আপন ফাউন্ডেশন

হাসান বসরী আল আনছারী রহ. জীবন ও বাণী

Date:

Share post:

হযরত হাসান বসরী (র) একজন ভাগ্যবান পুরুষ। ভাগ্যবান এ অর্থে যে, তিনিও সে সোনালি যুগের সন্তান। নবীর শহর মদিনাতে তাঁর জন্ম। তাঁর মা ছিলেন উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালমা (র)-এর একজন পরিচারিকা। তাঁর সৌভাগ্য হল, শিশু অবস্থায় তিনি উম্মে সালমা (রা) ও হযরত আয়েশা (রা)-এর স্তন্য পান করেছেন। মা কাজে ব্যস্ত। শিশু হাসান হয়তো ক্ষুধার কারণে কান্না শুরু করেছেন, তখন হযরত সালমা (রা) নিজের স্তন তাঁর মুখে পুরে দিতেন। আর সে স্তন পান করে তিনিও শান্ত হতেন। হযরত আয়েশা (রা) নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। কিন্তু তিনিও মাঝে মাঝে ক্রন্দনরত শিশুকে পরম আদরে তুলে নিয়ে বুকের দুধ পান করাতেন। নিঃসন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর স্তন থেকে দুধ বের হতো। সবই আল্লাহর অপার মহিমা। এর চেয়ে ভাগ্যবান কে আছে আর! মুসলিম-দুনিয়ার দু জননী, দু নবী-পত্নীকে তিনি জননী হিসেবে পেয়েছেন। তাঁদের বুকের পীযূষধারা পান করে পরিতৃপ্ত হয়েছেন ।

শুধু তাই নয়, পেয়েছেন মহানবীর সানুরাগ সংস্পর্শ। একদিন তো স্বয়ং রাসূলে করীম (স)-এর পানির পেয়ালার পানি পান করে ফেললেন শিশু হাসান। পেয়ালায় পানির পরিমাণ কম দেখে রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞেস করলেন, পানি পান করল কে?
উম্মে সালমা (র) বললেন, হাসান।
রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, আমার পানির পেয়ালা থেকে যে পরিমাণ পানি সে পান করেছে, আল্লাহ তাঁকে সে পরিমাণ দ্বীনী এলুম দান করবেন।

একটি হাদীসে আছে একদিন হযরত রাসুলুল্লাহ (স) যখন উম্মে সালমা (র)-এর ঘরে এলেন, তখন তিনি হাসানকে রাসূলুল্লাহ (স)- এর কোলে তুলে দিলেন। আর তাঁকে কোলে নিয়ে তিনি তাঁর জন্যে আল্লাহ্র দরবারে দোয়া জানালেন। বলাবাহুল্য, নবী-মুস্তাফার এ দোয়ার কারণেই হযরত হাসান বসরী (র)-এর জীবনে সাফল্য আসে আল্লাহর তরফ থেকে। তাই বলেছিলাম, তাঁর চেয়ে ভাগ্যবান কে আছে আর ।

এমনকি নামটির পেছনেও সৌভাগ্যের সঙ্কেত আছে। শোনা যায়, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কে যেন এই ফুটফুটে শিশুকে নিয়ে যায় হযরত উমর (রা)-এর কাছে। নবজাতককে দেখে তিনি বলে ওঠেন, ভারি ‘সুন্দর’ চেহারা তো। এর চেহারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেন এর নাম রাখা হয় হাসান। ‘হাসান’ শব্দের অর্থ সুন্দর। তখন থেকে তিনি ‘হাসান’ নামেই পরিচিত হয়ে গেলেন। অর্থাৎ, তাঁর নামের পেছনে রয়ে গেল মুসলিম বিশ্বের আরো একটি উজ্জ্বল মানুষের সেময় অভিব্যক্তি।

নিজের সন্তান না হলেও হযরত সালমা (রা) তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। তাঁর জন্য দোয়া করতেন। আল্লাহ্ যেন তাঁকে মুসলিম জাহানের ইমাম বানিয়ে দেন, এ ছিল তাঁর আন্তরিক প্রার্থনা।

তাঁর সৌভাগ্যের আরো প্রমাণ হল, তিনি কম করেও একশ কুড়িজন আলোকিত পুরুষের সংস্পর্শ ধন্য। হযরত আলী (রা)-এর পুত্র ইমাম হাসান (রা)-এর কাছে তিনি বিদ্যার্জন করেন। শরীয়তী জ্ঞান ছাড়াও মারেফাতের দীক্ষাও তিনি তাঁরই কাছ থেকে পান। অবশ্য ‘তোহফা’ নামক গ্রন্থের গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন, হযরত হাসান বসরী (র) আসলে হযরত আলী (রা)-এর শিষ্য।

হযরত হাসান বসরী (র)-এর আধ্যাত্মিক জীবন শুরু

নবারুণের মত প্রদীপ্ত তরুণ হযরত হাসান বসরী (র) ছিলেন রত্ন-ব্যবসায়ী। আর ব্যবসা উপলক্ষে বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করতেন। সমকালের বিশ্ববিখ্যাত সাম্রাজ্য হল রোম । রোমের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ও তাঁর একটি বন্ধুত্রে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একবার রোমে পৌঁছেই হযরত হাসান বসরী (র) দেখলেন, মন্ত্রীবর কোথায় যেন যাবার জন্য প্রস্তুত । বন্ধুকে দেখে তিনি খুব খুশি। বললেন, বড় ভাল সময়ে এসেছেন আপনি। চলুন আমার সঙ্গে গিয়ে একটি অনুষ্ঠান দেখে আসবেন ।

ঘোড়ার পিঠে চড়ে তাঁরা যাত্রা করলেন ।

গন্তব্যস্থলে গিয়ে দেখা গেল, এক মাঠের প্রান্তে স্বর্ণ ও মণিমাণিক্য খচিত রেশমী বস্ত্রের একটি সুদৃশ্য অপূর্ব তাঁবু। তাঁবুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে একদল সুসজ্জিত সৈন্য নিজেদের ভাষায় কী যেন বলতে লাগল । তারপর চলে গেল । এরপর এলেন একদল অভিজ্ঞ পণ্ডিত মানুষ। তাঁবু প্রদক্ষিণ করে তাঁরাও যেন কি বললেন আর চলে গেলেন। তারপরে এক একদল রূপসী মহিলা । মাথায় মণিমাণিক্য ভর্তি স্বর্ণের থালা। তারাও ঘুরল তাঁবুর চারদিক। কী যেন বলল । আর চলে গেল । সবশেষে এলেন স্বয়ং রোম সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী। তাঁদের সঙ্গে এবার প্রধানমন্ত্রী গিয়ে যোগ দিলেন। আর সবাই ঢুকলেন তাঁবুর ভেতরে। কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তাঁরা বেরিয়ে এলেন তাঁবুর বাইরে। কিন্তু তখন তাঁরা অশ্রু-সজল ।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো, সবকিছু দেখে গেলেন হযরত হাসান বসরী (র)। এসবের কী কারণ, কী ব্যাখ্যা, তা জানার জন্য তার কৌতূহল প্রবল হয়ে উঠল। মন্ত্রী যখন ফিরে এলেন তাঁর কাছে, তখন তাঁকেই এ ঘটনার মর্ম জিজ্ঞেস করলেন ।

মন্ত্রী বললেন, আমাদের সম্রাটের এক পুত্র ছিল। তিনি তাঁকে খুব ভালবাসতেন। হঠাৎ ছেলেটি এক কঠিন অসুখে পড়ল। দেশ-বিদেশ থেকে নামী-দামী চিকিৎসকরা এলেন তার চিকিৎসা করতে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, সে মারা গেল। তাঁকে এখানে কবর দেয়া হয়। আর কবরের ওপর রয়েছে ঐ সুদৃশ্য তাঁবুটি। রাজপুত্রের স্মরণে প্রতি বছর এখানে এ অনুষ্ঠান হয়।

হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, কিন্তু এখানে যাঁরা এলেন আর কী কী কথা বলে চলে গেলেন, তা তো বুঝলাম না ।

মন্ত্রী বললেন, প্রথম যে সেনাদল দেখছেন, তারা বলে গেল হে রাজকুমার, আপনার যা ঘটেছে, আমাদের বাহুবল ও অস্ত্রবল দিয়ে যদি তা প্রতিহত করা যেত, তাহলে আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করে আপনাকে রক্ষা করতাম। কিছুতেই এ অবস্থার শিকার হতে দিতাম না। কিন্তু যাঁর ইশারা ইঙ্গিতে এমনটি হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা চলে না। তিনি এমন অমিত শক্তির অধিকারী যে, যে কোনও বীরের বীরত্ব ব্যর্থ হতে বাধ্য ।
আর পণ্ডিতসমাজ বলে গেলেন, রাজকুমার! আমরা আপনার জন্য দুঃখিত । কিন্তু কী আর করা যাবে। আমাদের পাণ্ডিত্য যদি আপনাকে রক্ষা করতে পারত, তাহলে তা প্রয়োগ করতে কিছু কম করতাম না । কিন্তু এক্ষেত্রে জ্ঞান, বুদ্ধি, বিদ্যা কিছুই কার্যকর নয়। কোন বিদ্যাই এ
অবস্থাকে আটকাতে পারে না ।

পরে মহিলারা এসে বলে গেল, যুবরাজ! আপনার বিচ্ছেদ-বেদনা অসহ্য। আপনাকে হারিয়ে আমরা চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছি। কিন্তু কিছু করার নেই। আমাদের রূপ-লাবণ্য যদি আপনাকে রক্ষা করার কাজে লাগানো যেত, তাহলে কখনই আমরা পিছপা হতাম না । কিন্তু এ ঘটনাপ্রবাহের নিয়ন্তা যিনি, তাঁর কাছে আমাদের কোন মূল্য নেই। আমরা আপনার জন্য কিছু করতে অক্ষম ।

সবশেষে সম্রাট। তিনি তাঁর পুত্রের উদ্দেশ্যে বললেন, প্রিয়তম পুত্র, তোমার পিতার শক্তি-সামর্থ্য আর কতটুকু! কত সৈন্য রয়েছে আমার। রয়েছে জ্ঞানী, গুণী, বিদ্বান। তারা সবাই তোমার হিতকামী ছিল। সবাই তোমার দীর্ঘজীবন কামনা করত। কিন্তু তোমার প্রাণরক্ষার ব্যাপারে সবাই অক্ষম। আমি আজ সবাকে তোমার কাছে হাজির করেছি। আর তারা তাদের অক্ষমতার কথা তোমাকে জানিয়ে দিয়ে গেল। আমি আর কী বলব! পুত্র স্নেহ যে কী, যার পুত্র রয়েছে, সে ছাড়া আর কেউ তা উপলব্ধি করতে পারবে না । আমার সৈন্য-সামন্ত, অর্থ, উপকরণ, বিদ্যা-বুদ্ধি বা যে কোনও শক্তি প্রয়োগ করে যদি তোমাকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, তাহলে আমি কখনো পিছপা হতাম না। সাম্রাজ্য, সম্পদ বিসর্জন দিয়েও যদি তোমাকে রক্ষা করতে পারতাম, তাতেও কোন ত্রুটি হত না। কিন্তু ঘটনার মালিক যিনি, তাঁর কাছে তোমার পিতা, এমনকি পৃথিবীর যে কোন সম্রাট, বীর, যোদ্ধা একান্তই দুর্বল । অতএব, প্রাণাধিক পুত্র আমার, তোমার রক্ষার ব্যাপারে আমি কিছুই করতে পারলাম না

মন্ত্রীর মুখে ঘটনার বিবরণ শুনে হযরত হাসান বসরী (র)-এর মনে ভাবান্তর দেখা দিল । ফুটে উঠল পার্থিব-জীবনের অসারতা। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ রইল না। সবকিছু ছেড়ে সহসা তিনি চলে গেলেন বসরায়। প্রতিজ্ঞা করলেন, আর কোনদিন সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হবেন না। সেখানে শুরু হলো তাঁর গভীর একাগ্র আধ্যাত্মিক জীবন । আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন হলেন তিনি।

সে এক কঠিন অকল্পনীয় জীবনসাধনা। সেকালে তাঁর মতো তপস্বী আর দেখা যায়নি। কখন যে কী হয়, আলেমুল গায়েব আল্লাহই তা জানেন।

মহানবী (স) কিংবা মহানবী-পত্নীর দোয়া আল্লাহ্ প্রসন্নচিত্তে মঞ্জুর করেন। শিশু হাসান হয়ে ওঠেন মহাসাধক হযরত হাসান বসরী (র)।

প্রায় ৭০ বছর ধরে একটানা তাঁর অযু ছিল । মাঝে মাঝে অযু নষ্ট হলে তিনি সাথে সাথে অজু করে নিতেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, সকল লোকই তাঁর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী। কিন্তু তিনি আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো মুখাপেক্ষী ছিলেন না । এ জন্য জ্ঞানী হিসেবে তাঁর নাম সকলের উর্ধ্বে ।

হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর উপস্থিতি তাঁর কাছে ছিল খুবই প্রেরণাদায়ক। সাধারণত, প্রতি শুক্রবার জুমআর নামাযের পর তিনি ওয়াজ করতেন। হযরত রাবেয়া বসরী (র) অনুপস্থিত থাকলে ওয়াজ করতেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যে শরবত হাতির পানের উপযোগী তা পিঁপড়ের পানপাত্রে কিভাবে ঢেলে দেয়া যায়। অর্থাৎ, তাঁর ভাষণের মর্ম গ্রহণের যোগ্যতা হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর তুলানায় অন্যদের ছিল না বললেই চলে । অনেক সময় তিনি এ পরম সম্মানিতা তাপসীকে বলতেন, আমার ভেতরে যে আন্তরিক প্রেরণা, এ এল কোত্থেকে? এর সৃষ্টি তোমারই অন্তরে ।
“বেশি লোক জড়ো না হলে কি আপনি খুশি হন না?” –অনেকে তাঁকে এ প্রশ্ন করতেন । তিনি বলতেন, না, তা নয়। লোক বেশি হলেই আমি খুশি হই না বরং যদি একটি আল্লাহপ্রেমিক জ্ঞানী মানুষ আসে, আমি তাতেই খুব আনন্দ পাই। হযরত হাসান বসরী (র)- এর জবাবগুলোর আলাদা একটা গুরুত্ব ছিল। অর্থাৎ স্ফুলিঙ্গের মধ্যে ঝলসে উঠতো প্রজ্ঞার আগুন ও আলোককণা ।

প্রশ্ন : ইসলাম কিরূপ এবং মুসলমান কে?
উত্তর : তিনি বলেন, ইসলাম কিতাবে রয়েছে আর মুসলমান চলে গেছে কবরের ভেতরে। = কী তীক্ষ্ণ, সঙ্কেতাশ্রয়ী উত্তর!

প্রশ্ন: ধর্মের মূলবস্তু কি?
উত্তর: পরহেজগারী। কিন্তু লোভ-লালসা তাকে ধ্বংস করে।

প্রশ্ন: আদন বেহেশত কিরূপ এবং তাতে প্রবেশ করবে কারা?
উত্তর : সোনার তৈরি জাঁকজমকপূর্ণ এক প্রাসাদ। সেখানে প্রবেশ করবেন রাসূলে করীম মুহাম্মদ (স) ছাড়া অন্য সব রাসূল, সত্যবাদী, শহীদ এবং ন্যায়নিষ্ঠ সুবিচারক সুলতান-বাদশাহ।

প্রশ্ন: কোন মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত চিকিৎসক অপরের রোগ চিকিৎসা করতে পারে কি?
উত্তর: যে নিজেই ব্যাধিগ্রস্ত, সে অন্যের চিকিৎসা কিভাবে করবে? পথভ্রান্ত যে, সে কি অন্যকে পথ দেখাতে পারে?

একবার তিনি সমবেত জনতাকে বললেন, তোমরা আমার কথাগুলো শোন উপকার হবে। কিন্তু আমার মধ্যে আমল বা চর্চার অভাব থাকে তাতে তোমাদের কি আসে যায়?
তারা বলল, আমাদের অন্তর ঘুমন্ত । এজন্য আপনার কথা মনে যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ঘুমন্ত না । একদম মৃত। ঘুমন্তকে ধাক্কা দিলে সে জাগে। কিন্তু মৃতকে ধাক্কা দিলেও সে আর জাগে না। চিরকাল দেখা যায়, কিছু কিছু লোক থাকে, যারা কেবল ভুল-ত্রুটি বা ছিদ্র খুঁজে বেড়ায়। হযরত হাসান বসরী (র)-এর যারা ভাষণ শুনতেন, তাদের মধ্যেও এ ধরনের কিছু লোক থাকতেন। সে সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আমি কেবল আল্লাহ্ সান্নিধ্য ও জান্নাত চাই। মানুষের নিরাপত্তা নয়। এদের জিহ্বার আক্রমণ থেকে স্বয়ং আল্লাহ্ও রেহাই পাননি । আমি তো কোন ছার।

কেউ কেউ ধারণা করে, নিজে নিশ্ছিদ্র হওয়ার পর অন্যকে উপদেশ দেয়া উচিত, তার আগে নয় । হযরত হাসান বসরী (র)-কে এ কথা বলা হলে তিনি জবাব দেন, শয়তানও আশা করে যে, ন্যায় কাজের আদেশ আর অন্যায় কাজের নিষেধ একেবারে বন্ধ হয়ে থাক ।

বিশ্বাসী মুসলমানের জন্য অন্য লোকের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করা কি উচিত?’ -এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শত্রুতাও বিদ্বেষপোষণে কী ক্ষতি হয়? হযরত ইউসুফ (আ)-এর ভ্রাতাদের বিদ্বেষমূলক ঘটনা থেকে তা বুঝে নেয়া যায় ।

ঈমানের শক্তি ও সাহসিকতা

এক জনসমাবেশে ভাষণ দিচ্ছেন হযরত হাসান বসরী (র)। এমন সময় সেদিকে ছুটে আসছেন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ। সঙ্গে এক সেনাদল। শ্রোতাদের মধ্যে কানাকানি হয়ে গেল, আজ হাসান বসরী (র)-এর পরীক্ষা। তিনি ভাষণ স্থগিত রেখে হাজ্জাজের সামনে মৌণ হয়ে যান কিনা দেখা যাবে। তা দেখা গেল একটু পরেই। ধাবমান হাজ্জাজ সভায় ঢুকে চুপ করে বসে পড়লেন একপাশে । আর সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে হযরত হাসান বসরী (র) যথারীতি বক্তৃতা দিতে থাকলেন। ভাষণ শেষে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এসে হযরত হাসান বসরী (র) এবং হাতে চুমু দিলেন। বললেন, যদি আল্লাহর ওলীকে দেখার কারো সত্যিকারের ইচ্ছে হয়, সে যেন হযরত হাসান বসরী (র)-কে দেখে যায়।

একবার হযরত আলী (রা) এক উদ্ভট আদেশ দিলেন। বক্তৃতামঞ্চ ভেঙে ফেলতে হবে আর এলামেলো বক্তৃতা বন্ধ করতে হবে। নিশ্চিত কোন কারণ ছিল। না হলে হযরত আলী (রা) এমন আদেশ জারি করতেন না। কিন্তু সে আদেশ হযরত হাসান বসরী (র) ক্ষেত্রে খাটল না। তিনি যেমন বক্তৃতা দেন, তেমনি দিয়ে চলেছেন। একদিন হযরত আলী (রা) তাঁর বক্তৃতাসভায় এসে হাজির। ভাষণরত হাসান বসরী (র)-কে তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন, আপনি আলেম না শিক্ষক?

হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, আমি আলেম নই। তবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর যে হাদীস আমি জেনেছি, তারই পুনরাবৃত্তি করছি মাত্র। একথা শুনে তিনি তাঁকে বক্তৃতা দিতে নিষেধ করলেন না বরং তাঁর প্রশংসা করে বললেন, তরুণটির সততা আছে। আর সে সুবক্তাও বটে বলে তিনি সভা ত্যাগ করলেন। কিছুক্ষণ পরে তরুণ বক্তা জানতে পারলেন, এমাত্র যিনি কথা বলে চলে গেলেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং হযরত আলী (রা)। জানা মাত্র তিনি বক্তৃতামঞ্চ থেকে নেমে হযরত আলী (রা)-এর খোঁজে বের হলেন। আর বেশ কিছু দূরে গিয়ে তাঁকে পেয়ে গেলেন। বিনীতভাবে বললেন, হুযুর! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে অযুর তারতীব শিক্ষা দিন। হযরত আলী (রা) তাঁকে পানি আনতে বললেন। পানি আনা হল এবং বিষয়টি হযরত হাসান বসরী (র)-কে তিনি শিখিয়ে দিলেন।

কুরআন তেলওয়াত শুনলেই একটি লোক অজ্ঞান হয়ে যেত । আর তার মুখ দিয়ে শব্দ হত। হাসান বসরী (র) তাঁকে বলেন, এসব ছাড়। কেননা, তোমার এ ভাব-বিহবলতা স্বতঃস্ফূর্ত নয়। তুমি ইচ্ছে করে এমন করছ। এটা ভান। আর সেটি গুনাহর কারণ। তিনি আরো বলেন, কারোর কোন কথা শুনে যদি ইচ্ছে করে কেউ কান্নার ভান করে, তাহলে তা শয়তানের কান্না বলে মনে করতে হবে।

তাঁর সম্পর্কে এ ধরনের আরো বহু কথা শোনা যায়। আর এসবের মধ্যে তাঁর প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। যেমন, তিনি নিজেকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। একবার, অনাবৃষ্টির ফলে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন প্রচুর লোক তাঁর কাছে এসে মাঠে গিয়ে এস্তেস্কার নামায পড়ার অনুরোধ জানায়। তাঁদের ধারণা ও বিশ্বাস ছিল যে, তিনি যদি নামায পড়ে আল্লাহ্র কাছে বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন, তাহলে অবশ্যই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। কিন্তু তিনি বিনীতভাবে বললেন, তোমরা যদি বৃষ্টি চাও, তাহলে আমাকে এ শহর থেকে দূর করে দাও। আসলে তিনি নিজেকে এক অপরাধী গুনাহগার বান্দা বলে মনে করতেন। তাঁকে দেখাতো যেন এক প্রাণদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামী। কোন হাসির চিহ্ন থাকত না চোখে-মুখে। সব সময়ে যেন ভয়ে ভয়ে আছেন কখন কী হয় । অর্থাৎ, প্রতি মুহূর্তে তিনি আল্লাহ্র ভয়ে ভীত হয়ে থাকতেন ।

এ ভয় পরকালকে ঘিরেও। রোজ কেয়ামতের দিন কী হবে, এ ভেবে তিনি শঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাতেন। ভয়ে কান্নাকাটিও করতেন। লোকে তাঁকে বলত, আপনি আলোকিত জ্ঞানী মানুষ । আপনার অত কান্না কিসের?

হযরত হাসান বসরী (র) বলেন, যদি অজ্ঞাতসারে কিছু করে থাকি, আল্লাহ্ যা পছন্দ করেন না । তখন তিনি যদি আমাকে বলেন, ওহে হাসান! আমার দরবারে তোমার ঠাঁই নেই । তোমার কোন উপাসনা কবুল হবার নয়। তখন আমার কী হবে! আমি এ কথা ভেবে কান্নাকাটি করি ।

নিজের সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ধারণার আরো একটি নমুনা: তিনি একটি লোককে কাঁদতে দেখে তার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলেন, আমি মুহাম্মদ ইবনে কার (র)-এর কাছে শুনেছি, বিশ্বাসীদের মধ্যে অনেককেই কিছুদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ কথা শোনার পর থেকে আমার এ অবস্থা। তার কথা শুনে হযরত হাসান বসরী (র) বলে উঠলেন, হায়! আমি যদি তেমন লোকদেরও একজন হতাম, তাহলে দীর্ঘদিন জাহান্নামের দণ্ড ভোগ করেও মুক্তি পেতাম । তাহলে কতো ভালই না হতো।

একটি হাদীস পড়ে তিনি জানলেন, নেহাদ নামে একটি লোক জাহান্নামের আগুন থেকে সবশেষে মুক্তি পাবে। তিনি বললেন, হায়! আমি যদি সেই সর্বশেষ লোকটিও হতে পারতাম । অর্থাৎ, পাপের অজানা সম্ভাবনায় তাঁর মন কণ্টকিত হতো সর্বক্ষণ।

একদিন অজানা ভয়ে তাঁর চোখ থেকে পানি গড়াচ্ছে। তিনি বসে আছেন মসজিদের ছাদের কিনারায়। হঠাৎ এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল একটি লোকের পরনের কাপড়ে। সে বললেন, পানিটা পবিত্র না অপবিত্র? হযরত হাসান বসরী (র) উত্তর দিলেন, ওটা অপবিত্র। তুমি কাপড়টা ধুয়ে নাও। কেননা, পাপীর চোখের পানি পবিত্র হতে পারে না।

একদিন এক ব্যক্তিকে কবরস্থ করে তিনি মাথার দিকে বসে বসে কান্না শুরু করলেন। চোখের পানিতে ভিজে গেল কবরের মাটি। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাঁর কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, কবর হল পার্থিব-জীবনের শেষ ও পর-জীবনের প্রথম আবাস। এ দুনিয়া কত অসার। চোখের ওপর এটা দেখেও তোমরা কী করে হাসি-তামাশায় মত্ত হতে পার? উদাসীনতা পরিহার করে এখনো কেন তোমরা কবরবাসের উপকরণ সংগ্রহে লেগে পড়ছো না? তাঁর কথার মর্ম উপলব্ধি করে এবার সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ল ।

শোনা যায়, ছেলেবেলায় তিনি একটি পাপকর্ম করেন। এটি যাতে ভুলে না যান, তার জন্য যখনই নতুন কাপড় পরতেন, তখনই ঐ কাপড়ে তা লিখে রাখতেন। আর এ পাপটির পরিণামের কথা ভেবেই তিনি অবিরাম কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহ্র প্রেমে, ভয়ে অস্থির- আকুল এ হৃদয়ের কান্না কত মধুর! কত পবিত্র ।

এ পবিত্র হৃদয়ের উপদেশবাণী শোনার জন্য খলিফা উমর ইবনে আবুদল আযীজ (র)-এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিও লোভাতুর ছিলেন। খলিফার অনুরোধে হযরত হাসান বসরী (র) তাঁকে উপদেশ দেন-যদি স্বয়ং আল্লাহ্ আপনার সঙ্গে থাকেন আর তাঁর প্রতি যদি আপনার আস্থা অটুট থাকে, তাহলে আর ভাবনা কিসের? এ কথায় যদি আপনার আস্থা না থাকে, তাহলে অন্যের উপদেশ খুব একটা ফল হবে না। খলিফাকে এসব কথা তিনি চিঠি লিখে জানান। চিঠির শেষে লিখলেন, সে দিনটির কথা খুব বেশি মনে করুন, যেদিন সবকিছু
ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

একবার মহামান্য বিসরে হাফী (র) তাঁকে এক চিঠিতে লিখলেন, শুনলাম আপনি নাকি এ বছর হজ্জে যাচ্ছেন । আমিও আপনার সহযাত্রী হতে চাই ।

পত্রোত্তরে হযরত হাসান বসরী (র) জানালেন, দেখুন, আল্লাহর পবিত্র প্রেমময় রাজ্যে একা-একা বাস করাই ভালো। আমরা যে একত্রিত হবো, অমনি পরস্পরের দোষ-ত্রুটি জেনে ফেলব। আর সেগুলো জেনে পরস্পরের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করব। তাই অনুরোধ হজ্জযাত্রায় আমার সঙ্গী হওয়ার আশা ছেড়ে দিন।

তিনটি অমূল্য উপদেশ

সাঈদ ইবনে জুবায়েরকে তিনি তিনটি উপদেশ দেন।

১.সুলতান-বাদশাহ ও সভাসদবর্গের দরবারে যাতায়াত কর না ।

২. তাপসী রাবেয়া (র)-এর মতো পূত-চরিত্রা নারী হলেও কখনই তুমি তাঁর সঙ্গে একাকী নির্জনে বস না । এমনকি কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষাও দিও না ।

৩. কোন গীত-বাদ্যের আসরে যোগদান করান । কেননা, এগুলো নির্বিঘ্ন নয় ।

একজন আলেমের বিপদ কিভাবে আসতে পারে’-মালেক ইবনে দীনার (র) একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, মনের মৃত্যু হলে আলেমগণও বিপন্ন হন ।
‘মনের মৃত্যু কিভাবে হয়?’
‘তাঁর উত্তর-দুনিয়ার প্রতি আসক্তি এলেই হৃদয়-মনের মৃত্যু ঘটে।

জ্বীন সম্প্রদায়েরও গুরু ছিলেন তিনি। অবশ্য জ্বীনদের সঙ্গে তাঁর সংস্পর্শের বিষয়টি খুবই গোপনীয় ছিল। এক রাতি শেষে, মসজিদে ফজরের নামায পড়তে গিয়ে সেটি জেনে ফেললেন হযরত আবদুল্লাহ। মসজিদের দরজায় হাজির হয়ে দেখেন, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ । তিনি মোনজাত করছেন, আর অনেকে তাঁকে অনুসরণ করে ‘আমীন’ বলছেন । আবদুল্লাহ্র মনে হল, হয়তো তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে মোনাজাত করছেন। বাইরে থেকে তিনি আওয়াজ দিলেন। খুট করে খুলে গেল দরজা। কিন্তু, ভেতরে ঢুকে আবদুল্লাহ হযরত হাসান বসরী (র) ছাড়া একটি প্রাণীকেও দেখতে পেলেন না। পরে তিনি গোপনে আবদুল্লাহকে জানান, এরা হলেন জ্বিন। প্রতি জুমআর রাতে কিছু জ্বিন তাঁর কাছে আসেন ধর্মশিক্ষার আগ্রহে। দ্বীনি বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার পর তিনি তাঁদের নিয়ে মোনাজাত করেন। আসলে, যাঁরা অনুচ্চ স্বরে আমীন বলেছিলেন, তাঁরা তাঁর শিষ্য নয়, জ্বিন সম্প্রদায়।

হযরত হাসান বসরী (র)-এর কারামত

হযরত হাসান বসরী (র)-কে ঘিরে কত ঘটনার চুমকি বসানো। হীরককণার মতো উজ্জ্বল এক একটি ঘটনা। চলেছেন হজ্জযাত্রায়। সঙ্গে বেশ কিছু জ্ঞানী মানুষ। রাস্তার ওপর একটি কূপ থেকে পানি তুলতে গিয়ে সবাই দেখেন পানি রয়েছে কূপের তলায়। কিন্তু দড়ি-বালতি নেই। তাঁরা হযরত হাসান বসরী (র)-কে সে কথা বললেন। তিনি বললেন, আমি যখন নামাজ পড়তে দাঁড়াব, তখন তোমরা কুঁয়োর কাছে যেও ।
কিছুক্ষণ পর তিনি নামায পড়ার জন্য যেই দাঁড়িয়েছেন, নির্দেশমত সবাই কূপের কাছে গিয়ে সবিস্ময়ে দেখেন, সেটি কানায় কানায় পূর্ণ। টইটুম্বুর! তাঁরা ইচ্ছেমত পানি পান করে পিপাসা দূর করেন। তাঁদের মধ্যে একজন একপাত্র পানি তুলে রাখলেন । প্রয়োজনে পরে পান করা যাবে, এ তাঁর ইচ্ছে। কিন্তু, কী কাণ্ড! সঙ্গে সঙ্গে কিনারাস্পর্শী পানি একেবারে নেমে গেল কূপের তলায়-যেমনটি ছিল আগে। তাঁরা একথাও হযরত হাসান বসরী (র)-কে জানালেন । তিনি বললেন, তোমরা আল্লাহ্র ওপর নির্ভরশীল নও বলেই এমনটি ঘটেছে।

কাবার পথে তাঁরা এগিয়ে চলেছেন। আলোর অভিযাত্রী হযরত হাসান বসরী (র) রাস্তা থেকে কিছু খেজুর সংগ্রহ করে সঙ্গীদের খেতে দিলেন । তাঁরা খেয়েও ফেললেন খেজুরগুলো । কিন্তু বীচিগুলো অমন জ্বল জ্বল করছে কেন? ঠিক যেন স্বর্ণকণা! তাঁরা সেগুলো ফেললেন না । কাছে রেখে দিলেন। মদিনায় পৌছে স্বর্ণকারদের দেখানো হল । তাজ্জব ব্যাপার। বীচিগুলো সত্যিই সোনার। একেবারে খাঁটি সোনা। আর তাঁরা উচিত মূল্য দিয়েই তা কিনে নিলেন ৷ অপ্রত্যাশিত কিছু অর্থ হাতে আসায় হজ্জযাত্রীরা লাভবান হলেন। নিজেদের জন্য বেশ কিছু কেনাকাটাও হয়ে গেল ।

অন্তরে কলুষ কামনার ফল : আবু আমার একজন আলেম। ছেলেদের কুরআন শিক্ষা দিতেন। কিন্তু একদিন ঘাটে গেল এক দুঃখজনক ঘটনা। দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক । ফুটফুটে একটি ছেলে একদিন পড়তে এল আলেমের কাছে। ভারি চমৎকার, মিষ্টি চেহারা। ছেলেটিকে দেখামাত্র আলেমের মনে কু-চিন্তার উদয় হলো। জেগে উঠল এক কলুষ কামনা। কিন্তু কি আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে তিনি কুরআন শরীফও ভুলে গেলেন । আর তাঁর সর্বাঙ্গে দেখা দিল এক অসহনীয় জ্বালা । আলেম এবার ভীত হয়ে পড়লেন। আলেমুল গায়েব তাঁর অন্তরের আবিল কামনার কথা জেনে নিয়েছেন। আর শুরু হয়েছে পাপের দণ্ড। ভয়ে, অনুশোচনায়, যন্ত্রণায় কেঁপে উঠলেন বিদ্ধান লোকটি। নাম তাঁর আবু আমর । দিশেহারা তিনি-ছুটে এলেন হযরত হাসান বসরী (র)-এর কাছে ।

সব কথা শুনে বললেন, এখন হজের মওসুম । আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত । তুমি হানীফ নামক এক মসজিদে যাও। ওখানে এক সাধককে দেখতে পাবে। তাঁকে সব খুলে বল। তাঁর দোয়া চাও । কথামত আবু আমার গিয়ে দেখেন, সত্যিই মসজিদের মধ্যে তিনি আছেন। তাঁকে ঘিরে রয়েছে ভক্তজন। তিনি ধর্মকথা পরিবেশন করছেন। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, ধবধবে সাদা পোশাক পরিহিত আরো একজন দরবেশ সে সাধকের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আবু আমর মসজিদের এক কোণে বসে রইলেন সুযোগের অপেক্ষায় ।

আসরের নামায শেষ । মসজিদ ক্রমশ ফাঁকা হয়ে গেল। এ সুযোগে আমর সাধকের কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত খুলে বললেন। কথা শুনে খুবই দুঃখিত হলেন তিনি। তারপর আকাশের দিকে চোখ তুলে বিশ্বপ্রভুর দরবারে দোয়া শরু করলেন।

তারপর (আৰু আমরের বর্ণনা অনুযায়ী) দোয়া শেষ করে আমরের দিকে তাকাতেই ভুলে যাওয়া কুরআন আবার তাঁর স্মরণে চলে এল । আনন্দে আবেগে তিনি লুটিয়ে পড়লেন মহাসাধকের পায়ের তলায়। তিনি আমরকে বললেন, তুমি আমার সন্ধান পেলে কি করে? আমর হযরত হাসান বসরী (র)-এর কথা বললেন।
ও, তিনি বলে উঠলেন, তার মানে হাসান আমার রহস্য প্রকাশ করেছেন। আমিও তাঁর রহস্য উন্মোচন করে দেব। আচ্ছা, বল দেখি কিছুক্ষণ আগে সাদা পোশাক পরা এক দরবেশ আমার সঙ্গে কথা বলে চলে গেলেন, তিনি কে, চিনতে পেরেছ কি?
আমর বললেন, না হুযুর ।
সাধক বললেন, তিনিই হযরত হাসান বসরী (র)।

প্রতিদিন দুপুরের পর তিনি বসরা থেকে এখানে আসেন। তারপর কথাবার্তা বলে আবার বসরা ফিরে গিয়ে আসরের নামায আদায় করেন। এমন একটি সুযোগ্য মানুষ বসরায় থাকতে তুমি আমার কাছে এলে কেন?

প্রতিবেশী শামাউনের ইসলাম গ্রহণ – এক প্রতিবেশী । নাম শামাউন। অগ্নির উপাসক। দীর্ঘায়ু লোক। অবশেষে একদিন বার্ধক্যে এসে উপস্থিত হলেন। আর তখনই আক্রান্ত হলেন এক কঠিন অসুখে। জীবনের আশা অতি ক্ষীণতম। তাঁর আসন্ন মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। হযরত হাসান বসরী (র)-এর কানেও এল কথাটা। তিনি প্রতিবেশীর অন্তিম শয্যার পাশে গিয়ে বসলেন। দেখলেন শামাউনের সারা শরীরে কালো কালো দাগ। তিনি বললেন, আগুন আর ধোঁয়া নিয়েই তো কাল কাটালে, এখন একবার আল্লাহকে মেনে নাও। ইসলাম কবুল কর । হয়তো আল্লাহ্র রহমত নেমে আসবে তোমার ওপর। শামাউনের ঠেটে তাচ্ছিল্যের আভাস। বললেন, দু’টি কারণে তোমাদের ধর্মের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা আছে। প্রথম কারণটি হল, ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা দিনরাত দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকে। আর দ্বিতীয় কারণ এ যে, তারা মুখে মৃত্যুর কথা বলে বটে। তবে এমন সব কাজ-কারবার করে, যা মৃত্যু-ভীতদের পক্ষে করা সম্ভব নয় । কেননা, ঐ সকল কাজে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হন ।
হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, শুভাকাঙ্ক্ষীর মতই কথা বলেছ তুমি । কিন্তু, তুমি কী করলে? আজীবন আল্লাহকে ভুলে আগুনের উপাসনা করে কি তাঁর বিরাগবাজন হলে না? শোন, আমি কোনদিন আগুনের উপাসনা করিনি। কিন্তু আমি যাঁর উপাসনা করি, তাঁর দয়ায় আগুন আমার বশীভূত। আর তুমি সুদীর্ঘ জীবন তাঁর উপাসনা করেছ; কিন্তু এমন দাবি করতে পারবে না যে, আগুন তোমার অনুগত । সে তোমার কোন ক্ষতি করবে না।

শামাউন বলেন, হ্যাঁ, আগুন আমার কোন অনিষ্ট করে না। আমার তা বিশ্বাস হয় না হাসান বসরী (র) বলেন, কিছু আগুন আনাও, পরীক্ষা করে দেখি ।

আগুন আনা হল। হযরত হাসান বসরী (র) শামাউনকে আগুনের ওপর হাত রাখতে বললেন। কিন্তু তাঁর সাহস হল না। তখন হযরত হাসান বসরী (র) নিজেরই একখানা হাত আগুনের ওপর চাপিয়ে দিলেন। আল্লাহর রমহতে তা পুড়ল না। একগুচ্ছ লোমও না।

দৃশ্য দেখে শামাউন অবাক। তাঁর মনে এল গভীর অনুশোচনা। তিনি বললেন, ভাই হাসান! সত্তর-আশি বছর ধরে চরম অন্যায় করে এসেছি। এখন কি তার প্রায়শ্চিত্তের অবকাশ আছে? থাকলে মুক্তির উপায় বলে দাও । হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, নিশ্চয় উপায় আছে। তুমি ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নাও। তারপর পবিত্র হৃদয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর। তিনি তোমাকে মুক্তি দেবেন।

শামাউন বললেন, মৃত্যুর পর শাস্তির পরিবর্তে আল্লাহ্ আমাকে মুক্তি দেবেন, এ মর্মে যদি তুমি আমাকে একখানি পত্র লিখে দাও, তাহলে আমি মুসলমান হতে পারি।

হযরত হাসান বসরী (র) তাঁর কথামত একখানি কাগজে লিখে শামাউনের হাতে দিলেন। শামাউন আবার কাগজখানিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের সই করে নিয়ে তা আবার হযরত হাসান বসরী (র)-কে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, মৃত্যুর পর দাফন করার সময় পত্রখানা আমার সঙ্গে দিও। আর তুমি নিজের হাতে আমাকে গোসল করিয়ে শুইয়ে দিও। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। আর অনতিকাল পরেই মারা গেলেন ।

তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী সব কাজ শেষ হল । শামাউনের দাফন কর্ম সম্পন্ন করে হযরত হাসান বসরী (র) মনে মনে নিজের কথাই ভাবতে লাগলেন। আগেই জেনেছি, তিনি নিজেকে পাপী বলে মনে করতেন। এখন তিনি ভাবতে শুরু করলেন, অন্যের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল্লাহর অধিকারে হস্তক্ষেপ করলাম।

এখন আমার মত পাপীর মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয় কে। সারা রাত তিনি আল্লাহ্র দরবারে হাত উঠিয়ে রইলেন। সে এক অবিরাম, অন্তহীন প্রার্থনা। শেষ রাতে স্বপ্ন দেখলেন, শামাউন মাথায় ঝকঝকে মুকুট, সুন্দর পোশাক পরে জান্নাতের উদ্যানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর শামাউন ভাই? তোমার অবস্থা কি?

শামাউনের প্রফুল্ল জবাব! যেভাবে আমাকে দেখতে পাচ্ছ, আমি সেরকমই আছি। আল্লাহ্র রহমতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি। আল্লাহ্র দীদারও লাভ করেছি। তোমার পত্রখানায় খুব কাজ দিয়েছে হাসান ভাই । নাও-বলে পত্রখানা তিনি হযরত হাসান বসরী (র)- কে ফিরিয়ে দিলেন ।

ঘুম ভেঙে গেল । আর তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, সত্যিই, শামাউনের পত্রখানা তাঁর হাতের মুঠোয়। যেন স্বপ্ন নয়, এমাত্র শামাউন সশরীরে এসে পত্রখানি তাঁকে দিয়ে গেলেন। তখন তিনি তাঁর প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, প্রভু গো! আপনার কাজের গূঢ় রহস্য উদ্ঘাটন করার সাধ্য আমার নেই। সারা জীবন যে আগুন নিয়ে পড়ে থাকল, তাঁকে মাত্র একবার কালেমা পড়ার কারণে আপনি মুক্তি দিলেন, শুধু তাই নয়, তাকে দেখাও দিলেন। তাহলে আজীবন যারা ঈমান মেনে রয়েছে, তাদের যে আপনি মুক্তি দেবেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই । শামাউনের জন্মাতবাস তাঁর চেতনায় নবদিগন্তের দয়ার খুলে দিল ।

নবচেতনার বিকাশ ঘটে অন্য একটি ঘটনায় ।

হযরত হাসান বসরী (র) একবার ঘুরতে ঘুরতে দজলা নদীর তীরে হাজির হলেন। দেখলেন এক কাফ্রি নির্জনে বসে এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছেন। আর পানপাত্র থেকে পানীয় পান করছেন। দেখামাত্র কাফ্রি সম্পর্কে তাঁর মনে এক খারাপ ধারণার সৃষ্টি হল । অর্থাৎ, লোকটিকে মদ্যপ ও লম্পট বলে তাঁর মনে হল । এও ভাবলেন যে, তিনি অন্তত এ লোকটির মতো নিকৃষ্ট নন।

ঠিক তখন, নদীর বুকে একখানি ভাসমান নৌকা ডুবে গেল । বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে উঠল নৌকার অরোহীরা। সঙ্গে সঙ্গে কাফ্রি ঝাঁপিয়ে পড়লেন নদীতে। আর সাতজন আরোহীর অন্তত দু’জনকে তুলে আনলেন ডাঙায়। হযরত হাসান বসরী (র)-কে লক্ষ্য করে বললেন, আমি দু’জনকে তুলে বাঁচালাম । আপনি অন্যদের উদ্ধার করুন। হযরত হাসান বসরী (র) কিন্তু সে উদ্যোগ গ্রহণ না করে বরং কাফ্রিকেই তাদের প্রাণরক্ষা করার অনুরোধ জানালেন। কাফ্রি তাদেরও উদ্ধার করলেন। এবার হাসান বসরী (র) মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিলেন। আর ঘৃণা নয়, এবার তিনি তাঁর কাছে গিয়ে বসলেন। বললেন, আপনি আজ আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন।
কাফ্রি বললেন, এ যে, মহিলাকে দেখছেন, ইনি আমার জননী। আর ঐ পানপাত্রে রয়েছে পবিত্র পানীয়। আমি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম-আপনি অন্ধ না চক্ষুষ্মান। দেখলাম, আপনি অন্ধই বটে ।

কাফ্রির কথায় হযরত হাসান বসরী (র) খুবই লজ্জিত হলেন। তাঁর প্রতি তিনি যে অন্যায় ধারণা করেছিলেন, তার জন্য তিনি ক্ষমা চাইলেন। বললেন, আপনি এতগুলো মানুষকে যেভাবে উদ্ধার করেছেন, আমাকেও তেমন করুন। আত্ম-অহমিকার অতলে আমিও নিমজ্জমান । দয়া করে আমাকে উদ্ধার করুন।

কাফ্রি আল্লাহ্র দরবারে হাত ওঠালেন। দয়াময়! আপনি হাসানের বাতেনী চোখ খুলে দিন । সেই থেকে হযরত হাসান বসরী (র) সামান্য চতুস্পদ প্রাণীকেও নিজের চেয়ে উৎকৃষ্ট বলে ভাবতেন। আর নিজেকে মনে করতেন এক দীনাতিদীন দাস ।

একদিন এক কুকুর দেখে বললেন, ইয়া আল্লাহ! পরকালে আমি কি এ কুকুরটির সাথে হাশর করতে পারব? তাঁর কথা শুনে একটি লোক জিজ্ঞেস করল, হুযুর কুকুরটি আপনার চেয়ে উত্তম না অধম?

তিনি বললেন, রোজ কিয়ামতে যদি মুক্তি পাই, তাহলে নিজেকে কুকুরটির তুলনায় উত্তম বলতে পারি। আর যদি না পাই, তাহলে জানবো সেটি আমার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম ।

এক নিন্দুক হযরত হাসান বসরী (র)-এর কুৎসা রটিয়ে বেড়াচ্ছিল। তিনি যখন তা জানতে পারলেন, তখন এক ঝুড়ি ভাল জাতের খেজুরসহ নিন্দাকারীর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। তারপর তাকে বিনীতভাবে বললেন, শুনতে পেলাম, আপনি নাকি আপনার নিজের আমলনামার নেকীগুলো আমার আমলনামায় স্থানান্তরিত করেছেন। কাজেই এর বিনিময়ে আপনাকেও কিছু মূল্যবান পুরস্কার দেয়া দরকার। কিন্তু আমি অক্ষম বলে এ সামান্য সওগাত আপনার জন্য এনেছি । গ্রহণ করে বাধিত করুন।

তাঁর এ উক্তির মধ্যে পরচর্চার মত নিন্দনীয় বিষয়টির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে।

তিনি বললেন, চারজন লোকের কাছে আমি যেমন অপ্রস্তুত হয়েছি, তেমনি কিছু শিক্ষাও পেয়েছি। এদের মধ্যে একজন এক নপুংসক। একজন মাতাল। তৃতীয় জন একটি বালক। আর চতুর্থ জন এক মহিলা
কিভাবে কী হয়েছে, তিনি তাও খুলে বলেন। প্রথমত, নপুংসকের কথা ।
(ক) একদিন তিনি এক নপুংসকের কাপড় ধরে টানেন। লোকটি বলে, আমার গোপন রহস্য এখনও বাইরে প্রকাশ পায়নি। আপনি কি তা প্রকাশ করতে চান?
(খ) এক মাতাল চলছে টলতে টলতে। হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, পথ বড় পিচ্ছিল । সাবধানে পা ফেল । নইলে আছাড় খাবে । লোকটা বলল, আমি মাতাল । আমার কিছু ক্ষতি হবে না। কাপড়ে কাদা লাগলে ধুয়ে নেব। কিন্তু আপনি এক মহাসাধক । প্রচুর আপনার শিষ্য। তারা আপনার ওপরেই নির্ভর করে। আপনার যদি পদসস্খলন হয়, তবে তাদেরও দশা হবে। কাজেই আপনি সাবধানে চলুন । আমার চেয়ে আপনার দায়িত্বই বেশি।
(গ) প্রদীপ হাতে নিয়ে পথ চলেছে এক বালক । হযরত হাসান বসরী (র) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এ আলো কোথা থেকে আনলে? ছেলেটি হঠাৎ আলো নিভিয়ে বলল, আগে আপনি বলুন আলো কোথায় গেল? তারপর আমি বলব কোথা থেকে আমি আলো এনেছি। বালকের এ কথা যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ।
(ঘ) এক সুন্দরী মহিলা চলেছে কোন গন্তব্যস্থলের দিকে। খোলা মাথা। কোন আবরণ নেই। হযরত হাসান বসরী (র) তাঁকে বললেন, তুমি এভাবে চলছ কেন? মাথা ঢেকে নাও। মহিলা দাঁড়িয়ে গেল কথা শুনে। বললেন জনাব, আমি আমার স্বামীর বিচ্ছেদের কারণে দিশেহারা হয়ে আছি। আমার অন্যদিকে এতটুকু মনোযোগ নেই। কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়েছি আপনার কথা ভেবে। আপনি আল্লাহর ওলী। আল্লাহ্র প্রতি আপনার অঢেল, অগাধ ভালবাসা । কিন্তু তৎসত্ত্বেও মানুষ কিভাবে পথ চলছে আপনি তা লক্ষ্য রাখেন। আল্লাহ্র প্রেমে নিমগ্ন মানুষের পক্ষে এও কি সম্ভব?
মহিলার বক্তব্যের গূঢ়ার্থ বুঝতে কোন অসুবিধা হল না হযরত হাসান বসরী (র)-এর ।

সাহাবী ও সাধারণ মানুষ

হযরত হাসান বসরী (র) তাঁর ভক্তদের বলেন, তোমরা সবাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীদের মত। স্বভাবতই তারা খুশি। অবশ্যই এটি মর্যাদার ব্যাপার। কিন্তু পরে তিনি বিশ্লেষণ করে বললেন, সে সামঞ্জস্য শুধু বহিরঙ্গের। অন্তরঙ্গের নয় । তোমরা যদি তাঁদের দেখতে, তাহলে তাঁদের পাগল বলে মনে করতে। আবার, তাঁরাও যদি তোমাদের দেখতেন, জানতেন, তাহলে তাঁরা তোমাদের মুসলিম বলে মনে করতেন না । তারা ছিলেন সুদক্ষ অশ্বারোহী, বাতাসের বেগে, পাখির বেগে তাঁরা ছুটে চলেছেন জান্নাতের দিকে আর আমরা? আমরা চলেছি দুর্বল ও আহত গাধার পিঠে চড়ে । ধীর গতিতে।

এক আরব বেদুইনকে তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শোনান। তিনি বলেন, ধৈর্য দু’রকম।

১. দুঃখে-কষ্টে পতিত হয়ে ধৈর্য ধারণ করা।

২. আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু বা বিষয় থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখা।

বেদুইন বলল, আপনার মতো দরবেশ আমি আর কখনো দেখিনি । কেউ এমন আছেন বলে শুনিওনি।

হাসান বসরী (র) বললেন, তুমি আমাকে অনেক ওপরে তুলে দিলে, আমার ধৈর্যধারণ অধৈর্যেরই নামান্তর। আর সাধকত্বও আমার লালসার ফল ।

কথাটা বুঝিয়ে বলুন হুযুর, বেদুইন অনুরোধ জানায়। শুনুন তবে, হাসান বসরী (র) বলেন, বিপদের সময় আমি যে ধৈর্যধারণ করি, তার কারণ আমি জাহান্নামের ভয়ে সবসময় অস্থির ও অধৈর্য হয়ে থাকি। তাহলে বুঝতে পারছেন, আমার ধৈর্য আসলে অধৈর্যেরই অন্য রূপ ।
আর, আমি যে দরবেশ জীবন-যাপন করছি, তার কারণ আমি জান্নাতলোভী-জান্নাতের জন্য লালায়িত। কিন্তু আল্লাহর প্রেমে যে ধৈর্যধারণ করে, প্রকৃপক্ষে সে-ই ধৈর্যশীল। শুধু আল্লাহর জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করে সে-ই প্রকৃত ত্যাগী। আর জান্নাতে যাবার জন্য ত্যাগ স্বীকার বা সংযম রক্ষা করে, তাকে প্রকৃত ত্যাগী বা সহনশীল বলা যাবে না।

অন্য যে কোন কামনা-বাসনা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা মনে রাখাকেই ইখলাস বলে। হযরত হাসান বশরী (র) বলেন, মানুষের জন্য পরিপূর্ণ ইখলাস, বিশুদ্ধ নিবিষ্টতা, স্বল্পে তুষ্টি ও সংযম -এ চারটি বস্তু একান্ত প্রয়োজন। যার মধ্যে এ চারটি অস্তিত্ত্ব বর্তমান পরকালের সাফল্য সম্বন্ধে তার কোন চিন্তা বা সন্দেহ নাই ।

একটি লোক নামায পড়তো ঠিকই, কিন্তু একা একা কখনো জামাতে নামায পড়তে দেখা যেত না। হযরত হাসান বসরী (র) একদিন তাকে জামাতে নামায না পড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সে কোন লোকের সঙ্গে মেলামেশা করত না। তার কারণ জানতে চাইলেন সে বললো, মাফ করবেন জনাব। আমি কঠিন ইবাদতে মগ্ন।
কেমন সে ইবাদত ?
আমার এমন কোন নিঃশ্বাস সঞ্চালিত হয় না, যার সঙ্গে আল্লাহর রহমত নেই। আর আমি আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা না করি। আমি আল্লাহর সেই রহমতের কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনার কাজে প্রতি মূহূর্তে মশগুল থাকি। কাজেই আর কিছু করার সময় পাইনি হযরত হাসান বশরী (র) বললেন, দেখা যাচ্ছে তুমি আমার চেয়ে উত্তম কাজে লিপ্ত।

একজনের একটি প্রশ্ন : আপনার মনে কি কখনো খুশির উদয় হয়েছে?
হযরত হাসান বসরী (র)-এর উত্তর হ্যাঁ। একদিন আমি আমার ঘরে বসে রয়েছি। বাইরে এক মহিলার গলার আওয়াজ শোনা গেল। সে তার স্বামীকে বলছে, পঞ্চাশ বছর ধরে আমি আপনার সঙ্গে রয়েছি। যখন যা দিয়েছেন, তাতেই আমি সবুর করেছি। শীতে কিংবা গরমে আলাদা আলাদা পোশাক চাইনি। আপনার অভাব ও অক্ষমতার প্রতি সহানুভূতি পেষণ করেছি। কখনও কোন অভিযোগ করিনি। কোন অপবাদ দেইনি। তবে আমার শুধু একটিই বলার কথা-দ্বিতীয়বার বিবাহ করার জন্য আমি আপনাকে অনুমতি দিতে প্রস্তুত নই। আমি দীর্ঘদিন ধরে বহু কষ্ট সহ্য করেছি শুধু এ জন্য যে, আমিই আপনার সব দিক দেখব। আপনি আর কারোর দিকে নজর দেবেন না । অন্য কোনদিকে আপনার মন যাবে না। এরপরও যদি আপনি দ্বিতীয়বার স্ত্রী গ্রহণ করেন, তাহলে আমীরুল মুমিনীনের কাছে আমি আপনার বিরুদ্ধে নালিশ জানাব ।
হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, মহিলার এ কথা শুনে আমার চোখে পানি গড়াল । আমি এর দৃষ্টান্ত খুঁজতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত কুরআনের একটি আয়াত মনে পড়ে গেল । নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। কিন্তু যারা তাঁর সাথে অন্যকে শরিক করে, তাদের তিনি ক্ষমা করবেন না ৷

অর্থাৎ, কুরআনের আয়াতটির সঙ্গে স্ত্রীলোকটির বক্তব্যে রয়েছে গভীর সামঞ্জস্য।

আরো একটি প্রশ্ন: আপনার অবস্থা কি?

হযরত হাসান বসরী (র) উত্তর দিলেন, সমুদ্রে যাদের জাহাজ ভেঙে পড়ে ডুবে যাচ্ছে, আর যারা সামান্য একখণ্ড কাঠ ধরে ভেসে আছে, তাদের আবার অবস্থা! তাদের অবস্থা তো দুঃখজনক । আমারও অবস্থা তাই ।

এক ঈদের দিনে তিনি কোথায় যাচ্ছেন! দেখলেন রাস্তার পাশে একদল তরুণ বেশ আমোদ-আহ্লাদ করছে। তাঁর মন্তব্য: এরা নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানে না । সে সম্পর্কে কিছু না জেনে এরা কিভাবে আমোদ-ফুর্তি করতে পারে?
একটি লোক কবর স্থানে বসে রুটি খাচ্ছে। তাঁর মন্তব্য: লোকটা হয়তো কপট। তাঁর এরূপ মন্তব্যের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, মৃত লোকের পাশে বসেও যার আহার স্পৃহা থাকে, সে মৃত্যু ও পরকালের প্রতি আস্থাশীল নয় । আর সেটি হল কপটতার লক্ষণ ।

হযরত হাসান বসরী (র)-এর ইন্তেকাল

সারা জীবন যাকে কোনদিন হাসতে দেখা যায়নি, মৃত্যের প্রাক্কালে তিনি কিন্তু হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন যে, সে কোন্ পাপ কর্মটি, কোন্ পাপটি ? বড় আশ্চর্য এ ঘটনা ।

মৃত্যের পর তাঁকে একজন স্বপ্নে দেখলেন। তিনি তাঁকে মৃত্যুকালীন সেই হাসি আর সংলাপের রহস্য জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বলেন, মৃত্যুকালে আমি শুনতে পেলাম, কে যেন মৃত্যুদূতকে বলছেন, একটু কষ্ট দিয়ে ওর প্রাণটা নাও। কেননা, ওর একটি গুনাহ রয়েছে। এ কথা শুনে আমি খুব খুশি হলাম এ ভেবে যে, তাহলে আমার আর সব পাপ মাফ হয়ে গেছে। একটি মাত্র বাকি আছে। মৃত্যু কষ্টের দ্বারা তারও কাফ্ফারা আদায় হয়ে যাবে। এজন্য আমি অমন করে হেসেছিলাম, আর কোন্ পাপটি বাকি রয়েছে তা জানতে চেয়েছিলাম ।

যে রাতে হযরত হাসান বসরী (র)-এর মৃত্যু হয়, সে রারে আরো একজন দরবেশ তাঁকে স্বপ্নে দেখেন। সে স্বপ্ন দৃশ্যটি এরূপ – আকাশের সব দরজা খোলা আছে। আর একটি আকাশবাণী ভেসে আসছে, হযরত হাসান বসরী (র) এখন আল্লাহ্র দরবারে হাজির হলেন । আর আল্লাহ হৃষ্টচিত্তে তাঁকে স্বাগত জানালেন ।

গ্রন্থসূত্র – তাযকিরাতুল আউলিয়া
মূল – হযরত খাজা ফরীদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরী
অনুবাদ – মাওলানা ক্বারী তোফাজ্জল হোসেন ও মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ হাসান
সিদ্দিকিয়া পাবলিকেশন্স

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles