সংকলক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
কদম শব্দের অর্থ পা । আর বুছি শব্দের অর্থ চুমু বা চুম্বন । সুতরাং কদম বুছির পূর্ণ অর্থ হলো পদ চুম্বন বা পায়ে চুমু দেওয়া । দলিলে উল্লেখিত পীর, ওস্তাদ, পিতামাতা, ন্যায় পরায়ন বাদশা, দ্বীনদার পরহেজগার সম্মানিত ব্যক্তিদের পায়ে চুমু দেওয়াকে শরীয়তের পরিভাষায় কদম বুছি বলা হয় । ইসলাম ধর্মে মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন, ন্যায়নীতি, আদব বা শিষ্টাচার এবং সুবিচার ভিত্তিক শান্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ গতিশীল সামাজিক পরিবেশ গঠন ও সংরক্ষণের যাবতীয় বিষয় নিহিত রয়েছে । তার মধ্যে আদব বা শিষ্টাচার ইসলাম তথা বিশ্ব মানবতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । মানব চরিত্রে আত্মহংকার, অহংবোধ, আমিত্ব ও অহমিকা দুরীকরণের উত্তম পন্থা হলো কদম বুছি । যুগ যুগ ধরে মানুষ আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের জন্য নবী রাসুল ওলী আল্লাহ ও পীর মুর্শিদের সান্নিধ্যে গিয়ে তাদের কদম বুছি করে থাকেন । মহান আল্লাহকে পাবার উছিলা হিসাবে আপন মুর্শীদের প্রতি আদব প্রদর্শন মুরীদের আমিত্ব খর্ব, পূর্ণ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ এবং তাঁর নেক দোয়া কামনা করার উপায় হিসাবে মুরীদ কর্তৃক পীর কেবলা কে কদম বুছি করা সম্পুর্ণ দলিল সম্মত । ইহা সালেক বা মুরীদের জন্য অত্যান্ত আধ্যাত্মিক উন্নত ও ফজিলতের আমল । পরম করুণাময় আল্লাহতে আত্মহুতি দেওয়া ও পরিপূর্ণ রূপে আত্মসমর্পনের হাকিকত ইহাতে বিদ্যমান । (মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী) ইসলাম ধর্মে আদব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় । রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের আদব শিক্ষা দিয়েছেন । ইসলামী আদর্শ আদব ও শিষ্ট চারিতা অতি চমৎকার যাহা সকলেরই প্রাপ্য অধিকার । স্নেহ মমতা, শ্রদ্ধা সম্মান, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের শিক্ষা ইসলামে দেওয়া হয়েছে । রাসুলে পাক (সঃ) এরশাদ করেন : যে বড়দের সম্মান করেনা এবং ছোটকে স্নেহ করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নয় । (তিরমিজী ও মেশকাত)
সম্মান প্রদর্শন বিভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে । যেমন ছালাম দেওয়া, বয়স্কদের পিছনে চলা, বিনয়ী ও নিম্ন স্বরে কথা বলা, গুরুজনদের আগমনে সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া, কাজ কর্মে সহযোগিতা করা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এগিয়ে দেওয়া এবং সাক্ষাতে হাত ও পায়ে চুম্বন করা । আদব ভদ্রতা সভ্যতা বিনয়ী নম্রতা, মানবতা, শ্রদ্ধা ভক্তি প্রেমপ্রীতি ভালবাসা স্নেহ মমতা ইত্যাদি মানব চরিত্রের উত্তম ভূষণ । যার অন্তর্নিহিত স্বরূপটি হলো ইসলাম তথা আল্লাহ প্রদত্ত শান্তি । যখন কোন পরিবারে সমাজে ও রাষ্ট্রে উক্ত গুণাবলী যথা রীতি প্রয়োগ হয়, তখন সেখানে আর অশান্তি অধর্ম বৈষম্য দ্বন্ধ কলহ বিচ্ছেদ কিছুই থাকে না । প্রীতি প্রেমের পুণ্য বাধনে মানব কুল যেন চীর শান্তি ধামে বসবাস করে । কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে এক শ্রেণীর লোকেরা কদমবুছি প্রসঙ্গে নানা রকম বিরূপধারনা (সৃষ্টি করছে) সমাজে সমালোচনা, মিথ্যা ফতোয়া ইহা ইসলাম বিরোধী, শিরক বিদয়াত ইত্যাদি বলে সরলমনা মানব মনে ভ্রান্ত ধারনা সৃষ্টি করছেন । ফলে কিছু সংখ্যক মানুষ তাদের ফতোয়ার খপ্পরে পড়ে ওলী আউলিয়া পীর মুর্শিদ পিতা মাতা কে কদম বুছি করা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর রহমত বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হযরত রাসুলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেন : আল্লাহর কছম আমার এমন বিষয়ের কোন ভয় নেই যে তোমরা আমার পরে শিরক করবে (বোখারী শরীফ, কিতাবুল জানাযা বাবঃ আসসালাতু আলা শহীদ, হাদিস নং ১২৭৯) প্রিয় পাঠক যেখানে হুজুর (সঃ) কছম করে বলেন যে তার উম্মত শিরক করবেনা সেখানে কিছু সংখ্যক লোক যেখানে সেখানে শিরকের ফতোয়া দিয়ে থাকেন তবে কি ? উনারা উক্ত হাদিস খানা পড়েন নাই ? অথচ উক্ত হাদিসে নবীদের উম্মত শিরক করবে না এ ব্যাপারে নবীজির কোন ভয় ও চিন্তা ও নেই । (ছোবহানাল্লাহ)
প্রমাণ হয়ে গেল দয়াল নবীজির যারা উম্মত তারা কখনও শিরক করে না । আর কদম বুছি কোন শিরক বা নাজায়েয আমল নয় বরং সুন্নতে সাহাবা, অতি উত্তম ছওয়াবের কাজ ইহাতে কোন রূপ সন্দেহের অবকাশ নাই।
কদম বুছির দলিল – হাদিস শরীফ
হাদীস-১ : হযরত ওয়াজি ইবনে আমের (রাঃ) বলেন আমরা যখন মদীনা শরীফে এসে পৌঁছলাম। বলা হলো ইনি আল্লাহর রাসুল আমরা তখন তাঁর হস্তদ্বয় ও পদদ্বয় ধরে চুমু খেলাম (আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, কিতাবুস সালাম । বাব তাকবীলির রিজাল, হাদিস নং ৯৭৫)
হাদীস-২ : হযরত যারেঈ (রাঃ) যিনি আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন আমরা যখন মদীনা শরীফে আগমন করলাম তখন আমাদের বাহন হতে তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর হাত মোবারক ও পা মোবারক চুম্বন করলাম । (আবু দাউদ শরীফ, কিতাবুল আদব) সালাম, বাব কুবলাতির রিজাল, এবং মিশকাত শরীফ কিতাবুল আদব বাবঃ মুসাফাওয়া মুয়ানাকা) গ্রন্থে বর্ণিত ২নং হাদিস শরীফটি নিম্নের কয়েকটি হাদিস গ্রন্থে রয়েছে –
যথাঃ
১ । তারীখুল কবীর ইমাম বুখারী ৪র্থ খন্ড ৪৪৭ পৃঃ হাদিস নং ১৪৯৩
২ । আল মুসান্নাফ ইমাম ইবনে আবি শায়রা । ৮/৫৬২ পৃ.
৩ । আবু দাউদ শরীফ কিতাবুল আদব । হাদিস নং ৫২২৫ ।
৪ । মুজামুল কবীর ইমাম তাবরাণী ৫/২৭৫ পৃ. হাদিস নং ৫৩১৩
৫ । আস সুনানে কুবরা, ইমাম বায়হাকী ৭/১০২ পৃ. হাঃ নং ১৩৩৬৫ ৬। মিশকাত শরীফ, খতিব তিরমিজী ৩/১৩২৮ পৃ. হাঃ নং ৪৬৮৮
৭ । শুয়াবুল ইমান, ইমাম বায়হাকী ১১/২৯৪ পৃ. হাঃ নং ৮৫৬০
৮ । তালখীসুল হবির ইবনে হাজর আসকালীন ৪/৯৩ পৃ. হাঃ নং ১৮৩০
৯। আশিয়াতুল লুমআত, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলবী ৩/৫০৮ পৃ. হা. নং ৪৬৮৮
আরও অনেক গ্রন্থে উক্ত হাদিস শরীফটি উল্লেখ রয়েছে ভেবে দেখুন এতগুলো হাদিস গ্রন্থে যে হাদিস খানা রয়েছে সে হাদিস কোন দিন ও জইফ হতে পারে না । অবশ্যই হাদিস খানা সহীহ ।
হাদীস- ৩ হযরত যাক ওয়ান বর্ণনা করেন হযরত সুয়াইব (রাঃ) বলেন আমি হযরত আলী (রাঃ) কে (স্বীয়চাচা) হযরত আব্বাস (রাঃ) এর হাত ও দুই পায়ে চুম্বুন করতে দেখেছি । (আল আদাবুল মুফরাদ । ইমাম বুখারী কিতাবুস সালাম বাবঃ তাকবীলির রিজাল হাদিস নং ৯৭৬ ও মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবুল আদব)
হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন সাহাবী এবং হযরত আব্বাস (রাঃ) ও ছিলেন সাহাবী কিন্তু হযরত আব্বাস (রাঃ) ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) এর চাচা । তাই মুরব্বী হিসাবে হযরত আলী (রাঃ) তাঁর হাত ও পায়ে চুমু খেয়েছেন । উক্ত হাদিস হতে ইহাই প্রমাণ হলো যে কদম বুছি শুধু রাসুলের জন্য খাস নয় মুরব্বী তথা বয়োজ্যেষ্ঠদের কদম বুছি করা বেলায়েতের সম্রাট মওলা আলী (রাঃ) এর আমল দ্বারা প্রমাণিত ।
হাদীস- ৪ : হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন, রাসুল (সঃ) একদিন রাগান্বিত অবস্থায় খুতবায় দাঁড়িয়ে বললেন আমাকে জিজ্ঞাসা কর, তোমরা যা যা প্রশ্ন করবে আমি সব কিছুই বলে দিব । অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে হুজাইফা দাঁড়ালেন এবং বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ আমার পিতাকে ? নবীজি বললেন তোমার পিতা অমুক অতঃপর সে তার পিতাকে ডাকলেন তখন হযরত উমর (রাঃ) ভয়ে প্রিয় নবীজির প্রতি দাঁড়ালেন এবং হুজুর (সঃ) এর কদম (পা) মোবারকে চুম্বন করলেন এবং বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ আমরা আল্লাহকে রব হিসাবে আপনাকে নবী হিসাবে ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং কোরআনকে ইমাম হিসাবে পেয়ে খুশি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন । আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের ক্ষমা করবেন । (তাফসীরে তাবারী শরীফ ৭ম খন্ড ৮৯নং পৃ. হাদিস নং ১২৮০১)
ইবনে কাসীর তার তাফসীরের মধ্যে সুরা মায়িদা ১০১ নং আয়াতের ব্যখ্যায়ও উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন । (তাফসীরে ইবনে কাসীর ২য় খন্ড ৬২৮ পৃ. জাকারিয়া বুক ডিপো দেওবন্দ, সাহারানপুর ভারত, এবং তাফসীরে দুররে মানসুর ৩য় খন্ড ২০৫ পৃ. বৈরত লেবানন)
হাদীস-৫ : হযরত মুয়াবিয়া ইবনে জাহিমা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ আমি যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা করেছি এখন আপনার নিকট পরামর্শ করতে এসেছি । নবীজি বললেন তোমার মা আছে কি ? সে বললো হ্যা তখন নবীজি বললেন তুমি তাঁর খেদমতে লেগে থাক । কেননা জান্নাত তাঁর দুপায়ের নিচে। (সুনানে নাসাই, কিতাবুল জিহাদ, বাবুর রূখসাতি ফীতাখাল্লাফি লিমান লাহু ওয়ালিদা) ।
হাদীস-৬ : একদিন এক লোক রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আসলেন এবং বললেন তিনি একটি মানত করেছিলেন যে আল্লাহ তায়ালা যদি আপনাকে মক্কা বিজয় দান করেন তবে তিনি কাবা শরীফ যাবেন এবং কাবার দরজা চুমু দিবেন । তখন হুজুর (সঃ) তাকে নির্দেশ দিলেন তুমি বাড়ী যাও এবং তোমার মায়ের পায়ে চুমু দাও । তাহলে তোমার মানত পুরন হয়ে যাবে । (উমদাতুলক্বারী শরহে বুখারী ২য় খন্ড) নীতু চট্যান্ডার
হাদীস-৭ : মেরাজের পূর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হানির ঘরে বিশ্রামে ছিলেন । এমন সময় জিব্রাইল (আঃ) আসলেন হুজুর (সঃ) এর সাথে যেন বেয়াদবী না হয় সেজন্য জিব্রাইল (আঃ) রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে ডাক দিলেন না তার দুই ঠোট হুজুর (সঃ) এর কদম মুবারকে লাগিয়ে দিলেন অর্থাৎ কদম বুছি করলেন । তখন রাসুলে পাক (সঃ) জিব্রাইল (আঃ) কে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন । জিব্রাইল (আঃ) তখন মেরাজে যাওয়ার সুসংবাদ দিলেন । (সূত্র মুসনাদে আউলিয়া)
কদম বুছির সমর্থনে অনেক হাদিস রয়েছে এ গ্রন্তে মাত্র কয়েকটি হাদিস তুলে ধরলাম । বিস্তারিত জানতে বিজ্ঞ লেখকদের কিতাব সমূহ পড়ার অনুরোধ রইল । আশা করি আসল সত্যটি জানতে পারবেন ।
ফকিহ্ মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিসগণের অভিমত –
অভিমত-ক বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফতহুল বারী শরহে বুখারী এর মধ্যে আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রাঃ) বলেন, হাদিস শরীফ দ্বারা হাত বুছি ও কদম বুছির বৈধতা ও অনুমোদন প্রমাণিত । তবে ইমাম মালেক ও ইমাম আবহারী এগুলোকে মাকরুহ বলেছেন যদি বড়ত্ব ও অহমিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যে হয় । কিন্তু যদি আল্লাহ তা’লার নৈকট্য বান বান্দা বা জ্ঞানগত সম্মান ও মর্যাদার কারণে হয় তাহলে উহা নিঃসন্দেহে জায়েজ । (ফতহুল বারী শরহে বুখারী ১১তম খন্ড ৫৭ পৃ.)
অভিমত- খ : বুখারী শরীফের মুকাদ্দামায় আল্লামা আহমদ আলী সাহারান পুরী (রঃ) বলেন, একদা ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) এর সাক্ষাত লাভে ধন্য হওয়ার জন্য আগমন করে ইমাম বুখারীর উভয় চোখের মাঝ খানে চুম্বন করলেন । অতঃপর তিনি ইমাম বুখারীকে সম্বোধন করে বললেন হে শিক্ষক কুল শিরোমনি মুহাদ্দিসগণের সম্রাট ও হাদিসে রাসুল (সঃ) এর কারণ সমূহ অনুসন্ধানে ডাক্তারের ভূমিকা পালনকারী সম্মানিত ও পবিত্র সত্তা । আমাকে একটু মেহেরবাণী করে আপনার পদ যুগল চুম্বন করে ধন্য হওয়ার সুযোগ দিন। (মুকাদ্দামাতু সহীহ বুখারী ৩ পৃ. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১১/৩৩)
অভিমত গ : মিশকাত শরীফের ব্যাখাকার আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, চুমু দেয়া মাকরুহ হবে না যখন তা কোন পরহেজগারিতা ইলম বা জ্ঞান ও বয়োজ্যেষ্ঠের কারণ হয় । ইমাম নববী (রহ) বলেন, কদম বুছি যদি ব্যক্তির জ্ঞানগত মর্যাদা খোদাভীরুতা ও ধার্মিকতা ইত্যাদি কারণে হয় তাহলে মাকরুহ তো হবেই না বরং মুস্তাহাব বা উত্তম আমল হিসাবে বিবেচিত হবে। (মিরকাত শরহে মিশকাত ৯ম খন্ড ৭৬ পৃ.)
অভিমত- ঘ : শায়খ মুহাদিস আবদুল হক দেহলভী (রহ) বলেন, পরহেজগার আলেমদের হাত চুম্বন জায়েজ এবং কেহ কেহ বলেন ইনসাফ ও দ্বীনের সম্মানার্থে চুমুদেয়াতে কোন দোষ নেই তবে দুনিয়াবী স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যে হলে তা অবশ্যই মাকরুহ ।
হাদিস শরীফে সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কদম বুছি বা কদম মুবারক চুম্বন করার একাধিক বর্ণনা এসেছে। সুতরাং গ্রহণ যোগ্য মত এটাই যে সফর থেকে ফিরে এসে সাক্ষাতের সময় মুয়ানাকা ও চুম্বন করা জায়েজ মাকরুহ নয় (আশি আতুল লুমআত শরহে মিশকাত ৪র্থ খন্ড ৩৩ পৃ. মোজাহিরুল হক্ক ৪র্থ খন্ড ৬০পৃ.)
অভিমত-ঙ : ইমাম নববী (রহ) বলেন কেউ যদি কারো পরহেজগারী ইলম যোগ্যতা ভদ্রতা, সত্যবাদিতা, পুণ্যশীলতা অনুরূপ দ্বীনি কার্যকলাপ দেখে হাত চুম্বন করে তা মাকরুহ নয় বরং মুস্তাহাব । পক্ষান্তরে কেউ যদি কারো জাঁকজমক ধনসম্পদ প্রভাব প্রতিপত্তি ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হাত পা চুম্বন করে তাহলে সেটা কঠোর মাকরুহ বরং হারাম । (মিশকাতুল মাসাবীহ এর কিতাবুল আদবের মুসাফা ও মুয়ানাকা পরিচ্ছেদের কদমবুছি বিষয়ক হাদিসের টিকা হাদিস নং ৪৪৮৩) উপরোক্ত দলিলের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে গেল যে, বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণের মতে ও কদম বুছি বা পদ চুম্বন জায়েজ ।
দেওবন্দী ওলামাগণের অভিমত
অভিমত-১ : মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর অভিমতঃ দ্বীনদার ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়ানো ও তাদের পায়ে চুমু খাওয়া বৈধ এবং তা হাদিসে রাসুল দ্বারা প্রমাণিত । (ফতুয়ায়ে রশীদিয়া ১/৫৪ পৃ.)
অভিমত-২ : মাওলানা আশরাফ আলী থানভির অভিমত-১ ঃ কদম বুছি (পদ চুম্বন) মূলতঃ একটি জায়েজ আমল । (এমদাদুল ফতোয়া, ৫ম খন্ড, ৩৪৫ পৃ)
অভিমত-৩ : থানভী সাহেবের অভিমত:২ : আলেম, পিতা-মাতা ইত্যাদির হাত ও পায়ে চুম্বন করা জায়েজ । (এমদাদুল আহকাম-১ম খন্ড পৃষ্ঠা-১৩৫)
অভিমত-৪ : থানভী সাহেবে অভিমত ৩ঃ থানভী সাহেব আত্তাকাশুফ গ্রন্থে একটি হাদিসের উদ্ধৃতি করে বলেন- এই হাদিসের জ্ঞাতব্য মূল কথা হলো পীরের প্রতি মুরিদগনের অভ্যাস হল স্বীয় পীরের হাত-পা ও কপালে চুম্বন করা, সুতরাং এতে কোন অসুবিধা নেই । তবে খেয়াল রাখতে হবে এ ক্ষেত্রে শরয়ী হুকুমের কোন ব্যত্যয় যাতে না ঘটে । (আত্তাকাশুফ ৪২৪ পৃষ্ঠা) ।
অভিমত-৫ : মুফতি মুহাম্মাদ শফি (পাকিস্তান) এর অভিমত ঃ মুফতি শফি সাহেব বলেন, হযরত মায়খ মুহাম্মদ আবেদ সিনদী বলেছেন, তাকওয়াবান আলেম, ন্যায় পরায়ন বাদশা, ধর্মীয় দৃষ্টিতে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী শুধুমাত্র এমন লোকদের হাত ও পা চুম্বন করা জায়েজ । (জাওহিরুল ফিকহ্ ৮ম খন্ড, ১৮৫ পৃঃ)
অভিমত-৬ : রশীদ আহমদ গাঙ্গুরীর উস্তাদ আহমদ সাঈদ দেওবন্দীর অভিমত: মিলাদ শরিফ পাঠ করা এবং হুজুর (সঃ) এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা কালে কিয়াম বা দাঁড়িয়ে যাওয়া জায়েজ । এমনকি দ্বীনদার লোকের সম্মানের জন্য দাঁড়ানো জায়েজ । এরূপ লোকের পদ চুম্বন করাও জায়েজ । ইহা হাদিস দ্বারা স্যাব্যস্ত। (সূত্র : মাকামাতে সাঈদীয়াহ্)
অভিমত-৭ : মাওলানা মহিউদ্দিন খান দেওবন্দীর অভিমত বাংলাদেশে প্রচলিত একটি ইসলামী পত্রিকা ‘মাসিক মদীনা’ যার সম্পাদক হলো মাওলানা মহিউদ্দিন খান- তিনি কদম বুছি সম্পর্কে উল্লেখ করেন “হযরত আবদুল্লা ইবনে যোবাইর (রাঃ) যখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রওনা হন, তখন তার মা হযরত আছমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) এর নিকট বিদায় নিতে গিয়ে হযরত অবদুল্লাহ ইবনে যোবাইর (রাঃ) উপুর হয়ে হাত ও পা চুমুতে সিক্ত করে দিতে লাগলেন । ( সুত্র: মাসিক মদীনা- মার্চ ২০০৩ সংখ্যা, ৪৩পৃঃ) ভারত বর্ষের (কওমী) দেওবন্দীর শ্রেষ্ঠ আলেমদের অভিমত হতে কদম বুছি বা পদ চুম্বন জায়েজ প্রমাণিত হলো । আহলে বাইত অনুসারী বিশ্বের সকল হক্কানী, রব্বানী, অলী আউলিয়া কেরামগণের দরবারে কদম বুছির প্রচলন ছিল এবং অদ্যাবধী আছে। বিধায় এই সুন্নাতে সাহাবার আমলটি কখনই শিরক হতে পারে না । উপরন্ত প্রতীয়মান হলো কদম বুছি বা পদচুম্বন উত্তম আমল ।
“সুরমাহ কুনদর চশমে খাকে আওলিয়া
তাববীনী যেবতে দাতা ইস্তিহা”
অর্থাৎ : আউলিয়া কেরামের পায়ের ধুলিকে চোখের সুরমা বানাও ফলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তোমার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হবে । (মাওঃ জালাল উদ্দিন রূমী)
মানব দেহে পা এমন একটি অঙ্গ যা কাবার দিকে পীর উস্তাদের বাড়ীর দিকে, পিতা-মাতার দিকে এবং জন সমক্ষে লম্বা করে দিয়ে বসা ও শোয়া নিষেধ । ইহা করলে বেয়াদবী ও গুনাহ হয় । কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এই পায়ের মর্যদাও মূল্য অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়েছে ।
যেমন :
(এক) নামাজ আদায়ের মধ্যে রুকু দিয়ে দুপায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলীতে তাঁকিয়ে “ছোবহানা রাব্বিয়াল আজীম” (বিজোড় সংখ্যায়) বলতে হয় । অন্য কোন সময় অন্য কোথাও তাকিয়ে এরূপ বলার হুকুম নাই । শুধুমাত্র নামাজের রুকুর মধ্যে বলতে হয় । যার অর্থ : মহান প্রভু অতিপবিত্র বিচার্য: রুকুতে গিয়ে পায়ের আঙ্গুলী দেখে বেজোড় সংখ্যায় মহান আল্লাহর প্রশংসা করার ভেদ কী? রহস্য উৎঘাটন হলে পায়ের মর্যাদা ও কদম বুছি করার বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যাবে ।
(দুই) প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সঃ) বিশ্ব মানবজাতিকে জানিয়ে দিলেন জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে যে মায়ের পদচুম্বন করলো সে যেন জান্নাতের চৌকাঠে চুমু দিল । এ অমীয় বাণী দ্বারা পায়ের মূল্য ও মর্যদা বৃদ্ধি করা হয়েছে । (আল জান্নাতুল তাহতা আকদামিল উম্মুহাত)
(তিন) একজন চাকর তাঁর মুনিবের সাথে বেয়াদবী বা কোন অপরাধ জনিত কাজ করে ফেললো । অথবা যে কোন ব্যক্তি অপর কারোর সাথে অন্যায় বা অপরাধ কাজ করিল যার ফলে অপরাধীর উপর ভীষন রাগান্বিত হয়ে প্রতিশোধ ও শাস্তি দেওয়ার ক্রোধানলে কঠোর হৃদয় তৈরী হলো । এমতাবস্থায় অপরাধী ব্যক্তি যদি প্রতি পক্ষের মাথায় আর বুকে পীঠে হাত দিয়ে অপরাধ ক্ষমা চায় তাহলে ক্ষমা তো করবেইনা বরং রাগ গোস্বা আরও দ্বিগুণ হবে, কিন্তু যখন দুপা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইবে তখন সাথে সাথে কঠোর হৃদয় নরম হবে । রাগ গোস্বা প্রশমিত হবে এবং তৎসঙ্গে অপরাধীর প্রতি দয়া, ক্ষমা ও মায়া মমতায় হৃদয় ভরে যাবে, শত অপরাধ করলেও সে ক্ষমা পাবে । সুতরাং ভেবে দেখুন এক্ষেত্রে ও পায়ের মর্যদা নিহিত আছে। আমার এক জন উস্তাদ বলেছিলেন ‘বাবা’ পাও ধরলেই তো পা ও না ধরলে না পাও । অতএব পায়ে হাত দিলেই মানুষের দিলে রহম পয়দা হয় । ইহা অতীব ভাবিবার বিষয় ।
(চার) পিতা-মাতা উস্তাদ, পীর মুর্শিদ কে যখন আদবের সহিত কদম বুছি করা হয় তখন উনারা উদার মনে আল্লাহপাকের দরবারে নেক দোয়া আশির্বাদ করেন। ফলে সন্তান, মুরিদ, আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও মুহাব্বত হাসিল করেন । এই নিয়ামত কদম বুছি বা পদ চুম্বন এর মাধ্যমেই প্রাপ্ত হয় । সুতরাং এখানেও পায়ের মূল্য ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেল ।
প্রিয় পাঠক সমাজঃ গ্রন্থের কলেবর না বাড়িয়ে আসুন আমরা মহান প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করি, হে মহান রাব্বুল আলামিন যে পথে আপনার নিয়ামত প্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে কেরাম, হক্কানী, রব্বানী বুজর্গানেদ্বীনেরা চলেছেন তাঁদের তরীকা মতে আমাদেরকে পরিচালিত করুন সহি আমলে জিন্দেগী নছিব করুন ।
ছুম্মা আমিন ॥
“আজ খোদা জুয়েম তাওফিকে আদব
বেয়াদব মারুম নাদান আজ ফজলে রব”
সংকলক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী