আপন ফাউন্ডেশন

কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর আত্মকথন – বাণী

Date:

Share post:

সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী

বিপুল সৌন্দর্য ও সত্য সাধনার আজন্ম সাধক কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আত্মার আলো দিয়ে যিনি গড়ে তুলেছিলেন বিপুলতর এক ফুলের পৃথিবী, সুরের পৃথিবী, প্রেমের, সত্যের পৃথিবী। রূপ-অরূপের সাধনায় যিনি বারবার ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন নিজেকেই! সত্যসাধনার এক শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আপন খবরের এবারের আয়োজনে থাকছে কাজী নজরুল ইসলাম এর আত্মকথনমূলক কিছু উক্তির সমাহার।

১. ফুল ফোটানোই আমার ধর্ম। তরবারি হয়তো আমার হাতে বোঝা, কিন্তু তাই বলে আমি তাকে ফেলেও দেইনি। আমি গোধূলী বেলায় রাখাল ছেলের সাথে বাঁশি বাজাই, ফজরে মুয়াজ্জিনের সুরে সুর মিলিয়ে আজান দেই, আবার দীপ্ত মধ্যাহ্নে খর তরবার নিয়ে রণভূমে ঝাঁপিয়ে পড়ি। তখন আমার খেলার বাঁশি হয়ে ওঠে যুদ্ধের বিষাণ রনশিঙ্গা।

২. সুর আমার সুন্দরের জন্য, আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা যে করে, সেই অসুরের জন্য।

৩. এ লেখা আমার নয়, এ লেখা আমার সুন্দরের। আমারি আত্মা বিজড়িত আমার পরমাত্মীয়ের।

৪. হে আমার মাঝের তিক্ত শক্তি, রুদ্র জ্বালা, বিষ-দাহন! হে আমার যুগে যুগে নির্মম নিষ্ঠুর সৈনিক-আত্মা, তোমায় আমি যেনো প্রশংসার লোভে খাটো না করি। তোমাকে দেবতা বলে প্রকাশ করবার ভন্ডামি যেন কোন দিন আমার মাঝে না আসে। আমি নিজে যতটুকু, ঠিক ততটুুকু যেন প্রকাশ করি।

৫. রাজার বাণী বুদ্বুদ, আমার বাণী সীমাহীন সমুদ্র। আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্ত্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।

৬. কবির কন্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী।

৭. সত্য স্বয়ং প্রকাশ। তাহাকে কোনো রক্ত আঁখি রাজদন্ড নিরোধ করতে পারে না। আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম-প্রকাশের বীণা, যে বীণায় সত্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল। আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে?

৮. আমি সত্য প্রকাশের যন্ত্র। সে যন্ত্রকে অপর কোনো নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করলেও করতে পারে, ধ্বংস করলেও করতে পারে, কিন্তু সে যন্ত্র যিনি বাজান, সে বীণায় যিনি রুদ্র বাণী ফোটান, তাঁকে অবরুদ্ধ করবে কে?

৯. দোষ আমারও না, আমার বীণারও না। দোষ তাঁর, যিনি আমার কন্ঠে তাঁর বীণা বাজান। সুতরাং রাজ বিদ্রোহী আমিও নই। প্রধান রাজবিদ্রোহী সেই বীণা বাদক ভগবান।

১০. আমি জানি, আমার কন্ঠের ঐ প্রলয় হুংকার একা আমার নয়। সে যে নিখিল আর্তপীড়িত আত্মার যন্ত্রণা চিৎকার।

১১. আজ এই আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় একা আমি দাড়িয়ে নেই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্য-সুন্দর ভগবানও দাড়িয়ে। যুগে যুগে তিনি এমনি নিরবে রাজবন্দী সত্য-সৈনিকের পশ্চাতে এসে দন্ডায়মান হন।

১২. কোন কিছুর ভয়েই নিজের সত্যকে, আপন ভগবানকে হীন করি নাই, লোভের বশবর্ত্তী হয়ে আত্ম উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই। কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা, আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা।

১৩. আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহংকার নয়, আত্ম উপলব্ধির, আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সতের সরল স্বীকারোক্তি।

১৪. আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই। কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন। আমার অসমাপ্ত কর্তব্য অন্যের দ্বারা সমাপ্ত হবে। সত্যের প্রকাশ পীড়া নিরুদ্ধ হবে না।

১৫. আমি যার হাতের বাঁশি, সে যদি আমায় না বাজায়, তাতে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, সত্য আমায় তেমন করেই বাজাচ্ছে, তার হাতের বাঁশী করে।

১৬. আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, – যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন-পঁচা, সেই মিথ্যা-সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভন্ডামী ও কুসংষ্কারের বিরুদ্ধে।

১৭. আমি ‘কোরক’ ব্যতীত প্রস্ফুটিত ফুল নই। আর যদিই সে রকম হয়ে থাকি কারুর চক্ষে, তবে সে বে-মালুম ধুতরো ফুল।

১৮. দেবতা হবার লোভ আমার কোনোদিনই নেই। আমি হতে চাই তাজা রক্ত মাংসের হাড্ডিওয়ালা দানব-অসুর।

১৯. দামী কথা জুয়েলার আমি নই। আমি ফুলের বেসাতি করি।

২০. রাধা ভালোবেসেছিল কৃষ্ণকে নয়, কৃষ্ণের বাঁশিকে। তোমরাও ঠিক ভালোবাসো আমাকে নয়, আমার সুরকে, আমার কাব্যকে।

২১. সূর্য্যকে অভিবাদন করতে পারি। কিন্তু তাকে উজ্জ্বলতর করে দেখানোর মতো আলো ও অভিমান আমার নেই।

২২. আমি অন্তরে অন্তরে প্রার্থনা করছি, কাছে থেকে যাদের কেবল ব্যথাই দিলাম, দূরে গিয়ে অন্ততঃ তাদের সে দুঃখ ভুলবার অবসর যদি না দেই, তবে মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা সত্য নয়।

২৩. আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি ধর্মের ভেদ আমার কোনোদিনও ছিল না, আজও নেই। অহংকারকে আমি অসুন্দরের দূত বলে মনে করি।

২৪. আমি যদি আসি, আসবো হিন্দু মুসলমানের সকল জাতির উর্দ্ধে যিনি একমেবাদ্বিতীয়ম্ তারই দাস হয়ে।

২৫. মানুষ দেখার কৌতুহল আমার নেই। স্রষ্টা দেখার সাধনা আমার। সুন্দর কে দেখার তপস্যা আমার।

২৬. আমার সাধনা অরূপের সাধনা, সাত সমুদ্দুর তের নদী পারে যে রাজকুমারী বন্দিনী, সেই রুপকথার অরূপাকে মায়া-নিদ্রা হতে জাগাবার দুঃসাহসী রাজকুমার আমি।

২৭. যে চোখের জল বুকের তলায় আটকে আছে, তাকে মুক্তি দেওয়ার ব্যথা হানা আমি।

২৮. আমার যতো বলা আমার সেই বিপুলতর কে নিয়ে, আমার সেই প্রিয়তম, সেই সুন্দরতমকে নিয়ে।

২৯. আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর, কুৎসিতের সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্ব্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়।

৩০. এ লেখা আমার নয়, এ লেখা আমারি সুন্দরের, আমারি আত্মা বিজড়িত আমার পরমাত্মীয়ের।

সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles