এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েসী
মারেফাত হচ্ছে গুপ্ত বিদ্যা, এজন্য মারেফাত সহজসাধ্য নয়। জীবনের পূর্ণ আত্মত্যাগ এর মাধ্যমে অর্জিত যে মুনাফা, তাই হলো মারেফাত। সর্ব-সাধারণের জন্য এটা উন্মুক্ত নয়। কঠিন সততার আলিঙ্গন, আত্ম-উৎসাহিত জীবন ব্যাবস্থার রুকন, আল্লাহ্ তা’য়ালার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে চাইলে পরীক্ষা দিতে হয়। এতে তার জীবনের সমস্ত সুখও কেড়ে নেয়া হতে পারে। দেখা হবে তাতে তার মনের পরিধিতে আল্লাহর প্রতি বৈরী মনোভাব আছে কিনা! যদিও তিনি অন্তর্যামী, তারপরও বাস্তবতার মুখোমুখি করেন তার বান্দাকে।
সাধক তাই বলেন, “যে করে আমার আশ, আমি করি তার সর্বনাশ! যদি না ছাড়ে আমার পাছ, তবেই আমি করি তারে দাসের দাস।” আল্লাহ্প্রাপ্তি হচ্ছে মারেফাত। এই মারেফাত বুঝতে চাইলে অজুদী রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। জানতে হবে, কোথায় সৃষ্টির উৎস। কলেমা, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্ব এসব কি ওজুদী রহস্য উদ্ঘাটনের সোপান? ‘ফাল ইয়ান জুরীল ইনছানু মিমমা খুলীক’ অর্থাৎ – মানুষকে জানতে হবে কি বস্তু দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। এই আত্মপ্রকাশের পথ পরিক্রমণ যদি ত্বরান্বিত না হয়, তবে মওলার দিদারে কি করে তাকে নিয়ে যাবে? সালাত শব্দের অর্থ যদি হয় অশ্লীল বা বদ কর্ম থেকে বেঁচে থাকা, তাহলে অন্য শব্দ বলে মিথ্যাচার কেন? আল্লাহ্ যে তাঁর কালাম সম্পর্কে প্রচারনায় হুঁশিয়ার করেছেন, তার কি হবে? তিনি তার বান্দাকে নাজেল মতে প্রচার করতে বলেছেন। না করলে কাফের হতে হবে। যাকাত হচ্ছে পবিত্র করণ, কি কি পবিত্র করলে সত্যিকার অর্থে পবিত্র করা হবে, তার কোন সঠিক বিশ্লেষণ আছে কি? যদি কেবল মালের উপর এই কথাটি বলা হতো, তাহলে কোরআনে সালাতের পাশাপাশি যাকাত কেন? এ থেকে বুঝা যায়, নিশ্চয় এর মধ্যে কঠিন হাকিকত নিহিত আছে, যা সর্বসাধারণ জানতে পারছেনা। হজ্জের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে দেখা বা সাক্ষাত, সেখানেও সালাতই মূল বিষয়। কিভাবে আল্লাহ্কে দেখা যাবে, আদৌ তার কোন সঠিক ফয়সালা নেই। কিন্তু কেন? আল্লাহ্ তায়ালার পাক কোরআনে আছে “কুল্লেশাইয়েন মোহিত।” তবে কেন হজ্জের মাধ্যমে আরব দেশে যেয়ে তাঁকে দেখতে হবে? তবে কি আল্লাহ্র কথা সত্য নয়? নাকী হজ্জের মূল তাৎপর্য সমন্ধে মানুষ রয়েছে অন্ধকারে? এ থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই?
কালেমার কথাই বলি। কালেমা হলো আল্লাহ্কে মানা ও হযরত মুহাম্মাদ (স:) কে নবী ও রাসুল স্বীকার করা। শুধু বাচনিক উচ্চারণেই কি কালেমা আদায় হবে? নাকী কালেমায় নিজের ইনছানিয়াতের স্বরূপ দাঁড় করিয়ে দেখলেই, মূল কালেমার সাধনা স্বার্থক হবে? তা না হলে “আলফা আলফা মাররাতুন বেলা তাহ্কীক ফাহুয়া কাফেরুন” কেন? সিয়াম আত্মশুদ্ধির এক শ্রেষ্ঠ নিয়ামক। যিনি যার প্রতি দূর্বল হবেন, তিনি নিশ্চয় অনুধাবন করবেন যে, বিনয়-ই হচ্ছে সংযম। সিয়ামের সংযম আমাদের মধ্যে নেই। বাস্তবতা এমন যে, বর্তমানে যে সিয়াম আমরা পালন করি তা আল্লাহ্ তায়ালাকে উপহাস করা ছাড়া কিছু নয়! বর্তমান রোজার নিয়ম-কানুন দেখলে সহজেই বোঝা যাবে। আজকের শরিয়তের ধর্ম প্রচারকগণ প্রচার করে দিয়েছে, এ মাসে যত ব্যায় করবে তার হিসাব নাকি আল্লাহ্ নিবেনা! যে মাসে সংযমের শিক্ষা নিতে বলা হচ্ছে, সে মাসে যদি খরচের খাতা খুলে দেওলিয়া হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ্ তাকে কতটুক মর্যাদা দিবে তা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা না। শুধু সিয়ামের একটা শরিয়তী বিশ্লেষণ করলে অনেকেই দেখতে পাবেন আল্লাহ্ কি এরকম কোন নিয়ম বেধে দিয়ে ছিলেন কিনা?
যদি এরকম নিয়ম বেধে দিয়ে না থাকেন, তাহলে আল্লাহ্ তালার হুকুমের সিয়ামে সংযমতা কোথায়? আর সংযমের প্রতিফলন হচ্ছে অহিংস হয়ে ওঠা। যা সমগ্র জীবনে বাস্তবায়িত করতে হয়। এজন্য অনেক সাধক বলে থাকেন সিয়াম একটাই। কারণ জীবন একটাই, এ জীবনে সংযমের শুরু আছেম, শেষ নেই। বিরামহীন সে সংযম বা আত্মশুদ্ধি। অনেকেই তার মমার্থ বুঝতে ন পেরে অযথা অলিদের কষ্ট দিয়ে থাকে। এহেন মূর্খদের জন্য মওলার দরবারে প্রর্থনা করি, তারা যেন মনুষ্যত্বের মর্তবা বুঝতে পারে। তারা যেন হয়ে উঠতে পারে একজন শ্রেষ্ঠ নিষ্কলুষ মানুষ। ওলিরা আঘাত পান, কিন্তু আঘাত দেন না। কারণ, মহান ওলীগণ সবচে’ শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাই তাদের কাছে মানুষ ছুটে যায়, একটু দোয়া নেবার জন্য। আমাদের সমাজে অনেক মাওলানা ওয়াজ মাহফিলে রওজা সমদ্ধে ঘৃণিত প্রচারণা চালিয়ে অলীদের জীবন দর্শনকে বিতর্কিত করতে চায়, আবার গোপনে ঐ রওজায় গিয়ে মানত করেন নিজের অপকর্ম থেকে পানাহর জন্য!
তাই মারেফত সমন্ধে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হলে মুর্শিদের পাবন্দ হতে হবে। যারা সমাজে মুর্শিদরূপে প্রকাশিত হয়েছেন, তারা কোরআন মতেই চলাফেরা করেন। তারা কখনো ধর্মের নামে কোরআনের পাতা বিক্রয় করে মুনাফা হাছেল করেন না। তিনারা জানেন, কোরআনের মর্তবা অমুল্য সম্পদ, উহা বিক্রয়ের জন্য নহে। তবে বিনিময় যোগ্য। এ বিনিময় মানে অর্থ সম্পদ নয়। আল্লাহ্ তায়ালা নিজেকে ছামাদ বলেছেন, যার কোন অভাব নেই। যে পূর্ণ অভাবমুক্ত। সেই মহান আল্লাহ্তালা বলেছেন বান্দার কাছে তিনি উত্তম ঋণ চান। এর হাকিকত কি? না বুঝে অনেকেই দুনিয়াবি বিনাশের পথে এগুচ্ছে। এগুলো এক সময় কোন কাজেই আসবে না। যদি প্রকৃত পরহেজগারী না থাকে। পৃথিবীতে এমন এক গুপ্ত প্রতিভা আছে, যা নির্জন ধ্যান বিহীন কায়েম সম্ভব নয়। তাকে অর্জন করতে হলে দুনিয়াবী যত অপকর্ম বা অকল্যানমূলক অবস্থান আছে, তা থেকে ফারেগ থাকতে হবে। এজন্যই মুর্শিদ শপথ ও শর্ত এমনকি পরিক্ষার মাধ্যমে মর্যাদার উপাধীতে ভূষিত কবেন।
আমরা অনেক সময় বলে থাকি কোরআন সবার জন্য। আসলে তা নয়। জ্ঞানীদের জন্যই কোরআন পথ নির্দেশক। তাই যিনি জ্ঞানী বা পথনির্দেশক, তঁর সন্নিকটে যাওয়া ব্যতিত কোন দিনই তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হলে তার পরিচয় সমন্ধে জ্ঞান থাকতে হবে। কোথা হতে এর সুচনা হলো আর কোথায় যেয়ে তার পূর্ণতা পেলো। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবন দর্শন’ই হচ্ছে আল কোরআন। তাঁর প্রতিফলনই হচ্ছে আহলে বায়াত বা পাক পাঞ্জাতন। যাহাদের সহচর্যে নবুয়ত রেসালত দাড়িয়ে, তাদের বাদ দিয়ে পূর্ণতা প্রাপ্তির দম্ভ কোনদিন সুফল বয়ে আনেনি, আর আগামীতেও আনবেনা।
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর ইন্তেকালের পরেই ইসলাম দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রথমত মওলাইয়াত। পরে খোলাফায়ে রাশেদীন। এই খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম, দ্বিতীয়, ও তৃতীয় পুরুষ তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে এজমা কেয়াস নাম করে আধ্যাত্মবাদকে দূরে ঠেলে দিয়ে নামসর্বস্ব ইসলাম প্রচার করেছেন। প্রকৃত ইসলাম বজায় থাকলে নিশ্চয় কালেমা, সালাত, যাকাত, রোজা, হজ্ব কেবল অনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিতো না। এবাদত এমন এক জিনিস যা হচ্ছে স্বভাবগত পরিচিতি। একবার তা স্পর্শ করতে পারলে তার নগদ মূল্য পাওয়া যায়। যার প্রতিশ্রুতি আল কোরআনে এসেছে। “আলাইন্না আউলিয়াল্লাহে লা খাওফুন আলায়হীম, অলাহুম ইয়াহজানুন”। ভয় তাদের নেই কারণ, অলিগণ বেহেস্তের আশা বা দোযখের ভয়ে ইবাদত করে না। করে আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। তাই কারো চোখ রাঙ্গানো ফতোয়ায় তাঁরা ভিত হন না। এমন অনেক ওলীদের জীবন কেড়ে নিয়েছেন ফতোয়াবাজগণ। আবার অনুশোচনায় সেই ওলীকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ বলে স্বীকার করেছেন! স্বীকার করলেই যে পাপ মোচন হবে এর তো কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না! কারণ বান্দার হক বান্দা থেকেই আদায় করতে হবে। তাই কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে ভেবে দেখুন এ ফতোয়া প্রতিহিংসায় পড়ে কিনা?
যারা অহমিকাই দূরিভূত করতে পারেনি, তারা কি করে মুহাম্মদী ইসলামের দাবীদার? আর মুহাম্মদী ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে আহলে বায়াতের দাওন ধরে, কাজেই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল (স) কে মানলেই ইমানদার হওয়া যাবে না। তিনার বংশধরদের মানতে হবে। কারণ, কোরআনের ভাষায় সাহাবীদের উপরে আহ্লে বায়াতের শান। আহ্লে বায়াতের প্রশংসা করতে গেলে যাদের চেহারা কালো হয়ে যায়, মুলত তারাই মুহাম্মদী ইসলামের হত্যাকারী, তারা এজন্যই সঠিক ইসলাম থেকে বহুদূরে আছে। যার ফলে মূল মারেফতে তাদের বোধগম্যতার ভিতর নেই। অতএব তাদের কাছে সহিষ্ণু মনোভাব আশা করা ঠিক নয়। এরা সবসময় উগ্রতা দিয়ে ধর্মপ্রচার করতে চায়, যার জন্য ইসলাম নামটাই অনেকে নিতে ভয় পায়। তবে কখনো যদি ঐসমস্ত ধার্মিক নামের দম্ভধারী নিজেকে একজন মানুষ শিক্ষকের পা বন্দ করে মারেফাতের গুপ্ত বিদ্যার সংস্পর্শে আসে, তাহলেই কেবল নফছের ঘৃণিত রুচির দহন হতে মুক্তি পেতে পারে, অন্যথা নয়। এজন্য সময় থাকতেই তাকে মারেফতের গুপ্ত বিদ্যা সমন্ধে ওয়াকেফ-হাল হতে হবে। লেবাসী শরীয়তের মধ্যে কোন মারেফত নেই। মারেফত হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার সেই সত্ত্বা দেখা, যাকে কারও সঙ্গে তুলনা চলেনা। কারণ, যিনি আধ্যাত্মবাদকে আপনত্বে প্রতিফলিত করতে চান, তার নেই কোন লোভ, মোহ, কাম, ক্রোধ, মাৎসর্য, মদ। তার পরিচিতি তখন হয়, তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ্।
অতএব, আসুন আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নেই এমন ভাবে যেন সেই সুক্ষ ভেদ সমন্ধে অবহিত হতে পারি। যে স¦ভাব সৃষ্টিকে আশরাফ করে আমরা যেনো সে স্বভাবে স্বভাবিত হই। হিংসা কখনো মানুষকে সুপথ দেখাতে পারে নি। প্রেমময়তা মানুষকে ঐশ্বরিক পথ দেখায়। সে প্রেম নারী পুরুষের যৌন তারনা নয়। সে প্রেম সবার তরে পবিত্রতা বিকশিত করে। সেই প্রেম হাসিল হলেই মারেফত হাসিল হবে। আল্লাহ্তালা সন্ধানীদের মারেফত তথা গুপ্ত বিদ্যা ধারণের ক্ষমতা প্রদান করুন, ¯্রষ্টার নিকট এই বিনীত প্রার্থনা থাকলো মহান প্রভুর দরবারে। আমিন।