আপন ফাউন্ডেশন

হাসান বসরী আনছারী রহ. এর পবিত্র বাণী

Date:

Share post:

১. মানুষ ছাগল ভেড়ার চেয়েও অসাবধান । রাখালের ডাক শুনে পশুরা ঘাস খাওয়া বন্ধ করে তার কাছে ছুটে যায়। কিন্তু মানুষ তার প্রতিপালকের আহ্বান শুনে ভ্রূক্ষেপ করে না । অসৎ কর্মেই লিপ্ত থাকে ।

২. মন্দলোকের সংসর্গ ভাল সঙ্গে সদ্ভাব প্রদর্শনে বাধা সৃষ্টি করে ।

৩. হৃদয়ে যখন আল্লাহ্-বিরোধিতার লেশমাত্র থাকে না, জানতে হবে তখন মারেফাত অর্জিত হয়েছে।

৪. বহিরঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা দ্বারা জান্নাত লাভ করা যায় না। প্রয়োজন মনের একাগ্রতা ও কঠোর সাধনা ।

৫. মনের আয়নায় যখন শুধু সৎ ভাবনা প্রতিফলিত হয়, তখন জানতে হবে সঠিক পথেই রয়েছি। যদি উঠে আসে সৎ চিন্তা, তাহলে ধরে নিতে হবে অসৎ পথেই আছি।

৬. যার কথায় না আছে যুক্তি, না আছে বুদ্ধি, তার কথায় কোন উপকার নেই। তার কথা শুনলে সময়ের অপচয়ই শুধু হয়।

৭. নিবিড় নির্জন চিন্তায় যার মন আল্লাহকে জানতে না পারে, সে নিশ্চয় পার্থিব জীবনের প্রতি মোহাচ্ছন্ন। অথবা অলস। আর যার দৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর রহস্যময়তার আভাস নেই, তারও দৃষ্টি জাগতিক ধূলাবালির দ্বারা আচ্ছন্ন।

৮. তওরাতে আছে, যে ব্যক্তি অল্পে তুষ্ট হওয়ার অভ্যাস করেছে, সে পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বেঁচে গিয়েছে। মানুষের সংস্রব যে এড়াতে পেরেছে, সে প্রকৃত পথের সন্ধান পেয়েছে। যে প্রবৃত্তিকে বশীভূত করেছে, সে স্বাধীনতা লাভ করেছে। যে হিংসা-দ্বেষ ত্যাগ করেছে, সে বন্ধুত্ব অর্জনের উপযুক্ত হয়েছে।

৯. আল্লাহ্-ভীতির লক্ষণ তিনটি: (ক) যার মনে আল্লাহর ভয় আছে, সে রেগে গেলেও বা স্বাভাবিক অবস্থায় সবসময় সত্য কথা বলে। (খ) যে বিষয়ে আল্লাহ খুশি নন, সে বিষয়ে মন্দ রিপুগুলিকে তিনি দমন করে রাখেন। (গ) যে কাজে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, সে কাজেই শুধু ব্যস্ত থাকেন ।

১০. এক পলকের পার্থিব অনাসক্তি হাজার বছরের ইবাদত অপেক্ষা মূল্যবান ।

১১. অন্তরে বাইরে অমিলই হল প্রবঞ্চনার লক্ষণ ।

১২. তিনিই প্রকৃত বিশ্বাসী, যিনি আল্লাহ্ শপথ নিয়ে বলতে পারেন যে, তিনি বিশ্বাসী ।

১৩. বিশ্বসীর সংজ্ঞা হল: ধীর স্থির লোক। গোপন গভীর সাধনায় দিন যাপন করেন। চাঞ্জল্যহীন । মুখে যা আসে, তাই বলেন না ।

১৪. তিন শ্রেণীর লোকের পরচর্চা করা সিদ্ধ । অথবা তাকে পরচর্চা বলে না। যেমন: (ক) ইন্দ্রিয়াসক্ত লোভী, (খ) প্রকাশ্যও প্রতিনিয়ত অসদাচারী, (গ) নিষ্ঠুর অত্যাচারী শাসক ও
নেতা ।

১৫. পরচর্চার প্রায়শ্চিত্ত হল আল্লাহর দরবারে ক্ষমানা চাওয়া। যার নিন্দা করা হয়, তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।

১৬. পার্থিব বিষয়াসক্ত মানুষ তিনটি আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যুবরণ করে। যেমন (ক) ধনের উপার্জন ও সঞ্চয়ের অতৃপ্তি, (খ) আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ার ক্ষোভ, (গ) পরকালের পাথেয় অর্জন না করার ব্যথা ।

১৭.যে হাল্কা বোঝা বয়, তার কষ্ট-ক্লেশ কম। সে বড় একটা বিপদে পড়ে না। কিন্তু ভারী বোঝা যাকে বইতে হয়, তার বড় কষ্ট। এমনকি সে ধ্বংসেরও সম্মুখীন হতে পারে

১৮. পার্থিব-জীবন যেন গচ্ছিত সম্পত্তি-এরূপ যারা মনে করেন, তারা প্রয়োজনে এর মালিকের হাতে জীবন সঁপে দিয়ে দিব্যি চলে যেতে পারেন । তাদের মনে কোন দুঃখ অশান্তির সৃষ্টি হয় না ।

১৯. তিনিই প্রকৃত বুদ্ধিমান, যিনি পর্থিব সৌধ ভেঙে তার ওপর গড়ে তোলেন পারলৌকিক ইমারত । পারলৌকিক ইমারত ভেঙে যিনি পার্থিব প্রাসাদ নির্মাণ করেন না।

২০. যিনি আল্লাহকে চিনেছেন, তিনি আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছেন। আর যিনি দুনিয়াকে চিনেছেন, তিনি আল্লাহর সঙ্গে শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছেন।

২১. মানুষের রিপুগুলোকে খুব শক্ত শেকলে বেঁধে রাখতে হয়। পশুদের ক্ষেত্রে তেমনটি দরকার হয় না ।

২২.মৃত্যুর পর লোকে তোমার সম্পর্কে কিরূপ ধারণা পোষণ করবে তা যদি জানতে চাও তাহলে, মৃত্যুর পর অপরের সম্পর্কে তুমি কেমন ধারণা করেছ, তা চিন্তা কর।

২৩. তোমাদের পূর্বপুরুষগণ কুরআন পাকের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করেছেন। কুরআনের আদেশ-নির্দেশ নিয়ে রাতভর চিন্তা করেছেন আর দিনে তার চর্চা করেছেন। কিন্তু তোমরা বিশুদ্ধরূণে কুরআন পাঠ কর, তার জের, জবর ঠিক করে দাও। কিন্তু কুরআন পাকের মূল লক্ষ্য তোমাদের মধ্যে প্রতিফলিত হয় না। কেবল অধ্যয়নই চলছে। কিন্তু তার বিধি-বিধান জীবনযাত্রার পাথেয় হিসেবে গৃহীত হচ্ছে না।

২৪. আল্লাহ্ যাকে ঘূণিত করে দিয়েছেন, সে ব্যক্তিই দুনিয়ার প্রতি আসক্ত।

২৫. যে মানুষ অন্য মানুষকে শুধু বশীভূত করতো চায়, সে প্রকৃত জ্ঞানী নয় । তাছাড়া তার অন্তরে রয়েছে অসৎ উদ্দেশ্য।

২৬. অপরকে কোন কঠোর আদেশ দানের পূর্বে নিজে তার চর্চা করা চাই ।

২৭. যে অন্যের দোষ তোমাকে বলে, সে নিশ্চয় তোমার দোষও অপরকে বলে ।

২৮. আমার স্বধর্মাবলম্বী ভাই সহোদর ভাইয়ের চেয়েও প্রিয়- যদি তার মধ্যে প্রকৃত দ্বীন থাকে। তার দ্বারা যে উপকার পাওয় যাবে, স্বধর্মচ্যুত সহোদর ভাইয়ের দ্বারা তা কখনই সম্ভব নয়। তার দ্বারা পার্থিব কিছু কাজ হতে পারে, কিন্তু ধর্মনিষ্ঠ ধর্মভাইয়ের দ্বারা পারলৌকিক উপকার লাভ হয় ।

২৯. বন্ধু-বান্ধবের জন্য কে কতটা খরচ করল, আল্লাহ্র কাছে তার তেমন গুরুত্ব রয়েছে পিতামাতার প্রতি কে কেমন খরচ করল তার ওপর। আল্লাহ্ খুব ভালোভাবেই তার হিসেব রাখেন । ৩০. যে নামায মনকে সংযত করে, সে নামাযই আল্লাহ্ ক্ষমা আশার করতে পারে ।

মোনাজাত : হযরত হাসান বসরী (র)-এর মোনাজাতও মনকে বিপুলভাবে টানে। তিনি বলতেন, প্রভু আমার! আপনি আমাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, আমি তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিনি। আপনি আমাকে বিপন্ন করেছেন, কিন্তু আমি ধৈর্যধারণ করতে পারিনি । কিন্তু কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিনি বলে আপনি আপনার নিয়ামত তুলে নেননি। আর ধৈর্য ধরিনি বলে আমার বিপদকেও স্থায়ী করেননি। প্রভু গো! আপনার মধ্যে বদান্যতা ও রহমত ছাড়া আর কিছুই নেই ।

গ্রন্থসূত্র – তাযকিরাতুল আউলিয়া
মূল – হযরত খাজা ফরীদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরী
অনুবাদ – মাওলানা ক্বারী তোফাজ্জল হোসেন ও মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ হাসান
সিদ্দিকিয়া পাবলিকেশন্স

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles