হযরত রাসূলুল্লাহ (স) বলতেন, ইয়েমেনের দিক থেকে আল্লাহ রহমতের সুগিন্ধ বাতাস ভেসে আসছে বলে অনুভব করছি। আল্লাহর রহমতের এ সুগন্ধি বাতাস হল একটি পবিত্র, পুষ্পিত হৃদয়। তাঁর নাম হযরত ওয়ায়েস করণী (র)। স্বনামধন্য এক তাবেয়ী। রাসূলে করীম (স)-এর যুগে তিনি জীবিত ছিলেন করণ দেশে তথা ইয়েমেনে । অথচ নবী-মুস্তাফা (স)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি কোনদিন ।
এক আশ্চর্য ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (স) কে ঘিরে প্রথমত এক গুচ্ছ সোনালি মানুষ তাঁর জীবন ও ধর্মকে বর্মের মতো রক্ষা করেছেন। জীবনে জীবন যোগ করেছেন। ক্রমশ আত্মনিবেদিত প্রাণের সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে যায়। তাঁর নৈতিক বিপ্লবের ডাকে সাড়া দিয়ে অসংখ্য হৃদয়-স্পন্দিত আবেগে ইসলামের পতাকাতলে এসে দাঁড়ায়। ইসলামি আন্দোলনে শরিক করতে সক্ষম হন। এক বছরের মধ্যে এ সংখ্যা চার হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। অনুগামীদের সংখ্যা কী দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বিদায় হজ্জ । আমারা দেখেছি, এ হজ্জে যাঁরা অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের সংখ্যা এক লাখ চব্বিশ হাজার থেকে চল্লিশ হাজার পর্যন্ত ।
বাইরে যখন জন-জাগরণের বিপুল কলোচ্ছ্বাস, তখন নীরবে, নিবিড় গোপনে একটি মানুষ তাঁর হৃদয়-মনসর্বস্ব মহানবী-জীবনে সঁপে দিয়ে গভীর গূঢ় সাধনায় মগ্ন। আরব মরুর অকাশে দেদীপ্যমান সূর্যের আলোকরশ্মি আত্মসাৎ করে দিনে দিনে তিনি জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে । মানুষ তাঁর খোঁজ রাখেনি, বনান্তরালে সুবাসিত ফুলের মতো তিনি ফুটে উঠেছেন। আর সে সুরভি যেখানে পৌঁছানোর কথা সেখানে ঠিকই পৌঁছেছে। মহানবী (স)-এর অপাপবিদ্ধ হৃদয়ে সে সুগন্ধী বাতাস পুলক-চঞ্চল আবেগে ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ্ সে রহমতকে উপলব্ধি করতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দেরি হয়নি। আর অন্তরচক্ষু দিয়ে তিনি তাঁর পরমপ্রিয় আত্মীয়কে খুব স্পষ্ট করে দেখে নিয়েছেন। হযরত ওয়ায়েস কারণী (র)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে অবশেষে রাসূলে করীম (স) একদিন তাঁর যিনি সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, তোমরা জেনে রেখো, আমার এমন একজন ভক্ত আছেন, শেষবিচারের দিনে রাবী ও মোজার-এর ছাগপালের পশম-সংখ্যা তুল্য পাপী মানুষদের জন্য আল্লাহ্র কাছে সুপারিশ করবেন ।
সবাই অবাক! কে, কে তিনি, এমন সৌভাগ্যবান পুরুষ? নবী করীম (স) বললেন, তিনি আল্লাহ্র এক প্রিয়জন – ওয়ায়েস করণী।
তিনি কি আপনাকে দেখেছেন?
না। চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেননি। তবে দেখেছেন তৃতীয় নয়ন দিয়ে।
তিনি যদি আপনার এতই গুণমুগ্ধ, তাহলে আপনার সমীপে উপস্থিত হন না কেন?
আল্লাহর নবী (স) বললেন, তার দু’টো কারণ আছে। প্রথম, আল্লাহ ও আল্লাহর নবীর প্রেমে তিনি এমনই বিভোর যে, তাঁর কোথাও যাওয়ার অবসর নেই । আর দ্বিতীয় কারণটি হল, তিনি শরীয়তের নির্দেশ পালনে নিয়ত নিরত। বাড়িতে তাঁর বৃদ্ধা মা আছেন। তিনি অন্ধ । ওয়ায়েস করণী ছাড়া তাঁকে দেখার আর লোক নেই। মায়ের ভরণ-পোষণ, দেখা-শোনা, সেবা-পরিচর্যা ইত্যাদি যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাঁকেই বহন করতে হয়। আবার রুজি- রোজগারের জন্য তাঁকে উটও চরাতে হয় ।
আলোকিত অনুচরবর্গ অবাক হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কথা শুনতে থাকেন। এমন একটি মহিমময় মানুষকে দেখার ইচ্ছা পুষ্পিত লতার মতো বেড়ে ওঠে। তাঁরা বলেন, তাঁর সাথে কি আমাদের দেখা হবে না? না, পার্থিব-জীবনে তোমাদের সাথে তাঁর দেখা হবে না। হযরত আবু বকর (র)-কে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, আপনিও আপনার জীবনে তাঁকে দেখতে পাবেন না। তবে উমর ও আলীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হবে।
তারঃপর তিনি ওয়ায়েস কারণীর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করলেন। তাঁর সমস্ত শরীর অপেক্ষাকৃত বড় বড় লোমে ঢাকা। আর দু’হাতের বামদিকে একটা করে সাদা দাগ আছে। অবশ্য তা শ্বেতী রোগ নয় ।
আসন্ন ওফাত প্রাক্কালে মহানবী (স) তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী হযরত উমর (র) ও হযরত আলী (র)-কে বলেন, আমার মৃত্যুর পর আমার খিরকা ওয়ায়েস করণীকে দেবে। তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, তিনি যেন আমার গুনাগার উম্মতের জন্য দোয়া করেন। নবীজির এ আদেশ যথাসময়ে পালিত হয় ।
ওয়ায়েস করণী (র)-এর সন্ধান লাভ
হযরত উমর (র)-এর শাসনকাল । মহানবী (স)-এর নির্দেশ ভুলে যাননি তিনি। হযরত আলী (রা)-কে সঙ্গে নিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়লেন মহাতাপসের সন্ধানে কুফার পথে। কুফার মসজিদে খোতবা পাঠকালে হযরত উমর (র) উপস্থিত লোকজনদের ওয়ায়েস করণী (র)-এর কথা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তেমন সুবিধে হল না। মানুষ তাঁকে দেখেছে। কিন্তু তাঁর ভেতরের জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বকে শনাক্ত করতে পারেনি। যেটুকু সংবাদ পাওয়া গেল তা হল যে, সে একটা পাগল। লোকালয় ছেড়ে জনবিরল এলাকায় বাস করে। মাঠে উট চরায় । দিনের শেষে শুকনো রুটি খায়। লোকে যখন হাসে, সে তখন কাঁদে । আর লোকে যখন কাঁদে, সে তখন হাসে। খাপছাড়া আস্ত এক পাগল । এ সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা দু’জন কারণ এলাকায় গেলেন। ওয়ায়েস করণী তখন একমনে নামায পড়ছেন। পাশেই তাঁর উট চরছিল । আল্লাহর ফেরেশতাগণ উটের পাল দেখাশোনা করছিলেন। নামায শেষ করে তিনি অতিথিদের কাছে এসে সালাম জানালেন ।
তাঁরা বললেনঃ
প্রশ্ন – আপনার নামটা জানতে পারি কি?
উত্তর – তিনি বললেন, আবদুল্লাহ্ ।
প্রশ্ন – হযরত উমর (র) বললেন, আপনার আসল নামটি বলুন।
উত্তর – ওয়ায়েস।
প্রশ্ন – দয়া করে আপনার হাতখানা দেখাবেন?
উত্তর – তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন।
হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথার সঙ্গে হুবহু মিল। সে সাদা দাগ। অথচ শ্বেতী নয় । হযরত উমর (র) হাতে চুমু দিলেন। তারপর তাঁর হাতে তুলে দিলেন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পবিত্র খিরকা । আর তিনি যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতদের জন্য দোয়া করেন, সে কথাও তাঁর কাছে নিবেদন করা হল ।
কিন্তু ওয়ায়েস করণী (র) বললেন, আপনারা ভাল করে খোঁজ নিন। সমস্তত তিনি অন্য লোক হবেন। হযরত উমর (র) বললেন খুব ভালভাবেই খোঁজ নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (স) যেসব চিহ্নের কথা বলেন, তা মিলে গেছে। আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, আপনি তাঁর পরমপ্রিয় ওয়ায়েস।
এতক্ষণে ওয়ায়েস কারণী আগন্তুকদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। পরিচয় পাওয়ার পর পুলকিত চিত্তে তিনি তাঁদের সালাম জানালেন। হাতে চুমু দিলেন। বললেন, আপনাদের মতো মহাসম্মানিত ব্যক্তিরা এ গরিবের কাছে তাশরীফ এনেছেন, এ আমার পরম সৌভাগ্য। আরো বললেন, নবীজীর গুনাগার বান্দার মুক্তির জন্য দোয়া করার যোগ্যতা আপনাদেরই বেশি রয়েছে।
হযরত উমর (রা) বললেন, আমরা তা করছি। কিন্তু আপনিও রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নির্দেশ পালন করুন ।
হযরত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পবিত্র খিরকাটি হাতে নিয়ে ওয়ায়েস করণী সামান্য তফাতে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালেন, প্রভু গো! রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতদের গুনাহ্ মাফ না করলে আমি এ খিরকা পরব না। নবী-মুস্তাফা হযরত উমর ও হযরত আলীর প্রতি যে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, তাঁরা তা পালন করেছেন। এখন আপনার কাজ বাকি । আপনি আপনার প্রিয় বন্ধুর উম্মতের পাপ মাফ করে দিন ।
দৈববাণী হলো, হে ওয়ায়েস! তোমার দোয়ার কারণে কিছু সংখ্যক উম্মতকে মাফ করা হলো। কিন্তু তিনি শুনলেন না। বললেন, যতক্ষণ না সমস্ত উম্মতকে মাফ করা হয়, ততক্ষণ আমি নবীজির দেয়া খিরকা পরব না ।
আকাশবাণী এল – তোমার দোয়ার জন্য কয়েক হাজার মানুষকে মার্জনা করা হবে ।
হযরত ওয়ায়েস করণী (র) যখন এভাবে সেজদাবনত অবস্থায় প্রতিপালকের দরবারে তাঁর আবেদন রাখছেন, তখন সেখানে হযরত উমর (রা) ও হযরত আলী (রা) এসে হাজির। তাঁদের দেখে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, আপনারা কেন আমার কাছে এলেন? আমি যে রাসূলের উম্মতদের মুক্তির জন্য চেষ্টা করছিলাম। যে পর্যন্ত না তাদের সবাইকে মাফ করতে পারছি, সে পর্যন্ত আমি প্রিয় নবীর খিরকা গায়ে তুলব না ।
ওয়ায়েস কারণী (র)-এর সামনে হযরত ওমর (র)-এর খেলাফত তুচ্ছ মনে হল : ছিন্নবস্ত্র পরিহিত এ মানুষটির অন্তর্জ্যোতি উপলব্ধি করে হযরত উমর (রা) অভিভূত ও ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন। সামান্য একটি লোক-অথচ কী অসামান্য। সাধারণ একটি মানুষ-অথচ অসাধারণ। এর তুলনায় তুচ্ছ তাঁর খিলাফত তাঁর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য। বিতৃষ্ণায় মন ভরে উঠল। তাঁর হযরত ওমর (রা) বললেন, এমনকি কেউ আছে যে, এখানি রুটির বিনিময়ে খিলাফতের দায়িত্ব নিতে পারে?
তাঁর এই স্বগোক্তি শুনে ওয়ায়েস কারণী যে বোকা, শুধু সে-ই তা নেবে। সত্যিই যদি মন না চায়, তাহলে ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেই তো হয়। যার মন চায়, সে কুড়িয়ে নেবে। ওসব বিনিময়ের কথা কি বলছেন?
এ কথা বলে তিনি এবার রাসূলুল্লাহ (স) প্রদত্ত পোশাক পরম ভক্তিভরে পরিধান করলেন। তারপর বললেন, আল্লাহ্ এ অধমের প্রার্থনায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাবী ও মোজার – কবিলার ছাগ-লোমের তুল্য নবীজীর উম্মতকে মার্জনা করবেন ।
হযরত উমর (র) ও হযরত আলী (রা) নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই মহাতাপসের আত্মিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন ।
কিছুক্ষণ পরে হযরত উমর (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি আপনার এমন গভীর ভালবাসা, অথচ আপনি একবার নিজে গিয়ে তাঁকে দর্শন করেননি কেন?
ওয়ায়েস কারণী (র) এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, আচ্ছা, আপনারা তো তাঁকে দেখেছেন, তাই না?
হ্যাঁ! দেখেছি ।
মনে হয় আপনারা কেবল তাঁর জোব্বাই দেখেছেন। তাঁকে ঠিক দেখেননি। বলুন তো, তাঁর পবিত্র ভুরু দু’টি জোড়া ছিল না আলাদা?
প্রশ্ন শুনে তাঁরা অপ্রস্তুত। আশ্চর্যের কথা, দু’জনের কেউই ওয়ায়েস করণী (র)-এর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি আরো একটি প্রশ্ন করলেন – আচ্ছা, মনে হয় প্রিয় নবীর ওপর আপনাদের গভীর ভালোবাসা ছিল, তাই না? নিশ্চয়ই। আর সে ভালোবাসা এখনো অটুট। তাই যদি হয়, তাহলে আপনাদের দু’জনের মুখে এখনো দাঁতগুলো রয়েছে কিভাবে? ওহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাঁতগুলো ভেঙে গেল, অথচ সমব্যথী হয়ে আপনাদের দাঁতগুলি ভেঙে ফেলতে পারলেন না। অথচ এখনো দাবি করেন, তাঁর প্রতি আপনাদের ভালবাসা এখনো অটুট। আর শুনুন, আমি তাঁকে চোখে কোনদিন দেখিনি। ওহুদের যুদ্ধে তাঁর কোন দাঁতটি ভেঙে পড়ে, তাও দেখিনি। কিন্তু যখন শুনলাম যুদ্ধে নবীজীর দাঁত ভেঙে গেছে, তখন ভাবলাম তাঁর মুখে তো এখন দাঁত নেই, তাহলে আমি আমার দাঁত রাখি কোন্ মুখে? মনে হওয়ামাত্র একটি দাঁত উপড়ে দিলাম । পরক্ষণে মনে হল, তাঁর ঠিক কোন্ দাঁতটি ভেঙে গেছে তা তো জানি না। হয়তো সে দাঁতটি এখনো রয়েছে আমার মুখে। এ সংশয় দূর করার জন্য আমি সব দাঁতগুলোই তুলে ফেলেছি।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয় দুসহচর ওয়ায়েস করণী (র)-এর এ বিবরণ শুনে শিউরে উঠলেন । এও কি সম্ভব? অথচ শুধু সম্ভব নয়, সত্য। ভালোবাসা, ভক্তি কাকে বলে, ওয়ায়েস করণী (র) তার এক প্রদীপ্ত প্রমাণ । আন্তরিক অকপট, নির্মল ভালবাসার এ নমুনা দেখে তাঁরা স্তম্ভিত। চোখের আড়ালে যিনি ছিলেন, তিনি কেমন করে সমগ্র চেতনা জুড়ে চৈতন্যময় হয়ে উঠেছেন। হযরত উমর (রা) ও হযরত আলী (রা) এই মহান প্রেমিকের কাছে কিছু শিক্ষা নিতে চাইলেন । বিনীত কণ্ঠে বললেন জনাব, আমাদের জন্য দোয়া করুন।
ওয়ায়েস করণী (র) বললেন, আমার ঈমান অনুরাগহীন। তবুও দোয়া করছি। প্রতি ওয়াক্ত নামাযে এ দোয়াই করে থাকি-প্রভু গো! বিশ্বাসী নর ও নারীকে আপনি ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রা)-কে বললেন, যদি ঈমান সহ কবরে যেতে পারেন, তাহলে দোয়া নিজেই আপনাকে খুঁজে নেবে ।
হযরত উমর (রা) বললেন, আরো কিছু বলুন ।
ওয়ায়েস কারণী (র) বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন আপনি কি আল্লাহকে চিনেছেন?
হ্যাঁ, চিনেছি।
যদি চিনে থাকেন, তাহলে অন্য কাউকে যেন না চেনেন, না জানেন। তবে তাই হবে আপনার পক্ষে সবচেয়ে ভাল ।
আরো কিছু বলুন ।
আল্লাহ্ কি আপনাকে চেনেন, জানেন ।
তা তো অবশ্যই ।
একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কেউ যদি আপনাকে না জানেন, তো খুব ভালো কথা ।
এ কথার পর হযরত উমর (রা) বললেন, দাঁড়ান, আপনার জন্য আমি কিছু নিয়ে আসি । আল্লাহ্ ও রাসূলপ্রেমী লোকটি তখন জামার পকেট থেকে দু’টি পয়সা বের করে বললেন, উট চরিয়ে আমি এ পয়সা রোজগার করেছি। যদি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন যে, এ পয়সা খরচ করার পরও আমি বেঁচে থাকব, তাহলে আমারও কিছু জিনিস-পত্রের প্রয়োজন হবে। তার মানে, জীবন কখন শেষ হয়ে যায় কেউ জানে না । সুতরাং কোন কিছু সঞ্চয়েরও প্রশ্ন আসে না। অর্থাৎ, খলিফার কাছ থেকে ওয়ায়েস করণী (র) কিছু নিতে অস্বীকার করলেন। পরে দুমহান অতিথির উদ্দেশ্যে বললেন, এখানে আসার জন্যে অনেক দুঃখ-কষ্ট পেয়েছেন। আমিও আপনাদের কম দুঃখ দেইনি । আশা করি আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন। এখন আপনারা বিদায় গ্রহণ করুন। রোজ কিয়ামত খুব কাছে। আল্লাহর রহমতে সেদিন আবার দেখা হবে। আর তখন, আমাদের সান্নিধ্য-সংস্পর্শ দীর্ঘস্থায়ী হবে। আমি এখন আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহে খুবই ব্যস্ত। এ কথা বলে, হযরত উমর (রা) ও হযরত আলী (রা) কে তিনি বিদায় জানালেন। তারপর নিজেও সেখান থেকে চলে গেলেন।
বস্তুত এ সাক্ষতের পর থেকেই হযরত উমর (রা) ও তাঁর সঙ্গী হযরত আলী (রা)- এর মাধ্যমে ওয়ায়েস করণী (র)-এর নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এজন্য আত্মনিবেদিত দরবেশের গোপন-গভীর নীরব সাধনায় বিঘ্ন দেখা দিল। তখন তিনি ঐ এলাকা ত্যাগ করে কুফায় চলে যান। শোনা যায় এরপরে হারম ইবনে জামান ছাড়া আর কারও সাথে তাঁর দেখা হয়নি ।
ইবনে জামান ও ওয়ায়েস করণী (র)
লোকমুখে ওয়ায়েস করণী (র)-এর নাম শুনে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য খুবই উতালা হয়ে উঠলেন ইবনে জামান। তাঁর শারীরিক বর্ণনা জানা ছিল । একদিন ফোরাত নদীতে তিনি তাঁকে অযু করতে দেখলেন। আর চিহ্নগুলো মিলিয়ে নিলেন মনে মনে। বুঝলেন, যাঁকে তিনি খুঁজছেন, ইনিই তিনি। ইবনে জামান তাঁকে সালাম জানিয়ে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন ।
তিনি সালামের জবাব দিলেন। কিন্তু করমর্দন করলেন না। ইবনে জামান দেখলেন, কী অপরিসীম দারিদ্র্য ও দৈন্যদশায় ক্লিষ্ট হয়েছেন ওয়ায়েস করণী (র)। দারিদ্র্য-জর্জর লোকটিকে দেখে ইবনে জামানের চোখে পানি এল। তিনি কাঁদলেন। কাঁদলেন ওয়ায়েস করণী (র)-ও। ইবনে জামান বললেন, আল্লাহ্ আপনার প্রতি করুণা বর্ষণ করুন ।
হযরত ওয়ায়েস কারণী (র) বললেন, হে হারম ইবনে জামান! আল্লাহ্ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন! আপনি কি জন্য এখানে এসেছেন? আর আমার সন্ধানই বা পেলেন কার কাছে? ইবনে জামান তাঁর কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বললেন, জনাব আপনি আমার ও আমার পিতার নাম জানলেন কি করে? এর আগে তো আপনি আমাকে কখনো দেখেননি। হয়তো আমার কথা কখনো কারো কাছে শুনতেও পাননি ।
ওয়ায়েস কারণী (র) বললেন, যার জ্ঞানের অগোচর কিছুই নেই, তিনিই আমাকে জানিয়েছেন । আমার আত্মা আপনার আত্মাকে চিনেছে ।
তারপর ইবনে জামান মহান তাপসকে অনুরোধ করলেন, দয়া করে রাসূলে করীম (স) সম্পর্কে কিছু বলুন ।
ওয়ায়েস কারণী (র) বললেন, আমি তাঁকে নিজের চোখে দেখিনি। কিন্তু তাঁর পূত-পবিত্র বাণী অন্যের মুখে শুনেছি। আমি মুহাদ্দিস বা ভাষ্যকার হতে চাইনি । আমার অন্য কাজ আছে। আপনি যদি পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করে শোনান তো আমি শুনি ।
ইবনে জামানের অনুরোধে ওয়ায়েস কারণী (র) পাঠ শুরু করলেন, ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাজীম।’ এটুকু উচ্চারণ করেই তিনি আকুলভাবে কাঁদতে কাঁদতেই পাঠ করে গেলেন, ‘অমা খালাক্বাতুল জ্বিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা-লিইয়া বুদুন’-আমি জ্বিন ও মানুষকে শুধু আমার উপাসনা করার উদ্দেশ্যে ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি ।
আয়াতটি পাঠ করেই তিনি জোরেশোরে চিৎকার করে উঠলেন । মনে হল, তিনি বুঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু না। ইবনে জামানের উদ্দেশ্যে বললেন, বলুন, আপনি কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? আপনার প্রতি আমার ভক্তি ও ভালোবাসাই আমাকে টেনে এনেছে ।
যিনি আল্লাহকে চিনেছেন, তিনি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে ভালোবাসা করে শান্তি পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। জেনে রাখুন, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে কেউ কোনদিন সুখী হতে পারে না ।
এ ধরনের কথাবার্তার পরে ইবনে জামান আবার অনুরোধ করলেন, দয়া করে আমাকে কিছু উপদেশ দিন।
ওয়ায়েস কারণী (র) এ অনুরোধ রক্ষা করলেন। বললেন, যখন ঘুমিয়ে যাবেন, তখন মনে করবেন মৃত্যু আপনার শিয়রে। আর যখন জেগে থাকবেন, তখন জানবেন মৃত্যু রয়েছে চোখের সামনে । কোন পাপকে ছোট মনে করবেন না। কেননা, পাপকে ছোট মনে করাও পাপ ।
ইবনে জামানের পরবর্তী প্রশ্ন: আমি এখন কোথায় বসবাস করব জনাব?
আপনি সিরিয়া চলে যান।
অপরিচিত দেশে আমার গ্রাসাচ্ছাদান কিভাবে চলবে?
যার মনে এত চিন্তা-ভাবনা, উপদেশে তার কোন কাজ হবে না ।
দয়া করে আরো কিছু বলুন ।
আপনার পিতার মৃত্যু হয়েছে। হযরত আদম, নূহ, মূসা, ঈসা এমনকি শেষ নবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (স)-ও ইন্তেকাল করেছেন। ভাই উমরও মৃত্যু পথের পথিক। কথাটা বলেই তিনি হায় উমর! হায় উমর! বলে কাঁদতে লাগলেন ।
ইবনে জামান কেমন যেন দিশেহারা হয়ে বললেন, আল্লাহ্ আপনার ভাল করুন। কিন্তু জনাব, হযরত উমর (রা) তো মৃত্যুবরণ করেননি।
হযরত ওয়ায়েস করণী (র) বললেন, আল্লাহ্ আমাকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানিয়ে দিয়েছেন । পরে বললেন, আসলে আপনি আমি আমরা সবাই মৃতদের দলভুক্ত।
এরপর নামাযের সময় উপস্থিত হলে হযরত ওয়ায়েস করণী (র) নামায সম্পন্ন করে দোয়া করলেন । তারপর বললেন, পাক কুরআন ও আল্লাহ্ ওলীদের কথা মেনে চলবেন । আর মুহূর্তের জন্যও মৃত্যুর কথা ভুলে যাবেন না। ইবনে জামান, আপনার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। আপনি আমার জন্য দোয়া করুন। আমিও আপনার জন্য দোয়া করছি। আপনি খাঁটি মুসলিমের জীবন-যাপন করবেন। তিনি এবার ইবনে জামানকে পথ-নির্দেশ করে বললেন, আপনি এ পথ ধরে চলে যান। তাঁর সঙ্গে কিছুদূর যেতে চাইলেন । কিন্তু তিনি রাজি হলেন না । বিদায় মুহূর্তটি করুণ হয়ে উঠল। দু’জনেই কাঁদলেন। ইবনে জামানের সঙ্গে হযরত ওয়ায়েস করণী (র)-এর সে প্রথম ও শেষ দেখা ।
ওয়ায়েস কারণী (র)-এর জীবন চর্চা
একটি বিবরণে পাওয়া যায়, হযরত ওয়ায়েস কারণী (র) ফজরের নামায শেষ করে তসবীহ পড়তে পড়তে জোহরের ওয়াক্তে পৌঁছে যেতেন। আবার জোহরের নামায শেষে তসবীহ পাঠে এসে যেত আসরের ওয়াক্ত। এভাবে নামাযও তসবীহ পাঠ চলত অনবচ্ছিন্নভাবে কয়েক দিন ও রাত। আহার নেই, নিদ্রা নেই । প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়া নেই। আর এজন্য অযু বা গোসলের প্রয়োজন হতো না তাঁর। বিরামহীন উপাসনা । ইবাদত-বন্দেগী যেন তাঁর মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করেছিল ।
বহু বিনিদ্র রজনী তিনি যাপন করেছেন। তিনি বলতেন, এ রাতটি আমার কিয়ামের জন্য, এ রাতটি রুকুর জন্য। এক রাতটি সেজদার জন্য ইত্যাদি ।
লোকে তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, হযরত! আপনি কেমন আছেন? তিনি বলতেন, কী বলব, সেজদায় গিয়ে সেজদার তাসবীহ পাঠ করতে করতে রাত কাবার হয়ে যায়। ফেরেশতাদের মতো একটু ইবাদত করব মনে করি, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না ।
আপনি কেমন আছেন?-এ প্রশ্নের উত্তরে একবার বলেন, কেমন আছি, তা কি করে বলব! ভোরে উঠে সন্ধ্যার আগেই মৃত্যু আসবে কিনা যে বলতে পারে না, সে আর কেমন থাকবে? প্রশ্নকর্তা বলেন, তবুও বলুন, আপনার অবস্থা কি?
তিনি বলেন, এক সহায়-সম্পদহীন পথিক । তার পথ যে খুবই দীর্ঘ।
কেউ তাঁকে প্রশ্ন করেন, নামাযের একাগ্রতা বলতে কি বোঝায়?
তাঁর উত্তর, যে নামাযে তীরবিদ্ধ হলেও নামাযসম্পন্নকারী তা টের পায় না ।
একবার তাঁর কাছে একটি লোকের এক আশ্চর্য খবর এল । লোকটি নাকি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে কবর স্থানে বসে গলায় কাফনের কাপড় ঝুলিয়ে কেবল কেঁদে যাচ্ছে। আর কিছু করে না। খবর শুনে হযরত ওয়ায়েস কারণী (র) বললেন, তোমরা আমাকে তার কাছে নিয়ে চল । তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল। সত্যিই, দীর্ঘদিন কেঁদে কেঁদে বেচারা কঙ্কালসার। আহার নিদ্রা বিশ্রাম সব ভুলে গেছে। ওয়ায়েস করণী (র) তাকে বললেন, হে ভ্রান্ত! কবর ও কাফনের কাপড় তোমাকে আল্লাহর নিকট থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। তোমাকে বিপথগামী করেছে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়। আর আল্লাহর পথ ধর ।
ওয়ায়েস কারনী (র)-এর কথায় লোকটির হুঁশ হল । তওবা করে নামায রোযা শুরু করল।
শোনা যায়, একবার তিনি পরপর তিনদিন ধরে উপবাসী রইলেন। চতুর্থ দিনে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটি দীনারের ওপর। তাঁর মনে হল, হয়তো এটি অন্য লোকের। পড়ে গেছে পথের ওপর। কাজেই দীনারটি তুলে নিলেন না। এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে । প্রচণ্ড ক্ষুধার তাড়না। স্থির করলেন, কচি ঘাস চিবিয়ে ক্ষুধার জ্বালা মেটাবেন। ঠিক এ সময়, কে যেন একখানি গরম রুটি তাঁর সামনে রেখে দিল । কিন্তু, রুটির মালিক অন্য কেউ হবে ভেবে, তাও তিনি এড়িয়ে গেলেন। তখন একটি ছাগল বলল, এ রুটি আপনারই। দেখুন, আপনি যাঁর দাস, আমিও তাঁর দাস। ওয়ায়েস করণী (র) এ ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন। আর রুটিখানা তুলে নিলেন। ওদিকে চোখের পলকে ছাগটি মিলে গেল ।
এমন পবিত্র-আত্মা সচরাচর বিরল। হযরত ওয়ায়েস করণী (র) প্রকৃতই আল্লাহর এক মহান সৃষ্টি। মানুষ হিসেবে মানুষ কত উন্নত হতে পারে, তিনি তার একটি উজ্জ্বলতম উদাহরণ। দীর্ঘজীবন শেষে তিনি জান্নাতবাসী হন। কেউ কেউ বলেন, সিফীনের যুদ্ধে হযরত আলী (র)-এর পক্ষে যোগদান করে শাহাদত বরণ করেন।
হযরত ওয়ায়েস কারণী (র)-এর বাণী
১. তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি তোমার যদি আস্থা ও বিশ্বাস না থাকে, তাহলে আসমান-জমিন তুল্য ইবাদত করলেও তা কবুল হবে না। সে ইবাদত নিষ্ফল ।
সে ব্যক্তি বলে, কিভাবে আস্থা রাখতে হবে?
২. তাঁর উত্তর, তোমার যা কিছু আছে, অর্থাৎ আল্লাহ্ তোমাকে যা দিয়েছেন, তাতেই তুষ্ট ও তৃপ্ত থাকবে । অন্য কোন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হবে না ৷
৩. তিনি আরো বলেন, তিনটি জিনিস যে খুব বেশি ভালোবাসে, জাহান্নাম তার কণ্ঠ থেকেও নিকটবর্তী। যেমন, (ক) সুখাদ্য, (খ) উত্তম পোশাক (গ) আমীর-উমারার উমেদারী।
8. তিনি বলেন, যে লোক আল্লাহকে চিনেছে, তার কাছে কোনও কিছু গোপন নেই। আর তার মাধ্যমে আল্লাহকে জানা সম্ভব ।
৫. শান্তি রয়েছে নির্জনতার মধ্যেই।
৬. একত্ববাদের জ্ঞান কেবল তখনই লাভ করা যায়, যখন আল্লাহ্র চিন্তা ছাড়া অন্য সব চিন্তা মন থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। আল্লাহ্র দরবারে মনকে হাজির রাখতে চাই। তাহলে শয়তান তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না ।
৭. উচ্চ মর্যাদার অন্বেষণ করেছি, আর তা পেয়েছি বিনয়ের মাধ্যমে। গৌরব অর্জনের বাসনা ছিল, তা অর্জন করেছি দরিদ্রের মধ্যে। নেতৃত্ব লাভের আশা করেছি তা পেয়েছি সত্যের ভেতরে। আভিজাত্যের ইচ্ছা ছিল, আল্লাহভীতির মধ্য দিয়ে তা লাভ করেছি। মহত্বের সন্ধান করেছি, আর তা পেয়েছি তুষ্টির মাধ্যমে। নির্ভরতার সন্ধান করেছি, আর তা আল্লাহ্ ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে পেয়ে গেছি ।
গ্রন্থসূত্র – তাযকিরাতুল আউলিয়া
মূল – হযরত খাজা ফরীদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরী
অনুবাদ – মাওলানা ক্বারী তোফাজ্জল হোসেন ও মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ হাসান
সিদ্দিকিয়া পাবলিকেশন্স