সংকলক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
মিলাদ ও কিয়াম হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মিক মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ, যা যুগে যুগে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে নবী পাক (সা.) এর স্মৃতিকে জাগ্রত করে রেখেছে। মিলাদ অর্থ নবীর ﷺ জন্ম ও জীবনকে স্মরণ করে প্রশংসা করা, আর কিয়াম হলো দাঁড়িয়ে নবীর রুহানী আগমনকে সম্মান জানানো। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমার যিকির আমি উচ্চ করেছি” (সূরা ইনশিরাহ), আর নবীর জন্মকে আল্লাহ নিজে “রহমত” বলেছেন (সূরা ইউনুস ৫৮)। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির জন্মদিন স্মরণ করতেন, এবং বহু ইমাম ও ওলী আউলিয়া মিলাদ-কিয়ামকে নেক আমল হিসেবে গণ্য করেছেন। সুফি দর্শনে এটি আত্মার প্রেমময় জাগরণ, যেখানে প্রেমিক মুরিদ দাঁড়িয়ে প্রিয় নবীর ﷺ রুহানী সৌরভে মাথা নত করে।
বর্তমানে একশ্রেণীর বকধার্মিক গোষ্ঠী এমন পবিত্রতর আমল মিলাদ ও কিয়াম প্রসঙ্গে উদ্দ্যেশ্যমূলক ভাবে বিষোদ্গার করেই যাচ্ছে। তাদের অবগতির জন্য আমাদের আজকের আয়োজন।
কোরআনের আলোকে মিলাদ –
১. যখন আল্লাহ তায়ালা সমস্ত নবীদের কাছ থেকে ওয়াদা নিলেন যে আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করবো তারপর যখনই আমার রাসুল (সা.) তোমাদের নিকট আসবে তোমার তাঁর প্রতি ঈমান আনবে ও সাহায্য করবে। – আল ইমরান ৮১
২. নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য হতে একজন সম্মানিত রাসুল এসেছেন। – তওবা ১২৮
৩. হে নবী, আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্কতাকারী রূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও উজ্জল প্রদীপরূপে। – আহযাব ৪৫,৪৬
৪. আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের রহমত রূপে প্রেরণ করেছি। – আম্বিয়া ১০৭
৫. আমিতো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি। – সাবা ২৮
৬. নবী মোমিনদের নিকট তাঁদের জানের চেয়েও বেশি প্রিয়। – আহযাব ৬
৭. কেউ রাসুলের আনগত্য করল, সে যেন আল্লাহর ই আনগত্য করল। – নিসা ৮০
৮. আর আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। – কালাম ৪
৯. তিনি (নবী সা.) কখনোই মনগড়া কথা বলেন না, ইহা তো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। – নাজম ৩,৪
১০. যারা আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল, তারা আল্লাহর হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করল, নিশ্চয়ই আল্লাহর হাত আপনার হাতের ওপর রয়েছে। – ফাত্তাহ ১০
আরো আয়াত সমূহ –
১১. সুরা নিসা ৬৪, ৭৯, ৮০, ১০৫, ১৭০
১২. সুরা আরাফ ১৫৮
১৩. সুরা আহযাব ৪০, ৫৬
১৪. সুরা মুহাম্মাদ ২, ৩
১৫. সুরা ইউসুফ ৩
১৬. সুরা কাসাস ৮৬
১৭. সুরা ইবরাহিম ১
১৮. সুরা কিয়ামাহ ১৬, ১৭, ১৮, ১৯
১৯. সুরা আলা ৬, ৭
২০. সুরা আল ইমরান ১৬৪
২১. সুরা জুমুয়া ২
২২. সুরা নাহল ৪৪
২৩. সুরা মায়িদা ৬৭
২৪. সুরা ফুরকান ৫৬, ৫৭
২৫. সুরা মুনাফেকুন ৮
অন্যান্য নবীগণ আখেরী নবী (সা.) এর প্রতি মিলাল কিয়াম করেছেন, তার দলিল –
১. আদি পিতা আদম ও বিবি হাওয়া এর ওপর ৩৪০ বছর কান্নার পর আরাফার ময়দানে রাসুল (সা.) এর প্রতি সালাত সালাম সহ ঐ নামের উঠিলা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ায় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন।
২. প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে হযরত ইবরাহিম আ. আমাদের নবী করীম সা. এর মিলাদুন্নবী নিয়ে আলোচনা করেন।
৩. ঈসা নবী রাসুলে পাক সা. এর মিলাদুন্নবী নিয়ে আলোচনা করেন।
হাদীসে মিলাদ কিয়াম
১. রাসুলে পাক সা. বলেন, আমি ইবরাহিম আ. এর দোয়া, ঈসা আ. এর সুসংবাদ ও আমার মায়ের চাক্ষুস দরশন। তিনি আমাকে প্রসবকালীন সময় দেখেছিলেন। নিশ্চয়ই তার মধ্য হতে এমন একটি নূর প্রকাশিত হয়েছে যার দ্বারা শাম দেশের বড় বড় দালানগুলোও আলোকিত হয়েছে। তিরমিজি ২০৩, মেশকাত ৫১৩, মেরকাত শরহে মেশকাত ১০খন্ড ৪৩৯ পৃষ্ঠা।
২. আবু হুরায়রা বলেন, রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, সৃষ্টি জগতে আমিই প্রথম নবী, প্রেরিত হয়েছি সবার শেষে। মেরকাত শরহে মেশকাত ১০খন্ড ৪৩৯ পৃ., শিফা শরীফ ১ম জি. ২৬৬পৃ.
৩. ইবনে আব্বাস বলেন, রাসুলে পাক সা. এর মিলাদের কথা বা জন্ম বিবরণী তার ঘরে বসে বর্ণনা করছিলেন। এমন সময় রাসুলে পাক সা. সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল।
৪. আবু দারদা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি একদা রাসুলে পাক সা. এর সঙ্গে আমির আনছারী এর ঘরে প্রবেশ করলাম। সে সময় আমির আনছারী তার ঘরে তার সন্তান ও আত্মীয়দের একত্র করে রাসুলে পাক সা. এর মিলাদ তথা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করছিলেন। তা দেখে রাসুলে পাক সা. সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, হে আমির! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং সকল ফেরেশতা তোমাদের জন্য রহমত প্রার্থনা করছে।
কিয়াম বা দাঁড়ানো প্রসঙ্গে দলিল
কোরানে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, তাকে তাজিম করো ও সাহায্য করো। (ফাত্তাহ ৯)।
হাদীস ১ – সাইদ খুদরী হতে বর্ণিত, যখন বনু কুরাইজা হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ এর ফায়ছালার সম্মতি প্রকাশ করল তখন রাসুলে পাক সা. তাকে ডাকলেন আর সাদ রাসুলের গৃহের নিকট অবস্থান করছিল। তিনি একটি গাধার ওপর ছওয়ার হয়ে এসেছিলেন। যখন তিনি মসজিদের নিকট পৌঁছালেন তখন রাসুল আনসার সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের সর্দারের প্রতি দাঁড়াও। বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ।
হাদীস ২ – হাছান ইবনে ছাবিত বলেন, দয়াল নবীজির সম্মানে দাঁড়ানো আমার জন্য ফরজ। আর ফরজ তরককারী সঠিক পথের পথিক নয়।
হাদীস ৩ – হযরত আয়েশা বলেন, আচার আচরণ ও চাল চলনে এবং মহত্তম চরিত্রে ফাতেমা অপেক্ষা অন্য কাউকে রাসুলে পাক সা. এর অধিক নিকটবর্তী আমি কাউকে দেখিনি। ফাতেমা যখন নবীজির কাছে আসতেন, তখন নবীপাক দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে চুমু খেতেন। আবার যখন রাসুলে পাক সা. ফাতেমার কাছে যাইতেন তখন ফাতেমা দাড়িয়ে নবীজির হাতে চুমু খেতেন ও স্বীয় আসনে বসাতেন। তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মেশকাত ৪০২পৃ. মেরকাত ৮ম খন্ড ৫০৪পৃ.।
হাদীস ৪ – রাসুলে পাক সা. বলেন, আমি মেরাজের রাত্রে কাছিফে আহমের বা লাল বর্ণের উপাত্যকায় হয়রত মুসা আ. এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। এমতবস্থায় আমি তাকে দাড়িয়ে সালাত পাঠ করতে দেখলাম। মুসলিম ২৩৭৫, নাসাই ১৬৩৪। তাফসিরে রুহুল মায়ানী ১৫খন্ড ৪৩৫পৃ.।
ফকিহ, মুজতাহিদ ও মনীষীগণের অভিমত
১. জালালুদ্দিন শিউতী বলেন, রাসুলে পাক সা. এর মিলাদ উপলক্ষ্যে শুকরিয়া আদায় করা মুস্তাহাব। রুহুল বায়ান ৯ খন্ড ৬৪ পৃ., সিরাতে হালবিয়া ১ম খন্ড ১২৪ পৃ., আল হাদীলিল ফাতুয়া ১ম খন্ড ২৫৫ পৃ.।
২. তকীউদ্দিন ছুবুকীর দরবারে একদা রাসুলে পাক সা. এর শানে কাছিদা পাঠ করা হয় ঐ সময় ইমাম ছুবুকী মহব্বতের জোশে দাড়িয়ে গেলেন এবং সকলেই দাড়িয়ে গেলেন। রুহুল বায়ান ৯ খন্ড, সিরাতে হালবিয়া ১ম খন্ড ১২৩ পৃ.।
৩. ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, মিলাদ কিয়াম করা ও এর উদ্দেশ্যে লোক জমায়েত করা মুস্তাহছান বা অতিব উত্তম কাজ। মাওলুদুন কবীর।
৪. আব্দুল হক মুহাদ্দেছ দেহলভী এক মোনাজাতে বলেন, হে আল্লাহ মিলাদের অনুষ্ঠানে আমি নবী পাক সা. কে দাঁড়িয়ে সালাম দেই। সেই আমলের উছিলায় তুমি আমাকে কবুল কর। আখবারুল আখিয়ার ৬২৪ পৃ.।
৫. জাওযী ও ইমাম কুস্তলানী বলেন, মিলাদ শরীফের খুছুছিয়াত হল এর উছিলায় লোকেরা ঐ বছর পর্যন্ত নিরাপদ থাকবেন। ইনছানুল উযুন ১ম খন্ড ১২৪ পৃ., রুহুল বায়ান ৬৪ পৃ., মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া ১মখন্ড ১৪৮ পৃ.।
৬. কেরামত আলী জৌনপুরী বলেন, রাসুলে পাক সা. এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক মিলাদ কিয়াম করা হয়। তাই মিলাদ কিয়ামের প্রতি অসম্মান মূলত রাসুলে পাক সা. কেই অসম্মান করা। আল মুলাখখাছ।
৭. শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী বলেন, আমার পিতা প্রতি বছর ১২ রবিউল আউয়াল মিলাদ মাহফিল আয়োজন করে লোকেদের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য লোকেদের মধ্যে বিতরণ করতেন। হাকীকতে মুহাম্মদী ৩০১ পৃ.।
৮. এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মাক্কী বলেন, এ ফকিরের নিয়ম এই যে, আমি মিলাদে মুস্তফায় শরীক হই এবং বরকতের আশায় প্রতি বছর মিলাদের আয়োজন করি। আর কিয়ামে আত্মায় শান্তি পাই। ফায়ছালায়ে হাফতে মাছায়েল।
৯. আশরাফ আলী থানভী বলেন, মিলাদ মাহফিল মুস্তাহাব, আর মুস্তাহাব মাহফিল ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। (মাজালিছে হাকিমুল উম্মত ২৩১ পৃ.)
১০. শামছুল হক ফরিদপুরী বলেন, নবী সা. কে বসে বসে সালাম দেয়া বেয়াদবী। তাছাওফ তত্ত্ব ৪১,৪২ পৃ.।
সংকলক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী