মহান আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জন্য যে ধর্ম নির্দিষ্ট করে দেন, সেই সর্বোত্তম অবিনশ্বর ধর্মের বাণী বহন করে যুগে যুগে একদল অত্যুজ্জ্বল আলোকময় পুরুষ দুনিয়াতে আভির্ভূত হয়েছেন। তাঁরা আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত, প্রেরিত। এ আলোকবাহী দূতগণকে আমরা রাসূল বা নবী নামে আখ্যায়িত করি। হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত-আলোক অভিযাত্রীগণের এ যেন এক সুদীর্ঘ কাফেলা। যেন তাঁরা দৌড়ে এসেছেন সমকালের মানুষের মাঝখানে। একজনের কাজ যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে তিনি তাঁর হাতের কাজ দিয়েছেন অন্যজনের হাতে। কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনিও তখন দ্রুত গতিতে কাজ শুরু করেছেন । তারপর পরবর্তীর্জনের নিকট কাজের ভার তুলে দিয়ে তিনিও থেমে গেছেন ।
এ দীর্ঘ কাফেলার শেষতম হলেন হযরত মুহাম্মদ (স)। তাঁর আপাত যাত্রা-বিরতি ঘটেছে ১২ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরী। সোমবার সকালবেলা। ইংরেজী ৭ জুন, ৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ । আপাত-বিরতি বলেছি এ কারণে যে, রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পরেও আলোকাভিসার বন্ধ হয়নি। বন্ধ হবেও না কোনদিন। আল্লাহ্ প্রদত্ত দ্বীনের আলো কখনো নিভবে না। রাসূলুল্লাহ (স) যে জীবন-ধর্মের আদর্শ রেখে গেছেন, তাঁর সুযোগ্য সোনালী জ্যোতির্ময় উত্তর পুরুষের দল সে আদর্শ বুকে বহন করে এসেছেন যুগের পর যুগ ।
তাঁর পরেই যাঁরা আদর্শিক জীবন বহন করেন, তাঁরা হলেন অব্যবহিত আলোকিত অনুগামীর দল-সাহাবায়ে কেরাম। তারপরে তাবেয়ীদিগের স্থান। আর এঁদেরই একজন হলেন ইমাম জাফর সাদেক (র)।
বংশ তালিকা
জাফর সাদেক (র)-এর কুনিয়াত আবু মুহাম্মদ। হযরত আলী (র)-এর সুযোগ্য বংশধর তিনি। অতএব সে হিসেবে রাসূলে করীম (স)-এর আহলে বাইয়াত তথা পরিবার পরিজনের অন্তর্ভুক্ত। বলা হয়েছে, প্রসিদ্ধ বারো জন ইমামের মধ্যে তিনিও একজন। তিনি বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন । কুরআন ও ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল । আর আমরা যাকে বলি এলমে মারেফাত-তাও ছিল তাঁর গভীর, সমকালের সেরা। এ বিষয়ে প্রচুর তত্ত্বপূর্ণ বাণী তিনি রেখে গেছেন । অর্থাৎ শরীয়ত ও মারেফাত-দু’দিক দিয়েই তিনি প্রজ্ঞাবান।
ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর আধ্যাত্মিকতা
তখন মুসলিম-দুনিয়ার খলিফা ছিলেন মনছুর বিল্লাহ । হিজরী শতকের প্রথমদিকে তিনি খলিফার কার্যভার গ্রহণ করেন । ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর আলোকময় ব্যক্তিত্বের নাম- খ্যাতি, জনপ্রিয়তা, জনগণের ওপর তাঁর বিশাল প্রভাব, তাঁর প্রতি জনগণের অঢেল ভক্তি ও ভালোবাসা খলিফাকে চিন্তাতুর করে তুলল । হয়তো ঈর্ষা অথবা ভয়। কে জানে, হয়তো তিনিই একদিন খিলাফতের দাবি করে বসবেন। অথবা তাঁর ভক্তজনেরা মনসুর বিল্লাহ-এর তখতে ইমাম জাফরকেই বসিয়ে দেবেন। অতএব আগেভাগে সাবধান হওয়া দরকার । মনসুর বিল্লাহ একদিন তাঁর মন্ত্রীকে আদেশ দিলেন-জাফর সাদেককে বন্দী করে দরবারে আনা হোক । তিনি তাঁকে হত্যা করবেন ।
চমকে উঠলেন মন্ত্রী। এ কী কথা! সম্পূর্ণ নিরীহ, নির্দোষ আপনভোলা একজন মানুষ, পার্থিব-জীবনের ভোগ লালসা পরিহার করে যিনি অবিরাম আল্লাহর ইবাদত-বন্দিগীতে বিভোর, খলিফা কিনা সে আত্মমগ্ন তাপসকে হত্যা করতে চান। তিনি সবিনয়ে খলিফাকে এমন কাজ করতে নিষেধ করলেন।
কিন্তু কে শোনে, কার কথা! খলিফা অনড়। তিনি তাঁর আদেশ বহাল রাখলেন। অগত্যা মন্ত্রী ইমাম জাফরকে বন্দী করার জন্য বেরিয়ে গেলেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও। খলিফা তাঁর ভৃত্যকে বলে রাখলেন, জাফর সাদেক যখন দরবারে হাজির হবে, তখন আমার দিকে লক্ষ্য রেখো। আমি আমার মাথার টুপি উঠিয়ে রাখব। আর তখনই এক কোপে তুমি তাঁকে দু’ভাগ করে দেবে।
কিন্তু যাঁর হাতে জীবন, যাঁর হাতে মরণ, সে সার্বভৌম শক্তির অধিকারী আল্লাহর কী অপার মহিমা! জাফরকে দরবারে ঢুকতে দেখে খলিফার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। কী অপার্থিব আলোর জ্যোতি জাফরের চোখে-মুখে! আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্ষমতাভিমানী খলিফা। এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। তারপর জাফর সাদেককে সসম্মানে অভ্যর্থনা জানিয়ে সিংহাসনে এনে বসালেন। কি করতে চেয়েছিলেন, আর কি হয়ে গেল! মহামান্য খলিফা শুধু যে নিজের আসন ছেড়ে দিলেন তাই নয়, বসে পড়লেন মহাতাপসের পায়ের তলায়। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, বলুন, আপনার কি প্রয়োজন?
ইমাম জাফর সাদেক (র) উত্তর দিলেন, আমার কোন প্রয়োজন নেই। শুধু প্রার্থনা, ভবিষ্যতে এভাবে আমাকে ডেকে এনে আমার সাধনার বিঘ্ন ঘটাবেন না ।
মনসুর কথা দিলেন। আর কখনো তা হবে না। তারপর তিনি তাঁকে সসম্মানে বিদায় দিলেন। ইমাম জাফর সাদেক (র) যেমন এসেছিলেন, সেভাবে দরবার-কক্ষ পরিত্যাগ করলেন । কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া তখনো শেষ হয়নি। বরং তা আরো সক্রিয় হলো। তিনি বিদায় নিতেই খলিফা অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। আর খুব সহজে তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন না। অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে রইলেন দীর্ঘক্ষণ। পর পর তিন ওয়াক্ত নামাজ কাজা হয়ে গেল।
আত্মীয়স্বজন ও সভাসদবর্গ হতবাক । কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল, কেউ বুঝতে পারলেন না । অবশেষে সংজ্ঞাশূন্য অবস্থাটা কেটে গেল । মনসুর চেতনা ফিরে পেলেন । এবার তাঁকে সবাই ছেঁকে ধরলেন। এ কী অবস্থা কেন হয়েছে? কি হয়েছিল আপনার? মনুসর তখন সুস্থ, স্বাভাবিক। বললেন, যখন ইমাম জাফর সাদেক (র) দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন, তখন আমি দেখলাম তিনটি বিষধর সাপ ফণা বিস্তার করে আমাকে বলছে, দেখো মনসুর, জাফর সাদেকের কোন ক্ষতি করার যদি চেষ্টা করো, তাহলে আমরা তোমাকে দংশন করব। ঐ ভয়ঙ্কর সাপের ভয়েই আমি তাঁর সঙ্গে অমন সুন্দর ব্যবহার করে তাঁকে বিদায় দিলাম । কিন্তু মনের ভেতরে সে ভয় এখনো কাটেনি। তাই ওভাবে মূর্ছা যাই। আল্লাহ্র পথের যাঁরা পথিক, তাঁরা ধ্যানে মগ্ন, পৃথিবীর কোন শক্তি তাঁদের এতটুকু অনিষ্ট করতে পারে না । অপরিমেয় ঐশীশক্তি তাঁদের রক্ষা করে সর্বক্ষণ। মহাসাধকগণ সেই ঐশীশক্তির অধিকারী ।
সমকালের আরো একজন বিখ্যাত সাধকের নাম হযরত দাউদ তায়ী (র) । একদিন তিনি এলেন ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর কাছে। বললেন, হুযুর, মনে হয় আমার অন্তর মলিন হয়ে গিয়েছে। কিছু উপদেশ দিন। হযরত ইমাম জাফর সাদেক (র) বললেন, আপনি এ কালের সর্বশেষ্ঠ তাপস । আপনার উপদেশের কি প্রয়োজন?
দাউদ তায়ী (র) বললেন, হযরত! আপনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বংশধর। এ যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে আমাদের উপদেশ দেয়া আপনার কর্তব্য।
তখন জাফর সাদেক (র) জবাব দিলেন, শেষ বিচারের দিনে নানাজী (রাসূলে করীম) যদি প্রশ্ন করেন, তুমি কেন আমার তাবেদারি করলে না, তখন আমি কি উত্তর দেব? সে ভয়েই আমি তটস্থ। মনে রাখবেন, বংশ দিয়ে কিছু হয় না। আমল বা সাধনা প্রয়োজন। আমলই মুক্তি আনে ।
এবার দাউদ তায়ী (র) কেঁদে ফেললেন। ওগো মাবুদ! যাঁর দেহে নবী করীম (স)-এর রক্তপ্রবাহ, যাঁর স্বভাব-চরিত্রে নবী-চরিত্রের আদর্শ, যাঁর নানাজী প্রিয় রাসূল, যাঁর জননী ধর্মনিষ্ঠ আদর্শ নারী-সেই তাপস-প্রধান জাফর সাদেকই যখন আপন কর্ম সম্বন্ধে হতাশ এবং মুক্তির বিষয়ে উৎকণ্ঠিত, তখন দাউদ তায়ী আর এমন কী মানুষ যে নিজের কর্ম সম্পর্কে গৌরববোধ করবে?
আর একদিনের ঘটনা : হযরত ইমাম জাফর সাদেক (র) তাঁর সহচর বন্ধুদের বললেন, এস, আমরা আজ সকলে শপথ নিই, রোজ কিয়ামতে আমাদের মধ্যে যে মুক্তিলাভ করবে, সে আর সকলের গুনাহ মাফীর জন্য আল্লাহ্ পাকের দরবারে সুপারিশ করবে। তারা বলল, হুযুর, যেখানে সুপারিশ করার জন্য স্বয়ং আপনার নানাজী উপস্থিত থাকবেন, সেখানে আমাদের এমন শপথের কি কোন প্রয়োজন আছে ?
জাফর সাদেক (র) বললেন, শোন, আমার নিজের ব্যাপারে ঐদিন তাঁর দিকে তাকাতে আমার লজ্জা লাগবে। তাই তোমাদের এমন প্রস্তাব দিয়েছি।
এ ধরনের প্রচুর ঘটনা হযরত ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর জীবনে আছে। প্রতিটি ঘটনাই চমকপ্রদ, আলোকিত। আত্মনিবেদিত একটি মানুষের এ কাহিনী আমাদেরও আঁধার- হৃদয়ে আলো এনে দেয় ।
ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর কয়েকটি ঘটনা
১. একবার হযরত ইমাম জাফর সাদেক (র) বেশ দামী পোশাক পরে আছেন। তা দেখে একটি লোক প্রতিবাদের সুরে বললেন, হুযুর, আপনি নবী-বংশের লোক । আপনার পক্ষে এমন পোশাক পরিধান করা শোভনীয় নয়। ইমাম জাফর সাদেক (র) তাঁর হাতখানি টেনে জামার ভেতরে ঢুকিয়ে দেখালেন ভেতরের জামাটি পুরু আর খসখসে। বললেন, আমার একটি জামা আটপৌরে, মানুষের মাঝে চলাফেরার জন্য । আর অন্যটি হল আল্লাহ্র দরবারে নামায আদায়ের জন্য ।
২. একবার দু মহাজ্ঞানীর মিলন হল । ইমাম জাফর সাদেক (র) ও ইমাম আবু হানিফ (র)। জাফর সাদেক (র) আবু হানিফা (র)-কে জিজ্ঞেস করলেন, জ্ঞানী কাকে বলে? জ্ঞানীর সংজ্ঞা কি?
ইমাম আবু হানিফা (র)-এর উত্তর, জ্ঞানী সে ব্যক্তি, যিনি ভাল ও মন্দের বিচার জানেন । জাফর সাদেক (র) বললেন, একটি জন্তুও তা জানতে পারে । কেননা, যে তাকে আদর- যত্ন করেন সে তার ক্ষতি করে না। অপর দিকে, যে তার যত্ন-আত্তি করে না, বরং কষ্ট দেয়, সে তার ক্ষতি করে ।
ইমাম আবু হানিফা (র) বললেন, তাহলে এবার আপনি জ্ঞানীর সংজ্ঞা বলুন, জাফর সাদেক (র) তখন বললেন, জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যিনি দু’টি ভালো কাজের মধ্যে বেশি ভালটিকে গ্রহণ করেন । আর দু’টি খারাপ কাজের মধ্যে কম খারাপটিকে গ্রহণ করেন ।
৩. একদিন একটি লোক ইমাম জাফর সাদেক (র)-কে বললেন, আপনার মধ্যে বাহ্য ও গুপ্ত উভয় গুণই আছে । কিন্তু বহুক্ষেত্রে দেখা যায়, আপনি যেন নিজেকে কিছুটা বড় মনে করেন।
সাধক ইমাম জাফর সাদেক (র) বললেন, আমার যা কিছু নিজস্ব, গৌরব বা গর্ব সব কিছু আমি মুছে ফেলেছি। তবে কিছু কিছু আল্লাহ্ প্রদত্ত গৌরব থাকে যা আপনা থেকে প্রতিভাত হয় । সেখানে মানুষের কোন হাত নেই । সুতরাং তাকে অহঙ্কার বা অহমিকা বলা চলে না ।
৪. একবার জাফর সাদেক (র)-কে ঘটনাচক্রে এক অপরিচিত লোকের সঙ্গে কয়েকদিন বাস করতে হয়। লোকটির একটি টাকার থলে ছিল। সেটি কোথায় যেন হারিয়ে যায় । কিন্তু সে সন্দেহ করল, জাফর সাদেক (র)-সেটি নিয়েছেন । তাই শেষ পর্যন্ত সে তাঁর কাছেই টাকার থলের দাবি জানাল । জাফর সাদেক (র) কোনরূপ প্রতিবাদ করলেন না। শুধু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কত টাকা ছিল? সে বললে, দু’হাজার। তিনি লোকটিকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন । আর দু’হাজার টাকা দিয়ে দিলেন
কিন্তু এর মধ্যে সে তার হারানো টাকার থলে পেয়ে গেল। তখন সে লজ্জিত, অনুতপ্ত। জাফর সাদেক (র)-এর কাছ থেকে নেয়া দু’হাজার টাকা ফেরত দেবার জন্য সে আবার তাঁর বাড়িতে এল । কিন্তু জাফর সাদেক (র) তা গ্রহণ করলেন না। বললেন, আমি যাকে যা কিছু দিই, কিন্তু তাঁকে একেবারেই দিয়ে দিই। আর ফেরত নেই না। কাজেই ও টাকা আর নেয়া যাবে না। বেচারা তখন আর কী করবে! অতগুলো টাকা নিজের কাছেই রাখতে হল । কিন্তু জাফর সাদেক (র)-কে চিনতে পেরে মরমে মরমে মরে যেতে লাগল সে।
৫. মহাতাপস জাফর সাদেক (র) চলেছেন একা একা । মুখে আল্লাহ্র নাম যিকির । ঐ পথে আরো একটি দুঃখী মানুষ চলছিল। এক দরিদ্র পথিক। ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর মুখে আল্লাহ্র নাম শুনে সেও দেখাদেখি জোরেশোরে আল্লাহ্ আল্লাহ্ বলতে বলতে তাঁর পেছনে চলছিল । আল্লাহর নাম জপ করতে করতেই জাফর সাদেক (র) আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করলেন, ওগো প্রভু, আমার জামা-কাপড়ের যে কী অভাব, আপনি তো নিজেই তা দেখছেন । আমাকে একটি জামা দান করুন। আল্লাহ্র তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটি সুন্দর জামা তাঁর কাছে এসে গেল । আল্লাহ্র প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি জামাটি গায়ে দিলেন ।
পেছনের দরিদ্র পথিক বললেন হুযুর, আমিও তো আপনার যিকিরের সঙ্গী ছিলাম । অতএব যিকিরের ফলস্বরূপ আপনি যা পেলেন, আমাকেও তার ভাগ দেয়া উচিত । আপনি তো আল্লাহ্র দরবার থেকে পেয়ে গেলেন। এখন আমাকে আপনার পক্ষ থেকে দিন। আপনার পুরাতন জামাটি আমাকে দান করুন। পথিকের কথা শুনে জাফর সাদেক (র) সাথে সাথে তাঁর নিজের জামাটি খুলে দিয়ে দিলেন। আর কৃতজ্ঞতায় বিগলিত, কৃতার্থ মুসাফির তাঁকে প্রাণভরে দোয়া করে চলে গেল ।
৬. একদিন একটি লোক এসে ইমাম জাফর সাদেক (র)-কে বললে, আমি আল্লাহকে দেখতে চাই। আপনি তার ব্যবস্থা করুন। জাফর সাদেক (র) বললেন, আপনি কি জানেন না যে আল্লাহকে দেখতে পাওয়া যাবে না। আল্লাহ্ কি মূসা (আ)-কে বললেননি, তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না? লোকটি বলল, সে তো গেল মূসা (র)-এর কথা। সে জমানা চলে গেছে। এখন শেষ নবীর যুগ। এখন তাঁরই দ্বীন চলছে। আমরা তাঁরই উম্মত। বিশেষ করে আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতগণের মধ্যে কোন এক ওলী বলতেন, আমার অন্তর আমার প্রভুকে দেখেছে । অন্য আরেকজন ওলী বলেছেন, তাঁকে না দেখে আমি তাঁর ইবাদত করছি না। লোকটির কথাগুলো শুনলেন ইমাম জাফর সাদেক (র)। তারপর তাঁর ভক্তদের বললেন, এর হাত পা বেঁধে নদীতে ফেলে দাও। আদেশ পালিত হল । নদীর পানিতে পড়ে বেচারা কাকুতি-মিনতি করতে লাগল, হে নবীর বংশধর! আমাকে সাহায্য করুন। কিন্তু না। তাঁকে কোন রকম সাহায্য করা হল না। তাঁকে কেউ পানি থেকে তুলেও আনল না। অবশেষে যখন সে তলিয়ে যাচ্ছে গভীর পানির তলায়, বাঁচবার কোন আশা নেই, তখন সে বলে উঠল-হে আল্লাহ! আমাকে বাঁচাও। জাফর সাদেক (র) এবার তাঁর অনুগামীদের বললেন, যাও, লোকটাকে এবার তুলে আনো । তাঁর নির্দেশে লোকটিকে তুলে আনা হলো । একটু পরে সে যখন সুস্থ, তখন জাফর সাদেক (র) বললেন, কী! আল্লাহ্র দেখা পেয়েছেন? সে বললে, হুযুর! যতক্ষণ আমার চোখের সামনে যবনিকা ছিল, ততক্ষণ মানুষের সাহায্য চেয়েছি, কিন্তু তা যখন দূর হল, তখন চেয়েছি আল্লাহ্র সাহায্য । জাফর সাদেক (র) বললেন, আপনি যখন আমার সাহায্য চাচ্ছিলেন, (আমি ছাড়া) কে আছে যে ব্যক্তির ডাকে সাড়া দিতে পারে? অতএব যান, এবার আপনার যে অন্তর্দৃষ্টি লাভ হয়েছে তাতে আশা করা যায়, আর কখনো ঐ ধরনের কথা বলবেন না । এ মহাসাধক মানুষের জন্য বহু মূল্যবান উপদেশ বা বাণী রেখে গেছেন । এখানে তার কিছু নমুনা দেয়া হলো।
ইমাম জাফর সাদেক (র)-এর অমূল্য উপদেশ
১. যে লোক বলে যে, আল্লাহ্ অমুক বস্তুর মধ্যে রয়েছেন বা ঐ বস্তু থেকেই তাঁর উদ্ভব ঘটেছে, সে কুফরী করল।
২. যে লোক আরাম ও নিরাপত্তার কামনায় উপাসনা করে, আর উপাসনার পর আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করে, সে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরে যায়। যে লোক উপাসনা প্রার্থনা করে নিজেকে আবেদ বলে ঘোষণা করে, সে পাপী। আর যে লোক পাপ কাজ করে লজ্জা পায়, সে আল্লাহ্র অনুগতদের অন্তর্ভূক্ত হয়।
৩. ইমাম জাফর সাদেক (র)-কে কেউ প্রশ্ন করেন, সহিষ্ণু দরিদ্র দরবেশ ও কৃতজ্ঞ ধনী ব্যক্তির মধ্যে কোন জন বেশি উত্তম? তিনি উত্তর দেন, ধৈর্যশীল দরবেশের মহিমা বেশি। কেননা, তিনি কেবলমাত্র আল্লাহ্র উপাসনায় মগ্ন থাকেন অহোরাত্র। কিন্তু কৃতজ্ঞ বিত্তশালীরা ধনসম্পদের ভাবনা ও হিসেব-নিকেশে বহু সময় ব্যয় বা নষ্ট করেন ।
৪. যে লোক কোন অন্যায় কাজ করার আগেই পাপের কথা ভেবে তওবা করে, সে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করে ।
৫. আল্লাহর যিকিরের অর্থ হল, তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে অন্য যে কোন বস্তুকে একেবারে ভুলে যাওয়া ।
৬. পাঁচ শ্রেণীর লোকের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না রাখার কথা বলেছেন তিনি। যেমন, (ক) মিথ্যাবাদী—এদের সঙ্গে চলাফেরা করলে তার কথা বিশ্বাস করে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (খ) কৃপণ-নিজের সঞ্চয়-স্বার্থের জন্য সে মানুষের ক্ষতি করবে। (গ) দয়াহীন ব্যক্তি-বিপদের সময় সে কোন দয়া করবে না। ফলে সর্বনাশ অনিবার্য। (ঘ) কাপুরুষ-প্রয়োজনের সময় সে কোন কাজে আসবে না। বিপদে ফেলে রেখে নিজের নিরাপত্তার খোঁজে করবে। (ঙ) ফাসেক-এদের লোভ-লালসা অন্তহীন । নিজের স্বার্থে কাউকে খুন করতে সে পিছপা হয় না ৷
ইমাম জাফর সাদেক (র) বলেন, জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যঞ্জনা রয়েছে পার্থিব জীবনেই । মানুষের সুখ ও শান্তি হল জান্নাতের রূপ। আর তার দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণাই হল জাহান্নামের প্রতীক । জান্নাত যেমন চির শান্তির স্থান, জাহান্নাম তেমনি যন্ত্রণার স্থান ।
যিনি তাঁর সর্বস্ব আল্লাহুর কাছে সমর্পণ করেন, একমাত্র তিনিই জান্নাতের অধিকারী । আর যে প্রবৃত্তি বা নফসের হাতের ক্রীড়নক, জাহান্নামই তার চিরস্থায়ী বাসস্থান ৷
গ্রন্থসূত্র – তাযকিরাতুল আউলিয়া
মূল – হযরত খাজা ফরীদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরী
অনুবাদ – মাওলানা ক্বারী তোফাজ্জল হোসেন ও মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ হাসান
সিদ্দিকিয়া পাবলিকেশন্স