আপন ফাউন্ডেশন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

আপন খবর – ৭ম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১

আপন খবর - Apon Khobor

লাবিব মাহফুজ চিশতী
- Advertisement -

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৭ম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

প্রবন্ধ – একটি গানের তাফসির

লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

শুধু আরবী ভাষা শিখলেই জ্ঞানী হওয়া যায় না, ধার্মিক হওয়া যায় না। আপনাদের মতো হাজার হাজার মৌলবীগণ মাদ্রাসার বিদ্যা ত্যাগ করে গুরুর/মুর্শিদের নিকট বায়াত হয়ে, তাঁর খেদমত করে আল্লাহর অলি হয়েছে/হচ্ছে, তা সামান্য ইতিহাস ঘাটলেই জানা যায়। তা আপনারা জানলেও স্বীকার করবেন না। কারণ, তা হলে ধর্ম ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যাবার ভয় আছে যে, ইহাই তকদির। সেজন্যই অজ্ঞ-মূর্খরা মতলব পূরণ করার জন্য ধর্মের নামে ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার, মারামারি-কামড়াকামড়ি করে বেড়ায়। ধর্ম এবং ধর্ম প্রচার গায়ের জোরে হয় না, কখনো হয় নি। প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা এবং জ্ঞানের (ইলমে এলাহী/ইলমে নব্বী/ইলমে মারেফাত/ইলমে সিনার) দ্বারা হবে। গায়ের জোরে গুন্ডা হওয়া যায়, ধর্ম প্রচারক হওয়া যায় না, পীর/মুর্শিদ হওয়া যায় না।

একই পথের পথিক বামন মৌলবী রফিকুল ইসলামও। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য, লোক জমায়েত করার জন্য এ সমস্ত বামন মোল্লাদেরকে ওয়াজের মজলিশে উপস্থিত করা হয়। ধর্মজ্ঞান বিবর্জিত একটি চরম বেয়াদব ছেলে। ভাষার মধ্যে কোনো শ্লীলতা নেই, মাধুর্য্য নেই, কোনো জ্ঞান নেই। তার ফোনে অশ্লীল ভিডিও পাওয়া গেছে এবং সে নিয়মিত পর্নোগ্রাফি ভিডিও দেখাসহ রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতো। সে জন্য তাকে গ্রেফতার করে জেলখানায় প্রেরণ করা হয়েছে (যুগান্তর-১৪ই এপ্রিল/২১ইং)। গ্রেফতার করা হয়েছে মৌলবী মামুনুল হক সহ আরো উগ্র-উচ্ছৃঙ্খল ধর্ম সন্ত্রাসীদেরকে। সমস্ত দেশটিকে ওরা অস্থির করে তুলেছে ধর্মের হিজাব পড়ে।

ফাঁদে পড়ে হেফাজত এখন নিজেদের ভুল স্বীকার করছে। কারণ, চুলার লাকড়ী সরে গেছে/নিবে গেছে তাই। মামুনুল হক নিজেই স্বীকার করেছে মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করার পরিকল্পনা করেছিল (যুগান্তর- ২১/৪/২১ইং, ও অন্যান্য পত্রিকা) ইহা তার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, ইহাও মতলবি কথা। হেফাজত অরাজনৈতিক দল বলে দাবী করছে, অথচ প্রকাশ্যে তার বিপরীত আচরণ করছে। মূলতঃ ওরা বিষের বোতলে মধুর লেবেল লাগিয়ে মধু বলে জনগণের সামনে তুলে ধরছে। হেফাজতের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও তাদের এ ধরনের সন্ত্রাসী ক্রিয়া-কর্মকে কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে সরকারের সাথে সমঝোতা করতে চেষ্টা করছে (যুগান্তর-২১/৪/২১ইং)।

অথচ তাদের স্বার্থোদ্ধারের কুমতলবের বলি হয়ে মাদ্রাসার কতোগুলো কচি প্রাণ ঝড়ে গেল, মায়ের কোল খালি হলো, যুগে যুগে তাই করা হয়েছে। এ ধরণের লোকদেরকে যারা আলেম বলে তারা নিজেরাও শতভাগ পথভ্রষ্ট, পাগল। এ ধরনের শত শত ক্রিয়াকর্ম মসজিদ এবং মাদ্রাসার মৌলবী-মোল্লাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে এবং তাদের দ্বারা ইহা সম্ভবও, তা বাস্তবে এবং পত্রিকায় চোখ বুলালেই দেখা যাবে/জানা যাবে। মৌলবী বাবুনগরী ও মামুনুল হকের বিরুদ্ধে হেফাজত নেতা মৌলবী শফিকে হত্যা করার অভিযোগও রয়েছে, তা তাদের ক্রিয়াকর্ম হতে বুঝা যাচ্ছে ইহা তাদের দ্বারা সম্ভবও হতে পারে।

এখন বুঝা যাচ্ছে, ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়ার জন্যই মৌলবী মামুনুল হক, বাবুনগরী’রা এ ধরণের ক্রিয়াকর্ম চালাচ্ছে। তাতে হেফাজতের মধ্যে দ্বন্দ-বিভেদ, মামলা চলছে, অনেকে হেফাজত হতে পদত্যাগ করছে। হেফাজতের অন্তরালে জামায়াত শিবিরও লুকিয়ে রয়েছে। এরা যে কতো উগ্র, গোঁড়া, উচ্ছৃঙ্খল বেয়াদব তা তাদের দ্বারা ঘটিত সাম্প্র্রতিক ঘটনাবলী এবং তাদের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য শুনলেই বুঝা যাবে। ওরা ইসলামের হেফাজতের ধূয়া তুলছে, অথচ নিজেদের চরিত্রের হেফাজত’ই করেনি। যারা ইনছানি আত্মা হারিয়ে হায়ানী আত্মার উপর চড়ে বেড়াচ্ছে (সুরা আনআম) তারা আবার ‘হেফাজতে ইসলামের’ নামে সাইন বোর্ড তুলে চোখ রাঙিয়ে নিজেদের সাফাই গেয়ে চলছে, অন্যকে হেদায়েতের বাণী শোনাচ্ছে!

নিজেদের স্বভাবের হেফাজত হলে ইসলাম হেফাজত হতো। তা না করে তারা কি হেফাজত করছে তাও বুঝে নি। ইসলাম কোথায় আর হেফাজত করছে কি! বস্তু ছাড়া গুণ থাকে না, ইসলাম কি বস্তু, কি জিনিস তা না বুঝেই অনুমান-কল্পনার পিছনে লেজ তুলে দৌঁড়াচ্ছে। সে জন্যই তাদের স্বভাব হতে/আচরণ হতে হায়ানী আত্মার গুণ-খাছিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। বিধায় রাছুলপাক (সাঃ) বলছেন, “আল ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত।” অর্থাৎ ইসলাম হলো স্বভাব ধর্ম। আরো বলছেন, “আমি এসেছি মানুষের উৎকৃষ্ট স্বভাব/গুণসমূহ (নফসে মুৎমাইন্নাহ্) জাগিয়ে তোলার জন্য (মেশকাত)।” যারা মুসলমান তাদের ভাব-ভাষা উগ্র-উচ্ছৃঙ্খল হয় না, আক্রমণাত্মক হয় না।

কারণ, শয়তানমুক্ত মানুষটিই হলো মুসলমান। মুসলমান কখনো অন্য ধর্মের উপাস্যকে গালি দিবে না (সুরা আনআম-১০৮), অন্য ধর্মের লোকদের উপর আক্রমণ করবে না, আক্রান্ত না হলে। জোর করে মুসলমান বানাবে না-এ বিষয়ে যতো যুক্তিই দেয়া হোক না কেনো সবই বাতিল বলে গণ্য। কোরান বলছে, “লা ইকরাহা ফিদ্দ্বীন” অর্থাৎ ধর্মের মধ্যে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই, তা নিজ ধর্মে কি পর ধর্মে। যারা জোর-জুলুম করে মুসলমান বানায় তারা নিজেরাই মুসলমান নয়। জোর করে হিন্দু বানানো যাবে না, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ বানানো যাবে না। চেয়ে দেখুন, হেফাজতের নেতা মৌলবী মামুনুল হকের চেহারায়ও সেই উগ্রতা এবং উচ্ছৃঙ্খলতা দৃশ্যমান, সাথে রয়েছে কপালের মধ্যে দুটি ‘খারিজী’ চিহ্ন। তার বক্তব্যে উগ্রতা-হিং¯্রতা, উত্তেজনাময় উচ্ছৃঙ্খলতা এবং আক্রমণাত্মক ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ধরনের লোকদেরকে আমি/আমরা কোনো মতেই মুসলমান বলে স্বীকার করি না- তা যতো যুক্তিই দেখানো হোক না কেনো।

“আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বাংলাদেশ”-এর ৫৫১ জন শীর্ষ আলেম হেফাজতের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবী জানিয়েছে (যুগান্তর-২৫/৪/২১ইং)। ধর্মের হিজাব পড়ে এ ধরণের মুসলমানের সংখ্যা ইয়াজিদের সৈন্যদের মধ্যে ছিল ত্রিশ হাজার। এ কথা কেউ বিশ্বাস করতেও পারেন আবার নাও করতে পারেন, সবই তকদির কিছু বলার নেই। ব্যবহারে বংশের পরিচয় বিধায় সে/তারা হায়ানী আত্মার বংশধর বলে স্বীকৃত। এ ধরনের আচার-আচরণের সর্বকালের মুসলমান নামধারীদেরকেই আমি/আমরা ঘৃণা করি। এরাই কারবালায় হযরত ইমাম হুসাইন (্আঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল/করছে। তাদের মধ্যেও কোরানের হাফেজ ছিল, মসজিদের ইমাম ছিল, মুফাচ্ছের ছিল।

আর তাদেরকে দেখে হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) বলছিলেন, “আলাইছা ফি মুসলিমুন ?” অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে কি একজন মুসলমান নেই ? আমরাও তা-ই বলি। ইয়াজিদ আর ইয়াজিদের সৈন্যদের ঈমান-আকিদা আর বর্তমান কওমী ওহাবী বা অন্যান্য মৌলবাদিদের ঈমান-আকিদা একই। সুতরাং এরাই তারা যারা কারবালায় হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আওলাদুন্নবীকে, নবীজির আহলে বাইয়্যেতের সদস্য হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ)-কে শহীদ করে ধর্মের কর্ণধার সেজেছিল। সেই হতে ইসলামের বিকৃতি কর্মটি ইয়াজিদ ও তার অনুসারীদের দ্বারা পূর্ণতা পেল। ইয়াজিদের সেনাপতি ওমর বিন সা’দ বলেছিল, “তোমরা তাড়াতাড়ি হুসাইনের মাথা কেটে নিয়ে এসো, দেখো তার জন্য যেন আবার আছরের নামাজ কাজা না হয় !” সেই মুনাফিকদের কথাটিই এখনকার মুনাফিক নামাজীরা বলছে, যা-ই করো, নামাজ পড়।

এখন নামাজ পড়লে হাশরের দিন ছোয়াব পাবে-এ ধরনের ধোঁকাপূর্ণ কথার কারণে মানুষ পথভ্রষ্ট হচ্ছে। কথাটি শুনতে মধুর মতো হলেও তাতেই রয়েছে অজ্ঞতা-মূর্খতার এক ভয়ংকর অন্ধকার ফাঁদ। যা-ই করো কথাটির মধ্যে ভালো-মন্দ সর্ব কর্মই রয়েছে। অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, মিথ্যা, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, গীবত ইত্যাদি মনে পোষণ করলে নামাজ মাত্রই হবে না। যাক, এখন ওরা হাজারো দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে আছে। মৌলবাদি ও তাদের দোসর- স্বজনরা আজ সু-সংগঠিত হয়ে কাজ করছে। তাদেরকে চিনতে হবে এবং তাদের পরিচয় সমাজে তুলে ধরতে হবে। নয় তো সাধারণ মানুষ তাদের ঈমান-আকিদা রক্ষা করতে পারবে না, পথভ্রষ্ট হবে/হচ্ছে। যদি কেউ কারবালার মুনাফিক ইয়াজিদ ও তার সৈন্যদের দেখতে চায় সে যেন এ সমস্ত নরপশুগুলোকে চিনে দেখে নেয়। দজ্জাল মুসলমান বেশেই মানুষকে পথভ্রষ্ট করবে/করছে। সে কোরানের আক্ষরিক জ্ঞানে বড় পন্ডিত হবে।

ঈমানদারদেরকে সাবধান হতে হবে, দাজ্জালকে চিনতে হবে। দাজ্জালের হুংকার শোনা যাচ্ছে। সে হুংকার দিয়ে বলছে, “সমস্ত নবীদের/অলিদের মাজার-রঁওযা, দরবার শরীফ, খানকাহ্ ভেঙ্গে দাও, মাজার পূজা বন্ধ করো, ওরশ বন্ধ করো, মিলাদ বেদআত, গান বাজনা হারাম।” যদি দাজ্জাল মোল্লাদের ভাষায় তথাকথিত শরিয়ত বিরোধী কাজের জন্য মাজার-রঁওযা, দরবার-খানকাহ্ ভেঙ্গে ফেলতে হয়, তবে নারী ধর্ষণ, শিশু বলাৎকারে জন্য, মানুষের ঈমান-আকিদা ধ্বংস করার জন্য, জঙ্গিবাদের কারণে আগে তাদের সমস্ত কওমী মাদ্রাসাগুলো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে হবে, ওদের ধর্ম ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ওদের মাদ্রাসায় শত শত নারী ধর্ষিত হচ্ছে, শিশু বলাৎকারের শিকার হচ্ছে।

নাকি বলবেন, তাতে কি হয়েছে, নামাজ পড়লেই সাতখুন মাফ! এজন্যই বুঝি আপনাদের উপদেশটি প্রচার করছেন, “যা-ই করুন, নামাজ পড়েন !” নামাজ বেহেশতের চাবি -এ চাবি মুলোর মতো ঝুলিয়ে নামাজের চাবি রেখেছেন লুকিয়ে। ফলে পুণ্যের স্থলে পাপ সৃষ্টি হচ্ছে, মানুষগুলো পশুত্বের স্বভাবের প্রভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ ধরণের লোক দেখানো নামাজীদের স্থান ওয়াইল দোযখে (সুরা মাউন)। ইহা কি প্রতারণা নয় ? আপনারা কি করছেন চেয়ে দেখুন, দাজ্জালের ডান চক্ষু কানা, বাম চক্ষু সামান্য ভালো এবং সে পশুর পৃষ্ঠে আরোহণ করে চলছে এবং সে নিজেও পশুর মতো হুংকার দিয়ে চিৎকার করছে। সে তার ডান হাতে বেহেশত আর বাম হাতে দোযখ দেখাচ্ছে। সে নিজেকেই একমাত্র সত্য পথের পথিক বলে দাবী করছে। সাধারণ মানুষগুলোকে তার/তাদের ফাঁদে ফেলে পথভ্রষ্ট করে চলছে।

যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে তারা দাজ্জাল এবং তার অনুসারীদেরকে চিনে, দেখে। ইয়াজুজ-মাজুজগুলো কামড়াকামড়ি করছে এবং তাদের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাও তারা দেখছে। দাজ্জাল অলি-আউলিয়াদের এবং তাদের শিক্ষার বিরোধীতা করবে/করছে, তাদের অনুষ্ঠানাদির বিরোধীতা করবে/করছে। ধর্মজ্ঞান আত্মার জ্ঞান দাজ্জাল এবং তার অনুসারীরা সে জ্ঞানের বিরোধীতা করবে/অস্বীকার করবে/করছে। তাদের বিকৃত ওহাবী আকিদা কেহ না মানলে/তাদের বিকৃত ওহাবীয়াত সমর্থন না করলে ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, আক্রমন, এমনকি খুনাখুনি পর্যন্ত চালাবে/চালাচ্ছে। ইহাই ছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দা মি. হামফ্রের ছয়টি শর্তের মধ্যে একটি। যেখানে অলিদের অনুষ্ঠান হবে সেখানে বাধা দিবে, ফতোয়াবাজি করবে/করছে, তাদের বিরোধীতা করে পাশে ওয়াজের ব্যবস্থা করবে/করছে। ওয়াজে অলি-আল্লাহদের বিরুদ্ধে অসম্মানজনক/অশালীন ভাব ভাষা ব্যবহার করবে/করছে (অলি- আউলিয়াদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে ওয়াজ করার কারণে আমাদের আড়াইহাজার উপজেলার এমপি আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম বাবু আমাদেরই এলাকায় এ ধরনের একটি ওহাবী দাজ্জাল মোল্লাদের অনুষ্ঠান ইচ্ছে মতো ধোলাই দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন, তাকে ধন্যবাদ জানাই, দোয়া রইলো (১৮-৩-২০২১ইং)। অলি-আউলিয়াদের, আল্লাহ প্রেমিকগণের মাহফিলের গান-বাজনার বিরোধীতা করবে/করছে। মিলাদ কিয়াম, গান বাজনা হারাম, ওরশ হারাম বলে ফতোয়াবাজি করবে/করছে।

মসজিদে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দিয়ে সমাজে দল সষ্টি করে, সমাজকে বিভক্ত করে জোর-জুলুম করবে/করছে। স্বীয় স্বার্থে কোরানকে ব্যবহার করবে, চুক্তি করে মসজিদে ইমামতির চাকরী নিবে, চুক্তিবদ্ধ হয়ে ওয়াজ করে তাদের বিকৃত মতবাদ প্রচার করবে। তাদের চুক্তিবদ্ধ ওয়াজের, ইমামতি ব্যবসা জায়েজ করার জন্য নানা রকম কুযুক্তির আমদানী করবে/করছে। চুক্তি বদ্ধ হওয়া মানেই গোলামী করা গোলামের পিছনে নামাজ জায়েজ নেই, চুক্তিবদ্ধ হয়ে ওয়াজ করাও জায়েজ নেই। সিলেটের এক মোল্লা পীরের (অলিপুরীর) ভাষায়, “যারা চুক্তিবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়ায়, ওয়াজ করে তাদের উপার্জন বেশ্যা নারীর উপার্জনের মতো।” ইহা কোনো দিনই দ্বীনের খেদমত নয়, হতে পারে না ; তবে ইহা ধর্ম ব্যবসা হতে পারে।

দ্বীনে মুহাম্মদী বা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা নিছক পুথিগত – ইহা ইহকালের বিদ্যা, পরকালের ইলেম অবশ্যই নয়। কারণ, কোরান রূপক (মুতাশাবেহাতুন) সাহিত্য, ্ রূপকের আড়ালে রয়েছে ধর্ম জ্ঞান। মাদ্রাসার আক্ষরিক বিদ্যা ধর্ম জ্ঞান নয়, ধর্ম জ্ঞানের খোসা/আবরণ/ ইলমুল কালাম। ওরা এক মসজিদ ছেড়ে অন্য মসজিদে গিয়ে তাদের মতবাদ প্রচার করে সমাজে/মুছুল্লিদের মধ্যে দ্বন্দ-বিভেদ সৃষ্টি করবে/করছে। এ ভাবে তারা যেখানেই মসজিদে চাকরী নিবে সেখানেই তাদের বিকৃত মত প্রচার করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে/করছে। রাছুল বলেন, “আলেমদের (মাদ্রাসার) ভিতর হতে দাজ্জাল বের হবে, তারা ঘরে ঘরে প্রবেশ করে মানুষের ঈমান নষ্ট করবে/করছে।” তাদের বাহির বেশ-ভূষণে সুন্দর হবে, ভিতর ময়লায় আবৃত থাকবে (হাদিস)। রাছুলপাক (সাঃ)-কে সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলো দাজ্জালকে চিনবো কি করে, দেখতে কেমন ? তিনি বললেন, দাজ্জালের বেশ-ভূষণ দেখতে আমার মতোই হবে। রাছুল দাজ্জালের পরিচয় দিয়েছেন রূপক ভাষায়, ঈমানদারগণ দাজ্জালকে চিনেন। দাজ্জালকে দাজ্জাল বললে বা চিনিয়ে দিলে ওরা আক্রমন করবে/করছে। ‘আক্রমণ করবে’ ইহা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বা চিন্তা-চেতনার কথা, আর ‘আক্রমণ করছে’ ইহা মুমিনদের কথা। রাছুলপাক (সাঃ) বলছেন, একমাত্র যারা মুমিন তারাই দাজ্জালকে চিনবে, তার কপালে ‘কাফ-ফে-রে’ তিন অক্ষর লেখা থাকবে। কেউ শুধু বিশ্বাস করে আর কেউ তা বর্তমানেই দেখে। ওরা চাঁদাবাজি করবে/করছে, ওয়াজ, মসজিদ, মাদ্রাসার নামে ব্যবসা-ভিক্ষাবৃত্তি, চাঁদাবাজি চালু করবে/করছে, নারী ধর্ষণ, শিশুদের বলাৎকার (যা লুত নবীর কওমের প্রথা) করবে/করছে। তারা নারীদের পর্দা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে, অথচ তারাই নারীদের পর্দা উন্মোচন/বস্ত্র হরণের লীলা করবে/করছে, ধর্ষণ-বলাৎকার প্রথা মাদ্রাসায় চালু রাখবে/রাখছে।

দিনাজপুর শহরের পুলহাটে কাশিমপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসা এতিমখানা শিক্ষক মাওলানা রবিউছ সানী মাদ্রাসার ১৩ বৎসরের এক ছেলেকে বলাৎকার করছে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের রছুলবাগ (মাঝিপাড়া) মাদ্রাসার শিক্ষক ১৪ বৎসরের এক ছাত্রকে পিঠিয়ে হত্যা করেছে (যুগান্তর ১৩/৩/২০২১ইং)। বরিশালের গৌরনদীর মাদ্রাসা ছাত্র ইসমাঈল হাওলাদার মিদুলকে (১৫ বৎসর) হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ রমজানপুর গ্রামের “জামেয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার” সুপার মাওলানা জাকির হোসেন, সহকারী শিক্ষক মাওলানা ফোরকান, রুহুল আমিন এবং মাওলানা বিল্লাল হোসেন। ছেলেটি ঐ মাদ্রাসারই হেফজখানার ছাত্র ছিল। ৫ই মার্চ ২০২১ইং যুগান্তরের প্রতিবেদনে জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরের পাঁচলাইশ থানাধীন মুরাদপুরে অবস্থিত “রহমানিয়া তাহফিজুল কোরান বালক-বালিকা একাডেমি” অধ্যক্ষ মাওলানা নাজিমউদ্দীন শিকল বন্দি করে ১০-১৩ বৎসরের ৭ জন বালককে অনেক দিন যাবৎ পর্যায়ক্রমে বলাৎকার করেছে। যুগান্তরের খবরে এসেছে এক মাদ্রাসার ছাত্রকে সরিষার তেল মেখে প্রায়ই বলাৎকার করাতে তার পায়ু পথে মারাত্মক ঘা হয়ে গেছে। আমাদের ঝাউগড়া গ্রামের উত্তর পাশের একটি গ্রামের ৯ জন ছেলেই মাদ্রাসা ত্যাগ করেছে বলাৎকারের কারণে। আমাদেরই গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের একটি গ্রামে মাদ্রাসার হেফজখানার ছাত্র ছিল।

ঝাউগড়া বেনজীরিয়া চিশতীয়া দরবার শরীফের পিছনে (আধা কিলোমিটার দূরে) নোয়াপাড়া গ্রামে এক মৌলবী একটি ঘর ভাড়া নিয়ে মাদ্রাসা খুলেছিল। প্রায় ৭/৮ মাসের মধ্যেই একটি বাচ্চাকে বলাৎকার করে ধরা পড়ে লোকজনের হাতে ইচ্ছে মতো মার খেয়ে পালিয়েছে। এখন আবার অন্য মৌলবী এসে নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু করেছে মাদ্রাসার নামে, হয় তো নতুন কোনো দুলহানীর সন্ধানে আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ঝাড়ফুঁকের কথা বলে এক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। রাঙ্গুনিয়ায় রুটিন করে মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতি রাতে বলাৎকার করতো মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা নাছির। ফরিদপুরে বলাৎকারের শিকার হয়ে এক মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। ফেণীতে এক মাদ্রাসা ছাত্রকে বলাৎকারের খবর যুগান্তরে এসেছে। তেমনি ময়মনসিংহে এক মাদ্রাসা ছাত্রকেও বলাৎকারের খবর যুগান্তরে এসেছে। নারায়ণগঞ্জে মাদ্রাসার ছাত্রকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে বলাৎকার করতো মাদ্রাসার শিক্ষক। মাদ্রাসার এক মৌলবীকে জুতাপেটা করছে মহিলারা ছেলেকে বলাৎকার করার কারণে। চিটাগাং রোডের এক মাদ্রাসার শিক্ষক (অনিবার্য কারণে নামটি লিখলাম না) ছাত্রকে বলাৎকার করার কারণে তার চাকরী চলে গেছে, অন্য মাদ্রাসায় গিয়ে চাকরী নিয়েও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণে আবারও চাকরী হারাতে হয়েছে। শেষে নিজের বাড়ির ভাড়াটিয়ার ছোট বাচ্চা মেয়েকেও ছাদের মধ্যে যৌন নির্যাতন করে ধরা পড়েছিল।

একুশে টিভির সংবাদ হতে জানা যায় মৌলবীরা ৫ বৎসরে ৮৩৪ জন ছেলেকে বলাৎকার করেছে। যতোগুলো বলাৎকারের খবর তার ৮০ভাগই মাদ্রাসার মৌলবীদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। মাদ্রাসার ১০-১৪ বৎসরের বালকদের বলাৎকারের ঘটনা প্রায় অধিকাংশই গোপন থাকে লোকলজ্জায় বা শিক্ষকদের ভয়ে ছাত্ররা প্রকাশ করছে না। যে কয়টি প্রকাশ পাচ্ছে তাতেই মাদ্রাসার ভয়ংকর চিত্র উঠে আসছে। প্রতিদিনই ২/১টি এ ধরণের খবর পত্রিকায় আসছে। মনে হচ্ছে লুতনবীর কওমের ঐতিহ্য মাদ্রাসায় স্বগৌরবেই ধরে রেখেছে। গত নভেম্বর মাসেই (২০২০ইং) মাদ্রাসার ৪০ জন ছাত্র মৌলবীদের দ্বারা বলাৎকারের শিকার হয়েছে, তার মধ্যে তিনজন মারা গেছে, আত্মহত্যা করেছে একজন (ডিবিসি নিউজ, ৯ই ডিসেম্বর/২০২০ইং)। আর মাদ্রাসার ছাত্রীদের অবস্থাতোও আরো ভয়ংকর, তা পত্রিকা পাঠ করলেই জানা যাবে, অনেকে লজ্জায় নিরব থেকে যাচ্ছে। মসজিদ-মাদ্রাসার মৌলবীরা মনে হয় এ ধরণের ক্রিয়াকমর্কে কিছুই মনে করেন না বা জায়েজ জানেন। কেনোই বা কিছু মনে করবে ? কারণ, তারা তো জানেই এবং বলছেই, যা-ই করুন নামাজ পড়–ন ! ওরা তো তাই করছে আর নামাজ পড়ছে ! মাদ্রাসার এ সমস্ত অশ্লীলতার সাফাই গাওয়ার জন্য তিনজন মৌলবী বক্তব্য হলো “এ ধরনের ক্রিয়াকর্মের ফলে ধর্মীয় মানসিকতা লালনকারী ব্যক্তিরা তাদের সন্তানকে হেফজখানায় দিতে আগ্রহ হারাচ্ছে, আগ্রহ হারাচ্ছে দাতারাও (যুগান্তর/ ১৯-৩-২০২১ইং)। দাতারা কেনো যে কিছু মনে করে আগ্রহ হারাচ্ছে আমি বুঝলাম না, আমার মনে হয় এ সমস্ত দাতারা বোকা !

কারণ, মৌলবীরা তো বলছেই, যা কিছুই করো, নামাজ পড়িও। ওরা যা-ই কিছু করেই তো নামাজ পড়ছে, পড়াচ্ছে, শিখাচ্ছে ! ধর্ষণ, বলাৎকার যা-ই করুক জান্নাতের চাবি তো আর ছাড়া যায় না। যে সমস্ত পিতা-মাতা ছোট বাচ্চাদেরকে কওমী মাদ্রাসায় পাঠায় নিশ্চয়ই তারাও জান্নাতের চাবির অংশীদার হবে, তাতে একটু-আধটু এমন হলে কি আর তেমন হবে। বাচ্চাদের ইহকালের একটু কষ্টের জন্য যদি সবাই জান্নাতের চাবিটা পেয়ে যায় তাতে কি সৌভাগ্যের কথা নয়! তথাকথিত জ্ঞানান্ধ/ধর্মান্ধ একদল মুসলমানগণ তাই মনে করে। এগুলোকে জ্ঞান দান করা আর গাধার নাকে গন্ধরাজ ফুল ধরা একই কথা।

আমি ইহাও জানি মাদ্রাসার অনেক মৌলবী বা তাদের স্ত্রীগণ নিজেদের মেয়েদেরকেই এ সমস্ত কারণে মাদ্রাসায় দিতে রাজি নয়। আর বড় বড় অনেক মৌলবীরা তাদের সন্তানকে মাদ্রাসায় লেখা পড়া না করিয়ে বিদেশে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে, অথচ ছোয়াবের ব্যাপারী’রা অন্যদের ছেলে মেয়েকে মাদ্রাসায় পড়ানোর জন্য অলীক ছোয়াবের কিসসা-কাহিনীর গজল গেয়ে চলছে। যাক, তিনজন মৌলবীর (হয়তো তাদের সমমনাগণও) পরবর্তী বক্তব্য হলো “এ সমস্ত ঘটনা নিয়ে ধর্মবিদ্বেষীরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।” মানে যারা এ সমস্ত ঘটনাগুলো তুলে ধরবে তারা ধর্ম বিদ্বেষী/মাদ্রাসার বিরোধী। আর যদি এ সমস্ত ক্রিয়াকর্মকে তুলে না ধরে, জায়েজ জানে বা কিছু মনে না করে বা কিছু না বলে তাহলে বুঝতে হবে সে ধর্মপ্রাণ-এ হলো তাদের মতলবী বয়ান। অপর দিকে ধর্মবিদ্বেষীরা নাকি ইহাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।

কথায় কথায় নারীদের পর্দার স্লোগান দিয়ে, মাদ্রাসায়ই একমাত্র ধর্ম শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, মাদ্রাসায় না পড়লে ধর্ম কর্ম হবে না, জান্নাতে যেতে পারবে না, আরবী না শিখলে/শুদ্ধ করে না পড়লে বেহেশতে যেতে পারবে না”-এ স্লোগান দিয়ে/ক্যানভাস করে যখন এ ধরনের দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের ঘটনা ঘটে, অপর দিকে মুক্ত মনের অধিকারী পীর/ফকিরদের সমালোচনা করবে তখন তো ইহাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেই ! হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে না করানো হচ্ছে তা কি ভাবনার বিষয় নয় ! তাহলে মোল্লাদের ভাষায়, মাদ্রাসার দাতাগণ এবং মাদ্রাসায় পড়ানোর ইচ্ছা ছিল যে সমস্ত পিতা-মাতার তারা কেনো ছেলেমেয়েদেরকে মাদ্রাসায় দিতে আগ্রহ হারাচ্ছে? নিশ্চয়ই মাদ্রাসার ক্রিয়া-কর্ম এবং পরিবেশকে কলুষিত/বিশ্রী জেনেই আগ্রহ হারাচ্ছে? তার জন্য দায়ী কারা? অবশ্যই মাদ্রাসার শিক্ষা, ঈমান-আকিদা, পরিবেশ এবং উস্তাদগণই দায়ী। যদিও এ কথাটি তাদের একদম ভালো লাগার কথা নয়, সহ্যও হবে না। তাতে কিছু বলার নেই, সবই তকদির। নারায়ণগঞ্জের ভুঁইঘরের মৌলবী (বড় হুজুর নামে পরিচিত) ১১ জন মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, খুলনার এক মৌলবী তার মাদ্রাসার ছাত্রীকে ধর্ষণ করার খবর পত্রিকায় এসেছে। এক মাওলানা মেয়েকে ধর্ষণ করে তাকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে এসে আযান দিয়ে নামাজের ইমামতি করেছিল (পত্রিকার খবর)! বলুন, দাড়ি, টুপি, পাগড়ীধারী এর চেয়ে পরহেজগারী ইমাম আর কোথায় পাওয়া যাবে! হ্যাঁ, তাই তো বলছি, যা-ই করুন, নামাজ পড়–ন! বেহেশতে হুর – পরী পাবেন ! তার জন্য এখনই ব্যবহারের কলাকৌশল জানতে হবে না !

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে বক্সগঞ্জ ইউনিয়নের শুভপুর “ওয়াছাকিয়া কোরআনিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার” ৯ বৎসরের ছাত্রীকে মাওলানা বিল্লাল হোসেন ধর্ষণ করেছে (যুগান্তর/৭ই এপ্রিল/২১ইং)। তনু, নুসরাত জাহান রাফিদের মতো অনেক ঘটনাই সমস্ত পৃথিবী ব্যাপী প্রচার পেয়েছে। ধর্ম শিক্ষা, পর্দার দোহাই দিয়ে তারাই আবার পর্দা উন্মোচণের বা দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের লীলা করে নারীদের পোষ্টমর্টেম করে চলছে। কোথাও পর্দার বরখেলাফ দেখলে তাদের চোখ রাঙানীর আস্ফালনে মাঠ গরম হয়ে যায়। কওমী ওহাবী মৌলবীদের বা তাদের সমমনা মৌলবীদের ওয়াজ মানেই নারীদের পোষ্টমর্টেম করা, পীর/ফকির/অলি-আউলিয়াদের সমালোচনা করা, রঁওযা বা মাজার, ওরশ, গান বাজনা, মিলাদ কিয়ামের বিরুদ্ধে আলোচনা করা আর রাজনৈতিক আলোচনা করা। আর তাদের বেলায় হলে পর্দা উন্মোচনের নিত্য লীলাটি জায়েজ হয়ে যায়। এজন্যই তো হেফাজতের নেতা মৌলবী শফি বলছে “মেয়েদেরকে স্কুলে দিবেন না, পর পুরুষেরা নাকি টেনে-হিছড়ে নিয়ে যাবে।”

আরো কতো কি বলছে। এর কারণ মনে হয় ওহাবী মৌলবাদি মোল্লারা আপন পুরুষ, তাই তাদের কাছে দিলে সুবিধা বেশী, জান্নাতের চাবি পাওয়া যাবে! ধর্মের হিজাব পড়ে আন্তর্জাতিকভাবে যতোগুলো জঙ্গি সংগঠন আছে সবারই ঈমান-আকিদা এক ও অভিন্ন, শুধু দলের নামটি ভিন্ন ;একই গাছের বিভিন্ন ডালপালা। তার মধ্যে হেফাজত একটি। তাদেরকে চিনতে পারাটাও তকদির আবার চিনতে না পারাটাও তকদির। ওরাই আবার পীর-ফকিরদের সমালোচনা করছে, বেদআতী, বেপর্দার স্লোগান দিচ্ছে-ক্যানভাস করছে, লজ্জাহীনতা কাকে বলে। প্রবাদ বাক্যে বলে, “ঝানযুর সুইকে বলছে তোমার গায়ে এতো ছিদ্র কেনো ?” ঝানযুরের গায়ে যে হাজার ছিদ্র তা দেখে না, সুইয়ের গায়ে একটি ছিদ্র তা দেখে সমালোচনায় ওরা পঞ্চমুখ। পীর/ফকিরগণ তো আপনাদের ভাষায় বেপর্দাই, বেদআতিই। পর্দার গুদামের মহাজন হয়ে মৌলবীদের/মাদ্রাসার মধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের নিত্য লীলা কেনো চলছে তা কি ভাবনার বিষয় নয় ! হাতিয়ার হবে কেনো সত্যই তো বলা হচ্ছে, আপনারাই তো বলাচ্ছেন, এখন সহ্য হয় না কেন ? ধর্ম ব্যবসাটি বন্ধ হবার ভয়ে! না বন্ধ হবে না, বন্ধ হওয়া উচিত ; মানব জাতির মুক্তির জন্য/কল্যাণের জন্য/শান্তিতে বাস করার জন্য। আপনাদের শিক্ষা এবং আকিদাগুলো অতি দ্রুত জঙ্গি মৌলবাদের দিকে ধাবিত করছে সমাজকে ; তা আপনাদের বক্তব্য এবং আচার-আচরণ হতেও তা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে।

সেজন্যই বলা হচ্ছে, “আল হাক্কু মুররুণ।” এ ধরনের হাজার হাজার ঘটনা তুলে ধরা যায় – যা মাদ্রাসায় ঘটে চলছে। যদি বলেন, মাদ্রাসার বাইরেও তো শত শত ধর্ষণ হচ্ছে, তা ঠিক। কিন্তু ওরা তো আর আপনাদের মতো ধর্ম শিক্ষা, পর্দার দোহাই দিয়ে ধর্মালয়/মাদ্রাসা দাবীদার নয় ! তাও পর্দা নিয়ে আপনাদের এক ঘেয়েমী, গোঁড়ামীপূর্ণ ভুল ব্যাখ্যার কারণে হচ্ছে। আমি বলছি পশু আত্মার বলয় থেকে যার মন সুরক্ষিত হয়ে ইনছানি আত্মায় কায়েম আছে তারই একমাত্র পর্দা আছে-সে দৈহিক নারী হোক আর পুরুষই হোক। কোরানে পুরুষের জন্য পর্দার নির্দেশ প্রথমে এসেছে (সুরা নূর-৩০), সে সম্পর্কে আপনারা কিছুই বলেন না ওয়াজে? যেখানে/যে সমস্ত মজলিশে নারী-পুরুষ উভয়েরই ইজ্জত-সম্মান-আব্রুর হেফাজত হয় সেখানে পর্দা আছে বলে বুঝতে হবে। নয়তো হাজারো কাপড়ের পর্দায় থাকলেও বস্ত্র হরণের লীলা চলবেই। শুধু কাপড়ের পর্দায় তা কোনো দিনই রক্ষা পাবে না, আর ধর্ষণ-বলাৎকারও বন্ধ হবে না/হচ্ছে না ; তা যে বা যারাই হোক। আসল জায়গায় পর্দা নেই, তাই এ দশা।

রাছুলপাক (সাঃ)-এর সময় মেয়েরা মসজিদে, ঈদগায়, পরামর্শ সভায় পুরুষদের সাথে যোগদান করছে, মেহমানদারী করেছে, একে অন্যের সাথে কুশল বিনিময় করেছে, কাজ করছে। আপনারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ওহাবী মত প্রবর্তন করে তার বিপরীত করছেন, তারই কুফল ইহা। চেয়ে দেখুন, তালেবান, আল কায়দা, আইএস, বোকো হারাম, আল-শাবাব নামে জঙ্গি সংগঠন গুলো কি ধরনের ভয়ংকর তান্ডব লীলা ধর্মের ছদ্মাবরণে চালাচ্ছে, কিভাবে নারী ধর্ষণ করছে। ওরা ধর্মের জন্য জেহাদ (?) করে মানুষ হত্যা করে চলছে আর কি সুন্দর দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের লীলা খেলা চালাচ্ছে। কথায় বলে চোরের মার বড় গলা। ২০/২৫ জন জঙ্গিদের অধীনে একটি মেয়ে যৌনদাসী নিয়োগ দিচ্ছে, আর বলছে, যারা তাদের যৌনদাসী হবে তারা বিনা হিসাবে বেহেশতে চলে যাবে। তাতে একশত সৌদি নারী জঙ্গিদের যৌনদাসী হওয়ার জন্য রাজি হয়ে তাদের দলে যোগ দিয়েছে। যারা তাদের যৌনদাসী হবে তারা জান্নাতে যাবে বলে ফতোয়া দিয়েছে ! ভালো, বেহেশতের পাসপোর্ট-ভিসা পাওয়া যায় যৌনদাসী হলে, মানে একটু .. .. ..।

তাহলে আর ইবাদতের প্রয়োজন কি ? এতো পর্দা পর্দা করছেন কেনো ! নারীদেরকে ধরে এনে বস্ত্র হরণের লীলা-খেলার পর জান্নাতে পাঠিয়ে দিলেই হলো। বাহ্ কতো সুন্দর সহজ সরল পথ আবিস্কার করে ফেললো ! এ ধরনের ‘সিরাতিম্ মুস্তাকিমের (?)’ পথে বাচ্চা ছেলেদেরকেও জান্নাতে পাঠানোর ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার জন্যই মনে হয় বলাৎকার করা হচ্ছে। কিন্তু বেরসিক গার্ডিয়ান বা বাচ্চা ছেলেরা জান্নাতে দিতে/যেতে একদমই রাজি হচ্ছে না যে ! আইএস জঙ্গিদের দ্বারা ধর্ষিত হতে রাজি না হওয়ায় (তাদের ভাষায় জান্নাতে যেতে রাজি না হওয়ায়) ১৭৩ মেয়ের শিরোচ্ছেদ করা হয়েছিল (যুগান্তরসহ সব পত্রিকায়/টিভি সংবাদ)। আফ্রিকার সোমালিয়ার জঙ্গি সংগঠন ‘বোকো হারাম’, ‘আল শাবাব’ দুই দলে ১২-১৫ বৎসরের ৩৪২ জন মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তারা আর ফিরে আসেনি। এক বৎসর পরে ৪/৫জন কোনো মতে ফিরে এসেছিল কিন্তু তাদের কোলে বাচ্চা ছিল। তালেবানদের অবস্থাও একই। আফগানিস্তানের এক নারী জঙ্গিদের এ সমস্ত ক্রিয়া-কর্মের প্রতিবাদ জানানোর জন্য লোহার ব্রা এবং অন্তর্বাস পড়ে রাস্তায় নেমেছিল। এর মানে মেয়েটি বুঝাতে চাইেছে আমরা নারীরা তো শত পর্দা করেও তালেবানদের হাত হতে ইজ্জত সম্মান রক্ষা করতে পারছি না, তাহলে কি লোহার পোশাক পড়ে থাকবো ? দল ভিন্ন হলেও তাদের সবারই ঈমান-আকিদা, উদ্দেশ্য এক ; জঙ্গি মৌলবাদ প্রতিষ্ঠিত করা। মনের পশুত্ব দূর করে ইনছানিয়াত কায়েম না হলে লোহার পোশাক ভেঙ্গে হলেও বস্ত্র উন্মোচণের লীলা খেলা চলবেই। সেজন্যই যারা পরকালপ্রাপ্ত মানুষ/ফকির/বস্তুমোহের উপরে বাস করছে তাদের নিকট নারীগণ নিরাপদপ্রাপ্ত বিধায় তাদের নিকট নারীগণ যাতায়াত করে। যাদের নিকট নারীদের ইজ্জত-সম্মান-আব্রু নিরাপদ নয় তাদের নিকট হতে দূরে থাকা বা পর্দা গ্রহণই উত্তম, জরুরী-সে যেই হোক। সেজন্যই পর্দা ব্যতীত মোল্লাদের নিকট নারীগণ কখনো যায় না, কারণ, মেয়েরা তাদের নিকট নিরাপদ নয়, তা তারা অবশ্যই জানে। তবে পোশাকের শালিনতা অবশ্যই স্বীকৃত, যার দেশে যে পোশাকের প্রচলন আছে সে পোশাকেই, ভিন জাতির পোশাক পড়তে হবে তার কোনো শর্ত নেই।

তবে হ্যাঁ, ফকিরদের অনুসারীদের মধ্যেও ২/৪টি এ ধরনের ঘটনা কোথাও না কোথাও অবশ্যই থাকতে পারে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর সময় তারই নিকটে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও যা ঘটছে মনের পর্দার অভাবেই ঘটছে। বস্তুমোহে বা হায়ানী আত্মার গুণÑখাছিয়তে যারা আবৃত বা হায়ানী আত্মার বংশধর যারা তারাই একমাত্র সমালোচনা করছে পীর/ফকিরদের। আমরা পীর/ফকির তাদেরকেই বলছি যারা রাছুলের ইলমে মারেফাতে/ইলমে সিনা/ইলমে এলাহীর অধিকারী/আত্মার জ্ঞানে জ্ঞানী এবং বস্তুমোহের উপরে বাস করছে, বাকাবিল্লাহ-র অধিকারী। এ ধরনের আল্লাহর অলিগণ/ ফকিরগণই হলেন একমাত্র ধর্মীয় নেতৃত্ব দানকারী হিসাবে স্বীকৃত। দাজ্জাল এবং তার অনুসারীরা তাদের বিরোধীতা করছে। আত্মার জ্ঞানই ধর্ম জ্ঞান। আউলিয়া মানেই হলো জ্ঞানী/আত্মার জ্ঞানে জ্ঞানী। অলিদের সম্পর্কে আল্লাহ নিশ্চিত আশ্বাসবাণী প্রেরণ করছেন, অলিগণই হলেন ফকির। মাদ্রাসার আক্ষরিক/ইলমুল কালামের/বিদ্যার অধিকারীদেরকে আমরা কখনোই পীর বা ফকির/অলি বলি না।

ইসলাম প্রচার হয়েছে একমাত্র অলি-আউলিয়াদের দ্বারা, কোনো আলেম-মোল্লা দিয়ে অবশ্যই নয়। বরং ওরা সত্য সনাতন এক ইসলামের গায়ে তিয়াত্তুর তালির পোশাক পড়িয়ে জোকার সাজিয়েছে। তার পরিণতি কতো ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে তা সচেতন মানুষের অবশ্যই জানা থাকার কথা। এ কথা স্বীকার করাও তকদির, স্বীকার না করাও তকদির। কারণ, লা ইকরাহা ফিদ্দ্বীন। আমাদের মহানবী (সাঃ) হতে সমস্ত অলি-আউলিয়াদের নিকটই নারীগণ দেখা সাক্ষাত, জ্ঞানার্জন করেছে/করছে, হাদিস-ইতিহাসে তার ভুরিভুরি প্রমাণ রয়েছে। তবে কখনো কখনো পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে কোথাও তার ব্যতিক্রমও হতে পারে। সমকামী ও নারী ধর্ষণকারী আলেম-মোল্লাগণই পীর/ফকিরদের সমালোচনা করছে।

রাছুলপাক (সাঃ) বলেন, “তুমি যার সমালোচনা করছ মূলতঃ তোমার চরিত্রটিই তার মধ্যে দেখতে পেয়েছ।” এতোগুলো কথা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো একটি কারণেই আমি বলতে বাধ্য হলাম। যারা হায়ানী আত্মার/নফসে আম্মারার গুণÑখাছিয়তে আবৃত তাদের নিকট হতে নারীদের পর্দা করা অবশ্যই জরুরী, সে তার মা অথবা নিজের মেয়ে হলেও। নয়তো হাজার কাপড়ের পর্দার মধ্যে থাকলেও দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের লীলা বন্ধ হবে না। চরমোনাইর নেতা মৌলবী ফজলুল করিমের এক অনুসারী (তাদের ভাষায় মুরিদ) তার নিজের মেয়েকে মামার বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বলে পথে পাটক্ষেতের মধ্যে নিয়ে ধর্ষণ করেছে (যুগান্তর ও অন্যান্য পত্রিকার সংবাদ)। চরমোনাইর নেতা মৌলবী ফজলুল করিমের অনুসারীরা সৌদিদের মতো লম্বা জুব্বা, টুপি/পাগড়ী পড়ে থাকে। তাদের ভাষায় সুন্নতি লেবাছ। তবে কেনো নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করলো ? কারণ, তার দেহের লেবাছ/পর্দা আছে কিন্তু তার মনের পর্দা ঠিক নেই। আর পশুদের জন্য তো পর্দার নির্দেশ আসেনি।

মনের মাঝে যে পশুটিকে লালন পালন করছে, সেই পশুটিই ধর্ষণ কার্যটি সংঘটিত করছে মানবের বেশে। তাই দেহের সুন্নতি লেবাছ/পর্দাটি উঠাতে/খুলতে বেশী সময় লাগে নি, সাথে মনের পর্দাটি কায়ম থাকলে এমনটি হতো না। জানা দরকার, কর্মটি বাহির থেকে ঘটে না, ভিতরের নির্দেশে কর্মটি হস্ত-পদ, মুখ, কর্ণ দ্বারা পরিচালিত হয়। খোদা তিনটি বিষয় জিজ্ঞাসা করবেন আর তা হলো দীল, কর্ণ এবং চক্ষু (সুরা বনী ইসরাঈল)। যারা ফকির তারা আজীবন পর্দাবৃতই আছে, তারা এ তিনটি বিষয়ের উপর হেফাজতকারী, অন্ধ-মূর্খরা তা জানে না। যদিও কোথাও তার ব্যতিক্রমও দেখা যায়, তারা পীর/ফকির নয়। সেজন্যই কোরানে বলা হচ্ছে, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অন্যের বন্ধু (সুরা আত্ তাওবা-৭১)।” “মুমিনদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে (সুরা তাওবা-৭২)।”

“নবী এবং মুমিনগণ একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যেই আছে (সুরা আনফাল-৬৪)।” অর্থাৎ তৌহিদে কায়েম হয়ে ‘বাকাবিল্লাহ/ওয়াজহুল্লাহর’ অধিকারী হয়ে আছে। মুমিনগণ নবীকে প্রাণের চেয়েও অধিক ভালোবাসে (সুরা আহযাব-৬)। হেদায়েত এবং রহমত (দয়া) একমাত্র মুমিনদের জন্যই (সুরা ইউনুছ-৫৭)। আর হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলকে প্রাণের চেয়েও বেশী মহব্বত করলে আল্লাহর ভালোবাসাও হয়ে যায়। তাতে তার জীবনের সমস্ত গুনাহ্ আল্লাহ মাফ করে দিবেন (সুরা বনী ইসরাঈল-৩১)। মুমিনগণ আল্লাহর দিদার প্রাপ্ত (আচ্ছালাতু মেরাজুল মুমিনীন)। খোদাকে দেখাই হলো মুমিনের নামাজ, ইহাই ছালাতুল মেরাজ। এ হাদিস মোতাবেক মাদ্রাসার আলেম-মোল্লাদের মধ্যে কয়জন মুমিন আছে তা কি ভাবনার বিষয় নয় ! এক মুমিন আরেক মুমিনের আয়না (আল মুমিনীনা মিররাতুল মুমিনীন)। রূহে ইনছানির অধিকারী মানুষটিই মুমিন, সে নারী বা পুরুষ যে-ই হোক। এরা নফস মুৎমাইন্নাহর অধিকারী/শয়তান/খান্নাছমুক্ত জান্নাতি মানুষ বিধায় তারা পরস্পর একে অন্যের বন্ধু (কোরান দ্রঃ)। তারা পর্দাবৃতই আছে। এ ধরনের মুমিনগণ এশকে ফাসেকীকে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে/করায়ত্ব করে এশকে সাদেকীনে কায়েম আছে বিধায় তাদের মধ্যে কোনো অশ্লীলতা নেই, ইহাই পর্দার হাকিকত। তাদেরই নামাজ (ছালাত) দায়েমীতে কায়েম আছে-ইহাই নামাজের কাজ (কোরান দ্রঃ)। যাক, ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষটিই পুরুষ, তা দৈহিক নারী-পুরুষ যে-ই হোক। দৈহিক আকার-আকৃতিতে তাদেরকেই মুমিন নারী-পুরুষ বলে, মূলতঃ তারা সবাই পুরুষ। যাক, বলাৎকার মানেই বলপূর্বক ধর্ষণ করা। আওয়ামী লীগ সরকার ধর্ষণের বিচার মৃত্যুদন্ড বা যাবৎ জীবন করছে কিন্তু কোন কারণে মাদ্রাসার ছেলেদের বলাৎকারে বিচার করছে না তা বুঝা গেল না।

অজ্ঞ-মূর্খরা ধার্মিক সেজে মসজিদের কমিটি করবে, টাকা আত্মসাৎ করবে, প্রতারণা করবে, সমাজের মধ্যে নেতৃত্ব দিবে/দিচ্ছে, তাতে সমাজের মানুষের অধঃপতন ঘটবে, উচ্ছৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হবে/হচ্ছে। এভাবে মানুষের ঈমান-আকিদাকে ধ্বংস করে দিয়ে অন্ধ-মূর্খ, বধির মানব সমাজ কায়েম হবে/হচ্ছে। তখন ধর্ম শুধু অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, তাতে কোনো পূণ্য অর্জন হবে না। এখন ইবাদত করো আল্লাহ হাশরের দির সোয়াব দিবেÑএ ধরনের ধোঁকাপূর্ণ কথা সমাজের মানুষকে শিক্ষা দিবে/দিচ্ছে। ‘যাই করো নামাজ পড়’-এ ধরনের কু-মতবাদ শিক্ষা দিবে/দিচ্ছে, হাদিসের মূল অংশ বাদ দিয়ে অপব্যাখ্যা করে প্রচার করবে/করছে “নামাজ বেহেশতের চাবি।” সেজন্যই নামাজে পাপ সৃষ্টি হচ্ছে পূণ্য লাভ হচ্ছে না। কোরান শুধু অক্ষরের (আক্ষরিক বিদ্যার) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তার কোনো জ্ঞান (মুহকামাত) থাকবে না। বর্তমানে তাই হচ্ছে। রাছুল বলেন, “কেয়ামতের পূর্বে অন্ধ-বধিরদের ফেৎনা হবে/হচ্ছে।” প্রতি মূহুর্তে কোটি কোটি কেয়ামত-পুনরুত্থান সংঘটিত হচ্ছে জ্ঞানীরা তা দেখেন। কোরান মহা জ্ঞান ভান্ডার, আক্ষরিক বিদ্যা দ্বারা বা ডিকশনারী/লোগাত দ্বারা তা কখনো কোনো দিনই বুঝা যাবে না। কোরান বলছে, ‘কোরান পড়ে কেউ পথ পায় আবার কেউ পথ হারায়।” কোরানের মুতাশাবেহাতের অর্থ করে পথ হারায় আর মুহকামাত বুঝে পথ পায়।

অপর দিকে দ্বীনে মুহাম্মদীর তরিকা সম্পর্কে অজ্ঞ (যে নিজকে চিনে নি সে-ই অজ্ঞ-মূর্খ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার থাকুক বা না থাকুক) একদল মূর্খরা পীর সেজে অলিআল্লাহদের পথকে বিকৃত করে চলছে। কিছু কিছু পীর সমাজে দেখা যায় তারা দ্বীনে মুহাম্মদীর প্রতি ঈমানই আনে নি তথা কোনো পীরের/গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণই করেনি, কামালিয়াত বা ইলমে সিনা অর্জন করবে দূরের কথা। তারা পীর সেজে সমাজের সাধারণ মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলছে। আরেক দল আছে তারাও বেমুরিদান, ওরা লাল কাপড় পড়ে/সংক্ষিপ্ত কাপড় পড়ে খাজা বাবার নামে গাজা বাবার ভক্ত সেজে গাজা খেয়ে চলছে এবং খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ)-এর নামে ওরশ মাহফিল করে চলছে, আর অশ্লীল কাফেলা গানের ব্যবস্থা করে হাজার হাজার টাকা কামিয়ে গাজা খাওয়ার পুঁজি-রুজির ব্যবস্থা করছে। ওরশের সময় পথভ্রষ্ট কিছু লোক পবিত্র মাজার বা রঁওযা শরীফের আশে পাশে বসে নানা রকম নেশাদ্রব্য বিক্রি করছে, খাচ্ছে। তাতে মাজারের পরিবেশ-পবিত্রতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের ক্রিয়া-কর্ম হতে মৌলবাদিরাও সমালোচনা করার ফায়দা লুফে নিচ্ছে। আরেক দল ওরা কারো মুরিদ নয়, হয়ও না তারা বিগত যুগের কোনো অলির আশেকীন বলে দোহাই দিয়ে পীর সেজে মানুষকে বিপদগামী করছে। আবার এক ধরনের মতলববাজ লোক রয়েছে যারা তাদের পীরের ইন্তেকালের কিছু দিন পরেই বলে বেড়ায় তাকে তার পীরে স্বপ্নে খেলাফত দান করেছে। এ কথা ২/৪ জনের নিকট প্রকাশ করে সে পীর সেজে বসে, আর কাফেলা গানের ব্যবস্থা করে মেয়েদের অশ্লীল নৃত্যগীত প্রদর্শণ করে টাকা কামানোর ধান্ধায় থাকে।

এ ধরনের পীরগুলো তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মৌলবী লেংড়া ইলিয়াছের মতো, সেও স্বপ্নে তাবলিগের নিয়ম-পদ্ধতি লাভ করছে বলে দাবী করছে। পেয়েছে স্বপ্নে অথচ প্রচার করছে বাস্তবে। এ ধরনের প্রতারক পীর ও মৌলবী ইলিয়াছের প্রচারটিও যদি স্বপ্নে হতো তবে মানুষ তাদের ধোকা-প্রবঞ্চনা হতে রক্ষা পেতো। স্বপ্নে বিয়ে করে কেউ বউ পেয়েছে কি না, স্বপ্নে সহবাস করে কেউ বাচ্চা পেয়েছে কি না – ইহা বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য বুঝা কোনো দূর্বোধ্য বিষয়ই নয়, আর নির্বোধদের ব্যাপারে কিছু বলার নেই। এ ধরনের বহু পীর (?) আমাদের সমাজে দেখা যায় যাদের মধ্যে তরিকার কোনো ধ্যান-ধারণা নেই, নেই ইলমে সিনার সাথে কোনো পরিচয়। যে সমস্ত মাজার বা রঁওযা ঘিরে এ সমস্ত ক্রিয়া-কর্ম সংঘটিত হয় সে সমস্ত মাজার বা রঁওযাগুলোর পবিত্রতার রক্ষার জন্য সবারই এগিয়ে আসা উচিত। অনেকে কিছু সহজিয়া বৈষ্ণব বাউলদের এবং ২/৪ কথা সুফিদের মধ্য হতে শিখে জগা খিচুরী তত্ত্ব সৃষ্টি করে তাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রচার করে চলছে। তরিকাকে যেমন বিকৃত করছে মোল্লা পীর এবং রাজনৈতিক পীরেরা তেমনি বিকৃত করছে এ ধরণের ইলমে সিনা বিবর্জিত বেমুরিদান একদল পীরেরা, কবিরাজি পীরেরা, রাজনৈতিক পীরেরা। ধর্ম জ্ঞান বিবর্জিত কিছু সাংবাদিক কবিরাজদেরকেও ‘ফকির’/পীর বলে সম্ভোধন করে তাদের বিকৃত ঘটনার কথা পত্রিকায় প্রকাশ করতে দেখা যায়।

ফকির আর কবিরাজের মধ্যে কি প্রভেদ সে সম্পর্কে ওরা একেবারেই বেখবর। দ্বীন ইসলামের তরিকা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তাদের দ্বারাও বিকৃত প্রচার চলছে। সাধারণ কিছু লোকের মুখে শোনা যায় তারা কবিরাজদেরকে ‘ফকির’ সম্বোধন করছে, ইহা তাদের অজ্ঞতার কারণেই হয়। তারা ‘ফকির’ কাকে বলে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। ‘ফকিরদের’ কথা কোরানের বেশ কয়েক জায়গাই তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে সুরা বাকারার ২৭৩ নম্বর আয়াতটি উল্লেখ্য যোগ্য। ‘ফকির’ অনেক উচ্চস্তরের একটি কথা। যিনি আল্লাহর ফেৎরাতে (সিফগাল্লাহয়) কায়েম হয়ে ওয়াজহুল্লাহর অধিকারী হয়েছেন তথা বাকাবিল্লাহধারী তিনিই ফকির।

ফকিরদেকে/পরকালপ্রাপ্তদেরকে (লিলফুকারাই) সাহায্য- সহযোগীতার করার জন্য খোদা নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন কোরানে। ফকিরগণই আল্লাহর রাস্তার মধ্যে (ফি সাবিলিল্লাহি) অবরুদ্ধ হয়ে আছে, তারা মানুষের নিকট কিছু চায় না, তাদের জন্য কিছু (টাকা-পয়সা বা অন্যান্য নজর নেওয়াজ) ব্যয় করার কথা সুরা বাকারার ২৭৩ নম্বর আয়াতে বিধৃত আছে এবং তা অতি উত্তম বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা ফকিরদেরকে/গুরুকে কিছু অর্থ-সম্পদ দিচ্ছে তা মূলতঃ আল্লাহপাকই দিচ্ছেন। হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রাঃ) একদিন তাঁর ভক্তদেরকে বলছেন, “মনে করো না তোমরা আমাকে কিছু দেও, না আল্লাহপাকই দেন, তোমাদের মাধ্যমে দেন।” তাতে পূণ্যটা আল্লাহপাক তোমাদের জন্য নির্ধারিত করেন। বুঝা গেল অলি আল্লাহর/ফকির/গুরুর খেদমত, তাকে নজর-নেওয়াজ পেশ সে-ই করতে পারে আল্লাাহপাক যার প্রতি দয়া করেন, করুণা করেন, অলি-আউলিয়ার খেদমত করে পূণ্যার্জনের তৌফিক দান করেন। আমলে আমালিয়াত আর খেদমতে মিলে কামালিয়াত।

প্রবন্ধ – কবিতার খেলা

আপন খবর ডেস্ক

কবিরা সত্য ও সুন্দরের পূজারী। তাঁরা তাঁদের সমস্ত জীবনের সাধনার দ্বারা জগতের বুকে নিয়ে আসেন ঐশী প্রেমের ফোঁয়াড়া। তাঁদের শাশ্বত বাণীর সলিলে আবগাহন করে মুক্তিপ্রিয় ও চিন্তাশীল মানুষেরা খুঁজে পায় আত্মার খোরাক। তাদের প্রতিটি কথায় উন্মোচিত হয় এক একটি রহস্যের দ্বার।

কবিতা এমনিতেই সুন্দরের প্রকাশ। তা আরো সুন্দর হয়ে উঠে যখন জগতের শ্রেষ্ঠ কবিরা মেতে উঠেন কবিতার খেলায়! অদ্ভুত সুন্দর এ খেলা, হৃদয়ে রহস্যের মুক্তধারা প্রবাহিত হয় এসব বাণীর মাধূর্যে ও চমকপ্রদ যুক্তিবিন্যাসে। প্রাণকে করে আন্দোলিত।

মির্জা গালিব একদিন মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। মুসল্লিরা তাকে বাধা দিলো। তারা বললো,
“মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায়, পিনে কে লিয়ে নেহি”
অর্থাৎ – মসজিদ খোদার ঘর। পানশালা নয়।
গালিব তাকালেন মুসল্লিদের দিকে। আরেক চুমুক পান করে আওড়ালেন –
“শারাব পিনে দে
মসজিদ মে ব্যায়ঠ কার,
ইয়ে ও জাগা বাতাহ
যাঁহা খুদা নেহি”
অর্থাৎ – আমাকে মসজিদে বসেই মদ খেতে দাও। নয়তো এমন জায়গা দেখাও যেখানে আল্লাহ নেই।
মুসল্লিরা নির্বাক! খোদা নেই এমন জায়গা দেখানো কি করে সম্ভব!

বহু বছর পর আরেক কবি আল্লামা ইকবাল গালিবের কথার জবাব দিলেন। বললেন,
“ইয়া গালিব, মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায়
পিনে কি জাগা নেহি,
কাফির কে দিলমে যা
ওঁয়াহা খুদা নেহি”
অর্থাৎ – হে গালিব, মসজিদ খোদার ঘর। পানশালা নয়। তুমি বরং কাফিরের হৃদয়ে যাও। সেখানে খোদা নেই।

কবি আহমাদ ফারাজ প্রতিউত্তর করলেন ইকবালের কথার।
তিনি আল্লামা ইকবালকে লক্ষ্য করে বললেন,
“কাফির কে দিল মে
আয়া হু দেখ কার,
খুদা মওজুদ হ্যায় ওঁয়াহা
উসসে পাতা নেহি”
অর্থাৎ – কাফিরের হৃদয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, সেখানেও খোদা আছেন। কিন্তু কাফির তা জানেই না।

এরপর লিখলেন কবি ওয়াসি শাহ। বললেন,
“খুদা কা মওজুদ
দুনিয়া মে হার জাগা,
তু জান্নাত মে যা
ওঁয়াহা পিনে সে মানা নেহি”
অর্থাৎ – খোদা দুনিয়ার সব জায়গাতেই আছেন। বরং তুমি জান্নাতে যাও। সেখানে পান করতে নিষেধ নেই।

এবার জবাব নিয়ে এলেন কবি সাকী ফারুকী। তিনি বললেন,
“পীতা হু সাকি
গাম-এ দুনিয়া ভুলানে কে লিয়ে,
জান্নাত মে কৌন সা গাম হ্যায়
ইসি লিয়ে ওঁয়াহা মাজা নেহি”
আমিতো পান করি দুনিয়ার যাতনা ভুলতে। কিন্তু জান্নাতে কোনো যাতনা নেই। তাই সেখানে মদ খেয়েও কোনো মজা নেই।

প্রবন্ধ – সঙ্গীত : কোরানের স্বপক্ষে

লেখক – পুলিন বকসী

‘গান গাই আমার মনরে বোঝাই, মন থাকে পাগল পারা
আর কিছু চাই না মনে গান ছাড়া!’

শাহ আব্দুল করিম বলছেন – গান গেয়ে তিনি তার ‘মনরে’ বোঝান এবং আপাতত গান ছাড়া ‘আর কিছু’ তিনি বোঝেনও না। সমগ্র বাংলার গ্রামগুলোতে এখনও অল্পবিস্তর দু’একজন বাউল-ফকিরদের দেখা মেলে, তারা গান গেয়ে চলেন রাস্তায় নইলে ট্রেনের কামরায় কিংবা বিলের কোনায়, হাতে হয়তো একটা একতারা নইলে দোতারা থাকে। অনেক পীরের খানকা আছে যেখানে গান তথা সেমা সঙ্গীত চলে অহরহ। আর ভারতবর্ষীয় সুফিদের গানের সুনামের কোন বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই সময়ে তীব্র অক্ষরবাদী প্রবণতা, সেইসাথে ইউরোপ-আমেরিকার ঔপনিবেশিক ও পূজিবাদি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ইউরোপ-আমেরিকা কর্তৃক তথাকথিত ‘শান্তি’ ও ‘গণতন্ত্র’ এক্সপোর্টের অযুহাতে মধ্যপ্রাচ্য সহ আফ্রিকায় গণহত্যা ইত্যাদির সাথে সৌদী আরবের পেট্রোডলারের রাজনীতির বদৌলতে ‘ওয়াহাবিবাদ’এর তীব্র প্রসারের কারনে আমাদের ভারতবর্ষীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক অর্থোডক্সি প্রবনতা বেড়েছে। সেটা কখনও ‘ব্রাক্ষণ্যবাদ’ বা কখনো ‘সালাফিবাদ’ নামে। এই অতি ‘পিউরিটান’ প্রবনতায় গানকে ধরা হচ্ছে ‘নাজায়েজ’ কিংবা হারাম কর্ম হিসেবে এবং কিছুকিছু জায়গায় এমনও দেখা যাচ্ছে তরুণেরা এই ‘অতি শুদ্ধতার’ বশবর্তী হয়ে তাদের বাদ্যযন্ত্রও ভেঙ্গে ফেলছেন!
গান প্রসঙ্গে এবং গানের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার প্রশ্নে যেহেতু হাদিসে এবং ক্ল্যাসিক্যাল মুসলিম মনীষিদের দু’রকম বয়ানের বিবৃতিই আমরা পাই, সুতরাং হাদিস সংক্রান্ত বিবৃতিতে না গিয়ে আমরা কোরানিক বয়ান মতে গান বিষয়ক ‘জায়িজ-নাজায়িজে’র তত্ত্ব-তালাশ করি।

গান নাজায়িজ বা ইসলামী অন্টোলজি মতে গান সঠিক না, এই পক্ষের ব্যক্তিবর্গ কোরানের যে আয়াতগুলোকে সামনে নিয়ে আসে তা হলো-
প্রথম দলিল- ‘মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে যারা লোকদেরকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য অজ্ঞানতা বশত লাহওয়াল ক্রয় করে এবং আল্লাহর পথকে হাসি-তামাশারূপে গ্রহণ করে’।

এই আয়াতে সরাসরি গানের কোন উল্লেখ দেখা যায় না। এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ আছে তা হলো ‘লাহওয়াল হাদিস’। মুসলিম আইনবেত্তাদের মধ্যে অনেকেই ‘লাহওয়ালে’র বিভিন্ন অর্থের মধ্যে গানকেও ধরেছেন। যদি এই ‘লাহওয়ালে’র অর্থ গান হয় তাহলে অবশ্যই গান হারাম এবং নাজায়েজ কাজতো বটেই! আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এই শব্দের অর্থ করেছেন মূলত এমন- ‘গান ও তার অনুরূপ বিষয় সমূহ’। মূলত ‘লাহওয়াল’ শব্দের অর্থ আরো কিছু, যেমন- খেলা, তামাশা, অসার কথা, অপ্রয়োজনীয় বাক্যালাপ, অনর্থক কাজ ইত্যাদি যা মানুষকে তার দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে বিরত রাখে।

আবার গান বা সংগীতের জন্য আরবী ভাষায় পৃথক শব্দও রয়েছে। যেমন- ‘গেনা’ বা ‘সামা’, ‘নাগমা’। কোরানে যদি গানকে হারামই বলা হতো তাহলে ‘লাহওয়াল’ শব্দ ব্যাবহার না করে সরাসরি ‘গেনা’ বা ‘নাগমা’ শব্দই ব্যবহার করা হতো। কথা হলো, ‘লাহওয়াল’ শব্দের যে অর্থ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস দিলেন সেই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসকেই আমরা দেখি তিনি গানকে খুব পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত গানের শ্রোতাও ছিলেন! সুতরাং আমরা বলতে পারি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস সম্ভবত ‘লাহওয়াল ‘ শব্দের এই অর্থ সম্পর্কিত বিবৃতি দেন নাই।

যাহোক এই আয়াত সম্পর্কে ইমাম গাজালী আরো খানিক স্পষ্ট করে বলেন- ইসলামের পরিবতে লোকদের পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অলীক কথা ও কাহিনী খরিদ করা নিন্দনীয় এবং হারাম। এতে কারো কোন মতভেদ নেই। কিন্তু সকল প্রকার গান-বাজনা ইসলামের প্রতিকূলে বিক্রি হইতে পারে না। এটাই এই আয়াতের মূল উদ্দেশ্য। পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে গান-বাদ্যতো দূরের কথা, কোরান পাঠ করলেও হারাম হবে।
২য় দলিল- ‘তবে কি তোমরা এই কোরান দ্বারা আশ্চর্যন্বিত হও? হাসি ঠাট্টা করছো! ক্রন্দন করছো না এবং তোমরাতো সামেদুন’। এই আয়াতের শেষ শব্দ ‘সামেদুন’ -এটি যদি আরবী ভাষার শব্দ হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় উদাসীন, গাফেল অবিবেচক, বেহুদা কাজে লিপ্ত ইত্যাদি।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মতে ‘সামেদুন’ আরবী শব্দ না। তার মতে ‘সমেদ’ হুমায়রী ভাষার শব্দ এবং এর অর্থ গান। ‘সমদ’ অর্থ গান হলে ‘সামেদুন’ অর্থ গায়ক বা গান পরিবেশনকারী। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী গান অবশ্যই হারাম। সেই হিসাব মতে ‘আশচর্যন্বিত’ হওয়া, ‘হাসি-ঠাট্টা’ ইত্যাদিও হারাম হয়ে দাঁড়ায়! কিন্তু হাসি-ঠাট্টা, আশ্চর্য হওয়া ইত্যাদি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম না সুতরাং গান হারাম হওয়ারো কোন কারণ দেখিনা। আবার আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের এই বর্ননার কথা বিবৃত করেছেন ইকরামা; যার মিথ্যা বর্ণনা করার অভ্যাস ছিল।

আবার কোরানে ভিন্ন ভাষা তখনই ব্যবহার হয়েছে যখন আরবীতে সেই শব্দ নেই কিন্তু আমরা জানি গানের প্রতিশব্দ আরবীতে ছিল। গিনা, নাগমা, সামা ইত্যাদি হিসেবে। তাহলে গানের আরবী শব্দ থাকা সত্ত্বেও কোরানে কেন হুমায়রী শব্দ ব্যবহৃত হলো সে-বিষয়ক ব্যাখ্যা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস দেননি।
৩য় দলিল- আল্লাহ বলছেন,‘হে শয়তান! তুমি তাহাদের মধ্য হইতে যাহাকে পার তোমার স্বর (ছওত) দ্বারা পথভ্রষ্ট কর’।

এই আয়াত অনুযায়ী শয়তানের স্বর বা ‘ছওত’ দিয়ে অনেকেই সংগীতকেই বোঝান। আর যেহেতু শয়তানের কন্ঠ থেকেই সংগীত আসে সুতরাং সংগীত হারাম! এটা এক রকমের অদ্ভুত যুক্তি! এই ‘ছওত’ নিয়ে আরেকটি আয়াতও আছে কোরানে, যেখানে বলা হচ্ছে, ‘তোমাওরা তোমাদের ‘ছওত’ কে নবীর ‘ছওতে’র উপর কোরো না। বনী ইসরাইলের সাত নম্বর আয়াত অনুযায়ী ‘ছওত’ মানে যদি গান হয় তাহলে সুরা হুজরার আয়াত অনুযায়ী আমরা বলতে পারি ‘তোমরা তোমাদের গানকে নবীর গানের উপর কোরো না’! আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কিন্তু উপরের আয়াতের মত এই আয়াতে ‘ছওত’কে গান হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি। তাহলে ব্যাপারটা কেমন আত্মসাংঘর্ষিক হলো বলে আমাদের মনে হয়!

উপরের তিনটি সুরার তিনটি আয়াতের কোথাও গানকে হারাম, নাজায়েজ ইত্যাদি বলা হয়নি। এই আয়াতগুলোকে ভিত্তি ধরে এর বিবিধ ভাবার্থ তৈয়ার করে বহু পন্ডিতবর্গ গানকে নিষিদ্ধ বলতে চেয়েছেন। কিন্তু কোরানে কোনটি হারাম আর কোনটি হালাল সে-বিষয়ে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। যেমন-
‘তোমাদের প্রতি যা হারাম করা হয়েছে, অবশ্যই সে সম্বন্ধে বিশদভাবে, সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হয়েছে’।
কোরান দ্বারা পরিষ্কার ভাবেই শুকর, মদ, জুয়া, সুদ, জেনা ইত্যাদিকে হারাম বলা হয়েছে। এই তালিকার কোথাও সংগীতের উল্লেখ নেই। কারণ, সঙ্গীত নিশ্চয়ই কল্যাণ বয়ে আনে। বয়ে আনে সৃষ্টির সৌন্দর্য। তাইতো মাওলানা জালালুদ্দিন রূমী সঙ্গীতের মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য প্রেমের পথকে বেছে নিয়েছিলেন।

প্রবন্ধ – পাঁচ ইয়াকিন

লেখক – সালমা আক্তার চিশতী

ধর্মের মূল বিষয় হলো ইয়াকিন। ইয়াকিনের দ্বারাই ধর্ম-অধর্ম নির্ণয় হয়। এখান থেকেই শুরু ধর্ম এবং কর্ম জগতের উর্ধ্বারোহণ। নিজকে চিনার জন্য ইয়াকিন পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। পাঁচ ইয়াকিন হলো বেলগায়েব ইয়াকিন, এলমুল ইয়াকিন, আয়নুল ইয়াকিন, হক্কুল ইয়াকিন, হুয়াল ইয়াকিন। মানব দেহের মাঝে একই ইয়াকিন পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেন মানুষ খোদাকে চিনতে পারে। খোদাকে চিনার মাঝে খোদার ভেদ উন্মোচণ করা যায়। খোদা অচেনা রূপ ধরে এই নাছুতের দেশে ঘুরে বেড়ায়। খোদার ভেদ জানতে হলে নিজ সম্পর্কে চেতন থাকতে হবে। কারণ, একজন কামেল ইনসান ব্যতিত খোদার ভেদ রহস্য কেউ বলতে পারবে না। মানুষ ধ্যান সাধনা করে খোদার ভেদ রহস্য উন্মোচণ করে থাকে। এই ধ্যান সাধনা করাটা সহজ সাধ্য বিষয় নয়। একটা মানুষের সারাটা জনম পার হয়ে যায় এই আমিত্বকে দূর করার সাধনা করতে গিয়ে। আমিত্ব এমন একটা ভেজাল বিষয় যা একজন মানুষের অন্তর জগতকে বিকশিত করতে বাধাস্বরূপ এসে দাঁড়িয়ে যায়। সাধারণ মানুষ এই বাধাটিকে ভেদ করতে হিমসিম খেয়ে থাকে। খাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, দৃশ্যমান খোদার বা খোদাকে দেখে উপাসনা করা আর বেলগায়েবে বা অদৃশ্য ঈমানে খোদার ইবাদত করা এক বিষয় নয়। খোদাকে দেখে বিশ্বাস করা দুঃসাহসের বিষয়।

নিরাকার খোদাকে বিশ্বাস করার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, ইহা শয়তানও পারে। যারা ইলমে এলাহীর অধিকারী তারাই খোদা চিনে এবং খোদাতে ফানা হয়ে বাকাবিল্লাহ প্রাপ্ত হয়। জ্ঞান ও কর্ম সাধনায় তারা এই হুয়াল ইয়াকিনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সাধনার পথে ততোটুকু অগ্রগামী হতে পারে যার ইয়াকিনের দরজাটা যতো শক্তিশালী। ইয়াকিন হতে অনুরাগের প্রকাশ ঘটে এবং একজন সাধক অনুরাগের বাহনে চড়ে সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারে। অনুরাগ সাধনার বলে ধ্যানের জগতে কামিয়াবী হওয়া যায় এবং মনকে স্থির করা সম্ভব হয়। যার মন নিয়ন্ত্রণ হয়েছে তার সর্ব সাধনাই সিদ্ধি। তাই নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন ‘আল্লাহর জাতের ধ্যানের একটি মুহূর্তের মর্যাদা হাজার বছর ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’ খোদার প্রেম আর দুনিয়ার প্রতি প্রেম এক বিষয় নয়, সম্পূর্ন বিপরীত। যারা আল্লাহকে ভালবাসে তারা এই মানব জনমে খোদার খাটি বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যার ইয়াকিন যতোটুকু তার কর্ম সাধনার ফল ততোটুকু উন্নতি লাভ করবে। নিজ অস্তিত্ব সম্পর্কে যারা বে-খেয়াল তারা খোদার ভেদ জানতে পারবে না। কারণ, নিজকে চেনা মানেই খোদাকে চেনা। এ বিষয়ে যারা গাফেল তারা কি করে সে ভেদ পাবে। খোদার ভেদ-রহস্যের মূল হলো মানুষ। যারা অচেতন-গাফেল তারা নিজেরাই জানে না যে, তারা জাহান্নামের অতুল সাগরের মাঝে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। অচেতন থাকাটাই হলো ইহকাল।

বেলগায়েব ইয়াকিন বা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানদারের প্রথম কাজ। কিন্তু অদৃশ্যের বিপরীত দৃশ্য বা হুয়াজ জাহেরু। সেজন্যই কালেমার ‘লা ইলাহা-র’ অর্থ হলো অদৃশ্য উপাস্য আমার উপাস্য নয়। ‘ইল্লাল্লাহ-তে’ দৃশ্যমান আমার উপাস্য। এখানেই শয়তানের যতো বাধা, শয়তান দৃশ্যমান খোদাতে বিশ্বাসী নয়। যারা শয়তানের গুণ-খাছিয়তে আছে তারও দৃশ্যমান খোদাতে বিশ্বাসী নয়। মুসলিম বিশ্বে তাদের সংখ্যা ৭২ কাতার। কারণ, সবাই ‘লা ইলাহা-তে বিশ্বাসী ‘ইল্লাল্লাহ-তে’ (দৃশ্যমান খোদাতে) বিশ্বাসী নয়। ‘লা ইলাহা’ হলো তনজিয়া আর ইল্লাল্লাহু হলো তসবিয়া। লা ইলাহা নফী আর ইল্লাল্লাহ হলো এসবাত। বেলগায়েব হলো অদৃশ্য বিশ্বাসী। বেলগায়েবের মানে অদৃশ্য খোদা। তবে শূন্যের মাঝেই সমস্ত কারণের কারণ, মূর্তের বিমূর্ত। কারণ, শূন্য হলো পূর্ণ। শূন্য হতেই শুরু এবং সবই শূন্যের রূপ। যেই জায়গায় শেষ সেই জায়গা থেকেই শুরু। সে অদৃশ্য হতে দৃশ্যে আসার জ্ঞানকে/জানাকে ইলমুল ইয়াকিন বলে বা এলেম দ্বারা নিজেকে জানা হলো এলমূল ইয়াকিন। এই এলেম স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার এলেম নয় এই এলেম হলো মুর্শিদের তরফ থেকে প্রাপ্ত এলেম। জানার মাঝেই রয়েছে আসলের রূপ পরিচয়-দরশন করার মর্ম। জানা/জ্ঞান না হলে খোদাকে চেনা হবে না। কারণ, জ্ঞানই নূর, তার তো শেষ নেই। কারণ, আজ্জাতু কুল্লুহু আলিমুন। এলেম দিয়ে জানার পর আল্লাহর বাসিরূন শক্তির দ্বারা নিজ অস্তিত্বকে দেখা এই রূপ অবস্থানটি হলো আইনুল ইয়াকিন।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলছেন ‘হযরত আবু তালিবের পুত্র ব্যতিত আমাকে কেউ দেখেনি।’ এই দেখাটি কোন দেখা তা জানাটাই হলো জ্ঞান। তা জানতে হলে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর এলেমের শহরে সাথে যোগ সূত্র স্থাপন করতে হবে। হযরত মাওলা আলী (আঃ) হলো তার দরজা। এই দরজার ধার উন্মোচন করতে হলে মাওলা আলী (আঃ)-এর মতো বাঘের উপর সোয়ার হতে হবে। অনুরাগের বাহনে দাঁড়াতে পারলে তবে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। এমকান ও ওয়াজেব এক দরশন হলো হক্কুল ইয়াকিন। বাকাবিল্লাহ্র স্তরে পৌঁছে যাওয়া হলো হুয়াল ইয়াকিন। হুয়াল ইয়াকিনের ভেদ গোপন আছে, একমাত্র জ্ঞানীগণই তার ভেদ বুঝেন। তবে এ বিষয়ে কোরানে বলা হয়েছে, “তুমি তোমার রবের বন্দেগী করো ইয়াকিন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত।” হুয়াল ইয়াকিনে পৌঁছলে তার আর কোনো বন্দেগী থাকে না। এ স্তরে পৌছলে হয় বন্দেগী করানেওয়ালা। পাক পাঞ্জাতন অর্থাৎ হযরত ফাতেমা (আঃ), হযরত হাসান (আঃ), হযরত হোসাইন (আঃ), হযরত মাওলা আলী (আঃ) ও হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। তাঁরা প্রত্যেক মানুষের সাথে বাস করে। পাঁচ বস্তুর সাথে পাঁচ আত্মা, পাঁচ নফস, পাঁচ ইয়াকিন ইত্যাদির সমাবেশ ঘটে একজন মানুষ এই ধরাধামে প্রকাশ হচ্ছে। কারণ, এই পাঁচ ইয়াকিনের সাথে পাঁচ কালেমা সম্পর্ক রয়েছে। কালেমার ভেদ জানা হলে খোদার মূল ভেদ জানা যায়। খোদা এই পঁচিশ বন্দের ঘরে ধরা পড়েছে, অথবা বলা যায় ১২-এর ঘরে খোদা বা মানুষ মোহনায় খোদা জ্ঞানীর কাছে ধরা পড়েছে। একজন কামেল ইনসান বেলগায়েব হতে হুয়াল ইয়াকিন পর্যন্ত একই দরশন করে থাকেন। কারণ, সে সৃষ্টির ভেদ রহস্য দেখতে পায়, জানতে পারে। মূলতঃ আল্লাহই সর্ব দ্রষ্টা। তাঁর অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা সে ভেদ-রহস্য জানতে পারে। মানুষ হলো আল্লাহর ভেদ। অহেদাল অজুদের সাথে হক্কুল ইয়াকিন এর যোগ সূত্র রয়েছে এবং ওয়াজেবুল অজুদের সম্পর্ক রয়েছে হুয়াল ইয়াকিনে। এই অজুদ সম্পর্কে জানতে হলে খোদার সাথে অবিচ্ছিন্ন যোগ রাখলে তবে সর্ব কিছুর মূল জানা যাবে। জানার পূর্ণতা তখনই মিলবে যখন নিজ অস্তিত্বের মাঝে খোদার রূপ শৈলী ফুটে উঠে। নিজ অস্তিত্বের মাঝে খোদার রূপ দরশন করাটাই বা ঐক্যতায় স্থিত থাকাই হলো হুয়াল ইয়াকিন। এখানে দুইয়ের পর্দা উঠে যায়।

খোদার রূপ দরশন করার জন্য কিছু কর্ম সাধনা আছে তা করতে হবে। এই পথ পরিক্রমাগুলো গুরুর দেওয়া হতে হবে। তবেই মরা গাছে ফুল ফুটবে। কারণ, গুরুর দয়া ছাড়া একজন শিষ্য তার মূল অবস্থানে পৌঁছাতে কখনোই পারবে না। হাদিস হতে জানা যায় ‘‘তালিবুদ্দুনিয়া মুয়ান্নাস, তালিবুল উকবা মামদুদ্, তালিবুল মাওলা মুযাক্কার।” অর্থাৎ দুনিয়ার সন্ধানীগণ স্ত্রীলোক, পরকালের সুখ সন্ধানীগণ নপূংসক এবং মাওলার সন্ধনীগণ পুরুষ। পুরুষত্ব যারাই অর্জন করেছে তারাই ইয়াকিনের পূর্ণতা প্রাপ্ত হচ্ছে। তাঁদের অজুদটি হলো খোদার তরফ থেকে সাধারণ মানুষদেরকে তাঁর রূপ দরশন করার জন্য এনায়েতস্বরূপ। যেমন দই তৈরী করতে হলে দুধের সাথে অল্প করে দই মিশাতে হয়, দই না মিশিয়ে দই পাতলে দই হবে না দুধটা নষ্ট হয়ে যাবে তেমনি হয় একজন ইসানুল কামেলের অবস্থান। কারণ, তার নিজ গুরুর কাছ থেকে কিছু অর্জন না করে সে একজন কামেল ইনসানে পরিণত হতে পারবে না। মানুষ অচেতন জীব তাই খোদার আসল লীলা দেখতে পায় না। কারণ, তা দেখতে হলে দিব্য দৃষ্টি অর্জন করতে হবে সেই অচেতন ঘুম ভাঙ্গাতে হলে হক্কুল ইয়াকিন অর্জন করতে হবে।

হক্কুল ইয়াকিনের দরজাটার মালিক হলো মাওলা আলী (আঃ)। আল্লাহপাক তাঁর জবানীতে (হাদিস কুদসিতে) বলে দিয়েছেন “আল ইনছানু সিররী ওয়া আনা সিররুহ।” অর্থাৎ মানুষ আমার গোপন ভেদ এবং আমি মানুষের গোপন ভেদ। হুয়াল ইয়াকিন যার অর্জন হয়েছে সে এই হাদিসের ভেদ জানেন। মুখস্ত বিদ্যার মতো জানলে চলবে না তা অর্জন করতে হবে। মাওলার ভেদ সম্পর্কে জানলেওয়ালা একজন কামেল অলীর সঙ্গ করলে তবেই অসিমের ভেদ সম্পর্কে জানতে পারবে।

খোদার ভেদ রহস্যের ভান্ডার সম্পর্কে অবগত হতে প্রথমে হক্কুল ইয়াকিন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। খুব কম সংখ্যক মানুষ হুয়াল ইয়াকিনের দরজা হাসিল করতে পারে। হুয়াল ইয়াকিন দ্বারা খোদার ভেদ জানা যায়। যারা খোদাকে চিনতে পেরেছে তাদের মন আর বদ্ধ চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ, তাঁরা হলো মুক্ত মনের অধিকারী। প্রবাদ বাক্য রয়েছে ‘গাছের গোড়া কেটে আগার মাঝে পানি ঢাললে কি ফল হবে’ তেমনি হুয়াল ইয়াকিন প্রতিষ্ঠিত হলে ধীরে ধীরে অনুরাগ বাহনের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। নয় তো একজন সাধকের মূল উদ্দেশ্য/লক্ষস্থলটিতে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। সর্ব কিছুর মূল হলো মুর্শিদের ভেদ উন্মোচন করা। মুর্শিদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাই হলো সব ইয়াকিনের মূল।

কবিতা – নূরের কলেমা

লেখক – নাসরিন সুলতানা

হাইউন জাত গোপন ছিল লা ইলাহা নিয়ে
নূর মতলকের কারণে নিল সৃষ্টির বাঞ্ছা পুড়িয়ে।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ গোপনেতে রয়
মুহাম্মদ রাসুল জগতে প্রকাশিত হয়।
দেখে শুনে সাবেত করে পড় কালেমা
কালেমায় দেখতে পাবে আল্লাহর চেহারা।
আল্লাহ ও রাসুলকে জান রহস্য নিগূঢ়
মুহম্মদের মাঝে আল্লাহর ইচ্ছা হলো পুর।
হতে পারে দুটি নাম প্রকাশ একটি ফুল
একই তাদের শাণ মান ঈমান সবার মূল।
যে চিনেছে নাফসাহু ভেদ হলো তার হু
চিনে নিলে রাব্বাহু খুঁজে পাবে প্রভু।
আর থেকো না অন্ধ ঘরে খোল এবার দ্বার
বিশ্বাসীদের জন্য নিদর্শন রেখেছেন খোদার।
সালাত কায়েম কর দেখে খোদার সুরাত
আহাম্মদের নামের ধ্যানে আদায় কর সালাত।
মীমের পর্দা তুলে দেখ আহাদ তার নাম
ঈমানদারে চিনতে পেরে করে নিল প্রনাম।
আল্লাহ ও রাসুলকে কেউ করোনা প্রভেদ
মুর্শিদ আমার দ্বীনের রাসুল জানতে হবে ভেদ।
কোরানে তার আছে প্রমাণ, মুখের কথা নয়
আল্লাহ যাদের পথ দেখান সে সৎ পথ প্রাপ্ত হয়।
কালেমা পড় কালেমা চিনো দেখতে পাবে ঈমান
সেই ঈমানের আলোতে পাবে হাশরে আছান।

প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৭ম পর্ব

লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

তারপর আল্লাহপাক ঐ নূরকে হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের মেরুদন্ডে স্থাপন করলেন এবং ক্রমাগতভাবে ঐ নূরকে এক মেরুদন্ড থেকে অন্য মেরুদন্ডে স্থানান্তর করতে থাকলেন। যখন এ নূর হযরত খাজা আবদুল মোত্তালিবের মেরুদন্ডে অবস্থান করলো, তখন তা দুই ভাগে পরিণত হলো। এক ভাগ হযরত আবদুল্লাহর মেরুদন্ডে স্থানান্তর হলো। যে নূর হতে হাবিবে খোদা হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আগমন হলো এবং দ্বিতীয় ভাগ হযরত আবু তালিবের মেরুদন্ডে স্থানান্তর হলো। যে নূর দ্বারা হযরত আলী আলাইহিস্ সালামের আগমন হলো। হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম হতে হযরত ফাতেমা আলাইহিস সালামের জন্ম হলো। হযরত আলী আলাইহিস্ সালাম এবং হযরত ফাতেমা আলাইহিস্ সালামের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হলো এবং এ দুই পবিত্র নূরের মাধ্যমে চতুর্থ এবং পঞ্চম নূরের প্রকাশ ঘটলো অর্থাৎ ইমাম হাসান ও হুসাইনের জন্ম হলো। এভাবেই নবুয়তী পাক পাঞ্জাতনের আগমন ঘটলো। যদিও নবুয়তী পাক পাঞ্জাতনের গোপন ভেদসমূহ সিনার ইলেমের অধিকারীদের নিকট পুশিদায় রয়েছে। উক্ত আয়াত সম্পর্কে ইবনে মাসুদ, জাবের, আনাস এবং হযরত উম্মে সালমা হতেও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াত পাক পাঞ্জাতনের শাণে নাযিল হয়েছে।

দ্বিতীয় রেওয়াতটি হলো, হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের সৃষ্টির পর আদম হতে পয়দা হলো হযরত হাওয়া। হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের অজুদ সৃষ্টি করে চল্লিশ দিন শুকানো হয়েছিল। তারপর আদম আলাইহিস্ সালামের দেহে রূহ নাযিল হলো (নাফাকতু ফিহি মির রূহী)। প্রথমে আদম আলাইহিস্ সালামের দেহে অন্ধকার দেখে রূহ প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ললাটে নূরে মোহাম্মদী স্থাপন করা হয় এবং তাতে দেহের অন্ধকার বিদূরিত হয়। তখনই আদম মানবরূপ ধারণ করে এবং হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে শব্দ করলেন। জবাবে আল্লাহ পাক ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললেন। এরপর ফেরেশতাগণ আদমকে সেজদা করেন এবং আজাজিল সেজদা দিতে অস্বীকার করে কাফের শয়তানে পরিণত হয়। এ সেজদা মুলতঃ আল্লাহর জন্যই ছিল এবং আদম-আল্লাহ পৃথক ছিল না। আর আদম যেহেতু চিরঞ্জীব বা লা-মউতে স্থিত বিধায় আদমের দিকে সেজদা মানে আল্লাহকেই সেজদা করা। ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য করণীয় দিক নির্দেশনা হিসাবে আদমকে সেজদা করানো হলো ফেরেশতা দিয়ে বিধায় এখন তারাই নাজাতপন্থী দল যারা আদমকে সেজদা করবে, অন্যেরা শয়তান মরদুদের দল। তবে আদমকে সেজদা করতে হলে আদম চিনে নিয়ে (ঈমানসহ) তাকে ফিল আরদে খলিফা হিসাবে স্বীকার করে নিতে হবে। আর আদম না চিনলে আল্লাহকেও চিনা যাবে না। আদম ব্যতিত আল্লাহকে যারা পৃথক জ্ঞান করে অনুমান-কাল্পনিক ভাবে সেজদা উপাসনা করে এরা মূলতঃ শেরেকীতে লিপ্ত আছে এবং এরাই হলো তাগুতের পূজারী। কারণ, আদম আল্লাহর সীরাত ও সুরাত নিয়ে স্থিত আছেন এবং এ কামেল ইনছানই আল্লাহর গোপন রহস্য (আল ইনছানু সিররী) বিধায় আদমকে সেজদা করলে তা মুলতঃ আল্লাহকেই করা হলো।

‘মৌলুদে বরজিঞ্জি’ নামক বিখ্যাত কিতাবে আল্লামা শরীফ বরজিঞ্জি লিখেছেন, আল্লাহপাক যখন হাকিকতে মোহাম্মদীকে প্রকাশ করার ইচ্ছা করলেন তখন হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে পয়দা করলেন এবং তাঁর ললাটে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর স্থাপন করলেন। ‘আহসানুল মাওয়ায়েজ’ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, একদিন আল্লাহপাকের কাছে হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম প্রার্থনা করলেন নূরে মোহাম্মদী দর্শন করার জন্য। তখন আল্লাহপাক নূরে মোহাম্মদীকে আদম আলাইহিস্ সালামের দু’হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীকে স্বচ্ছ আয়নার ন্যায় বিকশিত করলেন। ইহা দেখে আদম আলাইহিস্ সালাম উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলীর নখ চুম্বন করতঃ উহা চোখে লাগালেন এবং নবীজিকে দেখে কলেমা পড়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনলেন। অতঃপর এ সুন্নত তাঁর বংশধরের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গেল। এ কথাটি তাফসীরে ‘রুহুল বয়ানে’ বর্ণিত আছে। তাই আযান শুনে বা আযানের মধ্যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নাম শুনে অঙ্গুলী চুম্বন করা হলো সুন্নত। এ সুন্নত যারা পালন করেন আল্লাহপাক তাদের সমুদয় গুণাহ মাফ করে দিবেন। এ ঘটনাটি শায়খ ইমাম আবু তালিব মোহাম্মদ বিন আলী মক্কী তাঁর ‘কুতুল কুলুব’ কিতাবেও বর্ণনা করেছেন।

হযরত আদম আর হাওয়া যখন বেহেশতে ছিলেন, তখন আদম হাওয়ার রূপ-সৌন্দর্যের অনেক প্রশংসা করে বললেন যে, হযরত হাওয়ার চেয়ে সুন্দর আল্লাহপাক আর কাউকে সৃষ্টি করেননি। এ কথা শুনে আল্লাহপাক জিবরাইলকে নির্দেশ দিলেন আদমকে বেহেশত ফেরদৌসে নিয়ে যাবার জন্য। বেহেশতের একটি ঘোড়াতে তুলে আদমকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। একটি অতুলনীয় সৌন্দর্যময় প্রাসাদের সামনে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন প্রাসাদের দরজা দিয়ে একটি মেয়ের রূপ দেখে হযরত আদম বেঁহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। চেতনা ফিরে পাবার পর জিজ্ঞেস করলেন, জিবরাইল ঐ মেয়েটি কে ? জিবরাইল বললেন, আখেরী নবীর মেয়ে হযরত ফাতেমা আলাইহিস সালাম।

অন্য বর্ণনা হতে আরো জানা যায় যে, যখন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম জান্নাতুল ফেরদৌসে হযরত ফাতেমাকে দেখলেন, তখন তাঁর মাথায় একটি তাজ আর দুই কানে দুইটি দুল, কোনো কোনো বর্ণনায় ফুল দেখতে পেলেন। হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে আল্লাহপাক বললেন, হে আদম, যার পবিত্র নাম আমার আরশপাকে লিখিত দেখতে পেয়েছ সেই হাবিব মোহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের মেয়ে হলো এ নারী। তাঁর নাম হলো ফাতেমা। আমার সমস্ত সৃষ্টির সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটেছে এ ফাতেমার মধ্যে। তুমি তাঁর মাথায় যে তাজ দেখেছ সেই তাজ হলো তাঁরই স্বামী হযরত আলী আলাইহিস্ সালাম। আর দুই কানে যে দুল বা ফুল দেখেছ তা হলো তাঁরই দুই পুত্র হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন আলাইহিস্ সালাম। আমার হাবিব মোহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এবং বাকি চারজন তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়েত মোট পাঁচজনকে আমি তোমার সৃষ্টির নয় লক্ষ বৎসর পূর্বেই সৃষ্টি করেছি। এ পাঁচজনই হলো পবিত্র পাঁচ তন তথা পাক পাঞ্জাতন-যাদের প্রতি মহব্বত রাখা উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য ওয়াজিব বলে কোরানের ঘোষণা করেছেন (সুরা আহযাব- ৩৩)।

হাকেম, বায়হাকী এবং তিবরানী স্বীয় গ্রন্থ ‘আস্ সগীরে’ এবং আবু নায়ীম ও ইবনে আসাকির হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন গন্দম খেলেন, তখন তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন – হে আমার রব ! আপনি হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উছিলায় আমার মাগফেরাত করে দেন। তখন আল্লাহপাক বললেন, হে আদম ! তুমি মোহাম্মদকে কিভাবে চিনলে ? হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম বললেন, যখন আপনি আমাকে সৃষ্টি করে আমার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন আমি মাথা তুলে আরশে গায়ে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ” লিখিত দেখলাম। এ থেকে বুঝতে পারলাম, ইনিই আপনার সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহপাক বললেন, “হে আদম ! মোহাম্মদকে সৃষ্টি না করলে আমি তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না।” এ হাদিসটি ইবনে আসাকির কা’বে আহবার হতে এবং হযরত মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম হতে বর্ণনা করেছেন। ইবনে আদী হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে, আবু ইয়ালা, তিবরানী তার স্বীয় গ্রন্থ ‘আওসাতে’, হাসান ইবনে আরফা তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘জুযে’ আবু হুরায়রা হতে, বাযযাজ আবদুল্লাহ ইবনে ওমর এবং হযরত আবুজর গিফারী হতে, দারে-কুতনী স্বীয় ‘আফরাদ’ কিতাবে আবু দারদা এবং হযরত জাবের হতে, আবু নয়ীম তার ‘আল-হিলইয়া’ কিতাবে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে এবং তিবরানী ওবাদা ইবনে সামেত হতে বর্ণনা করেছেন। সবগুলো বর্ণনার মূল কথা একটিই আর তা হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ” -এ কলেমার বর্ণনা। মেরাজের বর্ণনায়ও এ ধরনের হাদিসের উল্লেখ রয়েছে-যার বর্ণনা হতে জানা যায় আরশ, কুরশী, লওহ, কলম, বেহেশতের পত্র-পল্লবে, দরজায়, হুরদের কপালে সর্ব কিছুতেই এ কালেমা লেখা রয়েছে।

বায়হাকী এবং ইবনে আসাকির হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, রাছুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলেন, যখন হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করলেন, তখন তাকে তাঁর সন্তান-সন্ততি দেখালেন। হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম তাদের পারস্পারিক শ্রেষ্ঠত্ব নিরীক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে তিনি একটি চমকদার নূর দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার রব ! এ কে ? আল্লাহপাক বললেন, এ তোমার সন্তান আহামদ। সে-ই প্রথম এবং সে-ই শেষ। সেই সর্বপ্রথম শাফায়াত করবে।

হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন পৃথিবীতে আগমন করেন তখন তাঁর সাথে সমস্ত পয়গাম্বদের সম সংখ্যক লাঠিও নাযিল হয়েছিল (খাসায়েসুল কুবরা, ২য় খন্ড)। কোনো কোনো বর্ণনা হতে জানা যায়, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন বেহেশত হতে আগমন করেন তখন একটি লাঠিও সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। সেই লাঠিই বংশ পরম্পরায় মুসা নবীর নিকট এসেছিল।

বিষয়টি বুঝার দরকার যে, এ লাঠি যার নিকটই থাকবে সে-ই খোদার রহস্যের জগতে প্রবেশ করতে পারবে এবং সে-ই হলো সত্যিকারের ওলী – যে হবে গুরু বা পীর বা মুর্শিদ। ইহা একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত লাঠি কোরানে সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতে ভেদ-ঈশারায় তার বর্ণনা রয়েছে। যদিও কোরানের আরো বহু জায়গায় এ লাঠির কথা বর্ণিত আছে। কোরানে মুসা নবীর ঘটনায়ও এ লাঠির বর্ণনা রয়েছে। ইলমে সিনার অধিকারীগণ ব্যতিত আর কেহই তার সন্ধান জানে না। এ জন্য অনেক মৌলবীরা বলে থাকেন যে, লাঠি ব্যবহার করা সুন্নত। মূলতঃ তারা যা বলছে তা হলো লাঠির প্রতীক বা রূপক, তার হাকিকত বুঝেনি।

সংগীত – হইলো আল্লার গুণে মানুষ

লেখক – দেওয়ান শাহ সাদেক আলী চিশতী

হইলো আল্লাহর গুণে মানুষ পরিচয়
তাইতো মানুষ ভজিতে কয়,
এই মানুষে দীন-দয়াময়।।
ভজনের মূল আল্লাহ রাসুল
ইহাতে নাই কাহারও ভূল,
আখিরাতে পাইবে কূল
এ কথা জানিও নিশ্চয়।।
এই মানুষে আল্লাহুর শান
যে জেনেছে ধন্য জনম,
জেনে শুনে হবে চেতন
দূরে যাবে মনের ভয়।।
করলে রাসূল নামে দেহ অর্পন
কেটে যাবে নিশার স্বপন,
সুবাতাসে হইলে চেতন
দেওয়ান সাদেক বলে নাই আর ভয়।।

সংগীত – আহসান সুরতে মানুষ

লেখক – মোতালেব হোসেন চিশতী

আহসান সুরতে মানুষ, বলেছে আল্লাহ পাক পরোয়ার
কে বলে দোযখে যাবে, যে বলে সে হয় গুনাহগার।

মনোবাঞ্ছা পুরাইতে, মাওলায় গড়েছে আদম নিজ হাতে
রুহু ফুঁকে দিয়ে তাতে, দিয়েছে বিচারের ভার।

সাত আসমান সাত জমিন তাতে, বানাইয়াছে পাক জাতে
আগুন পানি খাক বাতাসে, সওয়ার হইলো তার ভিতর।

আরশ কুরছি লওহ কলম, দেখোনা তা করে মালুম
নিজে খোদা এসমে আযম, আরশে আজীমের পর।

মোতালেব কয় খোদা বান্দা, না চিনিলে যায়না ধান্ধা
পাবেনা আর এই মর্যাদা, ভেঙে দিবে পশুর উপর।

সংগীত – রুহুল আযমের দীদার

লেখক – ফকির আতিকুর রহমান

রুহুল আযমের দীদার, মনরে আমার, করবি যদি কর সমাচার
রূপের মাঝে অধর লুকায়।।
আম্মারার রুহু হায়ান, পশুর সমান, মারছে ইনছান
অবিচারে রাজ্য হারায় –
জামাদাত নাবাদাত তামাম, অহি এলহাম বন্ধ সেথায়
জুলমাতে রবি ডুবে যায়।।
আছে সে বিশ্বজুড়ে, পাবি না রে, অসীম রূপে বিরাজ করে
লা সানী হয় সেই দয়াময় –
ইনসানী বরযোখ ধরে, খুঁজলে তাঁরে, আপন ঘরে
আরেফেলে নূর জহুর হয়।।
ডেকে কয় শাই কিবরিয়া, দেল গেছে যার আরশ হইয়া
স্বরুপে তাঁর রূপটি দেখায় –
আতিক তুই হেলা করে, কবর ঘরে থাকিস না রে
জান্নাতি মাকান দেখা যায়।।

সংগীত – আল্লাহ মহান শিখায় কোরান

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

আল্লাহ মহান, শিখায় কোরান, সেই প্রতিষ্ঠান কোনখানে?
আর রহমান, আল্লামাল কোরান –
প্রমাণ সুরা আর রাহমানে।

আল্লাহ শিক্ষা দিচ্ছে কোরান, তাতে সৃষ্টি হয়রে ইনছান
সত্য সুন্দর মধুর বয়ান, প্রকাশে তাঁর জবানে।

দেখিলাম মক্তব মাদ্রাসায়, কোরান মানুষে মানুষরে শিখায়
তাতে হাফেজ ক্বারী মাওলানা হয়, এ প্রথা সবাই জানে।

আল্লাহর শিক্ষায় শিক্ষা নিবো, পরিশুদ্ধ ইনছান হবো
সেই মাদ্রাসা কোথায় পাবো, আকাশে কি জমিনে?

শুনি আল্লাহ সাত আসমানের উপরে রয়, মানুষেতে দীন দয়াময়
মোফাজ্জল পড়িল ধোঁকায়, বোঝাও আমায় জ্ঞানী জনে।

সংগীত – মুর্শিদকে খোদা জানিয়া

লেখক – হান্নান শাহ চিশতী

মুর্শিদকে খোদা জানিয়া, সাধন করে যে জনা
সেই তো ভবে পরম ভক্ত, প্রেমোভাব তাঁর নমুনা।

গুরু কথায় অশ্রুসজল, সে প্রেমোভাবে রয় অবিচল
গুরু বিনে সদা চঞ্চল, ধ্যানেযোগে রয় সর্বক্ষনা।
লোভ লালসায় দিয়ে ইতি, সে ভজন করে গুরুরতি
চেতন প্রাণে গুরুগীতি, করে সদায় মুর্শিদ ভজনা।

গুরু রূপে নয়ন দিয়া, সে ডাকে সদায় সাঁই কিবরিয়া
মুর্শিদ রূপে ফানা হইয়া, সে হয় নিত্য দেওয়ানা।

হান্নান বলে মুর্শিদ আমার, দেওয়ান সাদেক বিনা গতি কি আর
নয়নে মুর্শিদ নিহার, করলে পাবি রাব্বানা।

সংগীত – গুরু ধরে জানো তাহার পরিচয়

লেখক – জসিম চিশতী নিজামী

গুরু ধরে জানো তাঁহার পরিচয়
ওরে, চিনা জানা না হইলে, হায়ান থাকবিরে নিশ্চয়।

মনরে, উপরে কেনো তাকাও বৃথা, যেথায় শূণ্য শুধুই ফাঁকা
চন্দ্র, সূর্য আর তারকা, দেখবে শুধু আসমানে।
তোমার নিজের ভিতর আছে ঢাকা, দেখোরে কোরানে লেখা
সন্ধান করলে পাবে দেখা, সুক্ষ্ম জ্ঞান হলে উদয়।

যে চিনেছে আপনারে, সে চিনেছে পরোয়ারে
মন তাঁহার টিকেনা ঘরে, কি যেন সে বলতে চায়।
সদায় সে থাকে নিহারে, আপন মাঝে সফর করে
আত্মায় আত্মায় যোগ মিলনে, প্রেম জোশেতে মেতে রয়।

যদি, হতে চাও খোদার পিয়ারা, হওনা আগে জ্যান্তে মরা
তবেই যাবে তারে ধরা, খাহেশ থাকলে নাই উপায়।
গলে বেঁধে প্রেমো ডুরি, গুরুর দয়ার হও ভিখারী
গুরু যে দয়ার ভান্ডারী, দেখে মোল্লা জসিম কয়।

সংগীত – মানুষ খুঁজলে মানুষ পাবি

লেখক – কাঙাল আব্দুর রহমান

মানুষ খুঁজলে মানুষ পাবি, নিত্যজ্ঞান হবে উদয়
মানুষ ভজে দেখো তাতে, বিরাজিছে দীন দয়াময়।

এই মানুষেরই হৃদকমলে, বিরাজ করে সাঁই আমার
সেই মানুষের ভজলে চরণ, পাবি তাঁরে হৃদ মাঝার।
প্রভূর ভজনালয় হয় এ মানুষ, তাঁরে ভজো রে মন সর্বদায়।

এই মানুষ মোহনায় খোদা, প্রকাশ করে আপন ধন
সে হয় খোদার প্রিয় বান্দা, যে হয় সরল সমর্পণ।
ভক্তি মনে ডাকলে তাঁরে, সে গুরুরুপে জাহের হয়।

না ভজিয়া মানুষ রতন, করে খোদার সন্ধান যে জনা
সে হয় মূর্খ, পায়না কভূ, পরম প্রভূর নমুনা।
তাই কাঙালে সকল ছাড়িয়া, দয়াল পদে রত রয়।

সংগীত – মুর্শিদ সনে প্রেম করিয়া

লেখক – মোবারক হুসাইন ‍ওয়ায়েসী

মুর্শিদ সনে প্রেম করিয়া, তাঁর রূপ স্মরিয়া কান্দরে
দমে দমে হরদমে তাঁর, নাম জপরে।।
দয়াল মুর্শিদ আমার নয়ন তারা, তাঁর প্রেমে আমি আত্মহারা
অনুরাগের ঘাটে প্রেমের, তরী বান্ধরে,
তাঁর নাম ধরিয়া পাড়ঘাটাতে, কত জনা গেলো পাড়ে।।
ঐ রূপে যদি চাও ডুবিতে, তুমি গমণ করো তরিকতে
দয়াল মুর্শিদের’ই চরণ পদ্মে, রহ সদায়রে,
তিনি কৃপা করলে তোমায়, চিন্তা নাই আর ভবপাড়ে।।
শাহ শাহীন বলে মোবারকরে, বাড়াবাড়ি করিস নারে
চিনে নে তোর দেহের মাঝে, কোনজনা বাস করে,
চিনে তাঁহার করলে সাধন, পাবি তাঁরে আপন ঘরে।।

সংগীত – বিষ আর মধু এক পেয়ালায়

লেখক – বাউল উজ্জল শাহ

বিষ আর মধূ এক পেয়ালায়
বাইছা যে খাওয়াইতে পারে,
তালাশ করে তারে রে মন
তালাশ করো তারে।

যে জনা হয় প্রেম মহাজন, মহারস করে আলিঙ্গন
সাধক যেজন পায় সুটল ধন, ডুইবা প্রেম সাগরে।
সেদিন মহারসের রসিক হইয়া, ভাসে স্বরুপ ধরে
সাধনায় কৃষ্ণ পাওয়া যায়, যুগল চরণ প্রেমের ঘরে।

গুরু সত্ত্বার অপার লীলা, চার রুপে তার চার পিয়ালা
তিন পেয়ালার উর্ধ্বে যেজন, মহাজন কয় তাঁরে।
সেদিন একই ভান্ডে বইসা দুজন, অভিন্ন রুপ ধরে
উজ্জলের সাধনায় বল নাই, মা বাঁচাতন নামটি ধরে।

অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১৩ ও ১৪ পর্ব

মূল – এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী

পর্ব ১৩
অনুভব করতে শিখো মহান প্রভুর প্রভুত্বকে। তিনি তো সদা সর্বক্ষণ নিমগ্ন তোমার অভ্যন্তরীন ও বাহ্যিক কার্যাবলীর সাথে। তোমার তুমিত্ব বা আমার আমিত্ব যখন আপনত্ব থেকে বিদায় নেয়, তখনই আমাদের মানবীয় সত্ত্বায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রভুর প্রভুত্ব। তখন আমরা সদা সর্বক্ষণ থাকি মহান প্রেমময়ের প্রেম প্রতিমার চরণ তলে। প্রতিটি মানুষ-ই সৃষ্টিলগ্ন থেকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে আত্মিক ও মানবিক চরম উৎকর্ষতার পানে, যেখানে উন্নতির সর্বোচ্চ নিয়ামক হচ্ছে মহান রব কে আপনত্বে ধারন করা। আমরা মানুষ স্রষ্টার এমন একটি অপূর্ণ শিল্প যাকে পূর্ণ থেকে পূর্ণতর করার জন্য আকুলতার সাথে অপেক্ষা ও প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।

আমার প্রভু তো নির্মিত হবে আমার হৃদয়ের আকুলতা ও আমার বির্ণিমাণের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে আমার প্রভু আমার মতো এবং আমাদের মানব সত্ত্বার সুক্ষ্ম কল্পনা ও প্রভুকে চিত্রিত করার দক্ষতা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হবে আমাদের সাথে প্রভুর আচরণ। এরুপ অঙ্কিত প্রতিটি প্রভুরূপ-ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রভুকে নির্মাণ করো আপন প্রজ্ঞা, জ্ঞান আর প্রেমের সমন্বয়ে। তিনি চরমভাবেই তোমাকেন্দ্রিক। এবার তুমি তার অভিমুখী হও।

পর্ব ১৪
আমাদের প্রত্যেকেরই শিখে নেয়া উচিত যে, কিভাবে পরিবর্তন-কে স্বাগত জানাতে হয়। এক একটি পরিবর্তনের মাধ্যমেই প্রেমময় প্রভুর আশীর্বাদ নেমে আসে আমাদের ওপর।
দুর্বল চিত্তের মানুষ স্বভাবতই পরিবর্তন কে ভয় পায়। গতানুগতিকতায় যারা আচ্ছন্ন, তারা চিরকাল পুরাতন কে আঁকড়ে ধরে’ই কাটিয়ে দিতে চায় জীবন। জীবনের নতুনত্বের সংজ্ঞা থেকে ও উপভোগ থেকে তারা বঞ্চিত। জীবন উন্নত থেকে উন্নততর হয় পরিবর্তনের মাধ্যমে।

কখনোই এমনটি ভাবা যাবে না যে, পরিবর্তিত হয়ে জীবন উল্টে যাচ্ছে। বরং এটা ভাবুন যে, পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবন গতিময় হচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে অধিকতর কল্যাণের পথে। আপনি কি জানেন, আপনার বর্তমান জীবনের জীবনের চাইতে আগত জীবন কতখানি ভালো ও উন্নত হতে পারে? সে জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

দয়াময় আমাদের কে দয়াদানের জন্য প্রস্তুত। দয়া গ্রহণের জন্য আমরা প্রস্তুত কিনা – এটাই হলো আসল কথা। পরিবর্তন মানেই বর্তমান এক একটি অবস্থা থেকে মৃত্যু ও উন্নততর অবস্থানে এক একটি পূনর্জন্ম। অতএব, প্রতিটি পরিবর্তন আসে আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

স্বাগত জানান পরিবর্তনকে। নিজেকে প্রস্তুত করুন করুণাময়ের বিগলিত করুণারাশিকে আত্মায় ধারণ করার জন্য। তিনি তো পরম দয়াময়।

সম্পাদকীয় – যারা করে কলঙ্ক লেপন

লাবিব মাহফুজ চিশতী

ধর্ম আত্মমুক্তির বিধান। ত্যাগের অনুশীলন তথা রিপুনিচয়ের বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধের কঠোর সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধতার পথে ধাবমান একটি জিবন’ই হলো প্রকৃত মুসলমানের জিবন। আত্মিক পথ পরিক্রমণে মহান প্রভুর গুণাবলী মানবীয় অস্তিত্বে ফুটিয়ে তোলাই আমাদের পরম মোক্ষ। প্রভুগুণে গুণান্বিত হলেই আমরা স্থিত হবো নিত্যলোকে, শান্তির ধামে, ইসলামে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আত্মিক পরিশুদ্ধতার এ পথ তথা ইসলাম এর অবস্থা আজ বরই করুণ। অধর্মের ভয়াল থাবায় আজ মূমুর্ষ ইসলাম। ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! অধার্মিকদের সংখ্যাধিক্য আর বিস্তর অপকর্মের দরুণ ইসলাম আজ মৃতপ্রায়। গুটিকয়ের সত্যানুসন্ধানীর সাথে নির্বাসিত! আজ অধার্মিকরা ধর্মীয় নেতৃত্বে আসীন! তাদের হাতে বানানো ধর্ম দ্বারা প্রতিনিয়ত কলঙ্কিত করছে ইসলামকে।

কোরান রূপক সাহিত্য হওয়ায় এবং খোদ কোরানেই রূপক প্রতীকের অনুসরন করতে নিষেধ করা সত্ত্বেও ধর্মীয় অতিপন্ডিত শ্রেণী এবং সংখ্যাগুরু নির্বোধ কথিত ধার্মিক সম্প্রদায় কোরানের রূপক-প্রতীক অনুসরণেই তৈরী করে নিচ্ছে ধর্মবিরোধী বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম। প্রতিনিয়ত কলঙ্কিত করছে ধর্মকে। যুগে যুগে ধর্ম এসব অধার্মিকদের হাতে কলঙ্কিত হয়েছে। এসব অধার্মিকরাই সর্বকালে সংখ্যায় অধিক এবং তারা বাস করেছে ধর্মীয় নিরাপত্তা সহকারে ধর্মের ছদ্মাবরণে।

বর্তমান সময়ের এরকম একটি অতিমারী বর্বর জঙ্গী সন্ত্রাসী সংগঠন হলো তালেবান, যারা ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করে প্রতিনিয়ত কলঙ্কিত করছে ধর্মকে। আফগানিস্তান কে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ইসলামী শাসনের নামে মনগড়া বর্বর অনৈসলামিক শাসন ব্যাবস্থা কায়েম করে বিশ্বব্যাপী সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছে তালেবানরা। সীমা ছাড়িয়ে গেছে তালেবানদের অপকর্মের। এমন কোনো নিন্দিত কর্ম নেই যা তারা করছে না। জ্ঞানান্ধ, ধর্মান্ধ, উগ্র, বর্বর এই সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে আজ জিম্মি পুরো আফগানিস্তান। তারা মানুষ হত্যা থেকে শুরু করে সকল হত্যাযজ্ঞ ও অপকর্ম করে যাচ্ছে ধর্মীয় ছদ্মাবরণে। নৃশংসতা, বর্বরতা, গোঁড়ামী আর ধর্মীয় অপব্যাখ্যার অপর নাম তালেবান। দেওবন্দ পন্থী সালাফীবাদ বা উগ্র ধর্মচেতনার দ্বারা পরিচালিত এসব সন্ত্রাসীগুলো তাদের বিকৃত ও ভারসাম্যহীন ধর্মশিক্ষার প্রদর্শনী করছে আফগানিস্তানে। পরিতাপের বিষয়, অনেকেই আফগানিস্তানে তালেবান শাসন কে দেখছেন ইসলামী জাগরণ হিসেবে! সেই সব অতিবোদ্ধাদের জন্য একরাশ অনুশোচনা!

আনুমানিক দু লক্ষ সন্ত্রাসী যোদ্ধার সমন্বয়ে তৈরী তালেবান একটি আফগান উগ্র জঙ্গী সম্প্রদায় যারা বিভিন্ন অমানবিক কার্যকলাপের জন্য পরিচিত ও আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই করছে দীর্ঘদিন থেকে। ইদানিং তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় যেয়ে কথিত ইসলামী শাসনের নামে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠা করছে এমন উদ্ভট, অমানবিক আর অনৈসলামিক শাসনতন্ত্র, যা সভ্য সমাজ কল্পনাও করতে পারেনা। তারা আগেও তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা সমূহে জারি করেছিল এমন সব নিন্দিত ও বর্বর শাসনব্যাবস্থা।

মানুষ হত্যায় তালেবানদের জুড়ি নেই। প্রগতিশীল আফগানদের নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে তারা। মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছে, হাজার হাজার আফগানদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে তালেবানরা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্ধতিগত এবং ধারাবাহিক ভাবে আফগান নাগরিকদের গণহত্যা করেছে তালেবানরা। তাদের ক্ষমতায় থাকার কয়েক বছরে (১৯৯৬-২০০১) ১৫ বার গণহত্যার শিকার হয়েছে আফগানরা। নিষ্ঠুরতার কি নির্মম প্রদর্শণী! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষদের হত্যা করা হতো ছুরির দ্বারা গলা কেটে ও চামড়া কেটে!

নারীদের প্রতি অত্যাচারের মাত্রায় তালেবানরা শীর্ষে! তাদের বিকৃত ধর্মচিন্তার ফসল হিসেবে আফগান নারীদের ঘরবন্দী করা হয়েছে। হিংস্রভাবে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তারা অর্ধেক আফগান জনগোষ্ঠীকে রীতিমতো গৃহবন্দী করেছে। নারীদের ওপর নেমে এসেছে নির্মম অত্যাচার। রাস্তাঘাটে মার খেতে হয়েছে বহু নারীকে। আবার নিজেদের নোংরা যৌন চাহিদা মেটাতে এসব নারীদেরকে দলে দলে ধরে নিয়ে সৈন্যশিবিরে যৌনদাসী করা হয়েছে। নারী নির্যাতন ও শিশু বলাৎকার থেকে শুরু করে এমন কেনো যৌন নিপীড়নমূলক বীভৎসতা নেই, যা তালেবানরা করে নি।

মানব পাচারের মতো ঘৃণিত কর্মে তারা সিদ্ধহস্ত। সংখ্যালঘু জাতির নারীদেরকে যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করে তারা। তাদের অর্থের বড় একটি যোগান আসে আফিম চাষ থেকে। তারা আফগান কৃষকদেরকে দিয়ে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে পপি ফুলের চাষ করায়। মাদক বিক্রি করে তারা যোগাড় করে অর্থ। এই পপি ফুলের বীজ থেকেই আসে আফিম ও হেরোইন।

অন্যান্য আফগান জাতিসমূহের প্রতি বৈষম্যে তালেবান দের জুড়ি মেলা ভার! তাদের কথিত শরিয়া (?) আইনের কঠোরতা ও অমানবিকতার ফলে আফগানিস্তান থেকে দ্রুত তাদের সংখ্যা হ্রাস পায়। অন্যান্য ধর্মালম্বীদের ধর্মাচরণে নিষেধাজ্ঞা আনা হয় এবং তাদের প্রতি বৈষম্য ও অত্যাচার প্রবলভাবে চলে।

জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতি সকল ধর্মান্ধদের মতোই তালেবান দেরও প্রচুর চুলকানি। জ্ঞানের আলো তাদের অজ্ঞতার রাজ্যে বরাবরই হুমকি স্বরুপ। তাদের মূর্খতা ঢেকে রাখার জন্য তারা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতি সহিংস। তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক স্কুল ধ্বংস করা হয়। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হয় নৃশংস হামলা। নারী শিক্ষকদের প্রতি চলানো হয় নির্মম অত্যাচার। তাদের স্কুলে আসা বন্ধ করা হয়। তাদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে সহ¯্রাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিহত হয়েছে অগনিত শিক্ষার্থী। ১৯৯৮ সালে তারা পুলি খুমরি পাবলিক লাইব্রেরী ধ্বংস করে। অসভ্য জংলীপনার এর চাইতে বড় উদাহরণ আর হয় কি? যুগ যুগ ধরে ধর্মান্ধরা লাইব্রেরী ধ্বংস করেছে। আগুনে বই পুড়িয়েছে। জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে চাওয়াই অজ্ঞদের বড় বাসনা। কারণ, পেঁচা কখনো সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। লাইব্রেরীটিতে ৫৫ হাজারেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বই ছিল। জংলী জাতি শিল্পের মর্যাদা কি বুঝবে? তারা আফাগান জাতীয় জাদুঘরের প্রায় তিন হাজার শিল্পকর্ম ধ্বংস করে। তাদের কথিত শাসনতন্ত্রে গান বাজনা নিষেধ, খেলাধুলা নিষেধ, ছবি আঁকা, টেলিভিশন সহ সকল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নিষেধ। সকল বিনোদন নিষেধ। বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়াতে দেখলেও তারা মারধোর করতো! বর্বরতা আর কুশিক্ষা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে মানুষ এমন অমানবিক আর অরুচিকর হতে পারে?

বর্বরতা আর মূর্খতাকে যদি কেউ ধর্ম বলে তাহলে তা হাস্যকর বৈ অন্য কিছু নয়। আফসোস তাদের জন্য যারা আবার এসব গাঁজাখুরি কথায় বিশ্বাস করে। এসবকেই ধর্ম মনে করে। আর এসব যারা করে তাদেরকে ধার্মিক মনে করে। ধিক সালাফিবাদ ও দেওবন্দিবাদকে, যারা অজ্ঞতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিয়েছে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে।

মানুষ হত্যা করা, নারীদের কে যৌনদাসী করা, বলাৎকার করা, মাদক ব্যাবসা করা, স্কুল কলেজ ধ্বংস করা, গণহত্যা, বই পুড়িয়ে দেয়া সহ এসকল ক্রিয়াকলাপ কে যারা ইসলাম বলবে তারা ইসলামের শত্রু ব্যতিত অন্য কেউ নয়। সন্ত্রাস কখনো ইসলাম হতে পারে না। মানুষ হত্যা করে যারা মুসলিম হতে চায় সে বন্ধ উন্মাদ। ইসলাম শান্তি-মুক্তির ধর্ম। মানবিকতার ধর্ম। আত্মিক পরিশুদ্ধতার ধর্ম। এখানে কোনো অজ্ঞতা, মূর্খতা, অমানবিকতার কোনো স্থান নেই। মহান প্রভু সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

আউলিয়াগণের মহিমান্বিত বাণী

1. কোরান বোঝা মানে নিজেকে চেনা-জানা। আমাকেই খুঁজে বের করা তথা সেই আমিকে এই আমিতে দেখা।
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

2. আর একটি মানব জনম তুমি নাও পেতে পারো। যদি পারো এ অমূল্য জিবনটিকে মহাজিবনের পূর্ণতা দাও।হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী

3. আমার হৃদয়ে প্রেমের ক্ষত। যতই তোমার প্রেমের কথা বলি, কিছুই বলা হয় না।
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.

4. যার দ্বারা প্র্রভুর সাক্ষাৎ লাভ হতে পারে, তাই নামাজ। এটা কঠিন বটে, অসাধ্য নয়।
খাজা বায়েজিদ বোস্তামী রহ.

5. পৃথীবির যত আয়োজন, সবি প্রেমের জন্য। প্রেমের আকর্ষণেই আসমান চক্রাকারে ঘুরছে।
মির্জা গালিব রহ.

6. ইশ্বর এক। কিন্তু নাম ও ভাব অনন্ত। তাই যে যে নামেই ডাকুক, সাড়া পান।
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।

7. আমার অন্তর তোমার সৌরভে আজ ভরপুর, যখন আমি নিজেকে পেয়েছি তোমাতে।
হযরত আমীর খসরু রহ.

8. স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অনেক পথ আছে। তার মধ্যে আমি প্রেমকে বেছে নিলাম।
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহ.

9. সত্যকে স্বীকার করা সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো দ্বারা মোটেও সম্ভব না।
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী রহ.

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৭ম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

- Advertisement -

Others Post

Labib Mahfuj Chisty

Editor - Apon Khobor

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ