হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
অপর দিকে ‘আহলে কিতাবগণও (ইহুদি-খ্রিষ্টান) বিভিন্ন নিদর্শনাদি হতে জ্ঞাত হয়েছিল যে, আখেরী জামানার নবী হযরত আবদুল্লাহর পৃষ্ঠে রয়েছেন। তাই তাঁর সাথে তাদের চরম শত্রুতা আরম্ভ করে দিল। তাঁকে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ঘাঁটিতে ওৎ পেতে থাকতো। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন আশ্চর্য ঘটনা দেখে নিরাশ ও অনুতপ্ত হয়ে ফিরে যেতো। ইহুদিগণ ইয়াহিয়া নবীকে শহীদ করে ফেলেছিল এবং তাঁর গায়ের পশমী জামা রক্তসহ রেখে দিল। তাদের মধ্যে একদল আলেম বললো, এ জামা যেদিন রক্তে ভিজে তার থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়বে তখন তোমরা বুঝে নিবে যে, আরবে আবদুল্লাহ নামে এক লোকের ঘরে আখেরী নবী জন্ম নিয়েছে। এ ধরনের বহু কিস্সা বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত আছে তা তুলে ধরলে লেখা অনেক বেড়ে যায় বিধায় থেমে যেতে হলো।
হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের প্রতি প্রেমাসক্ত ছিল প্রায় তিনশত কুমারী নারী। তাঁর পেশানীতে সর্বদা ঐ নূর চমকাইত। তাই দেখে নারীগণ তাঁর গমন পথে দাঁড়িয়ে থাকতো তাঁর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার জন্য। কেউবা তাঁর সাথে মিলনের জন্য বার বার আহ্বান জানাতো- যাতে ঐ নূর তাদের লাভ হয়। তাকে নানা রকম বিত্ত-সম্পদের লোভও দেখানো হতো। কিন্তু সবাই বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতো। বিভিন্ন নারীদের এ অবস্থা দেখে হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব হযরত আবদুল্লাহকে শিকারের উদ্দেশ্যে কিছুদিনের জন্য বাহিরে পাঠালেন। হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম যে ময়দানে শিকারের জন্য হাজির হলেন, সে ময়দানে হযরত আমেনা আলাইহিস্ সালামের পিতা ‘ওহাব ইবনে মানাফও’ উপস্থিত ছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে তিনি হযরত আবদুল্লাহর সাথেই গিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ শিকারের যাচ্ছেন এ কথা অবগত হয়ে সিরিয়ার (শামদেশ) চল্লিশজন (কোনো কোনো বর্ণনায় নব্বইজন) খ্রিষ্টান উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে তাকে হত্যা করার জন্য ঐ ময়দানে এসে হাজির হলো। তখন ‘ওহাব ইবনে মানাফ’ দেখতে পেলেন অদৃশ্য জগত হতে একদল শক্তিশালী অশ্বারোহী সৈন্য এসে ঐ খ্রিষ্টান সৈন্যদেরকে বিতাড়িত করে দিল। কোনো কোনো সহিহ্ বর্ণনায় রয়েছে, ঐ চল্লিশজনকে হত্যা করে তারা আবার অদৃশ্য জগতে চলে গিয়েছিল। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে ‘ওহাব ইবনে মানাফ’ বাড়িতে এসে সমস্ত ঘটনা স্বীয় স্ত্রীকে বললেন এবং আমেনাকে হযরত আবদুল্লাহর নিকট বিবাহ দেয়ার আকাঙ্খা প্রকাশ করলেন। এরপর তারা হযরত আবদুল মুত্তালিবের নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। হযরত আবদুল মুত্তালিব সর্বদিকে বিচার বিবেচনা করে হযরত আবদুল্লাহ ও হযরত আমেনার পরিণয় সূত্র সম্পন্ন করলেন। তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল ‘জমাদিউস্ সানী মাসের পঞ্চম দিবসে বৃহস্পতিবার (নর-ই-মুজাস্সাম মুহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ -১৩৮ পৃঃ), তাওয়ারিখে মোহাম্মদী প্রথম খন্ডের ৩৬-৩৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে তাদের বিবাহ হয়েছিল নয়-ই জমাদিউস্ সানী। যখন হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম হযরত আমেনা আলাইহিস্ সালামের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন এবং সেখানে তিনি তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। তখন ১২ই জমাদিউস্ সানী শুক্রবার দিন ঐ নূর চলে গেল হযরত আমেনা আলাইহিস্ সালামের গর্ভে। তখন হজ্জ্বের জন্য ‘জিলহ্জ্ব’ মাসের প্রয়োজন ছিল না। এরপর হতে তাঁর প্রতি কোনো নারীর আর তেমন আকর্ষণ রইলো না।
তাদের বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর পিতামহ হযরত আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখলেন, আবদুল্লাহর গৃহ হতে একটি নতুন সূর্য বের হলো ; তা উর্ধ্বদিকে আরোহণ করতে থাকলো। আরোহণ করতে করতে আসমানের নিকট যেয়ে পৌঁছলো ও স্থির হলো। তাতে চন্দ্র ও তারকারাজি এর কিরণে অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি স্বপ্নের কথা স্বপ্নবেত্তা আবদুর রহমানকে জানালেন। আবদুর রহমান বললেন, আপনি খুশি হোন। আবদুল্লাহর ঘরে এমন এক পয়গাম্বর হবেন যার ধর্ম সকল ধর্মের উপর বিজয়ী হবে, তা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে।
ইবনে সা’দ ও ইবনে আবি শায়বা মোহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেন, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আমার বংশে মূর্খতার যুগের কোনো বিবাহ নেই। আমার বংশ সর্বত্র পাক পবিত্র [খাসায়েসুল কুবরা, ১ম খন্ড-৭২ পৃষ্ঠা]।”
‘তিরমিযী’ হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আমার বংশে মূর্খতার যুগের কোনো বিবাহ নেই। আমার বংশের সকল বিবাহ ইসলামী পদ্ধতির অনুরূপ হয়েছে [খাসায়েসুল কুবরা, ১ম খন্ড- ৭২ পৃষ্ঠা]।”
উক্ত হাদিসসমূহ হতে প্রমাণিত যে, রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বংশাবলী যুগে যুগেই পবিত্রতার ভিতর চলে এসেছে এবং অসংখ্য রেওয়ায়েত রয়েছে এ ব্যাপারে। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বংশ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সাল্লাম হতে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম পর্যন্ত একাত্তর জনের নাম উল্লেখিত আছে এবং ঐতিহাসিকদের মতে এরা সবাই ছিল পরম পবিত্রতার আবরণে ঢাকা। আল্লাহপাকই তাদেরকে পবিত্র রেখেছেন এবং তাদের প্রতি রাজি-খুশি বা সন্তুষ্ট আছেন একমাত্র নূরে মোহাম্মদীর কারণে। সিহাহ্তে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, ‘কোরাইশ’ মূলত একটি মাছের নাম। তার জীবিকা হলো অপরাপর মাছ কিন্তু কোনো মাছের আহার সে নয়। তাকে বলা যায় মাছের পিতা। এ জন্য ঐ নামটি কোরাইশ বংশের জন্য গৃহীত হয়েছে। ‘মাছের পিতা বা মৎস্য বাবা’ যেমন কোরাইশ, তেমনি মানবজাতির বংশরাজ হলো কোরাইশ। এটাও বর্ণিত আছে যে, নাযার ইবনে কিনানার বংশধর আরবের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বসবাস করতো। কোসাই ইবনে কিলাব তাদেরকে মক্কায় একত্র করে বসবাস করতে থাকেন। সে হতে তিনি হলেন কোরাইশ মানে সংঘবদ্ধকারী বা একত্রকারী। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উর্ধ্বতন বংশধারার একাদশতম পুরুষ হলেন ‘ফিহির’ এবং ফিহিরই কোরাইশ নামে অভিহিত ছিল বিধায় রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম হলেন কোরাইশ বংশের। পরবর্তীতে এ কোরাইশ বংশ নানা শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। শেষে হাশেমী এবং উমাইয়া – এ দুই বংশের বিভক্ত হয়েছে। তার মধ্যে ‘হাশেমী’ বংশ সর্বশেষ্ঠ, এ হাশেমী বংশেই মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ ‘মুররাহ’ হতে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এবং নবম পুরুষ লুহাই বিন কাব হতে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বংশধারা বিভক্ত হয়ে গেছে। কাজেই নবীজির সপ্তম ও নবম উর্ধ্বতন বংশ ধারায় আবুবকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা জড়িত আছে। আর স্বয়ং ‘হাসেমী’ বংশে জন্মগ্রহণ করেন নবীর জ্ঞানের তোরণ, নূরের অংশ, জান্নাত-জাহান্নামের বন্টনকারী, মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে প্রভেদকারী হযরত আলী আলাইহিস্ সালাম।
ওয়াসিলা ইবনে আসকা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলছেন, আমি রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলছেন, আল্লাহপাক ইসমাঈলের বংশধর হতে কিনানাকে মনোনীত করে নিয়েছেন, বনী কিনানা হতে কোরাইশকে মনোনীত করে নিয়েছেন, কোরাইশ হতে বনী হাশেমকে মনোনীত করে নিয়েছেন এবং বনী হাশেম হতে আমাকে মনোনীত করে নিয়েছেন। তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ ইব্রাহীমের বংশধর হতে ইসমাঈলকে মনোনীত করে নিলেন এবং ইসমাঈলের বংশধর হতে বনী কিনানাকে মনোনীত করে নিলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত (নবীজি কাফেরদের মুখে কিছু টিকা-টিপ্পনী শুনে অতিশয় ক্ষুন্ন হলেন, তাতে তাঁর শান ও বংশ মর্যাদার কিছুটা বর্ণনা দিলেন) আছে যে, নবীজি মিম্বরের উপরে উঠে দাঁড়ালেন, অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? উপস্থিত সাহাবাগণ বললেন, আপনি আল্লাহর রাছুল। তিনি বললেন, আমি মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব। আল্লাহপাক মাখলুককে (জিন-ইনছানকে) সৃষ্টি করলেন, অতঃপর তিনি আমাকে স্থাপন করলেন তাদের উত্তম (ইনছানের) দলে। তারপর তিনি তাদেরকে বিভক্ত করলেন দুই দলে (আরব ও আজমে) এবং আমাকে স্থাপন করলেন উত্তম (আরবে) গোত্রে। তারপর তিনি তাদেরকে বিভক্ত করলেন বহু গৃহে (খান্দানে) এবং আমাকে স্থাপন করলেন উত্তম (হাশেম) গৃহে (খান্দানে)। কাজেই আমি মর্যাদায় তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও খান্দান হিসেবেও সর্বশ্রেষ্ঠ (আর উত্তম বংশের উত্তম লোকই নবুয়ত ও রিসালাতের হকদার হয়ে থাকে)।
একবার হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাবুক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পর বললেন, হে আল্লাহর রাছুল ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনার কিছু প্রশংসা করি। তিনি বললেন, বলো। হযরত আব্বাস বললেন
(১) দুনিয়ায় আবির্ভূত হওয়ার পূর্বে তুমি ছিলে বেহেশতের ছায়ায় অতি সুখে ও স্বাচ্ছন্দে এবং (আদমের পৃষ্ঠে) এক আমানতগার। যেখানে বেহেশতের (বৃক্ষ সকলের) পত্রগুচ্ছ দ্বারা আচ্ছাদন সম্পন্ন হয়েছিল।
(২) অনন্তর তুমি অবতরণ করলে জমীনে, তখন তুমি চর্মাবৃত মানুষ নও, নও
মাংসপিন্ড, নও জমাট রক্ত।
(৩) বরং তুমি ছিলে শুক্রবিন্দু, তা ছিল নূহের কিশতিতে, তখন প্লাবন নসর ও
তার উপাসকদের কণ্ঠ পর্যন্ত ডুবিয়ে দিলে।
(৪) এরূপে তুমি অতিক্রম করতে থাকলে এক পৃষ্ঠ হতে অপর গর্ভাশয়ের স্তরে,
যখন এক জগত পার হলো, অপর স্তর শুরু হলো।
(৫) তুমি অবতরণ করলে খলীলের অগ্নিকুন্ডে- সংগোপনে, তুমি ছিলে খলীলের
পৃষ্ঠে, কাজেই খলীল কিরূপে জ্বলে?
(৬) অবশেষে তোমার গৌরবময় গৃহ খানদাফের এক উচ্চ শিখরে গিয়ে উপস্থিত
হলো যার নিন্মে অবস্থিত অপরাপর বংশ। (তাঁর উর্ধ্বতন বংশের এক পুরুষের
নাম মুদারিকা ইবনে ইলিয়াস। তিনি ছিলেন দূর সম্পর্কীয় পিতামহ। তাঁর
জননীর নাম ছিল খানদাফ)।
(৭) এবং যখন তুমি ভুমিষ্ঠ হলে পৃথিবী আলোকিত হয়ে গেল এবং তোমার
আলোতে দিগ্দিগন্ত প্রদীপ্ত হয়ে গেল।
(৮) অতঃপর সে জ্যোতিতে ও সে আলোতে আমরা বয়ে চলছি হিদায়েতের
পথসমূহ।