লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
গণিত শাস্ত্রের এমন কিছু সংখ্যা আছে যা সাধারন অর্থে ব্যবহৃত হয় । আবার এমন কিছু কিছু সংখ্যা যেমন- ৩, ৫,৭,৯,১২,১৯,২৪,ও ৪০ ইত্যাদি সংখ্যাগুলি অত্যাধিক তাৎপর্যপূর্ন ও ব্যাখ্যা যুক্ত । অনুরূপ ৫,৭,৯,১২ ও ৪০ সংখ্যা গুলো কোন পার্থিব সংখ্যা নয় । এগুলো শাশ্বত চিরন্তন সংখ্যা যা দ্বারা সৃষ্টির উদয়, বিলয়, ভাঙ্গা,গড়া হচ্ছে। এ অধ্যায়ে শুধু চল্লিশ সংখ্যাটি নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা পাঠক সমাজে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।
নবী রাসুলদের শানে চল্লিশ সংখ্যা ব্যাবহারের দলিল –
(১) হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আ) বেহেস্ত হতে জমিনে পতিত হয়ে ৩৪০ বছর গুনাহ মাফ চেয়ে কেঁদেছিলেন ।
(২) হযরত নুহ (আঃ) এর সময় গজবী তুফান হয়ে ছিল ৪০ দিন এবং পৃথিবী হতে চল্লিশ জোড়া প্রাণী কিস্তিতে তুলেছিলেন ।
(৩) হযরত ইবরাহীম (আঃ) নমরূদের অগ্নিকুন্ডে ছিলেন ৪০দিন ।
(৪) হযরত মুসা (আঃ) উপর ৪০দিনে তৌরত শরিফ অবতীর্ন হয় ।
(৫) হযরত ইউনুছ (আঃ) মাছের পেটে ছিলেন ৪০দিন ।
(৬) হযরত ইউসুফ (আঃ) কুয়াতে পড়ে ছিলেন ৪০দিন ।
(৭) হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তাঁর পিতা মাতা ও ভ্রাতাগন তাকে সিজদা করেছিলেন, তাদের এক সিজদার মধ্যে ৪০দিন অতিবাহিত হয়েছিল।
(৮) হযরত ঈসা (আঃ) মাত্র ৪০দিন বয়সে কথা বলা শুরু করেছেন ।
(৯) মহানবী (সঃ) ৪০বছর বয়সে আল্লাহর পক্ষ হতে অহী প্রাপ্ত হন । (সুরা আলাক- ৫আয়াত) ।
(১০) প্রথম অহী নাজিলের ৪০ দিন পর দ্বিতীয় বারের অহী নাযিল করেন । সুরা- মুদাচ্ছিরের কিছু অংশ ।
ইসলাম ধর্মে চল্লিশ সংখ্যার ব্যবহার –
(১) শরয়ী বিধান মতে চল্লিশ টাকার এক টাকা যাকাত আদায় করা মুসলমানদের জন্য ফরজ ।
(২) তাসাউফ পন্থীদের মতে সৃষ্টিতত্ত্বে চল্লিশ উপাদানে মানব সৃষ্টি এ চল্লিশের একভাগ যাকাত দিতে হবে ।
(৩) মহানবী (সঃ) বর্ণনা করেন, মৃত ব্যক্তির মরদেহ কবরস্ত করে মানুষ যখন বিদায় নেয় মাত্র চল্লিশ কদম যেতেই ঐ কবরে মনকির, নকীর নামক দুই ফেরেস্তা প্রবেশ করে এবং কবরস্ত ব্যক্তিকে জীবিত করে ছওয়াল জওয়াব শুর করবে ।
(৪) হুজুর (সঃ) বলেন, মেহমান কে বিদায় দিতে কমপক্ষে চল্লিশ কদম এগিয়ে দেওয়া সুন্নাত ।
(৫) পবিত্র হজ যাত্রীদের মক্কা শরীফ হতে মদীনায় পৌছায়ে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় পর্যন্ত অবস্থান করবার হুকুম দেয়া হয়েছে।
(৬) রাসুলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেন, কোনো জামাতে (মজলিশে) যদি চল্লিশ জন লোক থাকে তাদের মধ্যে একজনকে অলি বানিয়ে তাঁর উছিলায় অন্য সকলের প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় ।
(৭) আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রঃ) বলেন কোনো মহল্লা বা গ্রাম দিয়ে যদি একজন নায়েবে রাসুল (অলি আল্লাহ) হেঁটে যায় তাঁর ইজ্জতে ৪০ দিন আল্লাহ তা’য়ালা ঐ মহল্লা বা গ্রাম বাসীর সকল প্রকার বালা মুসিবত বিপদ অপোদ থেকে মুক্ত রাখেন এবং কবর বাসীর কবর আজাবও মাফ করেন । চল্লিশ দিন পর্যন্ত। ছোবহানাল্লাহ্ = (মিশকাত শরহে মেরকাত)
(৮) মানুষের ইন্তেকালের পর রুহ বা আত্মা চল্লিশ দিন পর্যন্ত পরিবার পরিজন তথা আপনজনদের নিকটেই থাকে অতঃপর আমল অনুযায়ী ইল্লিন ও ছিজ্জিনে গমন করে, যার কারণে ওলামায়েকেরামগণ চল্লিশ দিনে মৃত ব্যক্তির রুহের মাগফেরাতের উদ্দেশ্যে বিশেষ মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার ব্যবস্থা করার প্রতি তাকিদ দিয়েছেন । অনেকে জরুরত ও বলেছেন এই চল্লিশ দিনের মিলাদ মাহফিলকেই“ চেহলাম” বলা হয় ।
(৯) রাসুলুল্লাহ (সঃ) এবং অলি আউলিয়াগণ খোদা প্রাপ্তির জন্যে বিশেষ নিয়মে নির্জনে চল্লিশ দিন ধ্যান মগ্ন মোরাকেবা মোশাহেদা ও বিশেষ ইবাদত বন্দেগী করে আল্লাহ তা’য়ালার সন্তষ্টি অর্জন করেছেন ইহাকে “চেল্লা” বা চেল্লাকুসী বলা হয় । আরোও অনেক ক্ষেত্রেই চল্লিশ সংখ্যাটির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং প্রতীয়মান হলো যে এই চল্লিশ সংখ্যাটি মহান আল্লাহ ও তাঁর হাবিব রাসুলে করিম (সঃ) অধিক যায়গায় বহুলাংশে ব্যবহার করেছেন । সেহেতু এই চল্লিশ সংখ্যাটি অবশ্যই ভাবিবার বিষয় ।
তাসাউফ ও সৃষ্টিতত্ত্বে চল্লিশ সংখ্যা ব্যবহার –
(১) সুরা মোমেনুন এর ১৪নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে মানব শিশুমাতৃ রেহেমে ৪০ সাপ্তাহ্ বা ৭টি ৪০ (৭x৪০) = ২৮০ দিন অবস্থানের পর জগতে ভুমিষ্ঠ হয় । প্রতি ৪০ দিন পর একটি করিয়া স্তর বা ধাপ অতিক্রম করে দেহ গঠিত হয়েছে ।
(২) চেহেলতন, চল্লিশ অস্থিত্ব বা উপাদানে মানবদেহ গঠনে পুর্নতা লাভ করে এমন কি বিশ্ব জগত ও একই ভাবে প্রকাশিত হয় । মৌলিক অস্থিত্ব নিম্ন রূপ ঃ জাত = ৫ পাঁচ জাতের গুণ ৫ = (৫x৫ = ২৫+৫=৩০) সেফাত = ৭ ও জামাত = ৩ তাহলে সর্বমোট (৩০+৭+৩=৪০) সুতরাং ওয়াজেবুল হইতে এমকান প্রাপ্ত তথা নিত্যধাম হতে লীলা ধামে রূপাকৃতিতে চল্লিশ অস্তিত্ব দ্বারা প্রকাশ হয় । (মোরশেদ কর্তৃক শিক্ষনীয়)
(৩) চিশতীয়া নিজামীয়া তরীকায় উপযুক্ত মুরীদকে চেহেলতন তথা আধ্যাত্মিক পুর্ণ চল্লিশের তালিম প্রদান করা হয় ।
(৪) ঝিটকা শরীফের সুফী সম্রাট দেওয়ান শাহ্ আব্দুর রশীদ আল চিশতী নিজামী (রহঃ) স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ হতে ৪০টি বর্ণ, অক্ষর বা হরফ দ্বারা ‘চেহেলতন দেওয়ান’ নামক একখানা বিখ্যাত অনন্য তাসাউফের কিতাব রচনা করেছেন । উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে চল্লিশ হরফে লেখা দেওয়ান আমার হরফে হরফে ব্যাখ্যা তৌহিদ ও আল্লার
(৫) অনুরূপ জেন্দা অলি আহম্মদ কাউছার আলী চিশ্তী ওরফে জেন্দাশাহ (রহঃ) নেয়ামতে খোদা নামক কিতাব খানা চল্লিশ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত করেছেন । ছোবহানাল্লাহ্
প্রিয় পাঠক সমাজ – উপরোক্ত চল্লিশ সংখ্যাটির দলিল ও আলোচনা দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম এই ৪০ সংখ্যাটি সাধারণ কোনো পার্থিব সংখ্যাই শুধু নয় । ইহাতে নিগুঢ় ভেদ রহস্য তত্ত্ব ও তথ্য রহিয়াছে । বেলায়েত প্রাপ্ত কামেল মোরশেদের খেদমত করে তালিম ও তাসাউফ প্রাপ্ত হলে এই চল্লিশের ভেদতত্ত্ব অনুধাবন করা সম্ভব । কারণ সংখ্যাটি হলো শাশ্বত, চিরন্তন, যা দ্বারা সৃষ্টির অরুজ নজুল, উদয় বিলয় ভাঙা গড়া চলছে।
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী