আপন ফাউন্ডেশন

নজরুল প্রদত্ত জীবন দেশনা – পর্ব ০১ (বাণীসমূহ)

Date:

Share post:

সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী

বাঙালী চেতনায় চির ভাস্বর এক প্রদীপ্ত অধ্যায়ের নাম কাজী নজরুল ইসলাম । অন্ধত্ব, খর্বত্ব, ক্লীবত্ব থেকে মুক্তির জন্য নজরুল দেশনা সর্বাধিক প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই আপন খবরের ধারাবাহিক আয়োজনে থাকছে “নজরুল প্রদত্ত জীবন দেশনা”

এ পর্যায়ে কাজী নজরুল ইসলাম এর ৫০ টি জীবনঘনিষ্ট বাণী সংকলিত হলো –

১. ভাঙো দাসত্বের নিগড়। এ বিশ্বে সবাই স্বাধীন। মুক্ত আকাশের এই মুক্ত মাঠে দাড়াইয়া কে কাহার অধীনতা স্বীকার করিবে?

২. অন্যকে কষ্ট দিয়া তাহার আহা-দিল নিতে নাই। বেদনাতুরের আন্তরিক প্রার্থনায় আল্লাহর আরশ টলিয়া যায়।

৩. বিবেকের ক্ষমতা অসীম। যাহারা পশুশক্তির ব্যাবহার করিয়া বাহিরে এতো দূর্বার দূর্জয়, অন্তরে তাহারা বিবেকের দংশনে তেমনি ক্ষত-বিক্ষত, অতি দীন।

৪. বিবেকের যে দংশন, তা নরক যন্ত্রনার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ানক।

৫. বিবেকই তো তোমার নেতা। তোমার কর্তব্যজ্ঞানই তো তোমার নেতা।

৬. তোমার যতটুকু শক্তি আছে প্রয়োগ করো। দেশের কাছে, খোদার কাছে অসঙ্কোচে দাড়াইবার পাথেয় সঞ্চয় করো। তোমার বিবেকের কাছে অগাধ শান্তি পাইবে।

৭. যে প্রদীপ তিলে তিলে পুড়ে বুকের স্নেহ-রসকে জ্বালিয়ে অপরকে দান করে আলো, সেই প্রদীপই জানে এই আত্মদানের-আপনাকে নিঃশেষে বিলিয়ে দেওয়ার কি অপার আনন্দ।

৮. অন্তরে যাহারা ঘৃণ্য নীচ আর ছোট হইয়া গিয়াছে, আত্মসম্মান-জ্ঞান যাহাদের এতো অসাড়-হিম হইয়া গিয়াছে, তাহাদিগকে জাগাইয়া তুলিতে চাই- এই ডায়ারের দেওয়া অপমানের মত বজ্র বেদন।

৯. সবারই অন্তরে একটা বিদ্রোহের ভাব আত্মসম্মানের স্থুল সংস্করণ রুপে নিদ্রিত থাকে, যেটা খোঁচা খাইয়া জর্জ্জরিত না হইলে মরণ-কামড় কামড়াইতে আসে না।

১০. আর্ট এর অর্থ সত্যের প্রকাশ। সত্য মাত্রেই সুন্দর, সত্য চিরমঙ্গলময়।

১১. আর্টকে সৃষ্টি, আনন্দ বা মানুষ এবং প্রকৃতি ইত্যাদি অনেক কিছু বলা যাইতে পারে। তবে সত্যের প্রকাশই হইতেছে ইহার অন্যতম উদ্দেশ্য।

১২. প্রাণে প্রাণে পরিচয় হইয়া যখন দুইট প্রাণ মানুষের গড়া সমস্ত বাজে বন্ধনের ভয়-ভীতি দূরে সরাইয়া সহজ সঙ্কোচে মিশিতে পারে, তখনই সে মিলন সত্যিকার, তাহাই চিরস্থায়ী, চিরন্তন।

১৩. আত্মাকে ঘৃণা করা আর পরমাত্মাকে ঘৃণা করা একই কথা।

১৪. এই আত্মার অপমানে যে সেই অনাদী অনন্ত মহা-আত্মারি অপমান করা হয়।

১৫. যাহাদের মনে পাপ, তাহারা বাহিরে যতই গদাই-লষ্করি চাল দেখাক্, অন্তরে তাহারা খ্যাঁকশেয়ালীর চেয়েও ভীরু।

১৬. মদকে মদ বলিয়া খাওয়ানো তত দোষের নয়, যত দোষ হয় মদকে দুধ বলিয়া খাওয়ানোতে।

১৭. ভন্ড লক্ষপতি অপেক্ষা দরিদ্র তপস্বী ঢের ভালো।

১৮. আমরা মানুষকে বিচার করিবো মনুষ্যত্বের দিক দিয়া।

১৯. সাপ লইয়া খেলা করিতে গেলে তাহাকে দস্তুরমতো সাপূড়ে হওয়া চাই। শুধু একটু বাঁশি বাজাইতে পারিলেই চলিবে না।

২০. ভাবের দাস হইও না। ভাবকে তোমার দাস করিয়া লও।  কর্মে শক্তি আনিবার জন্য ভাব সাধনা করো।

২১. মানুষকে কজ্বায় আনিবার জন্য তাহার সর্ব্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁয়া দিয়া তাহাকে মাতাইয়া তুলিতে না পারিলে তাহার দ্বারা কোন কাজ করানো যায় না।

২২. পরের সমস্ত ভালো-মন্দকে ভালো বলিয়া মানিয়া লওয়ায়, আত্মা, নিজের শক্তি ও জাতীয় সত্যকে নেহায়েৎ খর্ব্ব করা হয়।

২৩. নিজের শক্তি, স্বজাতির বিশেষত্ব হারানো মনুষ্যত্বের মস্ত অবমাননা।

২৪. স্বদেশের মাঝেই বিশ্বকে পাইতে হবে। সীমার মাঝেই অসীমের সুর বাজাইতে হবে।

২৫. স্বার্থের মায়া ত্যাগ করিয়া সত্যকে বড় করিয়া দেখিতে শিখিতে হইবে।

২৬. মিথ্যাকে সহ্য করার মতো কাপুরুষতা আর পাপ নাই।

২৭. মহান কোনো কাজে প্রিয়জনের দোষ দেখিলেও তাহা লুকাইলে চলিবে না।

২৮. অন্ধেরও একটা দৃষ্টি আছে। সে হচ্ছে অন্তদৃষ্টি বা অতীন্দ্রীয় দৃষ্টি।

২৯. লোকলজ্জা বা মুখচোরা জিনিসটাই আমাদিগকে এমন দূর্ব্বল করিয়া ফেলিয়াছে।

৩০. যে অপমান করে তার চেয়ে কাপুরুষ হীন সে-ই,  যে অপমান সয়।

৩১. যে মিথ্যুক তোমার পথে এসে দাড়ায়, পিষে দিয়ে যায় তাকে। দেখবে, তোমারই পতাকা-তলে বিশ্ব শির লোটাচ্ছে।

৩২. অভাব, বেদনা, আঘাত, মার, বিদ্রুপের চাবুক-জ্বালা, অনাদর, অপমান এই সপ্ত নরক হাঁ করে আছে গ্রাস করবার জন্য। এই জাহান্নামের মধ্যে বসে পুষ্পের হাঁসি হাসতে পারবে?

৩৩. অহঙ্কার একদিন চোখের জলে ডুববেই ডুববে।

৩৪. রাজ নিযুক্ত বিচারক সত্য বিচারক হতে পারে না।

৩৫. পড়ে পড়ে মার খাওয়ায় কোনো পৌরুষ নেই।

৩৬. বীণাই শোভা পায় যার হাতে, তাঁকেও লাঠি ঘুরাতে দেখলে দুঃখও হয়, হাসিও পায়।

৩৭. যার নিজের লোভ গেলো না, যিনি নিজে দিব্য সত্তা লাভ করেন  নি, তিনি কেমন করে লোভীকে তাড়াবেন? কোন্ শক্তিতে দৈত্য, দানব, অসুর সংহার করবেন?

৩৮.  ত্যাগ ও ভোগ- দুয়েরই প্রয়োজন আছে জীবনে। যে ভোগের স্বাদ পেল না, তার ত্যাগের সাধ জাগে না।

৩৯. বড় ত্যাগ তার জন্য, যিনি সকলকে বড় করবেন।

৪০. মানুষ পেট ভরে খেয়ে, গা ভরা বস্ত্র পেয়ে সন্তুষ্ট হয় না। সে চায় প্রেম, আনন্দ, গান, ফুলের গন্ধ, চাঁদের জোৎস্না।

৪১. যিনি শোকে সান্ত্বনা দিতে না পারেন, কলহ-বিদ্বেষ দূর করে সাম্য আনতে না পারেন, আত্মঘাতী লোভ থেকে জনগনকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে তিনি অগ্রনায়ক নন।

৪২. অতি প্রাচুর্য আমাদের বিলাসী, ভোগী করে শেষে অলস, কর্ম্মবিমুখ জাতিতে পরিণত করেছে।

৪৩. বাগানের গোলাপ তুলবো, তাই বলে বাগানের আগাছাও তুলে আনবো, তার কোনো মানে নেই।

৪৪. তুবড়িবাজি দেখে মুগ্ধ হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থেকো না। তোমার দুর্গম অমানিশার পথে ঐ আলো কেবল চোখে ধাঁধা লাগায়।

৪৫. পরের মাথায় কাঠাল ভেঙে খাওয়ার ব্যাবসাটা লোপ পাওয়া দরকার।

৪৬. প্রকৃতি আপনাদের মা’দের চেয়ে কম স্নেহময়ী নয়।

৪৭. অন্যের ঠিক প্রাণে গিয়ে আঘাত করার মতো শক্তি পাইতে নিজেরও ঠিক প্রাণ থাকা চাই।

৪৮. নব বসন্তের জন্য সারা শীতকাল অপেক্ষা করে থাকতে হয়।

৪৯. বনের পাখি নীড়ের উর্দ্ধে উঠে গান করে বলে, বন তাকে কোনোদিন অনুযোগ করে না।

৫০. যাহারা মানব জাতির কল্যাণ সাধন করেন সেবা দিয়া, কর্ম্ম দিয়া, তাঁহারা মহৎ; কিন্তু সেই মহৎ হইবার প্রেরণা যাহারা যোগান তাঁহারা মহৎ যদি নাই হন, অন্ততঃ ক্ষুদ্র নন। ইহারা থাকেন শক্তির পেছনে রুধির ধারার মতো গোপন, ফুলের মাঝে মাটির মমতা-রসের মতো অলক্ষ্যে।

ধন্যবাদ সবাইকে। আমাদের সাথেই থাকবেন। কাজী নজরুল ইসলাম এর আরো বাণীসমূহ আগামী তে প্রকাশ করা হবে।

সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles