লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
প্রমাণ-১ : হযরত মুত্তালিব (রাঃ) বর্ণনা করেন যখন উসমান ইবনে মাজউন (রাঃ) ইন্তেকাল করেন তখন তার লাশ বের করা হয় ও দাফন করা হয় । তখন নবী করিম (দঃ) জনৈক ব্যক্তিকে এক খন্ড পাথর আনতে বলেন কিন্তু সে ইহা বহন করতে অক্ষম হয় । তখন নবী করীম (সঃ) ইহা নিজে বহন করে আনতে অগ্রসর হন ও নিজের জামার আস্তিন গুটিয়ে ফেলেন, মহানবী (সঃ) পাথর বয়ে এনে উসমান ইবনে মাজউনের কবরের শিয়রে রাখেন। রাসুল (সঃ) বলেন এর দ্বারা আমি আমার ভায়ের মাজার চিহ্নিত করছি। (সুনানে আবু দাউদ ১ম জি মেশকাত শরীফ ১৪৯ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ৪ খন্ড ১৬৭ পৃ.)।
প্রমাণ-২ : হযরত জাফর ইবনে মুহাম্মদ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন নবী পাক (সঃ) এক কবরের উপর মুঠ করে তিন মুঠ মাটি দিয়েছিলেন । হুজুর (সঃ) এর পুত্র ইব্রাহীমের মাজারে পানি ছিটিয়েছেন এবং ঐ মাজারের উপর কাঁকর স্থাপন করেছেন । (শরহে মেশকাত ৪র্থ খন্ড ১৬৫ পৃ. মেশকাত ১৪৮ পৃ. শরহে সুন্নাহ হাঃ নং ১৫১৫) এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ হয় যে সম্মানিত ব্যক্তির মাজারের উপর কাঁকর বা পাথরের কংক্রিট ব্যবহার করা রাসুল (সঃ) এর সুন্নাত ।
প্রমাণ-৩ : হযরত বুরাইদা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সঃ) এর জন্য ‘কবরে লাহদ’ তৈরী করা হয়েছিল এবং তাঁকে কিবলার দিক হতে নামানো হয়েছিল । অতঃপর তাঁর রওয়ার উপর কাঁচা ইট স্থাপন করা হয়েছিল (মুসনাদে ইমামে আজম দালায়েলুন্নবুয়্যাত ৭ম খন্ড ১৯৬ পৃ.
প্রমাণ -৪ : হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই নবী করিম (সঃ) এর জন্য লাহদ কবর তৈরী করা হয়েছিল । অতঃপর তাঁর রওযা শরীফে ইট স্থাপন করা হয়েছিল । (মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৩ খন্ড ৩০৫ পৃ.)।
প্রমাণ- ৫ : হযরত আমের ইবনে সাদ ইবেন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) হতে বর্ণিত : মৃত্যু কালিন রোগ অবস্থায় বলেছিলেন আমার জন্য লাহদ কবর তৈরী করবেন এবং ইহাতে কাঁচা ইট খাড়া করে দিবেন যেভাবে রাসুল (সঃ) এর রওযায় দেওয়া হয়েছিল । (সহি মুসলিম ৯৬৬ মুসনাদে আহমদ ১৮৪/১, ইবনে মাজাহ্ ১৫৫৬, মেসকাত ১৪৮ পৃ. শরহে ফাতহুল কাদির ২য় খন্ড ১৪৪ পৃ. ও মেরকাত শরহে মেসকাত ৪র্থ খন্ড) এছাড়াও বুখারী শরীফ ১ম খন্ড ৭০ পৃষ্ঠা, মেশকাত শরীফ ১৪৯ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ৪র্থ খন্ড ১৬৯ পৃ. দ্রঃ । বর্ণিত হাদিস দলিল দ্বারা প্রমাণিত হলো । মহানবী (সঃ) আবু বকর (রাঃ) ওমর (রাঃ) এবং সাদ ইবনে আস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ রাসুল (সঃ) সহ তাদের মাজার পাকা করেছেন । সুতরাং হক্কানী অলি আউলিয়াগণের মাজার পাকা করা রাসুল (সঃ) ও সাহাবীদের সুন্নাত ।
গিলাফ চড়ানো ও ঘর তৈরী –
প্রমাণ-১ : হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন : মহানবী (সঃ) এর রওয়া শরীফের উপর একটি লাল চাঁদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। (সহি মুসলিম, মেশকাত শরীফ ১৪৮ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ও ৪র্থ খন্ড ১৫৩ পৃ. মুসনাদে আহমদ ৩৫৫/১ ও সুনানে নাসাঈ ২০১২)
প্রমাণ- ২ : হযরত আনিস সাবাই হতে সাঈদ ইবনে মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন ঃ নিশ্চয়ই নবী করিম (সঃ) সাইদ ইবনে মুয়াজ (রাঃ) এর কবরে নামলেন সাথে উছামা ইবনে জায়েদ (রাঃ) ও নামলেন এবং তাঁর কবর একটি কাপড় দ্বারা ঢেকে দিলেন । (মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৩ খন্ড ৩২৩ পৃ.)
প্রমাণ-৩ : অলি আউলিয়া ও বজুর্গানে দ্বীনের মাজারের উপর ইমারত তৈরী করা ও কাপড় দ্বারা গিলাফ দেওয়া জায়েজ । যদি মানুষের মনে শ্রেষ্ঠতম ধারণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয় । যাতে লোকেরা ঐ কবর বাসীকে নগন্য মনে না করে । (তাফছিরে রুহুল বয়ান ৩ খন্ড ১০ম পারা ৪৮২ পৃ.)
প্রমাণ- ৪ : আল্লামা শেখ আব্দুল হক দেহলভী (রাঃ) বলেন : শেষ জামানায় মানুষ বাহ্যিক বেশ বুষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে । তাই মাশাযেখ ও বুজুর্গানে দ্বীনের মাজারের উপর ইমারত তৈরী বিশেষ অভিপ্রায় জোড় দেওয়া হয়েছে। যেন মুসলমানদের আউলিয়া কেরামগণের উপর শ্রদ্ধাভক্তি প্রকাশ পায় । (শরহে শফরুস সাদৎ)
প্রমাণ- ৫ : আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) বলেন পুর্বসুরী আলিমগণ পীর মাশায়েখ ও উলামায়ে কেরামের মাজারের উপর ইমারত তৈরী করা জায়েজ বলেছেন । যাতে লোকেরা যেয়ারত করে সেখানে বসে আরাম পায় । ( মেরকাত শরহে মেশকাত ৪র্থ খন্ড ১৫৬ পৃ. জানাযা অধ্যায়)
প্রমাণ- ৬ : যদি মাইয়্যেত উলামা, মাশায়েখ বা সৈয়দ বংশের কেউ হয় তবে তাঁর কবরের উপর ইমারত (ঘর) তৈরী করা মাকরুহ নয় । (ফতোয়ায়ে শামী- ৩ খন্ড ১৪৪ পৃ.)
প্রমাণ-৭ : মশহুর কিতাব রুদ্দুল মোহতাবে রয়েছে যদি বর্তমান কালে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সম্মান বোধের প্রত্যাশা করা হয় যাতে কবর বাসীর উপর অবজ্ঞা করা না হয় বরং উদাসিন ব্যক্তির মনে আদব ও ভয় সৃষ্টি হয় । তাহলে মাজারে গিলাফ দেওয়া জায়েজ। কেননা সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল । (ফতোয়ায়ে শামী ৫ম খন্ড । কিতাবুল কেরাহিয়া)
প্রমাণ- ৮ : অলি আউলিয়া ও পুন্যাত্মাদের মাজারে ইমারত তৈরী করা । গিলাফ পাগড়ী ও চাঁদর চড়ানো জায়েজ । যদি এর দ্বারা সাধারণ লোকের দৃষ্টিতে তাদের প্রতি সম্মান প্রকাশ পায় এবং লোকেরা যেন তাঁকে নগন্য মনে না করে। (তাফছিরে রুহুল বয়ান ১০ পারা হাদিকায়ে নাদিয়া)
প্রমাণ-৯ : যখন হাসান ইবনে আলী (রাঃ) ইন্তেকাল করে ছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁর মাজারের উপর একটি তাবু খাটাইলেন এবং এক বৎসর রেখেছিলেন । (সহি বুখারী শরফি, মেশকাত শরীফ ১৫০ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ৩য় খন্ড ২০৫ পৃ.) প্রমাণ- ১০ : হযরত উমর (রাঃ) যয়নব বিনতে জাহাসের মাজারের উপর হযরত আয়েশা (রাঃ) স্বীয় ভাই আবদুর রহমান (রাঃ) এর মাজারের উপর, মুহাম্মদ ইবনে হানিফা (রাঃ) যিনি হযরত আলী (রাঃ) এর ছেলে ছিলেন তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর মাজারের উপর গম্বুজ তৈরী করেছিলেন। (শরহে মুয়াত্তয়ে মালেক) ।
প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন, পবিত্র কাবা ঘরে গিলাফ দেওয়া আছে শুধুকি কাবা ঘরের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ? আসলে তা নয়- মূলত: মানুষের মন ও বিবেক কে সতর্ক করার জন্য, যে এই পবিত্র কাবা ঘর বিশ্বের অন্য কোন মসজিদ বা ঘরের মত নয় । নিশ্চয় ইহা আল্লাহর ঘোষিত পুত পবিত্র ঘর । অনুরূপ কোরআন শরিফের উপর গিলাফ দেওয়া হয় । কেন দেওয়া হয় ? গিলাফ দিলেও কোরআন শরীফ না দিলেও কোরআন শরীফই থাকবে- তবে হ্যা, গিলাফ থাকলে মানুষের মন ও বিবেক সাবধান হয়ে যাবে যে ইহা পৃথিবীর অন্য কোন বই পুস্তক নহে” নিশ্চই মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআন শরীফ ।
বিবেক বলবে এই পবিত্র গ্রন্থ অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা যাবে না। অবহেলায় অবজ্ঞায় যেখানে সেখানে ফেলে রাখাও যাবে না, গুনাহ হবে । তাহলে বুঝা গেল গিলাফ থাকার কারনে, পবিত্র কাবা শরীফ ও কোরআন শরীফের প্রতি মানুষের সম্মান শ্রদ্ধা ভক্তি ও আদবের উন্মেষ ঘটে। উপরোল্লেখিত সহি দলিল দ্বারা অলি আউলিয়ার মাজার শরিফে গিলাফ চড়ানো জায়েজের মাধ্যমে ইহা ও প্রতীয়মান হল যে, জিয়ারতকারী যেন গিলাফ চড়ানো দেখে সতর্ক ও সাবধান হয়ে যায় । মাজার শরিফ কে যেন মৃত কবর বাসীর সাথে তুলনা না করে । কোন রূপ অবজ্ঞা, অবহেলা, অসম্মান ও বেয়াদবী প্রকাশ না পায় । কারন আল্লাহর ভাষায় তাঁরা জীবিত ও রবের নিকট হতে রিজিক প্রাপ্ত । (আল ইমরান ১৬৯ আয়াত)
অতএব মাজার পাকা করা, ইমারত ও গম্বুজ তৈরি এবং গিলাফ চড়ানো সুন্নাত। সুন্নতে সাহাবা দলিল দ্বারা প্রমানিত হলো । ইন্নামাল আমালু বেন নিয়াত- নিশ্চয় সমস্ত কাজের ফল নিয়ত অনুসারে হবে । (বুখারী ১ম খন্ড)
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী