হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
ইবনে ইসহাকের ‘সিরাতে রাছুলুল্লাহ (সাঃ)’ বিশ্ব বিখ্যাত কিতাবের ৯৫-৯৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, হযরত হালিমা যখন শিশু মোহাম্মদকে মক্কায় তাঁর নিজের লোকদের কাছে নিয়ে এলেন, তখন ভিড়ের মধ্যে তাঁর কাছ থেকে মোহাম্মদ হারিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও হযরত হালিমা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা তাকে পেলেন না। না পেয়ে তিনি তখন খাজা আবদুল মুত্তালিবের কাছে যেয়ে বললেন, আজকে রাতে আমি মোহাম্মদকে নিয়ে এসেছিলাম। মক্কার উত্তর দিকে আমি ছিলাম। তখন কোথায় সে চলে গেলো, তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। খাজা আবদুল মুত্তালিব এ কথা শুনে দ্রুত কাবাঘরে গিয়ে তাকে ফিরে পাবার জন্য প্রার্থনা করলেন। এর কিছুক্ষণ পরই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ এবং অন্য একজন কোরাইশ তাঁকে পেয়ে খাজা আবদুল মুত্তালিবের কাছে নিয়ে এলেন। বললেন, ‘আমরা আপনার এ ছেলেকে মক্কার উত্তর দিকে পেয়েছি। তখন খাজা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে কাঁধে নিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করলেন এবং আল্লাহর হেফাজতে তাঁকে দেয়ার কথা বললেন, আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য প্রার্থনা করলেন। এরপর পাঠিয়ে দিলেন হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামের কাছে। সুদীর্ঘ পাঁচ বৎসর পর হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে বুকে ফিরিয়ে পেলেন। কিন্তু হযরত আমিনার আলাইহাস্ সালামের এ সুখ বেশী দিন ছিল না। মনের অভিলাষ মতে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম স্বামীর মাজার জিয়ারতের জন্য এবং তার পিতৃকুলের সবাইকে দেখার জন্য মদীনায় রওয়ানা হলেন। সাথে নিলেন বিশ্বস্ত পারিবারিক দাসী উম্মে আয়মনকে। মদীনার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে স্বামীর মাজার দরশনে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামের হৃদয় বিগলিত অশ্রুধারা প্রবাহিত করে, মাজার জিয়ারত করে পিতৃালয়ে চলে গেলেন। একমাস সেখানে অতিবাহিত করে মক্কায় ফিরে আসার পথে মাঝখানে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম মারাত্মক অসুস্থ হয়ে প্রাণ ত্যাগ করলেন। তখন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বয়স মাত্র ছয় বৎসর ছিল। হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামকে সেখানে শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম ও উম্মে আয়মন মিলে সমাধিস্থ করে অশ্রুভারাক্রান্ত হৃদয়ে মক্কায় চলে আসেন। আসার পথে শিশু মোহাম্মদ তাঁর মায়ের মাজারের দিকে ফিরে বার বার তাকাতে ছিলেন আর চোখের পানি ফেলছিলেন। ইতিহাসে ইহা এক করুণ হৃদয় বিদারক দৃশ্য। পিতা হারানো ছয় বৎসরের শিশু হয়ে নিজ হাতে মায়ের সমাধি দিতে হলো, সেই দূর দেশে নির্জন মরুভূমিতে, তা হৃদয় দিয়ে একটু উপলদ্ধি করে দেখুন বিষয়টি কেমন। যদি আমার আপনার এতোটুকু ছয় বছরের শিশু সন্তানের এমন হয় ভেবে দেখুন তা কেমন লাগবে। যদিও ইতিহাস আর হৃদয়ের উপলদ্ধি এক জিনিস নয়, তবু ঘটনাটি কেমন করুণ তা নবী প্রেমিকগণ উপলদ্ধি করতে পারবেন।
শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের দায়িত্ব ভার নিলেন দাদা হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব এবং অতিশয় আদর যতœ সহকারে পৌত্রের দেখাশোনা করেছিলেন। কিন্তু তিন বা চার বৎসর পর পিতামহ হযরত আবদুল মুত্তালিবও ওফাত লাভ করেন। ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আবদুল মুত্তালিব পারসিকদের সাহায্যে ‘জুল ইয়েজেনের’ পুত্র সায়েফের তোব্বাসের সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে অভিনন্দন জ্ঞাপনের জন্য কোরাইশদের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি ‘সানা-তে’ গিয়েছিলেন। তার কিছুকাল পরেই ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি ওফাত লাভ করেন। তখন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বয়স ছিল ‘হাতির বছরে’ আট বৎসর। কোনো বর্ণনায় রয়েছে তখন তাঁর নয় বৎসর ছিল।
মোহাম্মদ ইবনে সাদ ইবনে আল-মুসাইয়িব হতে বর্ণিত হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব যখন বুঝতে পারলেন তাঁর ইন্তেকালের সময় সন্নিকটে, তখন তিনি তাঁর ছয়জন মেয়ে সাফিয়া, বাররা, আতিকা, উম্ম হাকিম আল-বায়দা, উমায়মা ও আরওয়াকে ডেকে বললেন, আমাকে নিয়ে তোমরা শোকগাথা রচনা করো। আমার ইন্তেকালের পর তোমরা কে কী বলবে আমি তা শুনে যেতে চাই। তারা তাদের পিতাকে সেই শোকগাথা কবিতা শুনিয়েছিলেন। শোকগাথা কবিতাগুলো অনেক বড় বিধায় উল্লেখ করা হলো না। ইবনে ইসহাকের ‘সিরাতে রাছুলুল্লাহ (সাঃ)’ কিতাবের ৯৭ পৃষ্ঠায় শোকগাথাগুলো বর্ণিত আছে।
হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের ইন্তেকাল বা ওফাত লাভের পর শিশু হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের দায়িত্ব ভার হযরত খাজা আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর উপর ন্যাস্ত হয়। ১২ বৎসর ২ মাস ১০ দিন বয়সে চাচা খাজা আবু তালিবের সাথে শাম (সিরিয়া) দেশে বাণিজ্যে যান। ১৪ বৎসর বয়সে ফিজারের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং পরে ‘হিলফুল ফজুল’ নামে জনসেবামুলক একটি সংস্থা গঠন করেন। ২৪ বৎসর বয়সে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সাথে দ্বিতীয়বার নবীজি শাম দেশে বাণিজ্যে যান। ২৫ বৎসর বয়সে হযরত খাদিজাতুত্ তাহেরা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার মালামাল নিয়ে তৃতীয়বারের মত শাম দেশে বাণিজ্যে যান এবং বানিজ্যে প্রচুর লাভবান হয়ে ফিরে আসেন। শাম দেশ হতে আসার ২ মাস পর ৪০ বৎসর বয়স্কা নারী হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাকে বিবাহ করেন। তখন ছিল ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ। যদিও মাত্র ২/১জন লেখক এ কথাটি স্বীকার করতে রাজি নয় যে, বিবাহের সময় হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার বয়স চল্লিশ বৎসর ছিলো। তাদের মতে তখন তাঁর বয়স ছিল ছাব্বিশ বৎসর। আর রোকেয়া, কুলসুম, জয়নব রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের মেয়ে নয়, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার বোনের মেয়ে বলে কয়েকজন লেখক অভিমত পেশ করেছেন। কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে তারা আব্বা বা পিতা বলেই সম্ভোধন করতেন বলে ইতিহাসে তারা নবীজির মেয়ে বলেই পরিচিত। একমাত্র হযরত ফাতেমাকেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের মেয়ে বলে তারা স্বীকার করেন। যদিও ইসলামের ইতিহাসে চৌদ্দ আনা লেখকই এ কথা স্বীকার করেন না। মূলতঃ চল্লিশ বৎসরের অভিমতটিই সর্বজন স্বীকৃত। হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা আরবের মধ্যে ধনবতী ও পবিত্রা মহিলা ছিলেন। জাহেলিয়াত যুগের কোনো অপবিত্রতা তাকে ষ্পর্শ করতে পারেনি বিধায় আরবে তিনি ‘খাজিাতুত্ তাহেরা’ বলে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ব্যতীত সব সন্তান হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার গর্ভেই জন্মগ্রহণ করে। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের ৩৫ বৎসর বয়সের সময় কাবাঘর মেরামতে নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেন এবং ‘হাজরে আসওয়াদ’ নিজ হাতে স্থাপন করে এক রক্তক্ষয়ী ঝগড়ার মিমাংসা করেন। এ সময়ে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম ৫ বৎসর বয়স্ক হযরত আলী আলাইহিস্ সালামকে নিজ গৃহে প্রতিপালনের জন্য নিয়ে আসেন। ২৫বৎসরের শেষের দিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে মগ্ন হন। তিনি ২/৩ দিনের খাবার সাথে নিয়ে যেতেন আবার মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন। এভাবে নির্জনে বা পর্বত গুহায় ধ্যান সাধনা করার রীতি নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বংশগত একটি রেওয়াজ ছিল। হযরত আবদুল মুত্তালিবও প্রতি বৎসর রমজান মাস এলে নির্জন পাহাড়ের গুহায় বসে দীর্ঘ এক মাস ধ্যান সাধনায় মগ্ন থাকতেন। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা মাঝে মধ্যে খাবার দিয়ে আসতেন। এভাবে হেরাগুহায় ধ্যান সাধনায় ২৭শে রমজান সোমবার ১লা ফেব্রুয়ারী ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০বৎসর ১দিন বয়সে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত লাভের পর সর্বপ্রথম সুরা আলাকের পাঁচটি আয়াত নাযিল হলো। আয়াতগুলো হলো, ‘ইক্বরা বিসমি রাব্বিাকাল্ লাযী খালাক্ব অর্থাৎ পড় যা তোমার প্রভুরূপে আছে বা প্রভুর নামের সাথে এবং যা সৃষ্টি করে। ‘খালাক্বাল ইনছানা মিন্ আলাক্ব’ অর্থাৎ সৃষ্টি করেন ইনছানকে আলাক্ব হতে তথা ইনছান সৃষ্টি হয়েছে আলাক্ব হতে তথা রক্তপিন্ড হতে। ‘ইক্বরা ওয়া রাব্বুকাল আকরামুল্’ অর্থাৎ পড় এবং তোমার রব প্রতিষ্ঠিতভাবে (বা পরম) সম্মানীত দাতা বা অতি দানশীল। ‘অল্লাযী আল্লামা বিল্ক্বালাম’ অর্থাৎ তিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দেন অথবা যিনি শিক্ষা দান করেন কলম দ্বারা। ‘আল্লামাল ইন্ছানা মা-লাম ইয়া’লাম’ অর্থাৎ শিক্ষা দেন ইনছানকে যা সে জানে না। এ পাঁচটি আয়াতের মাধ্যমে রব মানুষকে কলমের সাহায্যে কোরান শিক্ষা দেন সে গোপন ভেদ-রহস্য প্রকাশ করা হয়েছে। সে কলম নূরের সৃষ্টি এবং তার কালিও নুরের-লেখে চলছেন অনাদিকাল হতে। নূরের কলমে নূর কালিতে নূরের কোরান লওহ মাহফুজে লেখা হচ্ছে-যাকে বলে ‘কিতাবুন মাকনূনি’। সেখান থেকে চার ফেরেশতার মাধ্যমে হাবিবে খোদার ক্বলবে নাযিল হয়। কোরান শিক্ষা দেয়ার পর আল্লাহপাক ইনছান সৃষ্টি করে তারপর ভাষা জ্ঞান দান করেন। যে সাত অক্ষরের কোরান মানুষকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তা খন্ডন হলে আল্লাহপাক কৈফিয়ত নিবেন এবং তা হেফাজত না হলে জাহান্নামী হতে হবে। আল্লাহর শিক্ষা দেয়া কোরানকে যারা হেফাজত করছে একমাত্র তারাই হলো কোরানে হাফেজ এবং এ হাফেজগণই আল্লাহর কালাম বহনকারী, প্রকাশকারী তথা তাদের মধ্যেই আল্লাহর কালাম নাযিল হয়। নবুয়তের ভাষায় ‘ওহী’ আর বেলায়েতের ভাষায় ‘ইলমে লাদুন্নী।’ যিনি মুর্শিদ (খোদা নিজেই মুর্শিদ) একমাত্র তিনিই তার কোরান শিক্ষা দিতে পারেন। বুঝা প্রয়োজন যে, ‘আলাকের’ পূর্বে আরো পাঁচটি স্তর বা জগত ছিল, পরে আরো চারটি স্তর অতিক্রম করে শেষে ইনছানের আগমন হলো। এ চারটি স্তরের প্রথমই হলো ‘ধালাক’-যেখান থেকে রব-রহমান সাত অক্ষরের কোরান শিক্ষা দিয়ে ইনছান সৃষ্টি করছেন। ঈমানদারগণ আল্লাহর নিকট হতেই কোরান শিক্ষা করে বা পাঠ করে তথা আত্মাপরিচয় লাভ করে তাকে চিনে নিচ্ছেন এবং একমাত্র তারই মধ্যে দায়েমীত ওয়াছেল হয়ে থাকেন। এ মানুষের মধ্যেই ¯্রষ্টার অবস্থান, কোরানের অবস্থান, ইলমে এলাহীর প্রকাশ। এ পাঁচ আয়াত হতেই সুরা ফাতেহার সাত আয়াত প্রকাশ সাব্যস্ত আছে। এ সাত আয়াত মক্কায় ছিল শেষে মদীনাতে প্রকাশিল বিধায় পূর্ণাঙ্গ সুরা হিসাবে এ সুরাটি দু’বার নাযিল দেখানো হয়েছে। সুরা ফাতেহায় আল্লাহ, রব, রহমান, রহিম এবং মালিক-এ পাঁচটি নামের মর্মার্থে জাতপাকের গোপন পরিচয় নিহিত আছে।