সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
ঘুমন্ত একটি বৃহৎ জাতিকে কলমের খোঁচায় জাগিয়ে তোলা সামান্য কোনো কাজ নয়। এ গুরুদায়িত্বটিই পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তার বাঁধন ভাঙার জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছিলেন সমগ্র একটি জাতিকে। কলমের খোঁচায় উপহার দিয়েছিলেন অজস্র মণি মাণিক্য। আপন খবরের আয়োজনে প্রিয় পাঠকদের জন্য থাকছে কাজী নজরুল ইসলাম এর কয়েকটি বাণী সমাহার।
১. আগুন যেমন ধাতুকে পুড়িয়ে খাঁটি করে; দুঃখও তেমনি আত্মাকে একেবারে আয়নার মতো সাফ করে দেয়।
২. মনের সব কষ্টই দুঃখ নামে অভিহিত হতে পারে না।
৩. অন্যের দুঃখে বেদনা অনুভব করার নামই হচ্ছে মহত্তর ব্যাথার অনুভব।
৪. আত্মার ধর্ম এমনি বিস্ময়কর যে, এই পরের ব্যাথায় ব্যথিত হওয়াতেও সে এমন একটি নিবিড় আনন্দের আভাস পায়, যেন রক্তমর্মর বুকে ঝর্ণাধারার একটি স্নিগ্ধ দীঘল রেখা।
৫. বেদনার গভীর আন্তরিকতাতেই ত্যাগের নির্বিকার প্রশান্তি- চির ব্যথার বনেই আনন্দ-স্পর্শমনি খুঁজে পাওয়া যায়।
৬. যখন আমরা আপন বুকের বেদন দিয়ে সারা বিশ্বের ব্যাথা নিজের করে নিতে পারি, কেবল তখনই আমাদের আত্মা উন্নত প্রসারিত হয়। তখনই আমরা সত্যকে চিনি, সুন্দরকে উপলব্ধি করি।
৭. দুঃখের আঘাতকে আনন্দের আহ্বানের মতোই বরণ করে নিতে হবে।
৮. যেই মাত্র মানুষ নিপিড়িত হতে লাগলো, অমনি সৃষ্টি হল বেদনার মহাকাব্য- রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড প্রভৃতি।
৯. দুঃখ কষ্টই তো আমার অপার্থিব চিরদিনের চাওয়া-পাওয়া ধন। ও যে অলঙ্কার। তাই হাসি মুখে তাকে বরণ করে নিয়েছি।
১০. দুঃখী যখন আনন্দকে পেতে সুখের মরীচিকা-ভ্রান্ত মৃগের মতন অনসরণ করে, তখন সে তার দুঃখের দৌলতে যে আনন্দটুকু পেয়েছিল তা ত হারায়ই, উল্টো সে আরো অনেকখানি পেছনে অ-সোয়াস্তির গর্ত্তে গিয়ে পড়ে। তারপর তাকে আবার সেই আগে চলা দুঃখের পথ ধরেই চলতে হয়।
১১. নিখিল-মানবের দুঃখ কেবলই মনকে পীড়িত, বিদ্রোহী করে তোলে, কিন্তু নিজের বেদনা, সে যেন মানুষকে ধেয়ানী সুস্থ করে তোলো। বড় মধুর, বড় প্রিয় সে দুঃখ।
১২. এই ধরণীর দুঃখ-বেদনা-অভাব, সব যেনো সুন্দর-সুমধুর।
১৩. এই পৃথিবীতে দুঃখ বলে কিছু নেই, ও যেনো আনন্দেরই আর একটা দিক। সুরার মত এর আনন্দ তিক্ত জ্বালাময়। এ সুরা যারা পান করেছে, তাদের আনন্দ সুখী মানব কল্পনাও করতে পারে না।
১৪. মানুষের জন্য সর্ব্ব ত্যাগী হবে, সকল দুঃখ মাথা পেতে সহ্য করবে, তারা দুঃখী, তারা পীড়িত বলে নয়, তারা সুন্দর বলে। এ বেদনাবোধ শুধু ভাবের নয়, আইডিয়ার নয়, এ বোধ প্রেমের, ভালোবাসার।
১৫. মস্ত ঘন ব্যথার বুকেও একটা বেশ আনন্দ ঘুম-পাড়ানো থাকে। যেটা আমরা ভাল করে অনুভব করতে পারি নে।
১৬. প্রিয়তমের কাছ থেকে আঘাত পাওয়াতে যে কত নিবিড় মাধুরী, তা বেদনাতুর ছাড়া বুঝবে কে? যার নিজের বুকে বেদনা বাজেনি, সে পরের বেদনা বুঝবে না, বুঝবে না।
১৭. প্রত্যাখ্যান আর বিদ্রুপের ভয় ও বেদনা যে বড় নিদারুন।
১৮. স্রোত যদি তার তরঙ্গ হারায়, তবে তার ব্যাথা সে নিজেই বোঝে, বাঁধ দেওয়া প্রশান্ত দীঘির জল তার সে বেদন বুঝবে না। মুক্তকে যখন বন্ধনে আনবার চেষ্টা করা হয়, তখনই তার তরঙ্গের কল্লোলে মধুর চল-চপলতার কলহ-বাণী ফুটে ওঠে।
১৯. পাষাণের বুক চিরে আমরা সোনা ফলাতে চাই।
২০. বেহেশতের পাখি যখন গান করে তখন পৃথিবীর ধূলো থেকে সে উর্ধ্বে উঠে যায়। এই সুরের পথ ধরেই মানুষ মুক্তির পথ পেয়েছে।
২১. সুরের আঘাতেও মনের পানি উথলায়; সুর কখনো খারাপ হয় না।
২২. খারাপ মনের পাত্রে পানি রাখলে সে পানি হয়তো দূষিত হয়, কিন্তু তাই বলে পানিকে দোষ দেয়া যায় না।
২৩. সুরের সঙ্গে ফুলের তুলনা দেয়া যেতে পারে। ফুল দিয়ে কোথাও কোথাও পূজা হয়। সেই ফুল নগরবিলাসীদের কন্ঠেও শোভা পায়। তাই বলে ফুল খারাপ, এ কথা বলা যায় কি? শরীয়ত হয়তো গানের খারাপ দিকটাকেই খারাপ বলতে পারে। কিন্তু সুর কখনো খারাপ নয়।
২৪. মানুষের মারফতে দুনিয়ার বুকে আল্লাহর রহমত নেমে আসে। সুরও আল্লাহর রহমত রূপে দুনিয়ায় নাজিল হয়েছে। কিন্তু সব মানুষের মুখ দিয়ে তো সুরের রহমত বের হয় না। যাদের মুখ দিয়ে সুর বেরোয় তাদের ওপর আল্লাহর রহম আছে।
২৫. দেশকে যে নারীর করুণা নিয়ে সেবা করে সে পুরুষ নয়, মহা পুরুষ।
২৬. মা তার ছেলেকে যেমন বোঝে তেমন আর কেউ বোঝে না।
সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী