ছালমা আক্তার চিশতী
নিজ সেফাত ফানা হলেই হয় “তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ” আর তখনই হয় গুরুর জাতে স্থিত হওয়া, ঐক্যতায় পৌছে যাওয়া। গুরুর জাতে মিশাটা সহজ কথা নয়, গুরুর জাতে মিশতে হলে গুরু যা বলবে তা সরল মনে শুনতে হবে, হৃদে ধারণ করবে এবং সে অনুসারে জীবন গঠন করতে হবে। গুরুর কালাম শোনার মূল অর্থ হলো তা নিজ মানব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আর নিজ অস্তিত্বের ধারণায় বা দুনিয়ায় মন আবদ্ধ থাকলে গুরুর কালামগুলো কানে ও দীলে পৌছেবে না। কারণ, যেই মানুষটি ভক্ত হবে সে গুরুর কান দিয়ে শুনবে, গুরুর চোখ দিয়ে দেখবে তার নিজ কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এ অবস্থাকে কোরানে বলা হয়েছে, “ওয়ামা ইয়ান্তেকু আনিল হাওয়া।”
যেমন, একটি পুতুল যখন মানুষ তৈরি করে, পুতুলটি কিভাবে কথা বলবে তা একমাত্র ঐ মানুষটি বলতে পারবে। কারণ, সে যেই ভাবে চাইবে পুতুলটি সেই ভাবেই ব্যাটারী লাগানোর পর কথা বলবে। তেমনি একজন গুরু ভক্তের অবস্থান সে গুরুর কাছে পুতুলের মতো হয়ে যাবে।
মাওলানা রুমী (রাঃ) তাঁর ‘মসনবীতে’ বলছেন –
“পীরেরা জাতে খোদা এক না দিদ
হাকিকতে নাই মুরিদু নাই মুরিদু নাই মুরিদু।”
অর্থাৎ – পীরের জাত ও আল্লাহর জাত যে এক ও অভিন্ন রূপে দেখতে পায়নি,
সে এখনো মুরিদ হয়নি, মুরিদ হয়নি, মুরিদ হয়নি।
মুরিদ হওয়াটা সহজ কথা নয়, আর মুরিদ হয়ে পীরের দরবারে কয়জন টিকতে পারে। পীরের জাতে জাত মিশাইতে চাইলে এই মানব মনের ভেজালগুলো ছাড়তে হবে, তবেই গুরু ভজন পূর্ণরূপে হবে। যেমন, আমরা কাপড় ধোয়ার পর সূর্যের আলোতে শুকাতে দেই, এই সূর্যের আলোতে দেওয়ার কারণ হলো কাপড়টি ভেজা। তেমনি গুরুর কালামগুলো হলো সূর্যের আলোর মত একজন মুরিদের হায়ানী আত্মার ভেজা ভাবটি শুকিয়ে ইনসানি আত্মার অধীকারী হয়ে যাবে। ইনসানীয়াত অর্জন করাটাই হলো একজন মুরিদের মূল কর্ম। একজন মুরিদ তার মূল কর্ম ভুলে হায়ানী আত্মার কর্মে মনকে ডুবিয়ে রাখে। হায়ানী আত্মার মাঝে মনকে ডুবিয়ে রাখাই হলো অচেতন থাকা, আর যারা অচেতন তারা জাহান্নামে যাবে।
কোরানের সূরা রহমানের ৪১ নম্বর আয়াত অনুসারে তাদেরকে দেখলেই চিনা যাবে। কারণ, তাদের মানব ছুরত থাকবে না। যেমন, আমরা একটি বস্তু চিনি না কিন্তু বস্তুটির নাম জানি, সেই বস্তুটি আমাদের চোখের সামনে থাকলেও, এই দেখা বস্তুটি অচেনা হয়ে রবে। তেমনি একজন অচেতন মানুষের দশা হবে তার সিরাত অনুসারে ছুরত হয়ে যাবে, তা সামনে থাকলেও চিনা যাবে না। কারণ, আমরা দেখার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছি তাই। সিরাত ঠিক না থাকলে মানব ছুরত কোনো দিন ঠিক থাকবে না, বদল হয়ে যাবে। মানব জনমটা শুধু দুনিয়া ভোগের জন্য নয়, মানবাত্মার মুক্তির জন্য আগমন। এই মানব জনমের মাঝে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে মুক্তির দেশে পৌছতে হয় গুরুর শিক্ষায় তাই জানা-বুঝা যায়। আমরা অনেক সময় মানুষের মুখে এই বাক্যটি শুনতে পাই, “ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।” যারা দুনিয়া বিবর্জিত মানুষ তারাই পারে দুনিয়ায় থেকেও দুনিয়ার বাহিরে বাস করতে। তারাই প্রকৃত সুখ-বিলাসিতা ভোগ করতে পারে। দুনিয়ায় থেকে ভোগ-বিলাসিতা পাপ। মাওলার সিরাত ধারণ করতে পারলে মাওলার এশ্কের দরিয়ার মাঝে বাস করা যাবে। এশ্ক হলো দুই রকমের একটি হলো দুনিয়াবী এবং অপরটি হলো আখেরাত মুখী।
হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রাঃ) দিওয়ানে-ই-মুঈনুদ্দিন এর মাঝে বলছেন –
বোর’ক্বে এশ্ক্ব বার’য়ে তো সাদ্ ক্বাদাম্ তেই র্কাদ
তো হাম মোয’য়েক্বে বেগ্যর্’ ইয়েক্ ক্বাদাম্ পীশ্ বিঅ।
অর্থাৎ – এশকের বোরাক তোমার জন্য শত কদম পাড়ি দিয়েছে
তুমি সংকীর্ণ জায়গা ছেড়ে এক পা এগিয়ে আসো।
এই মায়ার চক্ষু দিয়ে গুরুকে চিনা যাবে না। গুরুকে চিনতে হলে আখেরাত মুখী এশ্ক লাগবে। যেমন, জুলেখা যতক্ষণ এই মায়ার জগতের ইশ্কে ছিল ততক্ষণ ইউসুফকে পায়নি, আর যখন তাঁর মাঝে পবিত্র এশ্ক জাগ্রত হলো তখনই ইউসুফকে তিনি পেলেন। এই পাওয়াটা নিজ অস্তিত্বের মাঝে পাওয়া আর নিজ অস্তিত্বের মাঝে পাওয়ার ভেদ রহস্য জানতে হলে একজন আরিফে ইলাহীর কাছে যেতে হবে।
গাউছেপাক হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রাঃ) তাঁর ‘আল ফাতহুর রাব্বানী ওয়া ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবে ২৯৯ পৃষ্ঠায় বলছেন,
‘মুনাফিক, দজ্জাল ও প্রবৃত্তির পূজারীরাই সালেহীনদের (ওলী-আউলিয়াদের) এ হালতের প্রতি অবিশ্বাসী।’
যারা ‘মুনাফিক, তারা মনে করে একজন পীর-মুর্শিদ তাদের ভেদ রহস্য জানেন না। এই ধরনের ধারণাটি হলো তাদের ভুল ধারণা, জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ। কারণ, একজন পীর-মুর্শিদ হলো অন্তর্দৃষ্টিওয়ালা। তাঁর চোখে কিছু ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয় না, তিনি আল্লাহর চোখেই দেখেন। যে একজন পীর-মুর্শিদের চোখে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবে সে নিজেকেই নিজে ফাঁকি দিবে। এই ফাঁকি দেওয়ার কারণেই ঐ মুনাফিকের মধ্যে অন্ধত্ব প্রকাশ পেল। মুনাফিকরা মনে করে একজন পীর অথবা মুর্শিদ তাদের মতো সাধারণ লোক কিন্তু তাঁরা যে অসাধারণ মানুষ তারা তা বুঝে না, না বুঝাটাই তাদের জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ। যেমন, আমরা খাঁটি দই তৈরি করতে গিয়ে দুধকে ভালো করে জাল দিয়ে ঘন করে নেই তারপর দই পাতা হয়। আর এই দই মানুষের হজমের কাজ করে থাকে, স্বাদ সৃষ্টি করে। একজন মানুষ ছাড়া অন্য পশু কি এই দই খেতে পারবে ? পশুর তকদির ও মানুষের তকদির আলাদা। তেমনি একজন কামেল গুরুর কাছে গিয়ে তাঁর খাঁটি ভক্ত হতে হবে তবেই গুরুর পাক কালামগুলো ধারণ করতে পারবে। আকৃতিতে ও নামে মানুষ অথচ মানুষের স্বভাব নেই সে তো আসলে মানুষ নামের কলঙ্ক, পশু। এই কলঙ্ক’কে অলংকার করতে হলে একজন গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করতে হবে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে। বায়াত না হয়ে আখেরাতের কর্ম করলে তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছাবে না। যেমন, একটি গাছের মূল কেটে ফেলা হলে গাছটি বাঁচবে না, তেমনি একজন মুরিদের কাছে গুরু হলো গাছের মূলের মতো। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী তাঁর আধ্যাত্মিক আলোচনার মাঝে একটি কথা তুলে থাকেন যদিও তার পূর্বে এই কথা মাওলানা রুমীও বলছেন, কথাটি হলো “গুরুকে মনুষ্য জ্ঞান যার অধঃপাতে গতি তার।” গুরু হলো সর্বজ্ঞ, গুরু হলো চিরস্থায়ী সত্তা। তাই বলা যায় গুরুকে দেখার পর যদি একজন মুরিদের মনের ময়লা দূর না হয় তবে তার গুরু ভজন হবে না। গুরু আর ভক্ত একই আত্মার সমাবেশ ঘটিয়েছে এই মায়াময় জগতের মাঝে। আত্মার এক নাম হলো আল্লাহ। পবিত্রময় সত্তার অধিকারী হওয়া সাধনা সাপেক্ষ। সাধনা করার জন্য দৃঢ় মনোভাব/অনুরাগের আশ্রয় নিতে হবে। খোদাকে ধারণ করা অনেক কঠিন কার্র্য এই মায়ার জগতে। বার বার মন নিন্মগামী হয়ে যায়, তবু যারা এই অসাধ্যকে সাধন করেছে তারা খোদার দিদার লাভ করেছে।
সুরা বাকারা ১১১নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন – ‘বালা মান্ আস্লামা ওয়াজ্হাহু লিল্লাহি ওয়া হুয়া মোহসিনুন’ অর্থাৎ হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সমর্পণ করলো বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলো বা নিজেকে উৎসর্গ করলো তথা নফসকে খান্নাস মুক্ত করলো তার মুখমন্ডল আল্লাহর জন্য এবং সেই তো সৎকর্মশীল। ‘ফালা আজরুহু ইনদা রাব্বেহী’ অর্থাৎ অতএব তার জন্য উহার বিনিময় তার রবের নিকট রয়েছে। ‘ওয়া লা খাওফুন আলাইহীম ওয়ালাহুম ইয়াহ্জানুন’ অর্থাৎ তাদের জন্য ভয় নেই এবং তারা (কখনো) চিন্তিতও হবে না (সুরা বাকারা ১২নং আয়াত)। খোদাকে/গুরুকে যারা চিনেছে, খোদাতেই বাস করছে তারা ভয় মুক্ত। আল্লাহর নাম নয়, রাসুলের নাম নয়, হরদমে জপো মন গুরুজীর পাক নাম। যে নামে পার হবে কঠিন হাশরের মোকাম। যে যা জপে জপতে থাকুক, মন তুমি জপো মুর্শিদের/গুরুর নাম।