লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : “জালিকা ওয়ামাই ইয়্যু আজজিম শায়ায়িরুল্লাহি ফাইন্নাহা মিন তাক্বওয়াল কুলুব”- অর্থাৎ যে ব্যক্তি শায়ায়িরুল্লাহ কে সম্মান করে সেটা তার কলবে অবস্থিত খোদা ভীতি থেকেই নিঃসৃত । (সুরা হজ্ব- ৩২ আয়াত)
এখানে “শায়য়ির” অর্থ হলো আলামত, চিহ্ন বা নিদর্শন । হযরত শায়েখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী (রঃ) বলছেন যা কিছু মহান আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় তা-ই হলো শায়ায়িরুল্লাহ । শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলবী (রাঃ) বলেন, শায়ায়িরুল্লাহকে ভাল বাসার অর্থ হচ্ছে মহানবী (সঃ) কে কোরআন ও কাবাকে কিংবা যা কিছু মহান আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাকে ভালবাসা । আল্লাহর আউলিয়া কেরাম কে ভালবাসা একই কথা । কেননা নবী করিম (সঃ) বলেন, যখন আউলিয়া কেরামের দর্শন লাভ হয়, তখন আল্লাহকে স্মরণ হয় । (আলতাফ আল কুদুম ৩০পৃ.)
দলিল-১ : মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রঃ) বলেন আল-আউলিয়াগণের মাজারে বাতি জ্বালানো সাহেবে মাজারের শান মান প্রকাশার্থে জায়েজ। আর সাধারণ মানুষের কবরে বিনা প্রয়োজনে বাতি জ্বালানো নাজায়েজ । (জা আল হক ২য় খন্ড ১২২ পৃ.)
দলিল-২ : উক্ত কিতাবে জালিকা ওয়ামাই, .কুলুব । এ আয়াতের ফতোয়ায় বলেছেন এ সম্মানের বেলায় কোনো শর্তারোপ করা হয়নি। এক এক দেশে এক এক রীতি প্রচলিত আছে । আউলিয়াগণের মাজার সমূহে ফুল দেয়া, চাঁদর চড়ানো ও বাতি জ্বালানো ইত্যাদির উদ্দেশ্য হলো সম্মান প্রদর্শন । বিধায় এগুলো জায়েজ । ফতোয়ায়ে আলমগীরির কিতাবুল কারাহাত ৫ম খন্ডের সূত্রে (জা আল হক ১১৪ পৃ. ২য় খন্ড)।
দলিল-৩ : হাদিকায়ে নাদিয়া শরহে তরীকায়ে মোহাম্মদীয়ার সূত্রে বর্ণিত আছে অলি আউলিয়ার আত্মার সম্মানের জন্য এবং জনগনের অবগতির জন্য মাজারের বাতি জ্বালানো জায়েজ। এবং ফুল ও সুগন্ধি রাখা উত্তম । (‘জা’ আল হক ২য় খন্ড ১১৭ পৃ) ।
দলিল-৪ : অতএব আউলিয়া কেরাম ও শায়রুল্লাহর অর্ন্তভুক্ত তাঁদের কে তাজিম করাটা মুত্তাকি হওয়ার লক্ষণ । আর যেহেতু আউলিয়া কেরাম গন জীবনেও ওফাতে অমর ও চিরঞ্জীব সেহেতু তাঁদের মাজার সমূহকে তাজিম করাটা তাক্বওয়া বা খোদা ভিতির লক্ষণ ব্যতীত কিছুই নয় । (ওহাবীদের সংশয় নিরশন-৫২ পৃ.)
দলিল-৫ : যদি কেউ আউলিয়া কেরামের মাজারে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহ পাকের রহমতের প্রকাশস্থল মনে করে তাঁদেরকে উছিলা বানায় এবং সেই লক্ষ্যে তাদের মাজার শরিফে পশু-পাখি নজরে মান্নত করে কিংবা আতর ও মোম বাতি জ্বালায় বা ফুল, চন্দন, চাদর ইত্যাদি চড়ায় এবং মাজার শরিফ কে চুমো দেয় কিংবা মুখ ঘর্ষণ করে, তবে তাঁর এই কাজকে শরিয়ত সম্মত মোস্তাহাব বলে স্বীকৃত করতে হবে । (ওহাবীদের সংশয় নিরশন-৫৩ পৃ.)
দলিল-৬ : এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললো যে, হে রাসুল, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে বেহেস্তের চৌকাঠে ও হুরীর ললাটে চুম্বন করবো। কিন্তু আমি অতি পাপী বেহেশতে যাওয়া আমার ভাগ্যে বোধ হয় নাই । এমতাবস্থায় কি করে আমার প্রতিজ্ঞা পালন করি । উত্তরে নবী করিম (সঃ) বললেন তুমি তোমার মায়ের ললাটে ও পিতার পায়ে চুম্বন করো, তবেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা হবে । সে বললো হুজুর তারা তো কেউ জীবিত নেই- হুজুর (সঃ) বললেন তাদের কবরে গিয়ে চুম্বন করো । সে বললো তাদের কবর ও আমার জানা নেই । হুজুর (সঃ) বললেন তাদের উদ্দেশ্যে মাটিতে দাগ কেটে দুটি নকল কবর বানিয়ে তাতেই চুম্বন করো। (ফতোয়ায়ে আলমগীরি, খাজিনাতোল রওজা মাতালেবুন মুমিনিন ও কেফায়া)
দলিল-৭ : উক্ত ফতোয়ায়ে আলমগীরির সুত্রে মুফতি নঈম খান বলেন নিজের মাতা পিতার কবরে চুমু দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই বরং বৈধ বা জায়েজ । (জা-আল হক ২০৯পৃ.)
এপ্রসঙ্গে নিম্নের দলিল সমূহ দেখে নিতে পারেন । যথা-
(১) ফাতহুল বারী- ৬ষ্ঠ খন্ড ১৫পৃ.
(২) আহকামূল মাজার- ৫৫পৃ.)
(৩) সেফা উস সাকাম-৩৩পৃ.
(৪) তাফছিরে কানজুল ঈমান ও খাজাইনুল ইরফান ১ম খন্ড-১৭৪পৃ.
(৫) হৃদয়তীর্থ মদীনার পথে ১৫৪ পৃ.
(৬) প্রশ্ন উত্তরে আকায়েদ ও মাসায়েল শিক্ষা ৬১ পৃ.
(৭) আস সায়েক্কাহ- ৬৪-পৃ.
(৮) ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫ম খন্ড ৩৭৮ পৃষ্ঠা ।
সহি দলিল দ্বারা মাজারে বাতি জ্বালানো ফুল চন্দন দেওয়া মান্নত করাও চুমো দেয়া জায়েজ বা বৈধ প্রমাণিত হলো ।
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী