লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
বিদআত আরবী শব্দ । ইহা বাদিউন ধাতু হতে উদগত । এর অর্থ নতুনত্ব । নববিধান, নতুন উদ্ভাবন, আমদানী ও নতুন আবিস্কার । ইসলামী পরিভাষায় যা নবীজির যুগে ছিলনা, পরবর্তীতে হয়েছে তাকেই বিদয়াত বলা হয় । বিদয়াতের দুইটি দিক রয়েছে একটি বাহ্যিক বা জাগতিক অপরটি তাত্ত্বিক তথা স্রষ্টার সৃষ্টি বিকাশের চিরন্তন বিধান । বাহ্যিক বিদআত প্রসঙ্গে কিছু আলোচনার প্রয়োজন মনে করছি এই জন্যে যে, মসুলিম সমাজে বিদআত শব্দটির বহুল ব্যবহার চলছে । জনসাধারণ সঠিক অর্থ না জানার কারণে বিদআত কথাটি শোনা মাত্রই চমকে উঠে, মনে ভাবে বিদআত তুল্য আর পাপনাই ।
মুসলমানদের ভ্রান্ত ধারণা অপসারণে যুগ শ্রেষ্ঠ হক্কানী রব্বানী, ফকীহ, মোজতাহিদগণ বিদআতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন যথা- (এক) বিদআতে হাসানা, তথা উত্তম ও মঙ্গল ময় বিদআত (দুই) বিদয়াতে সাইয়্যেয়া । তথা মন্দ ও পথ ভ্রষ্টতা মূলক বিদআত । আল্লাহর কিতাবে দ্বীনুল কাইয়্যেমায় যত উদ্ভাবন বা আবিস্কার তা সবই বিদআতে হাসানা বা উত্তম বিদআত । সত্য দ্রষ্টা নবী রাসুলগণের শিক্ষার বাইরে দুনিয়া গ্রস্তদের নফস মুখী সকল অবিস্কার তথা আল্লাহর বিধান ও মহানবী (সঃ) এর জীবনাদর্শের বাইরে ব্যক্তি মতই বিদয়াতে সাইয়্যেয়া বা মন্দ ও ভুল উদ্ভাবন ।
আল্লামা ইবনে হাজর আসকালীন (রঃ) বলেন, বিদআত দুই প্রকার । যদি তা শরীয়তে উত্তম আবিষ্কারের মধ্যে পরে তবে ইহা হবে বিদয়াতে হাসানা । আর যদি ইহা অপছন্দনীয় আবিষ্কারের মধ্যে পরে তা হবে বিদয়াতে সাইয়্যেয়া । (ফতহুল বারী শরহে বুখারী ১৩/২৫৩ পৃ. উমদাতুলক্বারী শরহে বুখারী ১১/১২৬ পৃঃ)
বিদয়াতে হাসানা বলা হয় এমন সব কাজকে যার ভিত্তি বা ধ্যান ধারণা কোরআন হাদিস ইজমা ও কিয়াস বিরোধী নয় । বিদয়াতে হাসানা আমল করা জায়েজ এবং ইহা অনেক সময় মুস্তাহাব পর্যায়ে পড়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) বলেন, বিদয়াতে হাসানা বরং সুন্নতে মুস্তাহাসান । যেমনটি হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন যে, মুসলমানরা যা ভাল মনে করেন তা আল্লাহ তায়ালার কাছেও ভাল । (মিরকাত ১৩৮৫ নং হাদিসের ব্যাখ্যা) আল্লাহ বলেন : যে একটি ভাল কাজ করবে সে তার দশগুণ পাবে । (সুরা আনফাল ১৬০ নং আয়াত)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইসলামে কোন ভালো রীতি পদ্ধতি চালু করবে পরবর্তীতে তার উপর আমল করা হলে যারা তার উপর আমল করবে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব তাকেও দেয়া হবে । (মুসলিম শরীফ, কিতাবুয যাকাত, হাদিস নং ১০১৭)
উক্ত কোরআন হাদিস হতে বুঝা গেল নতুন আবিস্কার হওয়া সব জিনিসই খারাপ ও বাতিল নয় । অনেক উত্তম ও ভাল জিনিসও রয়েছে ।
“কুলু বিদয়াতিন দালালাতুন” অর্থাৎ প্রত্যেক বিদয়াতই গোমরাহী বা পথ ভ্রষ্টতা । (মুসলিম শরীফ)। উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় হযরত মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন : যে নব উদ্ভাবিত কাজ কোরআন হাদিস, আসার সাহাবীদের আমল বা কওল অথবা ইজমার বিরুদ্ধে বলে প্রমানিত তাই দালালা বা গুমরাহী । আর যে নব উদ্ভাবন উল্লেখিত কোনটির বিপরীত বা বিরুদ্ধ নয় তা মন্দ বা নাজায়েজ নয় । (মিরকাত শারহে মিসকাত ১ম খন্ড, ১৮৯পৃঃ)।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে বিদয়াতে সাইয়্যেয়া বা নিকৃষ্টতম নব উদ্ভাবনই হলো দালালা বা পথভ্রষ্টতা । আর বিদয়াতে হাসানা বা উত্তম নব আবিস্কৃত কাজ কখনও পথভ্রষ্টতা নয় বরং উত্তম । মুসলীম শরীফের একখানা হাদিস দ্বারা সকল নব আবিস্কার কে গবেষনা বিচার বিবেচনা না করে যারা হারাম শিরক, ফতুয়া দিচ্ছেন-তারা নিজেদের জীবন পরিচালনার রকমারী উপাদানের দিকে তাঁকায়ে দেখেন তো । বিদয়াত সমুদ্রে নিমজ্জিত কী-না? নানা রকম খাদ্য সামগ্রী ব্যবহৃত আসবাবপত্র, পোষাক পরিচ্ছেদ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, শিক্ষা সংস্কৃতি সব কিছু মিলায়ে দেখেন বিদয়াতের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন কী-না? যদি সকল নব আবিস্কারই পথভ্রষ্টতা হয় তাহলে বলতেই হয়, পবিত্র কোরআন শরীফ এর পঠন পদ্ধতি হেজাজের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর আবিস্কার ।
বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ যেমন তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে ইবনে কাসীর, কবীর, দুররে মানছুর, বাইজাভী, রহুল বয়ান, তাফসীরে জালালাইন সহ আরও অনেক । অনুরূপ হাদিস গ্রন্থ বুখারী, মুসলীম, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, নাসাই, মিশকাত এবং বিভিন্ন ফতোয়ার কিতাব সমূহ- নাহু, সরফ, বালাগাত, উর্দু, ফার্সি কিতাব ইত্যাদি রাসুলের যমানায় ছিল না । কোরআন হাদিসে এ নাম করণের ব্যাপারে কোন প্রমাণ ও নাই তাহলে উক্ত গ্রন্থ সমূহ প্রণয়ন ও অধ্যায়ন কি খারাপ ? বা গোমরাহীর কাজ ? কি ফতুয়া দিবেন ? সামচুল উলুম, আরশাফুল উলুম, ইমদাদুল উলুম, নিজামুল উলুম, কাসিমুল উলুম, কওমী, আলীয়া, হেফজখানা, দাওরায়ে হাদিস, লিল্লাহ বোর্ডিং এরূপ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসা নবীজির যুগে ছিল না! সবই নব আবিস্কার ।
মসজিদের কারুকার্য, মাইক, সাউন্ড বক্স, লাইট, ফ্যান, এসি, মসজিদের ভিতরে দাঁড়ায়ে মাইকে আযান, সাউন্ড বক্সে বয়ান, তারাবীর জামাত, টিভির পর্দায় ইসলামী প্রোগ্রাম, পোষ্টার, ব্যানার, চিঠি ও মাইকিং করে ওয়াজ মাহফিল, ডেকোরেটর, জেনারেটর এর রকমারী সাজ সজ্জায় গেইট প্যান্ডেল, তথায় বক্তারা বয়ান শেষে টাকা কালেকশন করেন এবং কোরবাণীর পশুর চামড়া, ধান, পাট, কালেকশন ও করা হয় বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের দ্বারা, জানার বিষয় এগুলোর ব্যাপারে কি ফতুয়া দিবেন ? এসব কি কুরুণে ছালাছায় ছিল ? আর একটি বিষয় হলো হাফেজ, ক্বারী মুফতী, মোহাদ্দেস মোফাচ্ছেরে কোরআন, শায়খুল হাদিস, আল্লামা, হেলালী, বেলালী, জিহাদী, জালালী, জামালী, যুক্তিবাদী এরকম উপাধী রাসুলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর কোন সাহাবায়ে কেরামগণের নামের সাথে ব্যবহৃত হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নাই অর্থাৎ এরূপ উপাধীগুলি নবীজির যুগে ছিল না ইহা নব আবিস্কার ।
সম্মানিত আলেম সাহেব যে মঞ্চে বসে যে মাইকে বিদয়াতের ফতুয়া প্রদান করেন ঐ সোফা চেয়ার খানা এবং মাইকটিও বিদয়াত- কারণ এগুলো সবই নব উদ্ভাবন । লক্ষ্য করুন হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী, সালাফী, আহলে হাদিস বর্তমানে ইসলাম ধর্মে জামাতে ইসলাম, মারকাজুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম, প্রচলিত তাবলীগ জামাত, টঙ্গীর ইজতিমা, এসবও বিদয়াত ।
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী