ইসলামের ইতিহাস মূলত আলোক ও প্রেমের এক অনন্ত জার্নি। নবী মুহাম্মদ ﷺ থেকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনগণ এক চিরন্তন প্রেম ও আত্মশুদ্ধির পথে হেঁটেছেন। এই ধারার এক অনন্য ফল—সুফিবাদ। অন্যদিকে, ১৮শ শতকের পর কিছু আন্দোলন ইসলামের মূল ধ্যান-ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়ে এক খুঁটিনাটি, বাইরের রূপ ও শক্তির মাধ্যমে ইসলামের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছে—যার একটি ধারা হলো সালাফিবাদ। এই ব্লগে আমরা আলোচনা করবো এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য, সুফিবাদের বিশুদ্ধতা, আর সালাফিবাদের ঘৃণা ও বিভক্তির রাজনীতি।
সুফিবাদ কী?
সুফিবাদ মূলত তাসাওউফেরই একটি জনমুখী রূপ। এটি হলো আত্মার পরিশুদ্ধির পথ, যেখানে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রেম, দয়া, দানশীলতা ও আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য:
আল্লাহর প্রেমে আত্মা বিলীন হওয়া (ফানা)
কেবল বাহ্যিক নয়, অন্তর্গত ইবাদতের প্রতি জোর
পীর-মুরিদ সম্পর্কের মাধ্যমে আত্মশিক্ষা
হালাল সামা ও যিকরের মাধ্যমে আত্মজাগরণ
অহংকার ও দম্ভ থেকে মুক্তির পথ
প্রধান সুফি ব্যক্তিত্ব:
হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.)
হযরত বায়েজিদ বুস্তামি (রহ.)
হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)
মাওলানা রূমী (রহ.)
সুফিরা বলেন, “ইসলাম শুধু নামাজ-রোজা নয়, বরং আত্মার সাথে আল্লাহর অন্তর্গত সম্পর্ক গড়ে তোলা।”
সালাফিবাদ: কী এবং কেন বিতর্কিত?
সালাফিবাদ (বা ওহাবিবাদ) মূলত মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহহাব (১৭০৩–১৭৯২) এর প্রতিষ্ঠিত এক আন্দোলন, যেটি ইসলামকে একটি কঠোর, অনমনীয়, শুধুমাত্র কিতাবি দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে। তারা নিজেদের আহলুস্ সুন্নাহ বলে দাবি করলেও বাস্তবে তারা ইসলামের মূল সৌন্দর্য—সহনশীলতা, ভালোবাসা ও রহমতের চর্চা থেকে সরে গিয়েছে।
মূল বৈশিষ্ট্য:
যেকোনো ধরণের মাজার, তবরুক, ওলিদের প্রতি সম্মানকে “শিরক” আখ্যা দেওয়া
পীর-মুরিদ প্রথাকে বাতিল বলা
শুধুমাত্র কুরআন-হাদীসের বাহ্যিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর
দর্শন, তাফসীর, তাসাওউফকে বিদআত বলা
সমালোচ্য দিক:
মুসলিম সমাজে বিভাজন তৈরি করা
সুন্নি ঐতিহ্যবাহী মাযহাব (হানাফি, শাফিঈ) ও সূফি পন্থীদের কাফের/মুশরিক বলে অভিযুক্ত করা
শিয়া, ব্রেলভি, দেওবন্দি, এমনকি নিরপেক্ষ মুসলমানদের বিরুদ্ধেও ফতোয়া
সৌদি পেট্রোডলারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তাদের মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস
ইতিহাসের নিরিখে: কে সত্যিকার ধারক?
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) থেকে শুরু করে ইমাম নববী (রহ.), ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.), শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)—সবাইই তাসাওউফের সাধক ছিলেন। সালাফিরা এদের অনেককে গ্রহণ করলেও তাদের সুফিবাদী অবস্থান মানতে চায় না।
সুফিবাদ মানে কোনো নতুন ধর্ম নয়। এটি সেই রাসূল ﷺ–এর হৃদয়গ্রাহী আহ্বান—”দীন সহজ করো, কঠিন করো না।”
সালাফীদের অপ-দৌরাত্ম্য: এক নজরে
সালাফিবাদ শুধু মতবাদে সীমাবদ্ধ নয়, তারা একধরনের রাজনৈতিক ইসলামও প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র ও ধর্ম মিলে একরৈখিক ফতোয়া-বান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়।
বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড:
মাজার ও আউলিয়াদের কবর ধ্বংস (সৌদি আরবে জান্নাতুল বাকি ধ্বংস)
সিরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বহু দেশে সুফি মাজারে হামলা
তরুণদের জিহাদের নামে আত্মঘাতী মানসিকতায় উস্কানি
সমাজে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন সৃষ্টি
এরা “তাওহীদের রক্ষক” হওয়ার দাবিতে একধরনের আত্মম্ভরিতায় ভোগে, যেখানে অন্য কোনো দীনী রূপ সহ্য করা হয় না।
আজকের তরুণদের জন্য সুফিবাদ কেন জরুরি?
তরুণ প্রজন্ম:
উদ্বিগ্ন, একাকী, মানসিক অবসাদে ভোগে
অর্থে সুখ খুঁজে পায় না
ধর্মে তৃপ্তি চায়, কিন্তু ঘৃণা নয়
সুফিবাদ তাদের শেখায়:
ভালোবাসো, কেননা আল্লাহ প্রেমময়
আত্মাকে জানো, তাহলেই প্রভুকে জানবে
ধৈর্য ধরো, ভিন্নমতকেও শ্রদ্ধা করো
উপসংহার: এক পথ প্রেমের, অন্য পথ বিভেদের
সুফিবাদ হলো হৃদয়ের ধর্ম, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়। সালাফিবাদ একরকম ভয় ও চাপে গড়া ধর্মব্যাখ্যা, যেখানে হৃদয় নয়, কেবল মুখস্থ ও বাহ্যিকতা গুরুত্ব পায়।
আমরা কীভাবে এমন এক ধর্মে বিশ্বাস করতে পারি যেখানে ভালোবাসা হারিয়ে যায়? রাসূল ﷺ এর ইসলাম এমন ছিল না। তিনি ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামিন—সকল সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত।
সুফিবাদ সেই রাস্তার নাম, যেখানে হৃদয় খোলে, চোখ অশ্রুসজল হয়, আর আত্মা বলে উঠে:
“আমার আল্লাহ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”