সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালী জাগরণের কবি। পরাধীন জাতিকে স্বকীয় বৈশিষ্টে জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। কাজী নজরুল ইসলাম এর দ্রোহ, সাম্য ও ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল সমগ্র বাংলা। আপন খবরের এবারের আয়োজনে থাকছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কিছু অনন্যসাধারণ বাণী সমাহার।
১. যে গাহিতে জানে, গানের পাখি যে, তাহাকে ছাড়িয়া দিবো দূর বন-বিথারে বনানীর কোলে- আমাদেরই আশে পাশে থাকিয়া আমাদের অবসাদক্লিষ্ট মুহূর্তকে সে গানে গানে ভরিয়া তুলিবে। প্রাণে প্রাণে নব প্রেরণার সঞ্চার করিবে। ইহারা আমাদের সুন্দর সাথী।
২. পশুর মতো সংখ্যা গরিষ্ঠ হইয়া বাঁচিয়া আমাদের লাভ কি? যদি আমাদের গৌরব করিবার কিছুই না থাকে।
৩. ভিতরের দিকে আমরা যত মরিতেছি, বাহিরের দিকে আমরা তত সংখ্যায় বাড়িয়া চলিতেছে। এক মাঠ আগাছা অপেক্ষা একটা মহীরুহ অনেক বড়-শ্রেষ্ঠ।
৪. দুর্যোগ রাতের নিরন্ধ্র অন্ধকার ভেদ করিয়া বিচ্ছুরিত হোক আমাদের প্রাণ-প্রদীপ্তি।
৫. প্রাণের প্রাচুর্যে আমরা যেনো সকল সংকীর্ণতাকে পায়ে দলিয়া চলিয়া যাইতে পারি।
৬. তরবারি গ্রহন করতে হয় উচ্চশিরে, উদ্ধত হস্ত তুলে; মালা গ্রহণ করতে হয় উচ্চশির অবনমিত করে- উদ্ধত হস্ত যুক্ত করে ললাটে ঠেকিয়ে।
৭. জোয়ার শুধু পূর্ণিমার চাঁদই জাগায় না, মৃত্যুর অমাবস্যার অন্তরালে ঢাকা পড়ে যে চাঁদ, সেও জোয়ার জাগায়।
৮. এ বিশ্বে কোনো কিছুই নশ্বর নয়, কোনো কিছুই হারায় না কোনোদিন।
৯. আমরা বড় কাউকে যখন হারাই, তখন তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করি- তাঁর সৃষ্টিকে তাঁর সাধনাকে শ্রদ্ধা করে, তাঁকে বাঁচিয়ে রেখে।
১০. ত্যাগের ভিতর দিয়ে জনগনকে যারা আপনার করে নিতে পারবে, তারাই হবে জনগনের নায়ক।
১১. স্রষ্টা যিনি, তাঁর সৃষ্টিতেই সুখ। নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখে সৃষ্টির সুখেই তিনি মশগুল থাকেন।
১২. আল্লাহ যে এতো বড় স্রষ্টা, তিনিও মানুষের দেখার অতীত, কল্পনার ও অতীত। তিনি শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, তাই তিনি সবচেয়ে বেশি গোপন।
১৩. ধান গাছ জন্মিয়ে মানুষ মাঠের পর মাঠকে অরণ্য করে তোলে, কিন্তু গোলাপের চাষের আয়োজন এদেশে করে কজন?
১৪. সকল প্রকার ভীরুতা হতে জীবনকে মুক্তি দিতে হবে। এই সৃষ্টির সকল কিছুকে বুঝতে হবে, জানতে হবে এবং পরিপূর্ণ ভাবে তাকে উপভোগ করতে হবে।
১৫. মহাত্মা হবার লোভ করো না।
১৬. সুন্দর কে স্বীকার করতে হয় যা সুন্দর তাই দিয়ে।
১৭. নদীর জল চলেছে সমুদ্রের সাথে মিশতে, দু ধারে গ্রাম সৃষ্টি করতে নয়।
১৮. তোমার তপস্যা যেনো তোমার সৌন্দর্য কে নিয়েই থাকে মগ্ন। তোমার চলা, তোমার বলা যেনো হয় তোমার সুন্দরের উদ্দেশ্যে। তাহলে তোমার প্রয়োজনের বাঁধ দিয় কেউ বাঁধতে পারবে না।
১৯. তোমার অন্তরতম কে ধ্যান করো তোমার বলা দিয়ে। বাধা যেনো তোমার ভিতর দিক থেকে জমা না হয়ে ওঠে।
২০. বসন্ত তো সব সময় আসে না। শাখার রিক্ততা কে যে ধিক্কার দেয় সে অসহিষ্ণু।
২১. ফুল ফোটার জন্য অপেক্ষা করতে জানে যে, সেই ফুল পায়। যে অসহিষ্ণু চলে যায়, সে তো পায় না ফুল। তার ডালা চিরশূন্য রয়ে যায়।
২২. এই কুম্ভকর্ণ মার্কা সমাজকে জাগাতে হলে আঘাত দিয়েই জাগাতে হবে।
২৩. দেবতা গ্রেট হতে পারে- কিন্তু সুন্দর নয়। তার আর সব আছে, চোখে জল নেই।
২৪. নৈকট্যের একটা নিষ্ঠুরতা আছে। চাঁদের জোৎস্নায় কলঙ্ক নেই, কিন্তু চাঁদে কলঙ্ক আছে। দূরে থেকে চাঁদ চক্ষু জুড়ায়, কিন্তু মৃত চন্দ্রলোকে গিয়ে কেউ খুশি হয়ে উঠবেন বলে মনে হয় না।
২৫. কত যুগ ধরে আপনার অতল তলায় বসে কেবলই শুক্তির পর শুক্তির বুকে মুক্তামালা রচনা করে গেল এবং আজ পর্যন্ত ব্যার্থ হয়ে রইলো তার সেই মুক্তা মালা, এ খবর কেউ রাখলো না।
২৬. যার কল্যাণ কামনা করো, সে যদি কোনদিন তোমায় দূর্ভাগ্যবশত বিষদৃষ্টিতেই দেখে, তাকেই বরণ করে নিও। তাকে ত্যাগ করো না।
২৭. ফুল ধুলায় ঝড়ে পরে, পায়ে পিষ্টও হয়, তাই বলে কি ফুল এতো অনাদরের?
২৮. ভুল করে ফুল যদি কারো কবরীতে খসে পড়ে এবং তিনি সেটাকে উপদ্রব মনে করেন, তাহলে ফুলের পক্ষে প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে কারো পায়ের তলায় পড়ে আত্মহত্যা করা।
২৯. আমরা পরের আঘাত চোখ বুজিয়া সহ্য করি, কিন্তু স্বজনের আঘাত সহিতে পারি না।
৩০. দুঃখের দিনেই প্রাণের মিলন সত্যিকার মিলন হয়।
৩১. ভিক্ষা যদি তোমার কাছে কেউ চাইতেই আসে অদৃষ্টের বিড়ম্বনায়, তাহলে তাকে ভিক্ষা না দাও, কুকুর লেলিয়ে দিও না যেনো।
৩২. মন্থনের একটা স্টেজ আসে- যাতে করে সুধা ওঠে। সেইখানেই থামতে হয়। তার পরেও মন্থন চালালে ওঠে বিষ।
৩৩. যাকে ভাসিয়ে দিয়েছো স্রোতে, তাকে দড়ি বেধে ভাসিয়ো না। ওকে তরঙ্গের সাথে ভেসে যেতে দাও। পাহাড়ে কি চোরাবালি কি সমুদ্দুর, এক জায়গায় গিয়ে সে ঠেকবেই।
৩৪. তোমার কাব্য সাধনা তোমায় যে ডিগ্রি দান করেছে বা দেবে তা হবে তোমার মাথার অলঙ্কার-শিরোপা। এটাই তোমার সত্যিকার গর্ব্ব করার জিনিস।
৩৫. তুমি আজকের মানুষদের খুশি করতে যেয়ে কালকের অনাগতদের অসম্মান অর্জন কোরো না যেনো।
৩৬. সরব হাততালির লোভের চেয়ে নীরব চোখের জলের অর্ঘ্য তোমার কাম্য হোক।
৩৭. খোদা মানুষকে বাকশক্তি দিয়াছেন শুধু মনের কথা গোপন করবার জন্য।
৩৮. যাকে হরদম দেখতে পাওয়া যায়, এমন একটা ব্যক্তি যে সারা দুনিয়ার মশহুর একজন লোক হবেন, এ আমরা সইতে পারি না।
৩৯. যে জিনিসটা জীবনের ভিতর দিয়ে, নিজের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুভব করিসনি, সেটাকে সমালোচনা করতে যাসনে যেনো।
৪০. আমরা নিয়তই বাধন ভাঙার ডোর সৃজন করে, ঐ অসীমতাকে ধরবার চেষ্টা করছি, আর দুষ্টু চপল শশক-শিশুর মত সে ততই এক অজানা বনের গহন-পথের পানে ছুটে চলেছে।
৪১. মৃগতৃষিকার মতো সুখ শুধু দূর তৃষিত মানবাত্মার ভ্রান্তি জন্মায়। কিন্তু সুখ কোথাও নেই। সুখ বলে কোনো চীজের অস্তিত্বও নেই। ওটা শুধু মানুষের কল্পনা। অতৃপ্তিকে তৃপ্তি দেবার জন্য কান্নারত ছেলেকে চাঁদ ধরে দেবার মতো ফুসলিয়ে রাখা। আত্মা একটু সজাগ হলেই এ প্রবঞ্চনা সহজেই ধরতে পারে।
৪২. মানুষকে- তার চির অমর আত্মাকে- তার সত্যকে বুঝতে হলে তার অন্তর-দেউলে প্রবেশ করতে হবে। তার বাইরের মিথ্যা আচার ব্যাবহারকে সত্য বলে ধরবো কেনো?
৪৩. মন্দিরে গিয়ে পূজা করা আর মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াটাই কি ধর্মের সার সত্য? এগুলো তো বাইরের বিধি।
৪৪. কত ঝঞ্ঝা, কত বজ্র, কত বিদ্যুতের পরিণতি এই বৃষ্টিধারা, এই চোখের জল।
৪৫. অলঙ্কার সুন্দর, কিন্তু ও কঠিন বস্তু দিয়ে প্রাণের পিপাসা মিটে না।
৪৬. ঢেউ ধরতে গেলেই জলে ডুববে। গন্ধ ধরতে গেলেই বিধবে কাটা। শ্যামলিমা ধরতে গেলেই বাজবে শাখা।
৪৭. পীড়িত মনের ছাপ মুখের মুকুরে ধরা পড়ে।
৪৮. অর্থ দিয়ে কি মানুষের হাতের সেবার আর শ্রমের প্রতিদান দেয়া যায়?
৪৯. যে দানে অহঙ্কার নেই, তাকে কি উপেক্ষা করতে আছে?
৫০. যে প্রেমে অবিশ্বাস করে, তার মতো হতভাগ্য বুঝি বিশ্বে কেউ নেই। তার কোথাও কোনো কিছুতেই সুখ নেই।
অসংখ্য ধন্যবাদ সবাইকে।
সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী