লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
সত্ত্বা একক, আদি সত্ত্বা। আমরা যাকে বলি ঈশ্বর, ভগবান গড বা আল্লাহ। এ এক সূদুর প্রেমের ইন্দ্রজাল! যেখানে স্বত্ত্বা নিজেই অনন্ত রহস্যের আড়ালে অবতরণ করে চলেছে এক-এক দৃশ্যমান অদৃশ্য জগৎসমূহকে। নিজের অনন্ত-অখন্ড ইচ্ছাশক্তিতে, নিত্যময়তার প্রকাশ অভিলাষে।
নিত্যময়তা স্বতঃপ্রাপ্ত। অর্থ্যাৎ যা নিত্য, সত্য, শাশ্বত, অবিনশ্বর- তাই পরিব্যাপ্ত এ জগতে। জগত মহান স্রষ্টার আপনত্বের স্বতঃস্ফূর্ত তথা স্বপ্রবৃত্ত বহিঃপ্রকাশ। মহান জাতপাক স্রষ্টা জাত কদিম। তিনি অনন্ত-রূপে অনন্ত-পথে আপনত্বে বহমান সমগ্র জগতে। অনন্ত সৌন্দর্যের আধার তিনি। তার জাত-জগতে কোনো নোংরা-পঙ্কিলতা বা অসৎ-স্বভাব বা সংকীর্ণ অহম বোধ বা অহং বোধের কোনো অবস্থিতি নেই। তিনি অনন্ত চৈতন্য স্বরূপ, পরম প্রেমোময়। যার অনন্ত চেতনার এক স্বতঃপ্রকাশরূপ এ ধরা। স্বাভাবিকভাবেই তাই এ অনন্ত মহাজগতে কোথাও নেই অসত্য, অসুন্দর বা স্রষ্টার জাত-পাক ও গুণসমুহের পরিপন্থী কোনো ক্রিয়া-কলাপ। যেহেতু পরমসত্ত্বা হতেই এ জগত সমুহ আগত, পরম সত্ত্বাতেই স্থিতি এবং পরম সত্ত্বাতেই পরিণতি- সেহেতু জগতে নিত্যময়তার বিরুদ্ধবাদী কিছু থাকাটা অসম্ভব।
সংশয় প্রবণতা ও খন্ডিত চেতনায় আবদ্ধ মানব-মন এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তুলবে- তাহলে জগতে এত অন্যায়, অসত্য, এত খারাপ সমূহ আসলো কোথা হতে? কোথা হতে এসবের উৎপত্তি? কিভাবেই বা আসলো? এসবের পরিণতিই বা কি? প্রকৃত অর্থেই যদি জগতে কোনো রিপু নিচয়ের বা বদ-আমিত্বের অবস্থান না থাকে, তাহলে কেনোই বা এত হানাহানি? আর কে করছে এসব?
এসবের প্রশ্নসমূহের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটা স্বতঃপ্রমানসিদ্ধ সূত্র দেখবো –
- ১। চির সুন্দরের প্রকাশ এ ধরা।
- ২। সর্বত্র পরিব্যাপ্ত চিন্ময় সত্ত্বা।
- ৩। নিত্য সত্ত্বা অপরিবর্তনীয় ও অবিভাজ্য।
- ৪। অসত্য সত্ত্বা বলে কিছু নেই।
- ৫। অসৎ ভাব বিদ্যমান নেই।
- ৬। চিন্ময় সত্ত্বা নিত্যপ্রাপ্ত।
- ৭। অসত্যকে নির্মাণ করতে হয়।
- ৮। অহং অসত্যের জনক।
- ৯। অহং হল আত্মাকে বিভক্ত করা।
- ১০। অবিভাজ্য সত্ত্বায় অবস্থিত ব্যক্তি মুক্ত।
আমরা যা বুঝতে পারলাম তা হলো, মহান স্রষ্টা হতেই উৎসারিত হচ্ছে এ সৃষ্টি। তিনি যেহেতু নিত্যময়, সেহেতু তাঁর সৃষ্টিও নিত্যময়। তিনি নিত্যজগতে নিত্যরূপে তথা চিন্ময় রূপে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। অতএব, তাঁর প্রকাশ ও বিকাশশীল এ জগতের কোথাও অনিত্যতা থাকার প্রশ্নই আসে না। অর্থ্যাৎ অসৎ ভাব বিদ্যমান নেই।
তাহলে আমরা অসৎ ভাব পাই কোথায়? উত্তর- আমরা অসৎ ভাব নির্মাণ করে নেই। অর্থ্যাৎ জগৎব্যাপি নিত্যময়তাই খোদার প্রকাশ, আর তাঁর মহান সৃষ্টি আমরা মানবকুল তার পরিপূর্ণ ইচ্ছাশক্তি বা এরাদার অধিকারী হয়ে অজ্ঞানতা বশত অহং স্বভাবে মত্ত হয়ে অকাতরে সৃষ্টি করে চলেছি। যেহেতু আমরা অহং স্বভাবে বা খন্ডিত আমিত্বে আবদ্ধ তাই আমরা যা সৃষ্টি করছি স্বভাবতই তা অসত্য। কারন অহং অসত্যের জনক। জাত-জগত হতে রূপ-জগতে এসে আমরা অনন্ত আমিত্ব হারিয়ে বেহুঁশ হয়ে বরণ করে নিয়েছি খন্ডিত আমিত্বকে। বিস্বরণ হয়েছি সেই অনাদী অখন্ড আমিকে, যে আমিই ছিলাম গঞ্জ-জাত তথা একত্ত্বে।
আজ জগতের পলে-পলে, হৃদয় তটিনীর কূলে-কূলে আমিই রচিতেছি আমার অসত্য জগৎ, অন্যায় আর অনিত্যের সংমিশ্রনে। যেহেতু আমি আজ বিছিন্ন পরম সত্ত্বা হতে, সেহেতু আমি তথা মানব-কুল পরমাত্মার নিত্যতায় অবিশ্বাসী হয়ে প্রতিটি মানব প্রানে-মনে-ধ্যানে দাঁড় করিয়ে নিয়েছি এক এক জন ইবলিছ, আযাযিল বা শয়তান, আমাদের অন্ধত্বকে চাপা দেয়ার জন্য। সকল ব্যার্থতাকে অন্ধ-অহমিকায় কোন কিছুর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচার জন্য। যা আমাদের মূর্খতারই অন্যপার। এই খন্ডিত অহং বা আমিত্ব বা জড়জাগতিক আমিত্ব (রিপুনিচয়ের কবলে অবিস্থিত মানব সত্ত্বা) যতক্ষন আমাদের স্বভাবে বিদ্যমান থাকবে অর্থাৎ আমার-আমার ভাব পরিব্যাপ্ত থাকবে ততক্ষন পরম আমিত্ব বা খোদায়ী আমিত্ব জাগ্রত হবে না। পরম আমিত্ব তথা ঈশ্বরময়তা জাগ্রত না হলে আমরা আবদ্ধ থাকবো আমাদের অসত্যের দ্বারা রচিত আমাদের খান্নাছ নিবাসে! যেটাই আমাদের ব্যর্থতা- যে ব্যর্থতাকে অস্বীকার করার জন্যই আমরা অবতারণা করেছি শয়তান নামক এক প্রহসনের।
জগতে শয়তান বা খান্নাছ বা আযাযিল বলে কিছু নেই। সবই মানুষ অজ্ঞানতা বা অন্ধত্বের প্রাবল্যে নির্মাণ করে নেয়। শয়তান আসে মানব মনের অহং থেকে, অহং আসে আত্মার বিভাজ্যতা থেকে, – মুলত আত্মা বা রুহ অবিভাজ্য।
রচনাকাল – 22/02/2015
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী