে করে এক-একটি দীনার নিয়ে নৌকার চারপাশে ভেসে উঠল। তখন হযরত মালেক দীনার (র) একটি মাছের মুখ থেকে একটি দীনার নিয়ে মাঝির হাতে দিল । মাঝি ও অন্যান্য যাত্রীরা এ অদ্ভূত ঘটনায় তাজ্জব হয়ে গেল । বিশেষ করে মাঝির মনে দারুণ ভীতির সঞ্চার হল । লোকটির প্রতি সে যা ব্যবহার করেছে, তা এখন অতিমাত্রায় উৎকট হয়ে তার কাছে ধরা পড়ল। আর সে লুটিয়ে পড়ল হযরত মালেক দীনার (র)-এর পায়ের তলায়। হযরত মালেক দীনার (র) তাঁকে ক্ষমা করে তখন নৌকা থেকে নেমে পানির ওপর দিয়ে হেঁটে তীরে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সে থেকে তাঁর নামের সঙ্গে দীনার কথাটি জুড়ে গেল চিরদিনের মতো।

হযরত মালেক দীনার (র)-এর চেহারা ছিল খুবই চমৎকার। আর ধন-সম্পত্তিরও অধিকারী ছিলেন। তিনি দামেস্ক শহরে বাস করতেন। এ শহরে খুব বড় একটি মসজিদ ছিল। হযরত মালেক দীনার (র) মনে মনে এক ফন্দী আঁটলেন। ঠিক করলেন, ঐ মসজিদে তিনি এতেকাফ করবেন পুরো বছর ধরে। ইবাদতে মশগুল থাকবেন। তাহলে তাঁর ওপর মানুষের নজর পড়বে। সকলের আস্থাভাজন হবেন তিনি। আর তাহলে মসজিদে ও মসজিদ সংলগ্ন ভূমির মুতাওয়াল্লী পদ পেয়ে যাবেন ।

যেমন ভাবনা, তেমনি কাজ। তিনি মসজিদে ঢুকে পড়লেন। সবসময় নফল নামায পড়তে থাকলেন। আর মোরাকাবায় মগ্ন রইলেন। অবশ্য মনে মনে জানতেন তিনি কপট । এক রাত্রে মসজিদের বাইরে যেতে তিনি এক আকাশবাণী শুনলেন, মালেক! আল্লাহর দরবারে তুমি এখনো তওবা করছ না কেন? একথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন। নিজের ভুল বুঝতে দেরি হল না । তিনি তো পবিত্র হৃদয়ে আল্লাহর ইবাদত করেননি। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাধুতার ভান করেছেন মাত্র । লোককে প্রতারণা করার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর, আল্লাহকে খুশি করা নয় । একথা মনে হওয়া মাত্র সত্যিই তিনি আল্লাহ্র দরবারে তওবা করে পবিত্র সরল মনে আল্লাহর উপাসনায় রত হলেন ।

পরদিন সকালে মসজিদের মুসল্লিগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন, বিভিন্ন কাজের শৃঙ্খলার জন্য মসজিদে একজন মুতাওয়াল্লী নিয়োগ করা দরকার। এ নিয়েও কথা উঠল । আর আলোচনার পর হযরত মালেক দীনার (র)-কেই তাঁরা উপযুক্ত বিবেচনা করলেন । আর তাঁকে এ পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। মালেক দীনার (র) মনে মনে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, প্রভু গো, আমি এক বছর ধরে এতেকাফে রইলাম, নামায ও তসবীহ পাঠ করলাম । তাতে কিছু হল না । আর মনের গোপন উদ্দেশ্যে বর্জন করে শুদ্ধ অন্তঃকরণ একটি রাত মাত্র ইবাদত করলাম, আর এতেই মুতাওয়াল্লী পদটি চলে এল আপনা থেকে। কিন্তু ওপদ আমি আর গ্রহণ করতে পারি না । আমি আপনার ইবাদত আর মসজিদ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না ৷

তাই হল। যে মুতায়াল্লী পদের জন্য তিনি কপটতার আশ্রয় নিয়েছিলেন, করায়ত্ত হওয়া সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় সে পদ গ্রহণের অসম্মতি জানিয়ে তিনি গভীর সাধনায় মগ্ন হলেন। আল্লাহ্ কখন কাকে কী করেন, একমাত্র তিনিই তা ভাল জানেন ।

এক বিত্তশালিনী ধর্মপরায়না, বিদূষী, রূপসী তরুণীর বিবাহের প্রস্তাবও তিনি নাকচ করেন এ বলে যে, আমি দুনিয়াকে তিন তালাক দিয়েছি। অতএব তালাকপ্রাপ্তা পৃথিবীর সঙ্গে আর সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। বিবাহের মাধ্যমে হলেও, কোন নারীকে তাই জীবন-সঙ্গিনী করা সম্ভব নয় । কেননা, তাও দুনিয়াদারীর আওতায় পড়ে। বিবাহের প্রস্তাবটি আনেন মহামান্য হযরত সাবেত বানানী (র)। তিনি ব্যর্থ ফিরে গেলেন।
পার্থিব-জীবনের উর্ধ্বে উঠে তিনি যে গভীর আধ্যাত্মজীবনের শরিক হন, তার পরিচয় জড়িয়ে আছে বিচিত্র ঘটনামালায়। আর তা অলৌকিকও বটে। গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। দেখা গেল, এক বিষধর সাপ নারগিস ফুলের পত্রযুক্ত শাখা নিয়ে তাঁকে বাতাস দিচ্ছে। কিন্তু, অন্য নিগূঢ় ঘটনাও আছে ।

হযরত মালেক দীনার (র)-এর কায়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা: তাঁর বহুদিনের ইচ্ছা, জেহাদে অংশ নেবেন। সুযোগও এসে গেল এক সময়। ইসলাম-বিরোধীদের সঙ্গে জেহাদ আসন্ন হয়ে উঠল। হযরত মালেক দীনার (র) জেহাদের খবর পেয়ে খুব খুশি । আল্লাহ্ এতদিনে হয়তো তাঁর ইচ্ছা পূরণের সুযোগ এনে দিয়েছেন। কিন্তু না, সুযোগ হয়েও হল না। ঠিক এ সময়ে তিনি কঠিন অসুখে পড়লেন। যুদ্ধে যোগদান করতে পারলেন না। দুঃখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হল তাঁর। তিনি তাঁর শরীরকেই এর জন্য দায়ী করলেন। হতভাগা! আল্লাহর দরবারে তোমার যদি এতটুকু দাম থাকত, তাহলে যুদ্ধের মুহূর্তে তুমি এভাবে রোগাক্রান্ত হতে না। তিনি তাঁর শরীরকে ভৎসনা করতে লাগলেন । আর হঠাৎ আকাশবাণী এল কানে: ওহে মালেক! বৃথা অস্থির হয়ো না। তুমি এর গোপন রহস্য বুঝতে পারনি। জেনে রেখো, যুদ্ধে অশংগ্রহণ করলে, তুমি শত্রুর হাতে বন্দী হতে । আর বন্দী অবস্থায় তারা তোমাকে শূকরের মাংস ভক্ষণ করাত। আর তা হত ধর্মনাশের কারণ। সে চরম বিপদ থেকে তোমাকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ্ পাক তোমাকে যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে অসুস্থ করে তোলেন।

হযরত মালেক দীনার (র) এ অপূর্ব সৌভাগ্যে পুলকিত হলেন। একদা এক নাস্তিকের সঙ্গে তুমুল তর্ক। তর্ক ধর্ম নিয়ে । নাস্তিক বলে, তার পথই উত্তম। মালেক দীনার (র) বলেন, তাঁর পথই শ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম ।

তর্কের ফয়সালা হবে কিভাবে? ঠিক হল দু’জনেই এক সঙ্গে নিজ নিজ হাত আগুনে স্থাপন করবেন । যার হাত অক্ষত থাকবে তার পথই ঠিক। আর যার হাত আগুনে পুড়বে তিনি ভ্রান্ত বলে সাব্যস্ত হবেন।

কথামতো তাই হল। কিন্তু আশ্চর্য, দু’জনের কারোরই হাতই পুড়ল না। তখন সিদ্ধান্ত হলো, দু’জনেই খাঁটি পথে আছেন। কেউ ভ্রান্ত নন। আর এ ঘটনায় খুবই ভেঙে পড়লেন হযরত মালেক দীনার (র)। তিনি সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। প্রভু গো! দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে আপনার উপাসনায় নিমগ্ন রইলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক নাস্তিকের সম পর্যায়ভুক্ত হলাম। এ আপনার কেমন বিচার প্রভু! তখন আকাশবাণী হল: তুমি বিচলিত হয়ো না মালেক! তোমার হাতের সঙ্গে সে-ও হাত রেখেছে। তোমার পুণ্য হাতের গুণেই তার হাত অক্ষত রয়েছে। যদি সে আলাদাভাবে আগুনে হাত রাখত, তাহলে নিশ্চয় তা পুড়ে ছাই হয়ে যেত ।

আল্লাহর বিচারে কখনো কোন ভুল হতে পারে না ।

হযরত মালেক দীনার (র) আরও একবার কঠিন অসুখে পড়েন। সামান্য সুস্থ হওয়ার পর বিশেষ কাজে তাঁকে যেতে হল বাজারে । শারীরিকভাবে তিনি তখনো দুর্বল । এখন হয়েছে কি, ঐদিনই বাজার কমিটির প্রধান পরিচালক বাজারে আসছেন। পরিচালক বলে কথা! তাঁর নিরাপত্তার জন্য অনুচরবাহিনী একে-ওকে-তাঁকে সরিয়ে দিয়ে রাস্তা পরিস্কার করতে লাগল । হযরত মালেক দীনার (র)-কেও সরে যেতে হল। কিন্তু শরীর দুর্বল ছিল বলে পাশে সরে যেতে একটু দেরি হল । আর এ অপরাধে তাঁর পিঠে এসে পড়ল এক চাবুক । তিনি আর্তস্বরে বলে উঠলেন, ইয়া আল্লাহ্ ! এ অত্যাচারীর নিষ্ঠুর হাত যেন দ্বিখণ্ডিত হয়। আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বন্ধুর আঘাত-জর্জর আবেদনে সাড়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে চাবুকধারীর ডান হাতাখানা দ্বিখণ্ডিত হয়ে বাজারের রাস্তায় পড়ে গেল ।

হযরত মালেক দীনার (র)-এর এক অত্যাচারী প্রতিবেশি ছিল। তার অত্যাচারে আর নিষ্ঠুরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাড়ার লোক এসে হযরত মালেক দীনার (র)-এর কাছে আবেদন জানাল লোকটিকে উপদেশ দিয়ে সৎপথে আনুন । তার অত্যাচার আর সহ্য হয় না ৷

লোকজনের অনুরোধে নির্দয় প্রতিবেশীকে কিছু সদুপদেশ দিলেন। কিন্তু সে কথা কানে না নিয়ে সে রূঢ় ভাষায় বলল, আমি স্বয়ং সরকারের লোক। আমার ওপর কর্তৃত্ব করার সাধ্য বা অধিকার কারো নেই। মালেক দীনার (র) বললেন, তাহলে কথাটা বাদশাহকে জানাতে হয় । সে বলল, তা জানাতে পারেন। মনে রাখবেন, বাদশাহ আমার মন যুগিয়ে চলেন । তিনি আমার ওপর বিরূপ হবেন না । দেখি, বাদশাহ কী করেন। মালেক দীনার (র) বলেলেন, যদি বাদশাহর তরফ থেকে কোন প্রতিকার পাওয়া না যায়, তাহলে আল্লাহর দরবারে যেতে হবে।

লোকটি মুখ টিপে হাসে। বলে, তিনি আবার বাদশাহর চেয়েও আমার প্রতি কোমল হৃদয় । প্রচুর ভালোবাসেন আমাকে । আমি তাঁর অনুগ্রহভাজনও বটে । মালেক দীনার (র)-এর মন খারাপ হয়ে গেল । বস্তুত বিষণ্ন হয়েই তিনি বাড়ি ফিরলেন । আর কঠোর-হৃদয় প্রতিবেশীর অত্যাচারের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেল। অত্যাচারিত মানুষ আবারও দল বেঁধে মালেক দীনার (র)-এর কাছে এসে বলল, আমরা এর আগেও আপনার কাছে এসেছিলাম। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। কিন্তু, আর তো পারা যায় না। লোকটার জুলুম সহ্যের বাইরে চলে গিয়েছে। আমাদের অনুরোধ, আপনি আরো একবার চেষ্টা করুন। আপনার কথায় যদি সে পথে আসে ভাল । না হয়, আমারই ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাব।

অগত্যা তিনি আবারও লোকটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশবাণী শুনলেন: মালেক! তুমি আমার বন্ধুর ওপর রাগ কর না, বিরক্ত ও হয়ো না । হযরত মালেক দীনার (র) আকাশবাণী শুনে হতভম্ব। এমন একটি কঠোর-হৃদয় অত্যাচারী লোক কী করে আল্লাহর বন্ধু হয়! তিনি এর মর্ম-রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলেন না; অবশ্য রাস্তা থেকে বাড়ি না ফিরে তিনি লোকটির কাছেই গেলেন । সে মালেক দীনার (র)-কে প্রশ্ন করে আপনি আবার এসেছেন কি কারণে জানাতে পারি কি? উত্তরে তিনি বললেন, আমি এসেছি আপনাকে সুসংবাদ দিতে। তিনি আকাশবাণীর বিবরণটি শোনালেন । লোকটি কিন্তু স্তম্ভিত হয়ে গেল । আল্লাহর বন্ধু সে? আশ্চর্য! সে ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে স্থির করে, তাই যদি হয় তাহলে আজ থেকে আমিও আমার মনের গতি ও প্রকৃতি বদলে নিলাম। আর যা কেউ আশা করেনি তা-ই হল। তার যাবতীয় সম্পত্তি, ধন-দৌলত আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিয়ে একদিন সে লোকালয় ছেড়ে চলে গেল । অত্যাচারিত মানুষের দল দেখল, মালেক দীনার (র)-এর দৌলতে একটি অন্ধকার হৃদয় হতে সূর্য উঠে বিশ্বচরাচরে তার কিরণমালা ছড়িয়ে দিল।

এ ঘটনার বহুদিন পরে লোকটির সঙ্গে মক্কা মোয়াজ্জামায় হযরত মালেক দীনার (র)-এর দেখা হয়। তখন তিনি অতি ক্ষীণ, কৃশকায়। কিন্তু দেহাবয়বে এক অপার্থিব আলোকপ্রভা । তখন তিনি বললেন, শুনুন আল্লাহ্ সত্যিই বলেছেন যে, তিনি আমার বন্ধু। আর আমি এখন আমার বন্ধুর কাছেই চলছি। আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন। গ্রামবাসীর কাছে আমার ক্ষমা প্রার্থনা করল । বলতে বলতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন । যেমন মালেক দীনার (র)-এর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন এতদিন। শেষকথা বলে দিয়ে তিনি সত্যি তার প্রিয় বন্ধুর কাছে ফিরে গেলেন ।
হযরত মালেক দীনার (র) ছিলেন ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রতিমূর্তি। পাক কুরআনে আল্লাহ্ এ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও সংযমের কথা বার বার বলেছেন। তাঁর পথের যাঁরা পথিক, দেখা যায় সহিষ্ণুতা ও সংযম তাঁদের পথচলার পাথেয় ।

এক সময় হযরত মালেক দীনার (র) একটি ভাড়াটে বাড়িতে বাস করতেন। বাড়ির সামনেই ছিল এক ইহুদী পরিবার। সাধারণভাবে ইহুদীরা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। তাঁর ওপর লোকটি ব্যক্তিগতভাবে হযরত মালেক দীনার (র)-এর প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল। সে করল কী, মালেক দীনার (র)-এর বাড়ির দরজার কাছেই শৌচালয় বানাল । আর এর মলমূত্র গড়িয়ে যেত তাঁর বাড়ি বরাবর। এমনকি দুর্গন্ধে সেখানে টেকা দায় । অথচ মালেক দীনার (র) এ অপ্রতিবেশী সুলভ অসামাজিক ব্যবহারের বিনিময়ে ইহুদীকে একটিও কটু কথা বলেননি । কোনদিন কলহ-ঝগড়াও করেননি। শুধু আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেন, তিনি যেন ঐ হৃদয়হীন ইহুদীকে হেদায়ত করেন। চোখের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলেন আঁধার পর্দা । বেশ কিছুদিন চলে গেল । একদিন ইহুদী জিজ্ঞেস করে, আমার পায়খানাটার জন্য আপনার কোন অসুবিধা হয় না তো? হযরত মালেক দীনার (র) উত্তর দেন, তা তো নিশ্চয় হয়। কিন্তু আমার কিছু করার নেই । একটা গামলা আর ঝাড়ু আছে। প্রত্যেকদিন ধুয়ে সাফ করে দিই ।
ইহুদী বলে, এতদিন ধরে আপনি অসুবিধা ভোগ করছেন, অথচ কোনদিন বিরক্তি বা রাগ প্রকাশ করেননি।
হযরত মালেক দীনার (র) বললেন, তা কেন করব? আল্লাহ্ আমাদের বলেছেন, ক্রোধ দমনকারীকে তিনি ভালবাসেন ।

সত্যিই এতদিনে ইহুদীর চোখের ওপর থেকে কাল পর্দা সরে গেল। শত্রুর অন্যায়- অত্যাচার নীরবে সহ্য করা ও তার প্রতি এতটুকু রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ না করা যদি ইসলামের রীতি-নীতি হয়, তাহলে মানুষের মুক্তি সাধনে একমাত্র ইসলামই সক্ষম। সে হযরত মালেক দীনার (র)-এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাকে ইসলামে ধর্মে দীক্ষা দেবার অনুরোধ জানালা । অপরিসীম ধৈর্য অভাবনীয় সাফল্যে উত্তীর্ণ হল ।

প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ : হযরত মালেক দীনার (র) পার্থিব জীবনে কঠোর সংযম পালন করতেন। বিশেষ করে খাদ্য ও পানীয়ের ব্যাপারে। বহুদিন অম্ল ও মিষ্টি দ্রব্য গ্রহণ করেননি। রোযা রাখতেন সারা বছর। দু’-এক টুকরো শুকনো রুটি দিয়ে ইফতার করতেন ৷ সেহেরীও সারতেন একইভাবে। হয়তো শুকনো রুটি বা এক গ্লাস পানি দিয়ে । আর এ ধরনের ব্যবস্থায় তার কোনও ক্ষোভ তো ছিলই না বরং তিনি খুশি ছিলেন ।
অবশেষে একদিন কিন্তু প্রবৃত্তির তাড়না অনুভব করলেন। মাংস খেতে ইচ্ছে হল তাঁর। দীর্ঘদিন খান নি। আজ যখন খাবার ইচ্ছা জাগল, তখন তা আর দমন করতে পারলেন না। মাংস কিনে নিয়েই বাড়ি ফিরলেন। দোকানি জানত, মালেক দীনার মাংস আহার করেন না তাই মাংস কিনে নিয়ে গিয়ে তিনি কী করবেন, তা জানার জন্য তার এক চাকরকে গোপনে পাঠালেন । চাকর দেখল, মাংস নিয়ে তিনি বাড়িতে গেলেন না । চলে এলেন এক নির্জন স্থানে । আর পাত্র থেকে মাংস বের করে নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে শুঁকলেন। আর আপন মনে বলতে লাগলেন, হে প্ৰবৃত্তি, আজ তোমার জন্য এতটুকুই ব্যবস্থা করা গেল। এর বেশি আর পারা গেল না । তারপর বাইরে এসে মাংসটুকু এক ভিখারিকে দিয়ে দিলেন ।

আবার তিনি সান্ত্বনা দিলেন তাঁর আত্মাকে । হে দুৰ্বল আত্মা! তোমার সঙ্গে আমার শত্রুতা নেই, সুতরাং ইচ্ছা করে তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি তা নয়। তুমি একটু সবুর কর। খুব বেশিদিন তোমাকে কষ্ট সহ্য করতে হবে না। অবশ্যই এর শেষ আছে একদিন। সেদিন দেখবে রাশি রাশি সুস্বাদু খাবার তোমার সেবায় উপস্থিত। চল্লিশ দিনের মাথায় মাংস না খেলে নাকি বুদ্ধি লোপ পায় । আমি এ কথা বিশ্বাস করি না। কারণ, আমি একটানা কুড়ি বছর মাংস খাইনি তাতে আল্লাহর রহমতে আমার বুদ্ধি লোপ হয়নি। তাই শুধু নয়; বরং আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাকরটি গিয়ে দোকান-মালিককে সবিস্তারে সব বলল । হযরত মালেক দীনার (র)-এর এ ত্যাগ ও সংযমের কথা শুনে সে হতবাক হয়ে গেল। হযরত মালেক দীনার (র) বসরায় বাস করেছেন চল্লিশ বছর। কিন্তু বেশিদিন খেজুর খাননি। খেজুরের সময় কেউ খেতে অনুরোধ করলে তিনি বলতেন, খেজুর খেয়ে তোমাদের পেটের কতটুকুই বা উন্নতি হয়েছে আর আমি যে খাই না, তাতে আমারই বা এমনকি অবনতি হয়েছে?
কিন্তু চল্লিশ বছর অতিক্রম হলে তাঁর খেজুর খাওয়ার ইচ্ছা হয়। মন বলল, খেজুরের স্বাদটা একবার নেয়া যাক। কিন্তু তিনি এর বিরোধিতা করে বললেন, না, তোমার এ ইচ্ছা আমি পূর্ণ হতে দেব না ।

হঠাৎ এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন কে যেন বলছেন, মালেক! তুমি এভাবে আত্মাকে আর কষ্ট দিও না। খেজুর খাও। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি খেজুর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন বটে আপন আত্মার উদ্দেশ্যে বললেন,হে আত্মা! প্রথমত তোমাকে রোযা রাখতে হবে পুরো এক সপ্তাহ। আর প্রতি রাতে ভোর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে হবে। তারপর তোমার বাসনা পূর্ণ করব, তার আগে নয়। তখন তিনি রোযা রাখতে লাগলেন। সপ্তাহখানেক রোযা রখার পর কিছু খেজুর কিনে এক মসজিদে গেলেন। তারপর খেজুরগুলো খাবেন বলে সামনে নিয়ে বসলেন। একটি ছেলে এ দৃশ্য দেখে তার পিতাকে ডেকে উঠল জোরে জোরে। আব্বা দেখুন, মসজিদে এক ইহুদী এসেছে। সে এখানে বসে খেজুর খাওয়ার তোড়জোড় করছে।

মসজিদে ইহুদী ঢুকেছে বলে লোকটি লাঠি হাতে ছুটে এল। কিন্তু এসে দেখে, বসে আছেন হযরত মালেক দীনার (র) স্বয়ং। আর লজ্জা পেয়ে সে তার কাছে ক্ষমা চাইল । মাফ করুন হুযুর! আমাদের এলাকায় ইহুদীরা ছাড়া দিনের বেলায় কেউ খেজুর খায় না। সব মুসলমানই রোযা রাখে । আমার নাবালক ছেলে কিছু না বুঝে আপনাকে ইহুদী বলে মনে করেছে ।

লোকটির কথা শুনে হযরত মালেক দীনার (র) আত্মমুখী হলেন। তাঁর মনে হল, ছেলেটির ইহুদী সম্বোধনের মধ্যে অবশ্যই কোন ইঙ্গিত আছে। তিনি বলে উঠলেন, ইয়া আল্লাহ! খেজুর খাওয়ার আগেই এক মাসুম শিশুর মুখ থেকে ইহুদী আখ্যায় ভূষিত হলাম। সেগুলো যদি খেয়েই ফেলতাম, তাহলে অধম কাফের রূপেই গণ্য হতাম। আমি আর এ খেজুর খাচ্ছি না। আর ঐ মুহূর্তে শপথ করলেন, আজীবন খেজুর খাবেন না ।

একদিন এক মুমূর্ষু রোগীর পাশে বসে তাঁকে কালেমায়ে শাহাদত পাঠ করানোর বৃথা চেষ্টা করলেন। যতবারই তিনি তাঁকে কালেমা পড়ে শোনাতে যান, ততবারই সে কালেমার বদলে শুধু দশ, এগারো ইত্যাদি সংখ্যা উচ্চারণ করতে থাকে। হযরত মালেক দীনার (র) তাঁকে শুধালেন, তুমি কি কাজ করতে? সে বলল, অর্থলগ্নি কারবার করতাম ।
তুমি কালেমা পড়ছ না কেন?
পড়তে তো চাই, কিন্তু লকলকে আগুনের শিখা আমার দিকে ধেয়ে আসে যে। আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মুখ দিয়ে সংখ্যা বেরিয়ে আসে। হযরত মালেক দীনার (র) কথা শুনে বুঝলেন, লোকটি মালের ওজনে কম দিত। আর সুদ নিত । তাই তার এ অবস্থা।

বসরা শহরে একবার আগুন লাগে। বিরাট অগ্নিকাণ্ড। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। হযরত মালেক দীনার (র) নিজের জুতো আর লাঠি নিয়ে এক ছাদের ওপর থেকে সে ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখছিলেন। যাদের মালপত্র কম ও হালকা, তারা কোন রকমে আগুন থেকে বেরিয়ে এল । কিন্তু যাদের মাল ভারী আর বেশি, তারা আটকা পড়ল আগুনে। জানমাল সব পুড়ে গেল। তিনি বললেন, এর মধ্যে বিচার দিনের নিদর্শন আছে। সেদিনও একইভাবে নিষ্পাপ ও স্বল্পপাপী মানুষ মুক্তি পাবে। কিন্তু আগুনে পুড়বে তারা, যাদের পাপের পরিমাণ ও ওজন দু-ই বেশি।

তাঁর সম্পর্কে অন্য এক মরমী সাধক হযরত জাফর ইবনে সোলায়মান (র) একটি ঘটনার বিররণ দিয়েছেন। তিনি একবার হযরত মালেক দীনার (র)-এর হজ্জের সহযাত্রী ছিলেন। দু’জনে এহরাম বেঁধে গিয়ে দাঁড়ালেন কাবার সামনে। পাঠ করতে লাগলেন তালবিয়া আল্লাহুম্মা ‘লাব্বাইকা’। প্রভু গো! আমি আপনার দরবারে হাজির। কিন্তু হঠাৎ তালবিয়া পাঠের সঙ্গে সঙ্গে মালেক দীনার (র) অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে গেলেন। পরে চেতনা ফিরে এলে হযরত জাফর সাদেক (র) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি হঠাৎ এমন জ্ঞান হারালেন কেন?
হযরত মালেক দীনার (র) বললেন, প্রভু গো! আপনার দরবারে আমি হাজির। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভয় হল, যদি আমার কথা শুনে আল্লাহ্ বলে বসেন, না, ইবাদতের ইচ্ছা নিয়ে তুমি আমার দরবারে হাজির হওনি, তাহলে আমার অবস্থা কেমন হবে? একথা মনে আসামাত্র আমি মূর্ছা যাই । এ থেকে বোঝা যায়, পূতচরিত্রের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্র ভয়ে তিনি কতখানি ভীত ছিলেন।

তাঁর আল্লাহভীতির আরও প্রমাণ হল, তিনি যখন নামাযে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহার ‘ইয়্যাকা না বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন’ (আমি কেবল তোমারই উপাসনা করি ও তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি) অংশটি উচ্চারণ করতেন তখন কান্নায় ভেঙে পড়তেন। তার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, এটি যদি কুরআনের আয়াত না হত, আর পাঠ করার নির্দেশ না থাকত, তাহলে আমি কিছুতেই এটি উচ্চারণ করতাম না। কেননা, এ এক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আমি মুখে বলি, ইয়া আল্লাহ্! আমি আপনারই ইবাদত করি। কিন্তু কাজে আমি প্রবৃত্তিরই দাসত্ব করি । মুখে উচ্চারণ করছি, আল্লাহ্ গো, আমি তোমারই সাহায্যপ্রার্থী। কিন্তু আসলে আমি মানুষের সাহায্যের প্রত্যাশা রাখি । আল্লাহ্ যদি মুখের ওপর বলে দেন, তুমি আর মিথ্যা শপথ কর না, তাহলে আমার অবস্থা কেমন হবে-এ ভয়ে কাঁদছি ।

হযরত মালেক দীনার (র) যেমন ছিলেন ধর্মভীরু, তেমনি কঠোর তাপস্বী। কঠিন অভ্যাস গড়ে উঠেছিল তাঁর। কোন রাতেই ঘুমাতে যেতেন না। সারা রাত জেগে ইবাদত বন্দেগী করতেন এবং রাতে তাঁর মেয়ে বললেন, আব্বা আজ একটু শুয়ে বিশ্রাম নিন। তিনি বললেন, মাগো কিভাবে বিশ্রাম নেব বল । আমার মন সবসময় আল্লাহর ভয়ে ভীত। তাছাড়া আমার আরো চিন্তা, আল্লাহর রহমত হয়তো নেমে আসছে আমার ওপর। কিন্তু আমাকে ঘুমুতে দেখে তা আবার ফিরে যাচ্ছে তাঁর কাছে। পাছে আমি বঞ্চিত হই, তাই আমি ঘুমুতে পারি না মা ।
একটি লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার দিনগুলো কিভাবে কাটছে ? তিনি বলেন, আর কেমন! আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করছি আর শয়তানের দাসত্ব করছি। যদি কেউ মসজিদের দরজায় বসে ডেকে বলে, যারা মসজিদের ভেতরে আছ, তাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি বের হয়ে এসো দেখি, তাহলে যে অধম লোকটি বেরিয়ে আসবে, সে হল এ মালেক। আর কেউ নন। মানুষের মহত্তম গুণ বিনয়। এ গুণে তিনি কিরূপ ভূষিত ছিলেন, এটি তাঁর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

এক মহিলা কোন কারণবশত তাঁকে কপট বা মোনাফেক বলে সম্বোধন করে। তিনি বলেন, মগো অন্তত বিশ বছরের মধ্যে কোন লোক আমাকে আমার আসল নাম ধরে সম্বোধন করেনি। এতদিন পরে আজ আপনিই আমাকে ঐ নাম ধরে ডাকলে। মনে হয়, আমি কি ধরনের লোক, একমাত্র আপনিই তা জানতে পেরেছেন। আমার এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝতে পেরেছি যে, লোকজন নিন্দা আর স্তুতি-দুটোই করবে। নিন্দুকরা অতিরিক্ত কুৎসা রটনা করে আর প্রশংসাকারীরা অতিমাত্রার প্রশংসা করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে। তিনি আরো বলেন, যে বন্ধুর দ্বারা কোন উপকার হয় না, তার বন্ধুত্ব ত্যাগ করা উত্তম ।

হযরত মালেক দীনার (র)-এর মূল্যবান উপদেশ :

১. এ যুগের বন্ধুত্বে রয়েছে কপটতা। প্রত্যেকের বাইরের দিকটি সুন্দর। কিন্তু ভেতরটা বড় বিশ্রী। এমনকি আলেমগণের অন্তরও কলুষিত ।
২. দুনিয়ার মোহ ত্যাগ কর। নিজেকে বাঁচাও, অন্যকে বাঁচার পথ দেখাও ।
৩. আল্লাহর ধ্যান-জ্ঞান, সাধনা ও তাঁর কাছে প্রার্থনার চেয়ে পার্থিব বিষয়াদি নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতে যে পছন্দ করে, তার মত নির্বোধ আর নেই। তার জ্ঞান খুবই অল্প, হৃদয় অন্ধ । তাই তার জীবনই বৃথা ।
৪. আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আ) কে জুতো আর লাঠি দিয়ে বললেন, যান, সারা দুনিয়া ভ্রমণ করুন আর সৃষ্টিজগৎ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করুন। যে পর্যন্ত জুতো ক্ষয় না হয় এবং লাঠি ভেঙে না যায়, ততদিন পর্যন্ত আপনি কেবল আমার অবদান ও মাহাত্ম্য সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকুন । এর অর্থ হল, আল্লাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্য নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর পথে অগ্রসর হোন ।
৫. কোন এক ঐশীগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (স)- এর অনুগামীদের আমি দু’টি জিনিস দান করেছি— যা ফেরেশতা জিবরাইল ও মিকাইলকেও দেইনি। একটি হল আমার প্রতিশ্রুতি- তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করব। আর একটি হল, আমি ওয়াদা করেছি, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব ।
তওরাতে উল্লেখ রয়েছে, হে সত্যানুসারীগণ! তোমরা পার্থিব জীবনে আমার গুণগান করে সুখী হও। জেনে রাখ, আমার প্রশংসা ও গুণগান করা দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা বড় সম্পদ এবং পরকালের জন্য সেরা নিয়ামত। অন্য এক ঐশী- গ্রন্থে আছে- আল্লাহ্ বলেন, যে দুনিয়াকে ভালবাসে সে দুনিয়াতে আমার ক্ষুদ্র ও নিকৃষ্ট বস্তু লাভ করবে। সে আর মোনাজাত, ইবাদত, মোরাকাবা, মোশাহাদায় স্বাদ উপভোগ করবে না। আমি তার অন্তর থেকে উপাসনার স্বাদ উঠিয়ে নিয়ে যাই ।
৬. যে সব সময় প্রবৃত্তির অনুগত, শয়তান তার কাছে বেশি যাতায়াত করে না। কেননা, সে মনে করে প্রবৃত্তির মাধ্যমেই শয়তানের কর্ম সম্পাদিত হয়ে থাকে।
৭. যে তোমার সেবা করছে, তার সেবায় সন্তুষ্ট থাক । তাহলেই আখেরাতে মুক্তি পাবে।

অনন্ত জীবনে মালেক দীনার (র) – হযরত মালেক দীনার (র)-এর মৃত্যের পর তাঁকে এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, আল্লাহর দরবারে কেমন ব্যবহার পাচ্ছেন? তিনি বলেন, আমি পাপী। কিন্তু আমার মধ্যে ঈমান ছিল বলে আল্লাহ্ আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। আরো স্বপ্নে দেখেন, মালেক দীনার (র) এবং ওয়াসে (র) এক সঙ্গে জান্নাতের দিকে এগুচ্ছেন। দরজায় হাজির হয়ে প্রথমে মালেক দীনার (র) ও পরে ওয়াসে (র) ভেতরে গেলেন। এ দৃশ্য দেখে স্বপ্নদর্শনকারী চিন্তা করলেন ওয়াসে দীনার (র)- এর চেয়ে মালেক দীনার (র)- এর মর্যাদা কী কারণে এতবেশী যে তিনি প্রথমেই জান্নাতে দাখিল হলেন। তখন আকাশবাণী শোনা গেল- ওয়াসে সবসময় দু’টি জামা ব্যবহার করতেন। আর মালেকের ছিল একটি জামা। দু’জনের মধ্যে মাহাত্ম্যের ব্যবধান এখানেই ।

গ্রন্থসূত্র – তাযকিরাতুল আউলিয়া
মূল – হযরত খাজা ফরীদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরী
অনুবাদ – মাওলানা ক্বারী তোফাজ্জল হোসেন ও মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ হাসান
সিদ্দিকিয়া পাবলিকেশন্স

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles