হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
‘তাফসীরে কানযুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফানের’ প্রথম খন্ডে সুরা বাকারার ২৪৮ নম্বর আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এ ‘তাবুত’ (পরে যা মুসা নবীর নিকট ছিল) শামশাদ কাঠের তৈরী একটা স্বর্ণ-খচিত সিন্দুক ছিল, যার দৈর্ঘ্য তিন হাত এবং প্রস্থ দু’হাত ছিল। সেটাকে আল্লাহপাক হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। এর মধ্যে সমস্ত নবীদের ছবি রক্ষিত ছিল। তাদের বাসস্থান ও বাসগৃহের ছবিও ছিল এবং শেষ ভাগে রাছুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এবং তাঁর পবিত্রতম বাসগৃহের ছবি একটা লাল ইয়াকুতের মধ্যে ছিল, যাতে হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম নামাজরত অবস্থায় দন্ডায়মান এবং সাহাবা-ই-কেরাম তাঁর চারদিকে ঘিরে রয়েছে। সিন্দুকখানা বংশ পরস্পরায় হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম পর্যন্ত পৌঁছলো। তিনি এর মধ্যে তাওরাত কিতাব ও তাঁর বিশেষ বিশেষ সামগ্রী রাখতেন। বিশেষ সামগ্রীর মধ্যে হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামের ‘আসা’ (লাঠি), তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, পবিত্র স্যান্ডেল যুগল এবং হযরত হারুন আলাইহিস্ সালামের পাগড়ি, লাঠি এবং সামান্য ‘মান্না’, যা বনী ইসরাঈলগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল।
হযরত শীশ আলাইহিস্ সালামও তাঁর পুত্রকে আদমের ওসীয়ত পালন করার জন্য নির্দেশ দিলেন। বললেন, ঐ নূর যেন পবিত্র রমণীদের ছাড়া অপর পাত্রে স্থাপিত না হয়। সে হতে এ ওসীয়ত এক করণ (যুগ) হতে অপর করণ পর্যন্ত চলে আসতে থাকে। এরূপে ওসীয়তের নিয়মের ভিতর দিয়ে আল্লাহপাক ঐ নূরকে পৌঁছিয়ে দিলেন হযরত আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ্ পর্যন্ত। এ মর্যাদাশীল বংশকে তিনি মুক্ত রাখলেন আইয়্যামে জাহেলীয়াতের কলুষ হতে। এভাবে পুরুষাণুক্রমে পবিত্র পৃষ্ঠদেশ ও পবিত্র গর্ভস্তরগুলো অতিক্রম করতে করতে এসে পড়লো হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের পেশানীতে।
‘কা’আবুল আহবার’ বর্ণনা করেন, ‘রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর মোবারক স্থিত হলো হযরত আবদুল মুত্তালিবের পেশানীতে। যখন তাঁর ভরা যৌবন, তিনি একদিন ঘুমিয়ে পড়লেন কাবার হাতিমে। ঘুম ভাঙ্গার পরে দেখলেন, তাঁর চক্ষুদ্বয় সুরমা লিপ্ত, মস্তকে তৈলমাখা, অঙ্গে সুন্দর ও সজ্জিত লেবাস। তিনি অতিশয় পেরেশান। তিনি কিছুই অবগত নন যে, কে এরূপ করলো। তাঁর পিতা তাকে কোরাইশদের ভবিষ্যদ্বিদগণের নিকট নিয়ে গেলেন। তারা সব শুনে বললেন, আসমান সমুদয়ের প্রভু তাঁর বিবাহের আদেশ জ্ঞাপন করলেন। তিনি প্রথম পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন ‘কয়লা, নামক এক মেয়ের সাথে। ‘কয়লা’র ইন্তেকালের পর তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন ফাতেমার সাথে। এ ফাতেমার গর্ভ অলংকৃত করেন হযরত আবদুল্লাহ। হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের দেহ হতে সর্বদা মেশকের সৌরভ বের হতো আর তাঁর পেশানী হতে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর চমকিত। দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে কোরাইশরা আবদুল মুত্তালিবকে হাতে ধরে ‘সাবির’ পাহাড়ে নিয়ে যেতো। তারা তাঁর উছিলা দিয়ে আল্লাহর কুদরত অন্বেষণ করতো ও পরিবারের জন্য প্রার্থনা জানাতো। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আগমনের জন্য প্রার্থনা জানাতো। এ হযরত আবদুল মুত্তালিব নূরে মোহাম্মদীর ধারক-বাহক ছিলেন এবং তিনি দ্বীনে হানিফের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
‘খাসায়েসুল কুবরা’ ২য় খন্ডের ৭৭ পৃষ্ঠায় হাকেম, বায়হাকী, তিবরানী ও আবু নায়ীম আবু আওয়ান থেকে, তিনি মেসওয়ার ইবনে মাখরামা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, আবদুল মুত্তালিব বলছেন, আমরা শীতকালীন সফরে ইয়ামেনে পৌছলাম। সেখানে এক ইহুদি আলেমের কাছে গেলে সে আমাকে প্রশ্ন করলো – তুমি কে ? আমি বললাম, আমি একজন কোরাইশী। সে জিজ্ঞেস করলো, কোন্ গোত্রের ? আমি বললাম, বনী-হাশেমের। তখন সে আমার অনুমতি নিয়ে আমার নাকের ছিদ্র দেখে বললো, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তোমার এক হাতে রাজত্ব এবং অন্য হাতে নবুয়ত রয়েছে। আমার ধারণা ছিল যে, এ নবুয়ত ও রাজত্ব বনী-যুহরার মধ্যে হবে। এখন এটা কিরূপে হলো ?
তখনো খাজা আবদুল মুত্তালিব বিবাহ করেননি। তাকে বিবাহ করার জন্য ঐ ইহুদি আলেম বললো। খাজা আবদুল মুত্তালিব দেশে ফিরে ‘হালা বিনতে ওয়াহাব ইবনে আবদে মানাফ’ কে বিয়ে করলেন। ভিন্ন বর্ণনায় তার নাম ‘কয়লা’ বলেও উল্লেখ আছে। তার মৃত্যুর পর ফাতেমাকে বিয়ে করলেন। এ ফাতেমাই হলো রাছুল পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের দাদী এবং হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের মাতা। খাজা আবদুল মুত্তালিবের পিতার নাম হাশিম এবং তাঁর মাতার নাম ছিল ছালমা।
যখন বাদশাহ আবরাহা বিরাট হস্তি বাহিনী নিয়ে কাবাঘর ধ্বংস করার মানসে মক্কায় আগমণ করে, তখন আবদুল মুত্তালিব ‘সাবির’ পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন। তাঁর পেশানী হতে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর মোবারক নতুন চাঁদের আকৃতিতে গোল হয়ে ঝলমল করে জ্বলে উঠলো। সে চাঁদ সদৃশ কিরণ গিয়ে কাবা ঘরের উপর পতিত হলো। এটা দেখে হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব বললেন, কোরাইশগণ তোমরা ফিরে চলো। নিশ্চিতই আমরা জয়ী হবো, কাবাঘর বাদশাহ্ আবরাহা ভাঙ্গতে পারবে না – এ ঘটনাই হলো তার প্রমাণ।
মক্কায় এসে বাদশাহ আবরাহা তার সেনাপতিকে মক্কার সর্দার হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের নিকট পাঠালো, সেনাপতি খাজা আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। যখন তার জ্ঞান ফিরলো সাথে সাথেই সে দৌঁড়িয়ে চলে গেল আর বলে গেল-হে মক্কার সর্দার ! আপনার সঙ্গে কেহই পারবে না। মক্কার লোকদের চারশত উট যখন বাদশাহ্ আবরাহার লোকেরা ধরে নিয়ে গেলো হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব সে উটের জন্য যখন বাদশাহ্ আবরাহার নিকট গেলেন, বাদশাহ্ আবরাহা খাজা আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথে স্বীয় আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং তাঁর হাত ধরে নিয়ে নিজের কাছে বসালো। তিনি তার লোকদের উট ফিরিয়ে নিয়ে আসলেন।
যখন বাদশাহ্ কাবাঘর ভাঙ্গার জন্য এক হাজার হাতি নিয়ে রওয়ানা হলো। আবরাহা বাদশাহ্র হাতি ছিল সাদা বর্ণের এবং তার নাম ছিল ‘মাহ্মুদ’। বাদশাহর হাতি যখন পথে খাজা আবদুল মুত্তালিবের সামনে পড়লো সঙ্গে সঙ্গে সে হাতি শীর নত করে তাকে প্রণাম করলো। শেষে আল্লাহ পাক ‘আবাবিল’ পাখির দ্বারা বাদশাহ আবরাহাকে হাতি-ঘোড়া, সৈন্যসহ ধ্বংস করে দিলেন। সুরা ফীলে তার বর্ণনা রয়েছে। সে পাখির দুই পায়ে এবং মুখে মোট তিনটি পাথর ছিল এবং এখনো আছে। সে ভেদ-রহস্য ইলমে সিনাতে গোপন আছে। এসবই ছিল তাঁর পেশানীতে যে নূর-ই- মোহাম্মদী ছিল তার মহিমা। একটু বুঝা দরকার যে, যে পবিত্র সত্তাটি নূরে মোহাম্মদীর ধারক-বাহক ছিল তার মর্যাদাটি আল্লাহপাকের সৃষ্টির ভিতর কতো উচ্চস্তরের হতে পারে। সে নূরের স্পর্শ যারাই পেয়েছে তারাই জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা পেয়েছে, বিষয়টি জ্ঞান দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুন।
‘মাদারিজুন্ নবুয়ত এবং ‘রওজাতুল আহযাব’ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, একদিন হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিবকে বললেন, পিতঃ আমি যখন মাঠে যাই, একটি নূর আমার পৃষ্ঠদেশ হতে বের হয়ে আসে এবং দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগ চলে যায় পূর্ব দিকে অন্য ভাগ চলে যায় পশ্চিম দিকে, মূহুর্তের মধ্যেই তা আবার মেঘের আকার ধারণ করে ও আমাকে ছায়া দান করে। এরপর তা আসমানের দিকে উঠে যায়। তখন আসমানের দরজা খুলে যায়। যখন আমি জমীনে বসি, তখন আওয়াজ আসতে থাকে “হে নূর-ই-মোহাম্মদীর বাহক, তোমার উপর ছালামত হোক।” আমি যখন শুষ্ক গাছের নিচে যাই সে মূহুর্তে তা সবুজ হয়ে যায়। আবদুল মুত্তালিব বললেন, বৎস ! তুমি মোবারক হও, তোমার পৃষ্ঠদেশ হতে আবির্ভাব ঘটবে নবীগণের সর্দার।
বুঝা যাচ্ছে, হযরত আবদুল মুত্তালিবও নূর-ই-মোহাম্মদী সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন এবং তিনি যে নূর-ই-মোহাম্মদীর ধারক-বাহক সে বিষয়ে তার বিশ্বাসও ছিল। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা তাঁর দ্বারা সংঘটিত হতো না এবং এ ধরনের বর্ণনাও তিনি দিতেন না। পবিত্র মানবগণের মাধ্যমেই নূরে মোহাম্মদীর আগমন ঘটেছে-এ কথা হাবিবে খোদা নিজেও বহুবার বলছেন-যা আমি আমার লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছি। সুতরাং তাঁর পবিত্র নূরের ধারক-বাহক যারা তারা সবাই হলেন জান্নাতি মানুষ। এ সৌভাগ্য লাভ হয়েছে একমাত্র সেই নূরের মোহাম্মদীর কারণেই এবং যারাই সেই নূরে মোহাম্মদীর ধারক-বাহক তারা সবাই পবিত্র মানুষ, মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষ বিধায় তারা সবাই হলেন ‘হযরত এবং সাইয়্যেদ’।