সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
বাংলার আধ্যাত্মবাদের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবশ্য-উচ্চারিত ও অবিসংবাদিত নাম। যিনি নিত্য সুন্দরের আরাধনায় ব্যায় করেছেন সমগ্রজীবন। রুদ্র সুন্দরের প্রচন্ড হুংকারে জাগিয়ে তুলেছেন অযুত কুসংস্কার-নিস্পেষিত প্রাণ। কাজী নজরুল ইসলাম যুগশ্রেষ্ঠ একজন ওলীর নাম যার আধাত্মচেতনাবোধে উজ্জীবিত হয়েছে অগনিত আত্মা-হারা মানুষ। আপন খবরের এবারের আয়োজনে থাকছে কাজী নজরুল ইসলাম এর আধ্যাত্মচেতনাবোধ সম্বলিত কিছু উক্তি।
১. আমি সংসার করেছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতিক্রম করে উর্ধ্বলোকে- সেখানে গেলে পৃথিবীর সকল অসম্পূর্ণতা সকল অপরাধ ক্ষমাসুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্ত্তিতে দেখা দেয়।
২. আমি ফকির, আল্লাহর দরবারে আমি পরম ভিক্ষু, যদি তার কাছে রহমত ও শক্তি ভিক্ষা পাই, ইনশাআল্লাহ- শুধু ভারত কেনো, সারা দুনিয়ায় সতের ডঙ্কা বেজে উঠবে, তৌহিদের – পরম অদ্বৈতবাদের অমৃতবন্যা বয়ে যাবে। এই অদ্বৈতবাদেরই সারা বিশ্বের মানব এসে মিলিত হবে।
৩. এই সত্যদ্রষ্টা, স্বপ্নপথের পথিকরাই দারিদ্র-দুঃখ-ব্যাধি-উৎপীড়ন জর্জ্জরিত মানবকে আনন্দের পথে, মুক্তির পথে নিয়ে গেছেন, ইমাম হয়ে, অগ্রপথিক হয়ে।
৪. কত হিটলার, কত কামাল আপনাদের মাঝে লুকিয়ে আছেন, তা আপনারা জানেন না। কিন্তু আল্লাহ আমায় তার স্বরুপ দেখিয়েছেন।
৫. আল্লাহ আপনাদের “সিরাতুল মুস্তাকিম” সুদৃঢ় সরল পথে পরিচালিত করুন। যে অনাগত মোজাহেদীনের জন্য আল্লাহর ফিরদাউস আলা আজও শুণ্য রয়েছে, তার পবিত্র বক্ষ পূর্ণ করবার জন্য আল্লাহর আহ্বান নেমে আসুক আপনাদের অন্তরে-দেহে-আত্মায়।
৬. অন্তরে পরম ঐশ্বর্য্য পেয়েও যিনি পরম ভিক্ষু, অনন্ত আসক্তির ভোগের মাঝে যিনি নিরাসক্ত নির্লোভ নিরভিমান নিরহঙ্কার, সেই পরম অভেদজ্ঞানী পরম সাম্য-সুন্দরের প্রতিক্ষায় আমি দিন গুনছি।
৭. আল্লাহ এই দাসের, বান্দার জীবনকে ভেঙে-চুরে মিসমার করে নতুন করে গড়েছেন।
৮. আমার আজো ভয় হয় যশঃখ্যাতির প্রলোভনকে; যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ।
৯. আল্লাহ আমায় সর্বপ্রলোভন হতে রক্ষা করুন।
১০. আমার বলতে দ্বিধা নেই, আল্লাহর রহমত আমি পেয়েছি। আমার পরম প্রিয় “আল গাফুরুস ওদুদ” (পরম ক্ষমা-সুন্দর ও প্রেমময়) আমায় নাজাত দিয়েছেন। কিন্তু অন্যকে মুক্ত করবার শক্তি আমায় দেননি।
১১. আল্লাহর সেই শক্তিকে গ্রহণ করার জন্য নিজেকে এই পৃথিবীর উর্ধ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়। অটল শান্ত ধ্যানী হতে হয়। উর্ধ্বে সঞ্চারণশীল মেঘদলকে সমতলভূমি গ্রহণ করতে পারে না। তাকে গ্রহণ করে সমতলের উর্ধ্বে যে অটল গিরিচূড়া উঠেছে, সে।
১২. আপনারা জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া আর কিছুর কামনা আমার নেই।
১৩. আমি সর্ববন্ধনমুক্ত, সর্বসংস্কার মুক্ত, সর্ব্ব ভেদাভেদ-জ্ঞান মুক্ত না হলে সেই পরম নিবারণ, পরম মুক্ত আল্লাহকে পাব না আমার শক্তিতে।
১৪. যে অদৃশ্য শক্তির হাতের পুতুল আমরা, সেই অনন্ত অপরিমাণ শক্তি যে উৎস হতে নিয়ত উৎসারিত হচ্ছে, সেইখানে খোঁজ পরম ঐশ্বর্য্যের সন্ধান। গোলামখানায়-কতলগাহে সে ঐশ্বর্য্যের এক কণাও নেই।
১৫. সঙ্গীতমূখর মাহফিল থেকে কোন্ মহামৌনী যেন আমারও অজ্ঞাতসারে চুরি করে নিয়ে যেতেন কোন এক না-জানা শূণ্যে, যেখানে বাণী নেই, সুর নেই – শুধু অনুভূতি, শুধু ইঙ্গিত।
১৬. আমার বাঁশিতে যে সুর বাজতো, যে বাঁশি আমি অভিমানে দিয়েছিলাম ফেলে, সেই হারানো বেণু আবার ফিরে পেলাম সেই চির-সুন্দর-লোকের অশ্রুমতী নদীর তীরে।
১৭. আজ আমার সকল সাধনা, তপস্যা, কামনা, বাসনা, চাওয়া, পাওয়া, জীবন, মরণ তাঁর পায়ে অঞ্জলী দিয়ে আমি আমিত্বের বোঝা বওয়ার দুঃখ থেকে মুক্তি পেয়েছি।
১৮. অসুন্দরের সাধনা আমার নয়। আমার আল্লাহ পরম সুন্দর । তিনি আমার কাছে নিত্য প্রিয়-ঘণ সুন্দর, প্রেম-ঘন সুন্দর, রস-ঘন সুন্দর, আনন্দ-ঘন সুন্দর।
১৯. আমার সর্ব অস্তিত্ব, জীবন-মরণ-কর্ম, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ যে তারই নামে শপথ করে তাঁকে নিবেদন করেছি। আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই, আমার ক্ষমা সুন্দর প্রিয়তম আমার আমিত্বকে গ্রহণ করেছেন।
২০. বাইরের প্রয়োজন, অভাবের আহ্বান আমায় বারে বারে কেড়ে এনেছে সেই মৌনীর কোল থেকে, নিগড়ের পর নিগড় দিয়ে আমায় বেঁধেছে কর্মের কারাগারে। আমিও বার বার চ্ছিন্ন করেছি সেই বন্ধন।
সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী