লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পড়ে আসুন প্রবন্ধটির প্রথম পর্ব – এখানে ক্লিক করে
সর্বশেষ প্রেরিত মুক্তির কান্ডারি মোহাম্মদ (সা) মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন চিরশান্তির মহা-বিধান। যেখানে মানুষকে পথ দেখানো হয়েছে কিভাবে মানবসমাজ পশুত্ব বা হায়ানাত এর উর্দ্ধে উঠে অধিষ্ঠিত হবে ইনছানিয়াতে। দ্য প্রফেট মোহাম্মদ (সা) তাঁর সারা জীবনের চেষ্টা, পরিশ্রম এবং ত্যাগের বিনিময়ে আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন কি করে আমরা আমাদের সঙ্গে বাস করা খান্নাছটিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে পান করতে পারবো মুক্তির অমৃত। দ্বীনে ফিৎরাত তথা দ্বীন ইসলামের প্রতিটি বিধানই মানবজাতির আত্মশুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির ফলে বিরাজিত মহিমা ময় আত্মিক অবস্থানের স্বানিধ্য বা আত্মপরিচয়ের বিধান।
যেমন-
কালেমা – মুক্তিপথের এক শ্রেষ্ঠ নিয়ামক যেখানে মানুষ ইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে লাভ করবে অতিন্দ্রিয় সত্ত্বা। অমূর্তের মাঝে ফুঁটিয়ে তুলবে মূর্তমান মনোমোহিনী রূপ। বস্তুগুণের সম্মিলিত শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত নিত্য জগতে নিজেকে অধিষ্ঠিত করা।
সালাত – যার সাধনায় প্রতিটি মানুষ আপন সত্ত্বাস্থিত সকল আবর্জনা, ময়লা, কুসংস্কার এর উর্দ্ধে উঠে অবস্থান করবে শ্বাশত নিত্যধামে। সার্বক্ষণিক ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে নিজেকে জিকির তথা স্বরন-সংযোগ এর উপযুক্ত করা।
সাওম – মানব সত্ত্বাস্থিত সকল রিপুনিচয়, যা মানুষকে ক্রমাগত উৎসাহিত করে ইন্দ্রিয় ভোগের পথে, সে সমস্ত পরাশক্তির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ জিহাদ হলো সাওম। যাতে করে মানুষ নিজেকে পরিপুর্ণ রূপে পবিত্র করতে সক্ষম হয়। দেহস্থিত খান্নাছকে বিতাড়ন করে একাকিত্ব অর্জন করা।
হাজ্জ – মানব সত্ত্বায় বিরাজিত পরম সত্ত্বার সঙ্গে মধুর আলিঙ্গণ তথা স্বানিধ্য লাভ । নুরে মোহাম্মদির রৌশনে উদ্ভাসিত গৃহ প্রদক্ষিন করে প্রেমময় এর সাথে মিলিত হওয়া।
যাকাত – মানব সত্ত্বায় বিরাজিত সকল অপবিত্রতা হতে মুক্ত হওয়া । ৭ জন মিসকিন পরিবেষ্টিত মানব দেহের চল্লিশ গঞ্জ মাল হতে এক গঞ্জ বিলিয়ে দেয়া।
“মোহাম্মদী দর্শন ভোগের নয়, ত্যাগের অনুশীলন।“ যুগে যুগে এ দর্শন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বস্তুবাদিদের, জড়বাদিদের দ্বারা। কারণ, পশুত্ব স্বভাব বিশিষ্ট অন্তকরণে এ দর্শন গ্রহণযোগ্য হবার কথা না। তাই বারবার আত্মশুদ্ধি বা আত্মমুক্তির এ দর্শন ( যে দর্শন গ্রহণ করলে প্রতিটি মানুষ অধিষ্ঠিত হবে নিত্যময় স্থান বা মোকামে মাহমুদায়, ফলে প্রতি মানব-সত্তায় বিরাজ করবে প্রশান্তি, অনিবার্য রূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ইসলাম বা চিরশান্তি) গুটিকতক সত্যানুসন্ধানীর সাথে বাধ্য হয়ে নির্বাসিত হয়েছে নির্জনে। পশুত্বের গুণ-খাছিয়তে মানব সমাজ এ দর্শন গ্রহণ তো দুরে থাক, এর কবর রচনা করার জন্য মরিয়া ছিল সর্বদাই। ফলে ত্যাগের অনুশীলন সমাজে অনেকটা অপরিচিতই রয়ে গেছে। বিস্তার লাভ করেছে বস্তুবাদি জড়বাদি জঘন্য সব মানবতার ধ্বংস সাধনকারি মতবাদ। যাতে সিংহভাগ মানুষ লিপ্ত।
অহী কালাম মানুষকে সৎপথ দেখানোর জন্য নাযিল হলেও মানব সমাজ তা হতে সঠিক পথের সন্ধান পাচ্ছে না। কারণ, অহী কালাম রূপক প্রতীক বা আলংকারিক এর পর্দায় আবৃত। গন্ড-মুর্খ মানবজাতি স্রষ্টার স্পষ্ট নিদের্শনা, রাছুলের জীবন বিধান সত্ত্বেও প্রতীকের অভ্যন্তরস্থিত সত্যকে গ্রহণ না করে মুল্যহীন রূপক প্রতীকের অনুসরণ করে যাচ্ছে। কারণ প্রকৃত ধর্মবিধান তো ত্যাগের অনুশীলন। ত্যাগের অনুশীলন তো সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা না। ফলে অতিবোদ্ধা মানবজাতি প্রকৃত ধর্ম বিধানকে মাটিচাপা দিয়ে নিছক প্রতিকী আচার-অনুষ্ঠান, চলা-ফেরা, খাবার-দাবার, ঘর-সংসার, ঢিলা-কুলুখ, মেসওয়াককে’ই ধর্মীয় বিধান বলে চালিয়ে দিচ্ছে। বস্তুবাদি সমাজে যা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সংস্কারের অতল-তলে নিক্ষিপ্ত করেছে ধর্মের মুল বিধান বা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরম-সত্ত্বার স্বানিধ্য লাভ করে নিজেকে, দেশকে, জাতিকে মহান নিত্যময়তায় অধিষ্ঠিত করার শিক্ষাকে।
দ্বীনে মোহাম্মদী বা পবিত্র ইসলাম হলো মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মুক্তির বিধান- তাই স্বাভাবিক ভাবেই দ্বীনে মোহাম্মদীর ওপর করা হয়েছে সর্বাধিক বিরোধিতা। দ্বীনের প্রতিটি বিধানের ওপর চালানো হয়েছে অত্যাচারের, অপশিক্ষার, অপব্যাখ্যার স্টিম রোলার। শুধু বিধানের ওপরেই নয়, মানবজাতির একমাত্র পরম মুক্তি-কান্ডারি, বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক, মানুষকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেওয়াই ছিল যার জীবনের একমাত্র ব্রত, (অমুসলমানরাও যার প্রশংসা করে শেষ করতে পারেনি) , তাঁর নিজের ওপর ও তাঁর পরিবারের ওপর চালানো হয়েছে বিশ্বের ইতিহাসের সবচাইতে জঘন্যতম বর্বরতা। দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাঁকে। বারবার আঘাতের পর আঘাতে রক্তাক্ত করা হয়েছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে। তার সবচাইতে কাছের আহলে বাইয়াত বা স্ব-গৃহের অধিবাসীদের এতটা নিকৃষ্ট, নির্দয় ভাবে হত্যা করা হয়েছে যা বিশ্বের যে কোনো নির্দয়তাকে হার মানায়। হত্যা করা হয়েছে মেয়েকে, মেয়ের জামাইকে। প্রানের চাইতে অধিক প্রিয় আদরের নাতিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। আর এক নাতি ইমাম হুসাইন এর মাথা কেটে নেওয়ার পর তার নিথর দেহের ওপর ঘোড়া চালিয়ে দেহ মোবারককেও মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। পরপর ১১ জন বংশধরকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। দ্বীনে মুহাম্মদীর প্রকৃত আদর্শে বিশ্বাসী গুটিকতক পবিত্র ব্যক্তিদেরকেও রেহাই দেয়া হয়নি। হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। বাধ্য করা হয়েছে দেশত্যাগে। ত্যাগের অনুশীলনে নিত্যময়তার প্রাপ্তির পথকে ধরার বুক থেকে চিরদিনের জন্য বিলীন করে দেয়ার জন্য এমন কোনো পাঁয়তারা নেই যা করা হয়নি।
সমগ্র বিশ্বে মোহাম্মদী উম্মতদের (তথাকথিত) বিরোধিতা ছিল সবচাইতে ভয়ংকর। মানবজাতির মুক্তির বিধান দ্বীনে মোহাম্মদীর শেষ প্রাণশক্তিকেও অক্ষত রাখা হয়নি। অক্ষত রাখা হয়নি পবিত্রতম মানব-ধর্ম বা সহজাত স্বভাব-ধর্মের কোনো একটি বিধানকে। ভোগবাদীদের দ্বারা যুগে-যুগে পবিত্রাত্মাদের ওপর আপতিত হয়েছে ঘোরতর বিরোধিতা। সকল মহামানবকে’ই বার বার যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হতে হয়েছে অসুর শক্তির সাথে। সকল নবী-রাছুলই ছিলেন যে পথের পথিক। শত শত বৎসর কাঁদতে হয়েছে নুহ নবীকে, অগ্নিকুন্ডে ফেলা হয়েছে ইব্রাহিম নবীকে, দেশত্যাগ করে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে মুসা নবীকে, জীবন দিতে হয়েছে ঈসা নবীকে, রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্যদেব সহ সকল মহামানবকে মুখোমুখি হতে হয়েছে তীব্র বিরোধিতার, জীবন দিতে হয়েছে সক্রেটিস কে। হাজারো অত্যাচার নির্যাতন জুলুমের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়েছে সকল মুক্তি পথের কান্ডারীর ওপর। সর্বশেষ যখন সকল মহামানবে অবস্থিত এক মানুষ আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন দ্বীনে মোহাম্মদীর আদলে, তখন সম্মিলিত বিরোধিতার তীব্র-স্রোত প্রবাহিত হতে লাগলো দ্বীনে মোহাম্মদীর ওপর। হাজারবার রক্তাক্ত হতে হলো সকল রঙ, সকল রুপে বিরাজিত একমাত্র রসশক্তি মোহাম্মদ (সা) কে। ইব্রাহিম-নমরুদ, মুসা-ফেরাউন, রাম-রাবন, কৌরব-পান্ডব, শেষ যুগে ভোগবাদি-ভাববাদীদের মতোই দ্বীনে মোহাম্মদীকেও মুখোমুখি হতে হলো ওহুদ, বদর, খন্দক, খাইবার সহ হাজারো সমরাঙ্গনে। ভোগী-আত্মা ও ত্যাগী-আত্মার শ্বাশত লড়াই প্রস্ফুটিত হতে লাগলো জঙ্গে-জামাল ও সিফফিনে।
মানব সৃষ্টির হাজার বছর পর যখন মরু-সাহারায় যখন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলো দ্বীনে ফিৎরাত, অতএব অনিবার্য ভাবেই প্রয়োজন দেখা দিলো দ্বীনে ফিৎরাতকে সকল কলংঙ্কমুক্ত করে আপন মহিমায় স্থিত করার। মুখোশধারী সকল ভন্ডদের চিহ্নিত করা ছিলো দ্বীনে মোহাম্মদী টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোহাম্মদের অনুসারী বা আদর্শের গৃহে বসবাসকারি মহামানবদের বিলিয়ে দিতে হয়েছে আপন আপন জীবন, উৎসর্গ করতে হয়েছে আপন বুকের তাজা রক্ত। পৃথক করতে হয়েছে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, পবিত্রতা-অপবিত্রতা কে। যারই ক্রমধারায় অনুষ্ঠিত হয় বিষাদময় কারবালা। যেখান থেকে আহলে বাইয়াতের পবিত্র রক্ত দিয়ে চিরতরে দেয়াল তোলা হয় পবিত্রতা এবং অপবিত্রতার মধ্যে, ন্যায় এবং অন্যায়ের মধ্যে, ধর্ম এবং অধর্মের মধ্যে। সকল ভন্ডামী, অপবিত্রতা, অন্যায় এবং মুখোশধারী শয়তান চক্রকে চিনিয়ে দেয়া হলো জগৎবাসীকে। সারা জাহান উপলব্ধি করলো “ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকে বাদ”। আপন জীবন, সন্তান, পরিবার ও সঙ্গীদের জীবন উৎসর্গ করে নূরে মোহাম্মদ, মোহাম্মদ (সা) এর কলিজার টুকরা, বেলায়েতের দরজা হযরত আলী – জগৎ জননী মা ফাতেমার দুলাল, প্রেমধর্মের কান্ডারী ইমাম হুসাইন পরিপূর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন দ্বীনে মোহাম্মদী কে।
রচনাকাল – 18/02/2015
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী