সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
হযরত আবু আলী শাকীক বলখী (রহ.) ছিলেন তৃতীয় শতকের একজন প্রখ্যাত সুফি ও আল্লাহওয়ালা আধ্যাত্মিক মহান সাধক। তিনি খোরাসানের বলখ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং হযরত ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.)-এর ভক্ত ছিলেন। দুনিয়ার মোহ ও ভোগবিলাস সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে তিনি আত্মশুদ্ধি ও তওয়াক্কুলের (আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা) অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর মতে, “তওয়াক্কুল এমন এক অবস্থা, যেখানে বান্দা তাঁর প্রয়োজনের জন্য সৃষ্টির দিকে না তাকিয়ে একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করে।” তিনি বলতেন, মানুষ যখন বুঝে ফেলে যে দুনিয়া ধ্বংসশীল, তখনই তার অন্তরে আখিরাতের চেতনা জেগে ওঠে। হযরত শাকীক বলখী (রহ.)-এর শিক্ষাগুলো পরবর্তী সুফিদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং তিনি ইসলামের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে একজন অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে চির-স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তাঁর অনন্য কিছু বাণী সংকলন –
1. আমি স্বপ্নে দেখলাম কেউ বলছে, যে ব্যক্তি রুজির ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তাঁর স্বভাব উত্তম হয়। উপাসনা থেকে প্রেরণা আসে।
2. বিপন্ন হয়ে চিৎকার করে যে অস্থির হয়, সে যেন তীর ধনুক নিয়ে আল্লাহর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
3. উপাসনার আসল বস্তু হল আল্লাহকে ভয় করা। তাঁর রহমতের আশা করা ও তাঁর ওপর বিশ্বাস বজায় রাখা।
4. যার সঙ্গে তিনটি বস্তু নেই, সে জাহান্নাম থেকে রেহাই পাবে না। সেগুলো হল, শান্তি, ভয়, ব্যাকুলতা।
5. তিনটি বস্তু সাধকগণের সাথী। মনের স্বাধীনতা, হিসাব নিকাশে অপরিপক্কতা, হৃদয়ের প্রশান্তি।
6. মৃত্যুর জন্য সদা সর্বদা প্রস্তুত থাকা চাই। কেননা মৃত্যু হাজির হবেই। আর তা হাজির হলে কখনো ফিরে যাবে না।
7. মানুষের ধর্মনিষ্ঠা তিনটি বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করা যায়। যেমন, ধর্মীয় আদেশ ও নিষেধ দ্বারা, ধর্মীয় ও বৈষয়িক কথাবার্তা দ্বারা, ধর্মের সঙ্গে বেশি সম্পর্ক না দুনিয়ার সঙ্গে, সেটি দ্বারা।
8. প্রায় সাতশ পন্ডিতের কাছে প্রশ্ন করে দেখেছি যে –
জ্ঞানী কে? উত্তর – যে দুনিয়ার সাথে প্রেম করে না, দুনিয়াদারীর লোভে পড়ে না, নিয়ত প্রতারিত হয়, সেই জ্ঞানী।
ধনী কে? উত্তর – যে আল্লাহর ভাগ বাটোয়ারায় খুশি, সেই প্রকৃত অর্থে ধনী।
দরবেশ কে? উত্তর – যার অন্তরে বেশি ধন লাভের আকাঙ্খা নেই, একমাত্র সেই প্রকৃত দরবেশ।
কৃপণ কে? উত্তর – যে আল্লাহ প্রদত্ত মালপত্রের হক আদায় করে না, সেই কৃপণ।
হযরত খাজা আবু আলী শাকীক আল বালখী (রহ.) এর আরো কিছু মূল্যবান বাণী দেয়া হল –
1. তওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) মানে হলো—তুমি যেন দুনিয়া থেকে হতাশ হও এবং আখিরাতের আশা একমাত্র আল্লাহর কাছেই রাখো।
2. যে ব্যক্তি দুনিয়ার চিন্তা করে, সে কখনোই পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর চিন্তা করতে পারে না।
3. নফসকে পরাজিত করতে না পারলে, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা অসম্ভব।
4. তিনটি গুণ যার মধ্যে নেই, সে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে না: ইখলাস (নিঃস্বার্থতা), খিদমাত (সেবাব্রততা), ও সবর (ধৈর্য)।
5. আল্লাহর প্রেমে ডুবে যাওয়া সেই আগুন, যা দুনিয়ার সকল মোহ ও কামনাকে ভস্ম করে দেয়।
6. নেক আমলের চেয়ে নিয়তের বিশুদ্ধতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিয়তই আমলের প্রাণ।
মহান ওলী – আউলিয়ায়ে কেরামগণের ঐশী চেতনাদীপ্ত বাণী সমূহ আমাদের অন্তরে প্রভূপ্রেমের অনন্ত আগুন প্রজ্বলিত করুক – মাওলার দরবারে এটাই প্রার্থনা।