মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, জুন ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – একটি গানের তাফসির
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
এ সুন্দর পৃথিবী নামক গ্রহের ধ্বংসের মূল তথা অশান্তির সৃষ্টির মূল কর্তা হলো মানব সুরতে বাস করা নরপশুগুলো। তাদের তাপের প্রভাবে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে এ গ্রহের মানুষগুলো। এ ধরনের নরপশু তথা নমরুদ/ফেরাউন/সরদার সউদ/দজ্জাল/অসুরদের থেকে রক্ষা করতেই প্রেরিত পুরুষদের/পরকালপ্রাপ্ত মানুষের /অবতারের/দূর্গার/গুরুর আগমন ঘটছে যুগে যুগে। ধর্মের হিজাব পড়া নরপশুগুলো সেজন্যই যুগে করেছে/করছে। সেজন্যই কোরানে ভক্ত-মুরিদানদেরকে(যারা ঈমান এনেছে) তাদেরকে প্রথমইে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে শয়তানের পথ পরিহার করে চলার জন্য। আর শয়য়তানের/ইভিলের/নারদের গুণ-খাছিয়তে আবৃত লোকটিই হলো মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রকাশ্য শত্রæ শয়তান (কোরান দ্রঃ)।
মূলতঃ শয়তানমুক্ত মানুষটিই হলো খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান (আল ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত)। যারা কোরান বুঝে তারাই এ কথা অবশ্যই স্বীকার করবে। যখনই কারো মানবাত্মার/মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটে তখনই সে আর কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, তিনি হয়ে যান সব মানুষের। প্রমাণ চেয়ে দেখুন সমস্ত অলি-আল্লাহদের/সাধু দরবেশদের নিকট, তাদের রঁওযা বা মাজার জিয়ারতে সর্বজাতির মানুষ আগমন করছে। কারণ, ইনছানিয়াত আঠার হাজার মাখলুকাতের ভিতহর নেই, তার বাহিরে, চতুর্থ দায়রায় তার অবস্থান, যেখানে অপবিত্রতার কোনো স্থান নেই। এখানেই জান্নাতিদের বাস। সাম্প্রদায়িকতার/দ্ব›দ্ব-বিভেদ-বৈষম্যের দেয়াল ভাঙলেই মুক্ত মনের মানুষ সৃষ্টি হয়। সর্বধর্মের আড়ালে বাস করা নরপশুগুলো (যারা শয়তানের/ইভিলের নারদের ধর্মে দাখেল হয়ে আছে) তা হতে দিবে না। আর আলেম-মোল্লাদের বা অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত, পাদ্রি, ব্রাহ্মণদের অবস্থান তিন জমাতের ভিতর, তাদের নিকট কয়জন যায় তা একটু চোখ মেলে চেয়ে দেখুন। ওরা সম্প্রদায়িকতার চারি দেয়ালে বাধা ষাঁড়, গুতাগুতিই ওদের ধর্ম। এ কথা কেই বিশ্বাস করতেও পারেন আবার নাও করতে পারেন, সবই তকদির।
তাদের ধর্মীয় উন্মাদনার কারনে, উগ্রতা-উচ্ছৃঙ্খলতার কারণ পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে/এখন হচ্ছে। সেজন্যই ওহাবী/কওমী আলেম-মোল্লারা বা তাদের সমমনাদের ধর্ম ব্যবসা রক্ষার্থে, মৌলবাদ ইহুদি, খ্রিষ্টানদের দালালি রক্ষার্থে, ব্যক্তিস্বার্থ পূরণাথ্যে আল্লাহর অলিদের প্রতি, তাদের রঁওযা/মাজারের প্রতি অনুষ্ঠানের প্রতি নানা ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, অন্যায় অত্যাচার করে চলেছে। মূলতঃ ওদের মানব ধর্ম বলতে কিছুই নেই, যা আছে তা হলো পশুত্বের ধর্মাচারণ। ওদের সুরত ধারণ করে/তাদের মুরিদ করে শয়তান/ইভিল/নারদ তাদের জবানে বলছে, ‘নবীজি মারা গেছেন, তার কোনো ক্ষমতা নেই, তিনি মাটির তৈরী, নূরের নয়, তিনি আমাদের মতোই মানুষ-এর বেশী কিছু নয়; কে আব্দুল কাদীর জিলানী, কে খাজা বাবা, কে শাহ্ জালাল? কিসের অলি ওরা সবাই ভন্ড, এরা নিজেরাই পাড় হতে পারবে না আবার আরেকজনকে পাড় করবে কীভাবে?(নাউজুবিল্লাহ্) এ ধরণের অন্ধ-বধিরগণের ধারণা তারাই একমাত্র ধর্ম পথে আছে, তাই তাদের কথা না শুনলে, না মানলে বন্য পশুর আচরণটি প্রকাশ করতে শুরু করে।
সেজন্যই তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ ওহবিী কওমীদেরকে লক্ষ্য করে বলছে, (ভাস্কর্য নিয়ে কথা) “কতিপয় ধর্ম ব্যবসায়ীর নিকট ইসলাম ধর্ম লিজ দেয়া হয়নি (যুগান্তর/১৪-১২-২০২০ ইং) এবং ওরা ইসলাম ধর্ম নিয়ে ভুল ব্যখ্যা করে চলছে (যুগান্তর/২৬-০২-২০২১ ইং)।” চেয়ে দেখুন কারা ভাস্কর্যের বিরোধীতা করেছিল/করছে? ভাস্কর্য আর মূর্তির মধ্যে আসমান-জমিন প্রভেদ মূর্খরা তা বুঝেনি, এ বিষয়ে মোল্লাদের ঐতিহাসিক ধারণা খুবই ক্ষীণ। মূলতঃ অজ্ঞতা, উগ্রতা এবং উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবটি প্রকাশ করাই হলো মূল বিষয়, ইহাই তাদের শিক্ষা। যখন ওহবিীরা জাজিরাতুল আরব দখল করে তখনও হাজার হাজার মানুষের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাংলাদেশকেও ওহাবী রাষ্ট্র বানানোর জন্য মূর্খরা বানর নৃত্য করে চলেছে। আলেম-মোল্লাদের এবং তাদের সমমনাদের বিশ্বাস-ধারণা একমাত্র মাদ্রাসায় পড়লেই ধর্ম জ্ঞানী হওয়া যায়। এ আকিদই তাদেরকে ধর্মান্ধ হতে বাধ্য করেছে। এ ধরনের মিথ্যা অহমিকার কারণেই ওরা অজ্ঞতা-মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছে আর মুর্দা হয়ে অন্ধকার কবরে বাস করচে। ওরা যে উলঙ্গ-মুর্দা অন্ধকার কবরে বাস করছে তাও বুঝার হুঁশ-আক্কেল হারিয়ে ফেলেছে। বিগত যুগের আলেম-মোল্লাদের এবং বর্তমানের শত শত আলেম-মোল্লাদের দিকে একটু তাকিয়ে দেখুন তারা মাদ্রাসার বিদ্যা বিসর্জন দিয়ে গুরুর/মুর্শিদের নিকট বায়াত/দীক্ষা নিয়ে সাধনা করে কীভাবে অলিত্বের দরজা লাভ করেছেন, মুক্ত মনের অধিকারী হয়ে মহাপুরুষে অধিরোহণ করছেন।
ইতিহাসে তার হাজার হাজার নজীর রয়েছে, একটু চোখ খুললেই দেখতে পাবেন। আর যদি গিনিপিগের মত চোখ বন্ধ করে রাখেন তবে কিছুই দেখতে বা বুঝতে পারবেন না। আর যদি মাদ্রাসা ব্যবসায়ী হয়ে থাকেন তবে আর এ সত্য কথাটি কখনোই স্বীকার করতে পারবেন না। কারণ, তাহরে মাদ্রাসার ব্যবসা বন্দ হয়ে যাবার করুণ গোঙানীর সুর বাজতে থাকবে। মাদ্রাসার বিদ্যা ত্যাগ না করে কেউ অলিত্বের দরজা লাভ করতে পারে নি এবং পারবে না।
আমার বক্তব্য হলো- “যে মাদ্রাসা মানুষকে পীর/মুর্শিদ/অলি/গুরুমুখি না করে তাদের বিরুদ্ধে নিয়ে যায়, মানুষকে সাম্প্রদায়িকতা হতে বের হয়ে মুক্ত মনের অধিকারী হতে দেয় না, ইনছানিয়াতের দিকে দাবিত করে না তথা মুনষ্যত্বের জাগরণ ঘটায় না, মানুষের প্রতি প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি করে না, অন্যান্য জাতির প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করে না, ঐক্যতা প্রতিষ্ঠিত করে না, অন্য ধর্মের উপাস্যকে গালি দেয়া শিখায়, তাই হলো শয়তানের মাদ্রাসা/শিক্ষালয়।” তা মূলতঃ কোনো ধর্ম শিক্ষাই অঙ্কুরোদগম হয়। এরাই সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে ফতোয়াবাজি, জোর জুলুমের মতো জঘন্য ক্রিয়া-কর্মে রতো থাকে। কারণ, মাদ্রাসার/আলেম-মোল্লাদের কোরান শিক্ষা হলো আক্ষরিক (মুতাশাবেহাত/তাশাবাহা-যার অর্থ করতে কোরানে নিষেধ করা হয়েছে)- ইহা ইলমুল কালাম; ইহা ধর্ম জ্ঞান অবশ্যই নয়। সেজন্যই তারা বহু মতবাদের ঘূর্ণিপাকে পড়তে বাধ্য। যারা নরপশু, অসুরত্বকে মনের মাঝে লালন পালন করছে তারা কখনো এ সত্য কথাগুলো স্বীকার করবে না, না করাটাই অসুরত্বের প্রমাণ।
কোরান রূপক সাহিত্য, রূপকের আড়ালেই রয়েছে ধর্মজ্ঞান (মুহকামাত)। যে কোরানের মুহকামাত বুঝে নি সে ধর্মজ্ঞানের/কোরানের কিছুই বুঝেনি, কোরানের মুহকামাত বুঝার জন্য আরবী পড়ার কোনো শর্ত নেই, কামেল গুরু/মুর্শিদের স্বানিধ্যের প্রয়োজন। কারণ, নিজকে চিনলে কোরানের মুহকামাত বুঝা হলো। নিজকে চিনলে খোদাকে চেনা যায়- ইহাই কোরান শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। তেইশ বৎসর ওহী কালাম নাযিল হয়েছে মানুষ কি তা বুঝানোর জন্য। যে মানুষ কী তা-ই বুঝেনি/চিনে নি, তার কোরান পড়া মানেন শুধু পাতা উল্টানো ছাড়া আর কিছুই করেনি। তা যতো বড় মাওলানা , মুফতি, মুহাদ্দেস বা মুফাচ্ছেরই হোক না কেনো। আরবী ফারসি ভাষা শিক্ষা করা আর কোরান শিক্ষা করা আসমান জমিন প্রভেদ। একজন ইলমে সিনার অধিকারী/ধর্মজ্ঞানীর/গুরুর নিকট সে ভেদ জেনে নিলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর মিথ্যা অহংকার-অহমিকার বেড়াজালে আবদ্ধ হলে তা আর কোনো দিনই জানা যাবে না, শুধু বকবক করেই যাওয়া যাবে। স্পষ্ট ভাবেই বলছি, মাদ্রাসায় কখনো কোনোদিনই কোরান শিক্ষা দেওয়া হয় না/হয়নি, শুধু আরবী ভাষাটিই ভাষান্তরসহ শিক্ষা দেয়া হয়- যা কখনো কোরানের জ্ঞান নয়। যে সমস্ত মাওলানা-মুফতিরা মাদ্রাসার বিদ্যা বিসর্জন দিয়ে গুরুর/পীরের/মুর্শিদের নিকট বায়াত গ্রহণ করে ঈমানদার হয়েছে তাদের কালামগুলো পড়ে দেখুন তারা কি বলছে। মাওলানা রুমী (রাঃ) বলেছেন, “আমি কোরানের মগজ উঠিয়ে নিয়েছি, আর অস্থি-চর্ম কুকুরের জন্য ফেলে রেখেছি।”
যারা কোরানের ভেদ বুঝেনি/নিজকে চিনেনি তারা অস্থি-চর্ম নিয়েই ব্যস্ত আছে। যারা কোরানের অস্থি-চর্ম নিয়ে ব্যস্ত আছে তারাই স্বার্থের পরিপন্থী হলে ফতোয়াবাজি, মারামারি, কামড়াকামড়ি, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে চলছে। তিনি আরো বলেছেন, “আমি এতোদিন মাওলানাই ছিলাম না, যতো দিন না শামছ তাবরেজির গোলামী করেছি।” তাহলে মাওলানা রুমী (রাঃ) বায়াত হওয়ার পূর্বে কোন আলেম ছিলেন, তখন কোন ইলেম ছিল আর শামস তাবরেজি (রাঃ)- এর নিকট বায়াত হয়ে কোন এলেম শিখে তিনি খাঁটি আলেম হলেন এবং কোনটি সত্যিকারের ইলেম/আলেম তা কি বুঝা গেল না? যারা মাদ্রাসার আক্ষরিক বিদ্যার গৌরব করে পীর/ফকিরের সমালোচনা করেন, আপনারা দেখুন তো এ বিদ্যা তো মাওলানা রুমী (রাঃ) এর কম ছিল না। তিনি সব বিদ্যা বিসর্জন দিয়ে অশিক্ষিত/অক্ষরজ্ঞানহীন মহা সাধক হযরত শামছ তাবরেজী (রাঃ) এর নিকট বায়াত হয়ে ইলমে সিনা অর্জন করে খাঁটি আলেম হয়ে গেলেন। আপনারা কি খাঁটি আলেম না খুসকি আলেম তা কি স্পষ্ট হয়ে গেল না?
হাজার হাজার আলেম, মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দেস, মুফচ্ছের রয়েছে যারা মাদ্রাসার বিদ্যা অর্জন দিয়ে পীর/গুরু/মুর্শিদের নিকট বায়াত হয়ে কোরান শিক্ষা করে ইলমে সিনা অর্জন করে খাঁটি আলেম/ইনছানুল কামেলে পরিণত হয়েছেন/হচ্ছেন। মুর্শিদ/গুরু/আল্লাহর অলি/খাঁটি আলেমদের নিকট হতে এ ধরনের হাজারো কালাম প্রকাশ পেয়েছে, আর অজ্ঞ-মূর্খরা তা শুনে নাক সিটকিয়েছে; ইহাই অজ্ঞাত-মূর্খতার পরিচয়।
মাজার বা রঁওযা জিয়ারত আর কবর পূজা আসমান জমিন প্রভেদ তা অজ্ঞ-মূর্খ গোঁয়ার গোবিন্দের দলেরা বুঝে নি। আল্লাহপাক তাদের তকদিরে সে বুঝ জ্ঞান দান করেন নি, দোয়া করি যেন সে বুঝ-জ্ঞান দান করেন। যদি তাদের সামান্যও ধর্মজ্ঞান থাকতো তবে দেখতে পেতো, বুঝতে পারতো যে সমস্ত মাদ্রাসার আলেমরাই (সামান্য কিছু খাঁটি সুন্নী আলেম ব্যতীত) কবর পূজা করছে, কবর পূজার শিক্ষা দেয়ার বা গন্দম খাওয়ার শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাদ্রাসা খুলেছে। এরা এতো অন্ধ যে তা বুঝার জন্য কোনো জ্ঞানীর সঙ্গও বিষতুল্য মনে করে, মিথ্যা অহংকার-অহমিকা সর্বদায়ই তাদের মনে বিরাজ করছে, ইহাই অজ্ঞানান্ধকারের বহিঃপ্রকাশ। ফকিররা কোনো দিনই কবর পূজা করে না, তারা রঁওযা বা মাজারে জিয়ারত করে/করছে এবং নিজেকেও রঁওযা বা মাজারে পরিণত করে নিবার শিক্ষা নিচ্ছে এবং তাতে তারা তা প্রাপ্ত হচ্ছে বিধায় ঈমানদারগণ/ভক্ত-মুরিদান, আশেকানগণ ওরশ পালন করছে। অজ্ঞ-মূর্খ এ সমস্ত আলেম-মোল্লাগণ যুগে যুগেই নবী-রাছুল অলিদের বিরোধীতা করেছিল/করছে। অন্যান্য ধর্মের ছদ্মাবরণেও এ সমস্ত ধর্ম সন্ত্রাসীরা বাস করছে। তাদের কামড়াকামড়িতে মানব সমাজে নাভীশ্বাস উঠে গেছে। এ কথা কেই বিশ্বাস করতে পারেন আবার বিশ্বাস নাও করতে পারেন সবই তকদির। তবে আগতকাল এসে তার প্রমাণ উপস্থাপন করবে, সেদিন চোখ খুলে যাবে, সবই দেখতে পাবেন-বুঝতে পারবেন। কোরান মহা জ্ঞানভান্ডার তা কখনো সম্প্রদায়িকতা সমর্থন করে না, তাহলে আর কোরানের সার্বজনীনতা থাকে না। কোরানের আক্ষরিক ব্যাখ্যা-বয়ান করে কোরানকে সাম্প্রদায়িকতার পোশাক পড়িয়েছে তারা।
৬শত হিজরীর পূর্বে মাদ্রাসার শিক্ষা অনেকটা অলি-আউলিয়াদের অনূকুলেই ছিল, ৬শ হিজরীর পরে সে সমস্ত শিক্ষা পরিবর্তন করে অন্ধ-গোঁড়া মৌলবাদী শিক্ষার প্রচলন করা হয়েছে-যা আল্লাহর অলিদের/দ্বীনে মুহাম্মদীর সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমানে আল্লাহর অলিদের শিক্ষা, আকিদা, আচারানুষ্ঠানের সাথে মাদ্রাসার শিক্ষা, আকিদা আকাশ-জমিন প্রভেদ সৃষ্টি হয়েছে। তাতে তাদের শিক্ষা-আকিদার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য, প্রচার ও প্রসারের জন্য পীর/গুরু/অলিদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, নির্যাতন এমনকি প্রয়োজনে গুরু/অলিদের হত্যা পর্যন্ত করছে। ইহাই ছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দা মি. হামফ্রেশের নির্দেশ।তিার জন্য পড়ে দেখতে পারেন ‘পরহেজগারীর আড়ালে ওরা কারা!!!’, “মি. হামফ্রের ডাইরি, ওহাবী পরিচয়, নজদ পরিচয়, ওহাবীদের আসল পরিচয়, ওহাবী মাযহাবের হাকীকত, যায়যালা- এ ধরনের খাঁটি সুন্নি আলেমদের লেখা আরো অনেক কিতাব রয়েছে। এ সমস্ত পথভ্রষ্ট ওহাবীদের ভ্রান্তিপূর্ণ ঈমান-আকিদা হতে বের হয়ে এসে মুক্ত মনের অধিকারী তথা ইনছানিয়াতে দাখেল হতে হলে একমাত্র অলি-আউলিয়াদের পথেই ধাবিত হতে হবে, তাদের শিক্ষাকে গ্রহণ করে নিতে হবে। সুরা ফাতেহায় তাদের পথে চলার/থাকার জন্যই প্রার্থনা করা শিক্ষা দিয়েছেন খোদা নিজেই। একমাত্র আল্লাহর অলিদের পথই হলো সিরাতিম মুস্তাকিম। আলেম-মোল্লাগণ সিরাতিম মুস্তাকিমের নাম শুনেছে কিন্তু দেখেনি কি জিনিস সিরাতিম মুস্তাকিম। মুক্ত মনের মহা সাধক হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজহ (রাঃ) প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন, সেনহ-মমতা, সম্যগুণ তথা ফিৎরাতে আহসান দ্বারা ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। সমস্ত আল্লাহর অলিগণই এ পথে দ্বীনে মুহাম্মদী প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছেন, এখনো প্রচার করছেন।
পাশাপাশি মাদ্রাসার আলেম-মোল্লাগণ যুগে যুগে তার বিরোধীতা করে আসছে, ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম করছে। ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি নজীর রয়েছে, এখনো আছে। দ্বীনে মুহাম্মদী/দ্বীন ইসলামের তরিকাকে বিকৃত করার জন্য তাদের দলের মাদ্রাসার বিদ্যাধীকারী কিছু মৌলবাদীদেরকে পীর বা অলি বলে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। তাদের মধ্যে ইলমে মারেফাতের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই, না জানে তারা কালেমার তাহকিক, সম্বল শুধু মাদ্রাসার আক্ষরিক বিদ্যা-ইলমুল কালাম। আমাদের দেশে এ ধরনের ইমিটেশন মার্কা পীর/অীরলর অভাব নেই। ওরা কোরান-হাদিসের আক্ষরিক বিদ্যাকে ধর্ম জ্ঞান বুষিয়ে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হচ্ছে, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করছে। মাওলানা মজিবুর রহমানের লেখা ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’ বইটির ৫ম খন্ডের মধ্যে দেখতে পাবেন সাত জন ওহাবী খারেজীকে (গোঁড়া এবং ওহাবী আকিদা ত্যাগ করতে না পারার কারণে তাদের জীর হাজি ইমদাদুল্লাহ সাবেরী তাঁর তরিকা হতে তাদেরকে খারিজ করে দিয়েছিলেন। সেই কথা গোপন করে এ ওহাবী মোল্লাগণ সাবেরী তারিকা প্রচার করে চলেছে) অলি বলে প্রচার করে দিয়েছে।
যাক, বর্তমানে মানুষের মন এক প্রকার যান্ত্রিক পর্যায়ে চলে গেছে। আগের মতো এক অন্যের প্রতি দয়া-মায়া, প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, ভ্রাতৃত্ব-সৌহার্দ্যভাব দেখা যায় না। যুবসমাজ নষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, গ্রামের পরিবেশ এখন পুরোটাই কলুষিত হয়ে গেছে। আদব-নম্রতা সবই বিলুপ্তির পথে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, প্রতারণা, অন্যায়-অবৈধ উপার্জন দ্রুত গতিতে বেড়ে চলছে। যুবসমাজ নৈতিকতা হারিয়ে হারিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, মুরুব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি এক প্রকার উঠেই গেছে। অল্প বয়মের ছেলেরা রাজনৈকিত ছত্রছায়ায় জোর-জুলুম করছে, বিচার আসনে বসছে, টাকা উপার্জনের অবৈধ পথে দ্রুত গতিতে ধাবিত হচ্ছে। কিছু অভিবাবক আছে ওরাও ওদের ছেলেদের এ ধরনের পরিণতি দেখে গৌরব অহংকার করছে, তার ছেলে নেতা হয়েছে, বিচারক হয়েছে, ইহাইও পাপেরই ফল। কারণ, ওরা ধর্মানুষ্ঠান পালন করলেও ধর্মকে ধারণ করেনি/অর্জন করেনি। কারণ, ধর্ম কি তা মূলতঃ ওরা বুঝেইনি বিধায় পুণ্যার্জন হয়নি তাই মানুষ হতে পারছে না। তার মূল কারণ, মাদ্রাসার আলেম-মোল্লাগণের, মসজিদের মৌলবীদের আক্ষরিক শিক্ষা-আকিদায় ডুবে অন্ধ-অনুমানে অন্ধকারে দৌঁড়িয়ে নিজেদের আত্মা হারিয়ে (সুরা আনআম-১২) তাদের অজান্তেই অজ্ঞ-মূর্খ, গোঁড়া মৌলবাদে পরিণত হয়ে নিজেদেরই ক্ষতি করছে আসফালা সাফেলিন হচ্ছে। তাতে তাদের কোনো পুণ্য লাভ তো হচ্ছেই না, বরং পাপে নিমজ্জিত হচ্ছে, তারই বহিঃপ্রকাশস্বরূপ নৈতিকতার অধঃপতন। সেই পাপের ফলেই আলেম-মোল্লাগণ ধর্মকে তেহাত্তর ফেরকায় বিখক্ত করে একে অন্যের প্রতি ফতোয়ার কাঁদা ছোড়াছুড়ি করছে, দ্বন্দ্ব-বিভেদ, জোর-জুলুম, মারামারি, কাটাকাটি করছে, কামড়াকামড়ি করছে, মানুষ হত্যা করছে। তাদের এ ধরনের ক্রিয়া কর্মে সাধারণ মানুষ চরমভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। সঠিক কোনো দিক নির্দেশনা পাচ্ছে না। কারণ, মাদ্রাসার আলেমরা বহুমুখী ঈমান-আকিদায় বিশ্বাসী, দ্বন্দ্ব-বিভেদের ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের মধ্যে ঐক্যতা নেই। ভুল অংকের ফল কখনো একটি হয় না, বহু-ই হয়। এ ইয়াজুজ-মাজুজদের ইশারাই রাছুল যুগে যুগে দিচ্ছেন। তাদের বিভিন্ন মতবাদের-আকিদার শিক্ষায় আক্রান্ত ইসলাম ও সমাজ। এ সত্য কথাটি তুলে ধরলেই ওরা তাদের আদিম চরিত্রটি প্রকাশ করে গোঁয়ার গোবিন্দের প্রেত নৃত্য শুরু করে। তাই বলছি, ওরা শান্তিবাদী নয়, মুক্ত মনের নয়, মহা মন সৃষ্টি করতে পারেনি, সে পথে যেতেও রাজি নয় শুধু আক্ষরিক বিদ্যা বা কিছু ইলমুল কালামকে ধর্ম জ্ঞান বুছেঝে আর ধর্মের আনুষ্ঠানিকতাকেই ধর্ম কর্ম বুঝেছে বিধায় দ্রুত অন্ধকার কবরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই বলা হচ্ছে, ‘আল হাক্কু মুররুণ।’ তারই বহিঃপ্রকাশস্বরূপ অন্ধ-মূর্খ আলেম-মোল্লাদের ফতোয়াবাজির দৌরাত্ম্য বেড়ে চলছে, ধর্ম জ্ঞানীদের উপর জোর-জুলুম চলছে, তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে।
রাছুল বলেন, “কেয়ামতের পূর্বে ‘ইলেম’ উঠিয়ে নেয়া হবে।” আর তা হবে ধর্ম জ্ঞানী আল্লাহর অলিদেরকে উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে। তখন থাকবে শুধু মাদ্রাসার আক্ষরিক বিদ্যার/ইলমুল কালামের অধিকারী পন্ডিতগণ(মাদ্রাসার আলেমগণ), ওরা কামড়াকামড়ি করবে/করছে। রাছুলের ভাষায় ওরা আসমানের নিচে এবং জমিনের উপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী হবে, মসজিদ পাকা হবে মানুষের ঈমান কাঁচা হবে, কোরানের অক্ষর থাকবে তার কোনো জ্ঞান থাকবে না (সুনানে বাইহাকী, মেশকাত)। তাদের ফাঁদে পড়ে মানুষ পথ ভ্রষ্ট হবে। ওরা এক এক জনে এক এক মতবাদ (যার যার ফেরকার কথা বলবে, তার মধ্যে কওমী ওহাবী ফেরকাটি উগ্র, গোঁড়া, ফতোয়াবাজ, ওরাও নানা দলে বিভক্ত। বারো আনা মসজিদ-মাদ্রাসাই ওহাবীদের দখলে। তার সঙ্গে জড়িত মোল্লাপীর বা রাজনৈতিক পীরেরা) শিক্ষা দিবে, প্রচার করবে এবং যার যার মতে ওয়াজ করার ফলে সমাজে দ্বন্দ্ব-বিভেদ সৃষ্টি হবে/হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মৌলবী কোন ফেরকার লোক তা চিনতে না পেরে তাদেরকে দিয়ে ওয়াজ করাবে তাতে দ্বন্দ্ব বিভেদ আরো চরম আকার ধারণ করবে/করছে। ফতোয়াবাজি করবে/করছে, উত্তেজনামূলক বক্তব্য দিয়ে সমাজে দ্বন্দ্ব বিভেদ সৃষ্টি করবে/করছে, দলাদলি-মারামারি করবে/করছে। শুধু ওয়াক্তিয় নামাজকে, বৎসরে এক মাস রোজা, মক্কায় গিয়ে হজ্জ করাকে, অর্থের যাকাতকে আর শুধু মৌখিক কালেমা পাঠকেই একমাত্র দর্ম কর্ম মনে করবে/করছে ( ইহাই ইয়াজিদের মতাদর্শ-শিক্ষা)।
সুনামগঞ্জের শাল্লায় মার্চের ১৯ তারিখে (২০২১ ইং) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের নেতা মৌলবী মামুনুল হক ও মৌলবী বাবুনগরীর উত্তেজনামূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বন্য পশুর মতো (নরুপশুই) আক্রমণ, ভাংচুর, লুটপাট এবং হত্যাকান্ড চালিয়েছে তাদের মতাদর্শে উজ্জীবিত জঙ্গি মৌলবাদীরা। এর পূর্বে শাপলা চত্ত্বরেও আরো ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজ এ সমস্ত নরপশুগুলোকে গ্রেফতার করার জন্য সরকারের নিকট দাবী জানিয়েছেন। বিষয়টি এমন যে, বিএনপি নামক চুলায় কওমী হেফজতের কাড়াই বসিয়ে জামায়াতে মুওদুদীর লাকড়ী জ্বেলে দিয়েছে, আর হেফাজতের মৌলবাদী মোল্লারা টগবগ করে জ্বলছে আর তান্ডব চালাচ্ছে। ৭১’এর স্বাধীনতার পর জামায়তে মওদুদীরা মৌলবী ইলিয়াছের তাবলিগ জামাতের হিজাবের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ লাভ করে তারা আবার সংগঠিত হয়ে মন্ত্রিত্বের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
বর্তমানে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ। ওরা আবার ২০১০ ইং সালে হেফাজতের হিজাব পড়ে আত্মপ্রকাশের ধান্ধায় তান্ডবলীলা করে চলছে। আওয়ামী-লীগ সরকারের সতর্ক এবং কঠোর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে ওরা নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য কেউ দলের সমালোচনা করছে, কেই পদত্যাগ করছে, কেউবা হেফাজতের বিচার চাইছে। ধর্ম জ্ঞানশূন্য মির্জা ফখরুল বলছে, “আলেমে দ্বীনকে’ কে গ্রেফতার করা হচ্ছে, তিনি তাদের পক্ষে আছেন। ধর্মীয় নেতা আলেম-ওলামাদেরকে নিঃশর্ত মুক্তি দাবী করছেন। কতটুকু ধর্ম জ্ঞান শূন্য হলে এ ধরনের কথা বলতে পারে। সেজন্যই মির্জা ফখরুল শুধু জুব্বা-টুপিধারীকেই ‘আলেমে দ্বীন’ বুঝেছেন। ‘আলেমে দ্বীন’ কাকে বলে সে সম্পর্কে তার হুঁশ-আক্কেলও নেই। তাদের ঘাড়ে মৌলবাদি ভূতে আছর করেছে বিধায়ই বিএনপির আজ এমন করুন পরিণতি, লেজে গোবরে অবস্থা। তাতেও তাদের হুঁশ-আক্কেল জাগেনি। বলা হয় গন্ডারের গায়ে গুলি লাগলে নাকি দুই ঘন্টা পরে লাফ দেয়, কিন্তু ফখরুল সাহেবদের ১০ বৎসরেও হুঁশ-আক্কেল জাগেনি। আপনারা যাদের কাঁধে চড়ে ক্ষমতায় যেতে চাচ্ছেন তারাই আপনাদেরকে টেনে হেচড়িয়ে নামিয়ে ময়লার স্তুপে নিক্ষেপ করে দিবে। এ দেশকে আফগানিস্তান বানানোর ধান্ধায় আছে। ধর্মের হিজাব পড়ে লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করার ইতহিাস যারা রচনা করছে। আমার মতে কোনো আলেমকে গ্রেফতার করা হয়নি, হয়েছে আলেমের ছদ্মবেশে ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদেরকে, জালেমদেরকে।
যারা স্বীয় সআর্থেদ্ধারের জন্য ধর্মের নামে, ধর্মের ছদ্মবরণে অসুরত্বের শক্তি প্রদর্শন করে চলছে। এ ধরনের আরো বহু ঘটনা মৌলবাদী জঙ্গিরা ঘটিয়ে চলছে ধম্যের হিজাব পড়ে। এই তো ৫ই এপ্রিল’২১ হেফজতের নেতা মৌলবী মামুনুল হক ঝর্ণা নামে এক বিউটি পার্লারের নারীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এক রিসোর্টে আসার ঘটনায় লঙ্কাকান্ড বাঁধিয়েছে। এ ধরনের আরো এক নারীর সাথে তার গোপন সম্পর্কের কথা মিগিয়ায়/খবরের কাগজে এসেছে, তা বিশ্ববাসী দেখেছে/ফোনালাপ শুনেছে। এখন এক নম্বর, দুই নম্বর, তিন নম্বর-নম্বরওয়ালা স্ত্রী বের হচ্ছে। কিন্তু সোনারগাঁও ধরা পড়ার আগে কি কোনো নম্বরের স্ত্রীর কথাই তার প্রথম স্ত্রী বা তার পরিবারের কেহই জানতো? জানতো না তার দলীয় কোনো লোকজনও। তাও প্রথম স্ত্রী ব্যতিত বাকি স্ত্রীদের কোনো কাবিন নামা (রেজিস্ট্রি) নেই বলে নিজেই স্বীকার করছে (যুগান্তরসহ সব পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে)। এর মানে চুক্তি বিবাহ (মুতা বিয়ে), তারা যা হারাম বলছে, তা আবার তারাই করছে! সুবিধাবাদীরা এখন ইজ্জত হেফাজত করার জন্য বলছে, ইহা তার ব্যক্তিগত ব্যপার। এ বিষয়টি নিজেদের বেলায় এখন যে ফতোয়ার আমদানি করছে তা অন্যদের বেলায় হলে তা অন্যরকম ফতোয়া দিয়ে ওরা অপপ্রচার, তান্ডব চালাতো- যা ওদের সহজাত প্রবৃত্তি। হেফাজতের নেতারা বেকায়দায় পড়ে এখন বলছে, ইহা তার ব্যক্তিগত ব্যপার। জেল হতে বের হলে বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হেফাজতের নেতারা হয়তো বলেই ফেলবে- ইহা ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা, আসলে কিছুই হয়নি।
এ সমস্ত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য হেফাজতের নেতারা এখন ইজ্জত হেফাজত করার বিভিন্ন দাওয়াই’ও প্রয়োগ করে চলছে। হতে পারে হেফজতের ইজ্জত হেফাজত করার জন্য, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চেষ্টা করছে। কিন্তু মাছটি এত বড় এবং বেয়ারা যে তা শাক দিয়ে ঢাকা যাচ্ছে না। মৌলবী মামুনুল হক উচ্চস্বরে চিৎকার করে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে বুঝাতে চাচ্ছে, সে-ই একমাত্র সঠিক পথে আছে, সে-ই একমাত্র ধর্ম জ্ঞানের অধিকারী আর বাকি সবাই কচু!!! ইহাই অজ্ঞতা-মূর্খতার পরিচয়। এত মহাজ্ঞানীই যখন মৌলবী মামুনুল হক তবে একটি কাজ করে বিশ্বের মুসলমানদেরকে তাক লাগিয়ে দেয়া হোক দেখি! আর সে কাজটি হলো “৭২ ফেরকার (এক কাতার মুক্তিপ্রাপ্ত, ৭২ কাতার হতে বের হয়ে এসে এক কাতার সৃষ্টি হচ্ছে। তারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে, পিতৃধর্মের অনুসারী নয়) লোকদেরকে একটি ফেকরাকয় পরিণত করে দেখিয়ে দিন? তা আপনি/আপনারা কোনো দিনই পারবেন না, আপনার সাথে এ বিষয়ে আমার চ্যালেঞ্জ রইলো। আপনার মতো তাদের মধ্য হতে ও নিজেরাই সঠিক বলে দাবী করে উচ্চস্বরে চিৎকার করছে, মহিষের গর্জ্জন করেছে। আর বড়ার (আমের আটি) মন্ত্র পাঠ করছে, “আমার বাঁশি বাইজো, আর কারো বাঁশি বাইজো না।” আর যার যার ফেরকার সাইনবোর্ডটি উপরে তুলে ধরার প্রতিযোগীতায় লিপ্ত ছিল/আছে। তাদের মধ্যেও আপনাদের মতো লক্ষ লক্ষ মুফতি, মুফাচ্ছের, মুহাদ্দেস রয়েছে।
তারা এক অন্যকে পথভ্রষ্ট বলে গালা-গালি করছে, কাফের-ফাসেক বেদআতি বলে ফতোয়াবাজি করছে, মারামারি, খুনাখুনি করছে। আপনিও তার মধ্যে একজন। সুতরাং আপনার অবস্থান কোথায় তা আশা করি এবার বুঝতে পারেছেন, যদি সামান্যও হুঁশ-আক্কেল থেকে থাকে! অন্যান্য ফেরকার মধ্যেও আপনার/আপনাদের মতো লক্ষ লক্ষ আলেম-মোল্লারা সত্য সত্য বলে বৃথা চিৎকার করে তাদের সাইনবোর্ডটি উপরে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় রতো ছির/আছে। আপনি এবার নিজের বিবেকের সিদ্ধান্ত নিয়ে বলুন আপনি/আপনারাও কতটুকু সত্য, কোন ফেরকায় আছেন। আপনিও ফেরকাবন্দির চারি দেয়ালে খোঁয়ারে বাধা ষাঁড়ের মতো নিস্ফল অস্ফালন করছেন। চেয়ে দেখুন আপনি/আপনারা যে ফেরকাই দাবী করবেন, আপনাদের বিপরীত ফেরকা রয়েছে। সুতরাং এ সমস্ত মহিষের নিস্ফল গর্জন ছেড়ে অলি আউলিয়াদের পথে ধাবিত হয়ে সুন্দর একজন মানুষ হতে চেষ্টা করুন; আদব-নম্রতা-ভদ্রতা প্রকাশ করুন। আপনার/আপনাদের মধ্যে অজ্ঞতার মিথ্যা মিথ্যা অহংকার-অহমিকা, হিংসা, দলাদলি, মারামারি করার যে আগুনটি (নারুল্লাহি মুকাদ্দাতু) দাউ দাউ করে জ্বলছে, তারই প্রভাবে উগ্রতা, উচ্ছৃঙ্খলতা মাদ্রাসার ছোট ছোট বাচ্চাদের মধ্যেও দেখা দিচ্ছে, পথভ্রষ্ট হচ্ছে। আপনাদের ভুল শিক্ষা-আচরণে শত শত ছোট ছেলেরা পথভ্রষ্ট হচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। হিংসা-প্রতিহিংসার অগ্নি যারা দীলে পোষণ করছে তারাই অগ্নিপূজক হিসেবে চিহ্নিত হবে। আলেম-মোল্লা আর অলিআল্লাহর/ফকিরের মধ্যে রয়েছে আসমান-জমিন প্রভেদ- এ বুঝ জ্ঞান আপনাদের কতটুকু আছে তা আপনাদের ভাব-ভাষা-বক্তব্য হতেই বুঝা যাচ্ছে।
এ সব কামড়াকামড়ি থেকে বের হয়ে এসে একজন মুর্শিদের/গুরুর খেদমতে আত্মনিয়োগ করে নিজেদের বাস্তবে মুক্তি জগতে নিয়ে যেতে চেষ্টা করুন। আদব-নম্রতা, ভদ্রতা, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববন্ধন সুন্দর আচরণ শিখতে চেষ্টা করুন এবং মানুষের সাথে সে ধরনের ব্যবহার করুন, সে যে ধর্মেরই হোক। জানি, এ ধরনের আচরণ করতে আপনাদের মহা কষ্ট হবে। কারণ, এধরনের শিক্ষা নেয়ার মাদ্রাসায় আপনারা নিজেরাও পড়েন নি, শিক্ষা নেন নি, শিক্ষা দেন ও না। তা আপনাদের ঈমান-আকিদা, আচার আচরণ হতেই স্পষ্ট প্রমাণিত। ওয়াজ নামক আওয়াজে আপনার মতো মহিষের গর্জ্জন সাড়ে তের শত বছর পূর্ব হতেই শুরু হয়েছে, এখনো কেরছেন; আর কত দিন এ ধরনের চিৎকার করবেন? আপনাদের এ সমস্ত আচরণের ফলাফল এক সত্য সনাতন ইসলামকে তেহাত্তর তালি পোশাক পড়িয়ে জোকার সাজিয়ে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, পবিত্র ইসলাম ধর্মকে কলঙ্ক করছেন। আর কী করতে চান? তারপরও আপনাদের বোকামিপূর্ণ মহিষের গর্জ্জনসম আস্ফালন বন্ধ হচ্ছে না? বোকায় বুঝে না সে কতো বড় বোকা। আপনার/আপনাদের ভাবখানা “মুই কী হনু রে।” আপনি/আপনারা কিছুই হন নি, হয়েছেন সত্যভ্রষ্ট। সত্যকে স্বীকার করা সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি ব্যতীত আর কারো দ্বারা মোটেও সম্ভব নয়।
প্রবন্ধ – তরিকতে নুর : প্রসঙ্গ আদব
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
আদব ও নম্রতা হলো জন্নাতি গুণ। এই আদব, নম্রতা, তমিজ, তাজিম অর্জন রেতে হলে তরিকতে পরিপূর্ণ দাখেল হতে হয়। ঈমান যার যতো বিশুদ্ধ/নির্মল আদব-নম্রতা-বিনয় তার ততো প্রবল। ইতাই সর্ব ইবাদতের মূল। কারণ-কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত এই পাঁচটি স্তম্ভ ঠিক মতো ধরে রাকতে হলে আদবও নম্রতার নূর লাগবে। আমরা মনে করি এমনি স্বাভাবিক গতিতেই চললেই হবে- এই ধারণাটিই হলো আমাদের ভুল। এই ভুলের মাঝে থাকলেই বিপথগামি হতে হবে। যেমন- কথায় আছে, ‘কাাঁচাতে নু নুলে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস’। যখন কাঁচা থাকে তখন বাঁশকে নোয়ানো যায় না। তেমনি একজন তরিকতপন্থী মানুষের হওয়া উচিত। তরিকতপন্থী হওয়াটাই হলো তার মাঝে আদব নম্রতার নূর লাগবে। যার মাঝে আলো রয়েছে তার আর অতিরিক্ত আলোর প্রয়োজন হয় না তেমনি যার মাঝে আদব নম্রতা রয়েছে সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত কোন চাহিদা থাকবে না। অতিরিক্ত চাহিদাটা হলো দুনিয়াতে কায়েম থাকার লক্ষণ।
যার চাহিদার নিয়ন্ত্রণ হয় নাই তার আখেরাতের ফলাফল হবে শুন্য। কারণ, আখেরাত এই নাছুতের জগত হতে তৈরি করে যেতে হবে, না হলে কর্মফল অনুযায়ী ফলাফল তৈরি হবে। যে কর্মফলটা আখেরাত মুখি হবে সে মানব জনমা হবে সার্থক। সর্থকতা অর্জন করতে হলে আদব নম্রতা সর্বোচ্চতর অবস্থানের উপর দাঁড়াতে হবে। কারণ, কর্মফলটার মাঝে নিজ অবস্থান কি হবে কতা নির্ভর করে। নিজ অবস্থানের উপর যেই মানুষ অচেতন তার কর্মফলটা অতি ভয়াবহ হবে। এই ভয়াবহ কর্মটাকে সুফলে পরিণত করতে হলে চরম আদব নম্রতার মাঝে যুব দিতে হবে। যেমন- একটি বরফের টুকরা আগুনের তাপ পেলে গলতে শুরু করে তেমনি যার মাঝে আদব নম্রতা রয়েছে তার মান গুরুর এশকের আগুনে পুড়ে বরফের মতো শক্ত অবস্থানটি পানির মতো সরল হয়ে যাবে, শুধু তা-ই নয় সবার সাথেই তার আচার-আচরণ হবে মধুময়। পানি যেমন যেই পত্রে রাখা হয় সেই পত্রের আকর ধারণ করে তেমনি যার মাঝে আদব নম্রতা রয়েছে তাকে যেই হালে রাখে সে ঐ হালেই থাকবে। আমার গুরু হযরত কাজা কাজী বেনজীর হক চিশত নিজামী (মাঃ জিঃ আঃ) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন “সরল মনে গুরুর ধ্যানে সদায় যেইজন মজে থাকে, বলো তার মতো কি ধনীরে আছে ত্রিজগতে”।
এলেম দ্বারা মুর্শিদকে চিনা যায় আর আদব নম্রতা দ্বারা মুর্শিদের মনকে জয় করা যায়। বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ)- তাঁর আলোচনা সভার মাঝে একটি কুকুরকে দেখে সাত বার দাঁড়িয়ে গেলেন। কারণ, সে কুকুরটি ঐ পথে সাতবার আসা-যাওয়া করেছিল এবং সে কুকুরটি ছিল তাঁর হুজুরের বাড়ির। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ)- তাঁর এত উচ্চ স্তরের আদব ছিল যে তাঁর আলোচনা সভার মধ্যে যখনই তাঁর দুষ্টি ডান দিকে পড়তো তখনই সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যেতেন। কারণ, তাঁর হুজুরের মাজার বা রঁওযাটি ছিল আলোচনা সভার ডান দিকে।
হযরত ফরিদউদ্দীন মাসুদ গঞ্জেশকর (রাঃ)- তাঁর হুজুরের খেদমত করেছিল চৌদ্দ বছর। তাঁর হুজুরের খেদমত করতে গিয়ে পতিতা মহিলার নিকট চোখ বন্ধক রেখে হুজুরের খেদমতের আঞ্জাম দিয়েছিলেন। ইহা এক কঠিন বিষয়। হযরত ইব্রাহিম বিন আদহাম (রাঃ)- তাঁর রাজত্ব ছেড়ে দিয়ে হুজুরের খেদমত করেছিল চব্বিশ বছর। তিনি নিজেই জঙ্গল হতে কাঠ কেটে এন জীরের দরবারে দিতেন। ইহাই ছিল তার খেদমতের আঞ্জাম। আদব নম্রতা ধরে রাখাইট ভক্তের মূল সাধনা। বিশ্বাস যার যতোটুকু প্রতিষ্ঠিত/পরিশুদ্ধ তার আদব-নম্রতা ততোটুকু পরিশুদ্ধ। যারা পর্থিব স্বার্থ পূরণের জন্য বায়াত হয়, তাদের বায়াত সঠিক নয়, তারা তাদের কর্ম অনুসারে ফলাফল ভোগ করবে। কারণ, হেদায়েত পাওয়াটা অতি ভাগ্যের বিষয়। আর পার্থিব স্বার্থ পূরণ না হলে যারা গুরুকে ত্যাগ করে আল্লাহপাক হাশরের দিন তাদের প্রতি তাকাবেন না। যাদের মাঝে স্বার্থ রয়েছে তাদের আদব নম্রতার ঘাটিতিও রয়েছে। আদব নম্রতা থাকলে নিজ ব্যক্তি স্বার্থ আর থাকে না। আদব নম্রতা যার যত বেশি সে ততো বেশি মুর্শিদের আনুগত্যে থাকতে পারবে।
হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রাঃ) –এর একটি ঘটনা নিচে বর্ণনা করা হলো- মানুষের নফস বা কু-প্রবৃত্তি যেন কয়লা সদৃশ। প্রথমতঃ তিনি কয়লার প্রভাবে অর্থাৎ তামসিকতায় ভুগছেন। তখন এবাদত-বন্দেগীর অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিয়ে কয়লাকে তিনি উত্তপ্ত করেন। আর তওবা ও অনুতাপের হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তাকে আয়নার মতো স্বচ্ছ করেন। এ নিয়ে পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়। নানা ধরনের এবাদত-বন্দেগীতে নিজেকে তিনি গড়ে তোলেন। পুরো এক বছর নিজের প্রতি সূক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে তিনি দেখতে পান, অহংকারের রশি তাঁর কাঁধে। এ রশি ছিন্ন করার জন্য আরও পাঁচ বছর তিনি কঠের সাধনায় রত হন। আর নব মুসলমান হয়ে যান। তখন মানব সমাজকে তাঁর মৃত বলে মনে হয়। তিনি তাদের ওপর জানাযা আদায় করে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যান। যেমন জানাযা আদায়কারীরা মৃত ব্যক্তি থেকে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যান। যেমন জানাযা আদায়কারীরা মৃত ব্যক্তির থেকে আলাদা হয়ে যান। তারপর তিনি আল্লাহর নৈকট্যলাভে সক্ষম হন।। গুরুর প্রতি আদব, নম্রতা, তমিজ ও তাজিম দ্বারাই সর্ব সাধন সিদ্ধি হয়। সব যুগের যত মহাপুরুস রয়েছে তাঁরা এই আদবের দ্বারাই সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। আদবের ফল’ই হলো পবিত্র প্রেম। যেমন- একটি মসজিদ ঘর তৈরি করতে গিয়ে তার ফাউন্ডেশন তৈরি করতে হয় ইট, পাথর, সিমেন্ট, বালু দিয়ে তেমনি এই দেহ মসজিদ ঘরের ফাউন্ডেশন হলো বিশ্বাস-ভক্তি, আদব নম্রতা। ফাউন্ডেশন না থাকলে মূল ভিত্তি ঠিক থাকে না। একটা মানুষ তার মূল ভিত্তিকে ধরে রাখে নিজ নফসের খায়েশকে দূরীভূত করে। মুরিদের আদব-নম্রতা সম্পর্কে পীর-মুর্শিদের কিছু বাণী উল্লেখ করা হলোঃ-
পীরের অজুদকে খোদার এনায়েত মনে করবে এবং তার সাথে পূর্ণ আদব বজায় রাখবে। নিজের সুখ-শান্তি পীরের মর্জির উপর নির্ভর করবে এবং নিজের নফসের খায়েশকে তাঁর সন্তুষ্টির তাবেদার করবে।
একজন মুরিদের এইরূপ অবস্থানই তৈরি করে নিতে হয় তার মনের। কারণ, দুনিয়ার সুখ-শান্তির আশা যদি মনে অহরহ থাকে তবে আর গুরু ভজন হবে না। মনের মাঝে যত দুনিয়ার প্রাধান্য থাকবে তত আখেরাত হারানো যাবে। যারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানী রূপে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে তাঁরা সবাই দুনিয়ার সুখ-শান্তিকে ত্যাগ করেছেন। আমিত্ব ত্যাগেই মানব ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। যারা আমিত্বের আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি সে অশান্তির অতল সাগরের মাঝে ডুবে আছে। মানুষ এক দরজা থেকে অন্য দরজায ভ্রমণ করে যেমন- হায়ানিয়াত থেকে ইনসানিয়াতে। মানুষ যখন খোদার দিকে ধাবিত হয় তখন তার নিজ নফসে বাস করা মুন্সি আজাজিল/খান্নাছ এসে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার বহুরূপ চেষ্টা করে থাকে, এই বাধাগুলোকে অতিক্রম করার একটাই পথ হলো নির্মল বিশ্বাসের মাধ্যমে পীরের মর্জির উপর নিজ মনকে ধাবিত করা। গুরুর এ বাহ্যিক দেহটা বিমূর্তের মূর্তরূপ বিধায় একজন ভক্ত/মুরিদানের জন্য খোদার রূপ দর্শন করার একমাত্র অবলম্বন বিধায় আল্লাহর তরফ হতে ইহা এক মহা নেয়ামতস্বরূপ। মানব মনকে গুরুর প্রতি একনিষ্ট চিত্তে ধাবিত করতে চাইলে নফসের ভেজালগুলো সরাতে হবে/হায়ানিয়াত দূর করতে হবে। যেমন ইটের দেয়াল তৈরি করতে চাইলে ঐ দেয়ালটি মজবুত হবে পানির দ্বারা তেমনি আমাদের দেহ ঘরের মনের দেয়ালগুলো শক্ত হবে আদব নম্রতার পানি দ্বারা। আদব নম্রতার নূর দ্বারা একজন ভক্ত তার নিজ সত্তাকে কলুষিত করে তোলে। পীরের ভেদ জানা হরে খোদার ভেদ রহস্য জানতে হলে খোদার ভেদ রহস্য জানতে পারবে, কারণ, খোদাকে চেনার মাঝে অন্তর্নিহিত মূল ভেদ রয়েছে নিজকে চেনার মধ্যে।
পীর-দরবেশদের সাথে ওঠা-বসা করা এবং আদবের সাথে পবিত্র মন নিয়ে আলোচনা করা পৃথিবীতে সবচেয়ে উত্তম কাজ এবং তার বিপরীত কাজ হল সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ।
নিজ পীরকে রেখে অন্য দরবারে বা বিভিন্ন মাজারে দৌড়াদৌড়ি করলে বা পূণ্য লাভের আশা করলে নিজ পীরের ফায়েজ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি তার ঈমান মাত্রই সঠিক নয় বলে সাব্যস্ত হবে। তাই একজন প্রকৃত মুরিদের কতৃব্য হলো পীরকে রেখে কোথাও না যাওয়া। ‘বস্তুত বাধ্যকারী সটিক প্রয়োজন ছাড়া স্বীয় পীর-মুর্শিদ থাকা সত্ত্বেও অন্য পীরের হাতে বায়’আতে ইরাদত’ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরী। এটাই নির্ভরযোগ্য অভিমত। এটাতেই কল্যাণ নিহিত। অন্যথায় পরিপূর্ণ ক্ষতির সম্ভাবনা বিদ্যমান’ (বায়আত ও খিলাফতের বিধান ২১ পৃঃ)। যারা পীরকে রেখে অন্য দরবারে আসা যাওয়া করে এবং স্বীয় পীর অসন্তুষ্ট হয় তবে তার সর্ব আমল ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরিণামে তারা অন্ধকার কবরের মাঝে নিক্ষিপ্ত হবে, কালো অজুদ নিয়ে হাশরে উঠবে। এই অন্ধকার থেকে মুক্ত হতে গেলে পীর মুর্শিদের দয়া লাগবে।
এই আদব, নম্রতা, তমিজ ও তাজিম ধরে রাখতে পারলেই একমাত্র পীরের ফায়েজ বরকত লাভ করবে। খোদাকে জয় করার একটাই রাস্তা হলো বিশ্বাসযোগে আদব-নম্রতা ধারণ করা। এর দ্বারাই খোদার ভেদত্ত্ব জানা যায়। খোদার ভেদ হলো একজন ইনসান। ইনসাফ হতে ইনসান এবং ইনসানের গুণ-খাছিয়ত হলো ইনছানিয়াত- যাকে ফিতরাতাল্লাহ্ বলে। এই জানার মাঝে বাধাস্বরূপ এসে দাঁড়ায় কালো রঙ্গের একটি অজুদ। তার আছে অসংখ্য সুরত। সেই কালো অজুদকে নূরের অজুদের রূপ দিতে চাইলে আল্লাহর খাস নাম আলিমুল দীলে ধারণ করতে হবে।
আমর দাাদ হুজুর দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (রাঃ) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন- ‘হলে জ্ঞানের অঙ্কুর, মন পাগল তোর, ভয় কিরে কার শমনে, জ্ঞান দিয়ে মন রাখবে সংশোধনে’।
মন একটি অচিন পাখির ন্যায়, এই মনকে ধরতে হলে গুরুপ্রদত্ত জ্ঞান লাগবে, তা ধারণ করতে না পারলে এই অচেনাকে চেনা যাবে না। দীলের মাঝে যাদি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বাসা বাধে তবে আর কালো রঙের অজুদটি ভাঙ্গা যাবে না/অতিক্রম/নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কারণ, সব ভেজালের মূল হলো দুনিয়ামুখি চিন্তা চেতনা- যা এ অজুদের নফস হতে প্রকাশ। এই জগতে যারা কামেল তাঁদেরকে চিনতে হলে সরল স্বভা দীলে ধারণ করতে হবে। যারা খোদার ভেদ জানতে চায় তাদের গুরুর সংযোগে এসে নিজকে চিনতে হবে। রুহে ইনসানীর অধিকারী হলেই হবে চৈতন্যের উদয়, আর চৈতন্যতাই পরকাল। চেতন যারা তার সর্বসময়/দম-কদমে রূপের পাহাড়া দিবে। কারণ, রূপের ঘরেই মাওলার বাসস্থান। আদব নম্রতা ধরে রাখতে হলে জান্নাতি কিছু গুন লাগবে। জান্নাতি গুণগুলো না থাকলে পীর মুর্শিদের প্রতিও আদব নম্রতা আর থাকবে না। ভক্তি রস দ্বারাই গুরুকে জয় করা যায়। প্রেম ফুল দ্বারাই তাঁর পূজা করা যায়। কারণ, গুরু হলো প্রেমের কাঙ্গাল, সে ধারে ধারে ঘুরে বেড়ায় প্রেমেরে জন্য। গালিমপুরের সাধক শেরআলী খান একটি গানে লিখেছেন, গানটি হলো- ‘প্রেম ফুলে পূজলে নাকি শুদ্ধ পূজা হবে তোমার, পূজিবার কী আছে আমার পূজিবার কী আছে আমার।’ গুরুর এখতিয়ারের বাহিরে চলাফেরা করলে পবিত্র প্রেমের আবাস ইঙ্গিত বিন্দু পরিমাণও দেখা মিলবে না তকদিরে।
পীর-মুর্শিদ আসলে দাঁড়াইয়া সম্মান করবে এবং তাজিম করবে। তাঁর বংশধরকেও সম্মান করবে এবং তাদের প্রতি সু-ধারনা পোষণ করবে।
শুধু গুরুকে/পীরকেই নয় তাঁর বংশধরদের প্রতিও আদব সম্মান বজায় রাখতে হবে। সম্মান না দিতে পারলে নিজ পূর বিরক্ত/অসন্তুষ্ট হবে। পীর অসন্তুষ্ট হওয়া মানে আল্লাহকেই অসন্তুষ্ট করা- এই কথার ভেদ রহস্য কেবল একজন কামেল পীর-মুর্শিদ দিতে পারবে। পীরের বংশধরদের অবস্থান অনেক উচ্চ স্তরে। কারণ, তাদেরকে সম্মান দিতে না পারলে পীরকে/গুরুকে পুরোপুরি সম্মান দেয়া হলো না। কারণ, যদি এই সম্পর্কে জানার চ্ছিা থাকে তবে আদবের সাথে একজন পীরের নিকট থেকে জেনে নিতে পারে। বিশ্বাসের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যে আদব-নম্রতা ধারণ করে রেখেছে সেই জ্ঞানী, ভক্ত। ভক্ত থাকে দায়েমী নামাজে। তাই বলা হয় ভক্তের অধীন ভগবান। নামাজের স্বভাব হলো আদব-নম্রতা (সুরা-মুমিনুন-২)। যার আদব-নম্রতা ঠিক আছে তার সর্ব ইবাদতই ঠিক আছে। আর আদবে আউলিয়া, বেআদবে শয়তান। মনের অবস্থান যদি সুন্দর না হয় তবে আর গুরুর নিকট যাওয়া ফলদায়ক হবে না কারণ, গুরুর কাছে যাওয়ার মূল উদেশ্য হলো মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যার গুরুতে মন একাগ্র চিত্তে স্থির হয়েছে সেই সম্পর্কে লালন সাঁইজি গানের মাঝে বলেছেন- “সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।” গুরু জ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে না লাগাতে পারলে গুরুর দয়া কোন দিন শিষ্যের দীলে পৌঁছবে না। যেমন- টিভি দেখার জন্য রিমোট লাগে, রিমোটের সঠিক ব্যবহার করতে না পারলে সেই রিমোটই টিভি নষ্ট করতে পারে, তেমনি মানুষের দীলের মাঝে ইচ্ছা শক্তি নামক রিমোট রয়েছে সেই রিমোটের অপব্যবহার করলে দেহ নামক ঘরটি ভেঙ্গে যাবে।
পীরের ব্যবহৃত জিনিস পাত্র ব্যবহার করবে না হুকুম ব্যতীত এবং তাঁর জায়নামাজে পা রাখবে না।
পীর-মুর্শিদ যেই জিনিসপত্র ব্যবহার করে থাকে সেইগুলো তাঁর অনুমতি ব্যতিত ব্যবহার করবে না। কারণ, পীর-মুর্শিদের বিষয়টি হলো আলাদা। তাঁদের সাধারণ মানুষের মত দেখা গেলেও তাঁরা আলাদা। পীর-মুর্শিদের কালামগুলো হলো এলমে লাদুন্নী। তাঁরা আধ্যাত্মিক জগতে মহামানব, তাই তাঁদের সব বিষয় হলো আলাদা। যার আদব নেই তার ঈমান ঠিক নেই। কিছুদিন পর সে ব্যক্তি হয়তো পীর-মুর্শিদ থেকে বিতাড়িত হয়, নয়তো সে নিজেই আল্লাহর প্রতি ঈমান হারিয়ে আসফালা সাফেলীন হয়ে যায়। গুরু কর্তৃক বা নিজেই গুরু/মুর্শিদ হতে বিতাড়িত হলে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর লানত প্রাপ্ত হয়, আঠার হাজার মাখলুকাত তাকে লানত দিতে তাকে। কারণ, গুরু বা মুর্শিদের নিকট বায়াত হওয়াই হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং তা আল্লাহর হাতেই বায়াত বলে কোরানে বিধৃত (সুরা ফাতহ্- ১০)। সর্ব প্রথম গুরুর প্রতি বেয়াদবী করে তর্ক-অহংকার করে এবং আল্লাহর ঘর মসজিদে সেজদা না করে লানত প্রাপ্ত হলো মুন্সি আজাজিল। সে হলো গুরু/মুর্শিদ হতে বিতাড়িত। কারণ, সে আদব-নম্রতা, বিনয়ের নূরে দাখেল হতে পারেনি।
যুগে যুগে মুন্স আজাজিলের অনুসারীদের মাধ্যেই আদব-নম্রতা, বিনয়ের চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যারা পূর-মুর্শিদের ভেদ জানে না তারা এইরূপ বেখেয়ালী কর্মকান্ড করে তাকে। যাদের বংশগত ভাবে পীর-মুর্শিদের আদব বুঝেনা তারা বেশীরভাগ এরূপ বেলেহাজ কুফরী কর্মকান্ডগুলো করে থাকে।
মাওলানা রুমী (রাঃ) বলেছেন- “পীরকে খোদা হইতে দুই জানিও না, দুই দেখিও না, দুই ভাবিও না।”
নিজ মানব সত্তার মাঝে যদি আদব-নম্রতা থাকে তবে পীর মুর্শিদের প্রতি এইরূপ সুধারণা আসবে। নিজ সত্তাটাকে পবিত্র করে তুলতে হবে, না হরে অপবিত্র সত্তার জন্য এই মানব জনমটা অভিশপ্ত জনমের অীধকারী হয়ে যাবে। যেমন- মানুষ বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন পোশাক পরিধান করে থাকে, আর ঋতুটা যদি একটাই হতো তবে একই রকমের পোশাক পরিধান করা হতো, ঠিক তেমনি একজন মানুষের এই মনকে বহুগামী করলে সেই স্বভাব অনুসারে তাকে পোশাক পরিধান করানো হবে সেই পোশাকগুলো মানুষের হবে না, আর মান যদি গুরুর অনুগামী হয় তবে সেই মানুষটির পরনে মানুষের পোশাক পরিধান করা থাকবে।
একজন মুরিদের নিজ অস্তিত্বকে বা ইচ্ছাকে পীরের ইচ্ছিা/মর্জির উপরে পরিপূর্ণ সমর্পিত করতে হবে। কারণ, পীর যদি সন্তুষ্ট থাকে তবে একজন মুরিদ তার মূল গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। আমাদের এই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়াটা হলো একটি অজানা পরীক্ষার মতো, আর গুরুর দেখা পাওয়াটা হলো সৌভাগ্যের বিষয়, আল্লাহর দয়া ও করুণার ফল। কারণ, ইহা পূর্ব ওয়াদার বাস্তবায়ন (সুরা আরাফ- ১২৭)। আর এই অজানা পরীক্ষা পাশ করতে হলে গুরুর নিকট গিয়ে তাঁর নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে, গুরুকে নিজ মনের ভিতরে ফুলের বাগান তৈরি করে আদব নম্রতা অর্থাৎ তাজা ফুলের সুগন্ধি দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে পারলে এই অসার জনমটা সার্থক হবে। কোদা যার সহায় হবে তার এই দূর্গম পথ অতিক্রম করতে কষ্ট হবে না। যেমন- যারা শিক্ষকের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং পড়ালেখায় অধিক মনোযোগ থাকে তাদের পরীক্ষায় পাস করাটা কষ্টকর হয় না। তেমনি যারা তরিকতের জগতে অধিক মনোযোগী , বিশ্বাস-ভক্তি নির্মল আছে তারা এই নাসুতের দরিয়া ধৈর্য্যের সাথে পাড়ি দিযে রুহে ইনসানীর দেশে দেশে পৌঁছে যাবে। পীরের জিনিস পত্র পীরের অনুমতি ব্যতিত না ধরার মাঝে একটি নিগুর ভেদ রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কারণ, একজন মুরিদের জন্য এই অবস্থানটি হলো চরম আদব নম্রতার। গুরু একজন সাধারণ মানুষের মতো দেখতে হলেও কিন্তু সে সাধারণ নয় তাঁর অন্তর জগতটা হলো পরিশুদ্ধ, আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারীতে পূর্ণ। আর একজন সাধারণ মানুষ ভুল ভ্রান্তির অতল সাগরের মাঝে ডুবে থাকে, গুরু হলো এই মায়ার জগতের ভুল ভ্রান্তির উর্ধ্বে হলো তাঁর বাসস্থান।
এ ডুবন্ত নাসুত সাগর হতে গুরু তার অনুসারীকে তুলে মুক্তির জগতে নিয়ে যায় তাই একজন গুরুর সম্মান আল্লাহ নিজেই তৈরি করে দেন। গুরুর প্রতি আদব, নম্রতা, তমিজ ও তাজিম না থাকলে তার সরিষার তেল মেখে কলা গাছে ওঠার মতো পরিস্থিতি হবে। পিছল খেতে খেতে সে নিজের গন্তব্য ভুলে যায়। একবার যদি ভুল পথে অগ্রসর হয় তবে আর সহজে মূল গন্তব্যে পৌঁছানো হবে না। কারণ, শয়তান অহরহ মানুষের পিছনে লেগে আছে। তাকে বশ করতে না পারলে মানব জনমটাই অসার হয়ে যাবে। বহু রূপের মাঝে ভ্রমণ করতে হবে। আমার মাঝে আদব নম্রতার অনেক ঘাটতি রয়েছে। গুরু/মুর্শিদের নিকট নূরে-এ-আদব/বিনয়-নম্রতার করুণা প্রার্থী। তারপরেও নূর-এ-আদবের মতো কঠিন বিষয়টি সম্পর্কে কিছু লেখার বাসনায় কলম ধরলাম, ভুল হলে দয়াল যেন ক্ষমা করেন।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৬ষ্ঠ পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
নূরে মোহাম্মদী পাঁচটি হালিয়তে এসে পাক পাঞ্জাতন রূপে বিকশিত হয়:
প্রথমত ছিলেন: আল্লাহর নূর
দ্বিতীয়তে ছিলেন: তবরকের ফুল (আহামদী নূর)
তৃতীয়তে ছিলেন: ময়নার গলার হার
চতুর্থতে ছিলেন: সেতারা রূপ (সূরা নজম)
পঞ্চমেতে ছিলেন: ময়ূরিণী
এ পাঁচটি অবস্থান মুতাশাবেহাত (রহস্যাচ্ছন্ন) বা রূপক বা উপমা হিসাবে বিধৃত। এ অবস্থাটি বিভিন্ন নামেও পরিচিত আছে, তবে সবার মূলতত্ব একই। এ সময় এশকের তসবীহ নিয়ে দ’ঠোটে নাম জপতেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’। সমস্ত সৃষ্টির রহস্যের আধার হলো এ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ কথাটি এবং শাজারাতুল ইয়াকীন’ গাছে বসে সত্তর হাজার বৎসর এ নাম জপে ছিলেন। ‘সত্তর হাজার’ কথাটিও এক রহস্যপূর্ণ চিরন্তন শাশ্বত কথা। এরপর ‘ইরফানের’ একটি আয়না বা দর্পণ সামনে এলো তাতে স্বীয় অস্তিত্বে পাঁচটি সুরত দেখেছিল- যা ছিল পাক পাঞ্জাতন। মূলত এ পায়রাহীন দর্পনই ‘মাছালু নূরিহী’- যার মধ্যে রূপ দরশন হয়। এ বেলায়তী পাক পাঞ্জাতনের সমষ্টি রূপ নিয়ে বেহেশতী গাছে মোহাম্মদী ফুল রূপে ছিলেন। তানাজ্জুলাত-ই-খামছা তথা পঞ্চস্তরে জাতপাকের নাযিল।
হকিকতে মোহাম্মদী হতে পাক পাঞ্জাতন বিকশিত হওয়ার ধারাটি হলো:
আল্লাহপাক হকিকতে মোহাম্মদীকে জহুর করে তাঁর প্রতি মহব্বতের নজরে তাওয়াজ্জু দেন মানে তাঁর নিজের প্রতি নিজের যে ভালোবাসা ছিল তা তাওয়াজ্জু মারফত ‘ইলকা’ করেন। তাতে ‘হুব্বে এলাহীর’ প্রবলভাব ধারণ করে, ফলে হাকিকতে মোহাম্মদী এতো অস্থির হন যে, তাতে কম্পন সৃষ্টি হয় এবং ডান দিকের এক অংশ পৃথক হয়ে খসে পড়ে ও কাঁপতে থাকে। মাওলাপাক তখন হাকিকতে মোহাম্মদীর মাধ্যমে ঐ খন্ডিত অংশের উপর রহমতের নজর নিক্ষেপ করেন, তাতে নারী জাতির স্বরূপ প্রকাশ করেন। ইনিই বাস্তব জগতে হযরত মা ফাতেমা আলাইহাস্ সালাম হলেন। এবার আল্লাহপাক দ্বিতীয়বার হাকিকতে মোহাম্মদীর প্রতি মহব্বতের নজরে তাওয়াজ্জু দিলেন। তখন বাম দিক হতে আরেকটি অংশ হাকিকতে মোহাম্মদী হতে পৃথক হয়ে যায় এবং প্রথম অংশের সংরক্ষক ও জোড়া হিসাবে একটি পুরুষ আকৃতি হয়ে যায়। ইনিই হলেন মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম। এ দু’সুরত প্রকাশ হওয়ার পর আল্লাহ হাকিকতে মোহাম্মদীর প্রতি তৃতীয়বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। এতে আরো একটি অংশ পৃথক হয়ে পড়ে এবং দু’ভাগ হয়ে দু’টি আকৃতি প্রকাশ পায়। প্রথম যে আকৃতি প্রকাশ পায় তা মাথা হতে নাভী পর্যন্ত হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আকৃতির অবিকল এবং ইনিই হলেন ইমাম হাসান আলাইহিস্ সালাম।
এজন্যই রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়া আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলেছেন, “আনা ওয়া আলীউন নূরীন মিন ওয়াহিদ” অর্থাৎ আমি এবং আলী একই নূরের দু’খন্ড। “আলী মীননী ওয়া আনা মিনাল আলী” অর্থাৎ আলী আমা হতে এবং আমি আলী হতে। “ফাতেমা মিননী ওয়া আনা মিনাল ফাতেমা। হাসান মিননী ওয়া আনা মিনাল হাসান। হুসাইন মিননি ওয়া আনা মিনাল হুসাইন।” অর্থাৎ ফাতেমা আমা হতে এবং আমি ফাতেমা হতে। হাসান আমা হতে এবং আমি হাসান হতে। হুসাইন আমা হতে এবং আমি হুসাইন হতে। এখানেই হুসাইনের জলিতে প্রতিঘাত হয়ে আল্লাহর কালাম ওহী হয়। হুসাইন চির সত্য, দ্বীন ইসলামের ভিত্তি। এখানেই রয়েছে ঈমান এবং ঈমানের সুরত। এ ঈমানকে ধারণ করলেই মিলবে আমান তথা মুক্তি। মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম বলেছেন, “হাসান হলেন মাথা হতে বক্ষ পর্যন্ত রাছুলুল্লাহর সদৃশ। আর হুসাইন হলেন নাভী হতে পা পর্যন্ত রাছুলুল্লাহর সদৃশ। [তিরমিযী, মেশকাত ১১তম খন্ড]। হাসান এবং হুসাইন মিলে ‘আহসান’ সুরত জহুরে আসছে। হাকিকতের জগতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় মোহাম্মদী গুণ-খাছিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। সমস্ত কিছুর ধারক-বাহক হলো হুসাইনী জগত এবং এখানেই জিবরাইলের আগমন হচ্ছে, কোরান নাযিল করছেন। পাক মাটি বস্তুর জগতে রমজানের সাতাশ তারিখে আল্লাহর কালাম নাযিল হচ্ছে। ‘ইন্না আনজালনা-হু ফী লাইলতিল ক্বাদরি’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই নাযিল হয় ‘হু’ শক্তির রজনীতে। আল্লাহপাক যখন কোরান শিক্ষা দিয়ে তারপর মানুষ সৃষ্টি করেন তখনই ‘হু’-এর আগমন ঘটে, নাযিল হয়। এখানেই পবিত্র রমজান মাস, যে মাসে কোরান নাযিল হয়। কোরান শিক্ষা দেয়া হয় শাবান মাসে আর তা নাযিল হয় রমজান মাসে।
রমাজন মাস ব্যতিত কোরান নাযিল হয় না।
নূরী জগতের বহু উর্ধ্বে সম্মান ও মহত্বের সিংহাসনে হযরতহ রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ত’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের মাহবুবিয়াতের গৌরবময় দীপ্তিমান অবস্থায় বিরাজমান আছেন।
এ সিংহাসনের নিচে: হাকিকতে মোহাম্মদী, বামদিকে মাওলা আলী ডান দিকে মা ফাতেমা, ইমাম হাসান, ইমাম হুসাইন (আ)।
আল্লাহপাকের নিকট হতে আলমে খালকের পরিবর্তনের দুটি ধারা চিহ্নিত আছে এবং তা প্রথমে হাকিকতে মোহাম্মদীর উপর প্রকাশ পায়- ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ তথা ভালো ও মন্দ- এ অবস্থায়। ভালো বা খায়ের হলে হাকিকতে মোহাম্মদী হতে হাকিকতে ফাতিমীয়ার দিকে পৌঁছে তথা সোপর্দ করা হয়। এজন্য ফাতেমাকে ‘খায়রুন্নেছা’ বলা হয়। শর বা মন্দ হলে মাওলা আলীর হয়ে হাককিকতের উপর ন্যায় হয়। তারপর ভাল-মন্দ দু’ হাকিকত মিলিত হয়ে হাকিকতে হাসান ও হুসাইনের দিকে পৌঁছে। তাদের এ দু’ হাকিকতের মধ্যস্থতায় যমানার গাউছের নিকট পৌঁছে। গাউছে যমানা হতে আবদাল, আওতাদ ইত্যাদি সমস্ত ওলী-আউলিয়াগণের নিকট পৌঁছে। তারপর তাদের মাধ্যমে সৃষ্টি পগতে এস বিকশিত হয় বিধায় ওলী-আউলিয়ার উছিলায় সৃষ্টি রহমতপ্রাপ্ত হচ্ছে। “খোশ আমদেদ ইমাম মাহদী (আঃ)” গ্রন্থে বলা হয়েছে, আল্লাহর খেলাফত বলতে এ রহমতকে বুঝায়- যা আল্লাহপাক হাকিকতে মোহাম্মদী বা পাক পাঞ্জাতনকে দান করেছেন। হাকিকি পাক পাঞ্জাতন সৃষ্টি করে তাদের উপরস্থ এবং নিম্নস্থ যাবতীয় জিনিসের স্থায়ীত্বের মূল স্থির করলেন এবং হাকিকি পাক পাঞ্জাতন হতে যাবতীয় বস্তুর হাকিকত সৃষ্টি করলেন। যাবতীয় বস্তুল স্থির করে আল্লাহ তাঁর নিজের খেলাফত দ্বারা পাক পাঞ্জাতনকে গৌরাবান্বিত করলেন।
নবুয়ত ও রিসালাতের ফায়েজ ছাড়া খেলাফতের ফায়েজ আসে না। হযরত আদম (আঃ) আল্লাহপাক হতে জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে খেলাফত লাভ করেছিলেন তাকে বলা হয় ‘আসলী খেলাফত’। এ খেলাফত পাক পাঞ্জাতন ব্যতিত সৃষ্টির আর কেউ লাভ করেনি বিধায় কামেল মোকাম্মেল সবাই পাক পাঞ্জাতনের মধ্যাস্থতায় খেলাফত ফায়জী লাভ করেন। তবে বুঝতে হবে এখানে বেলায়তী পাক পাঞ্জাতনের বিষয়টিই তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহপাক একদিন জিবরাঈলকে হুকুম করলেন বেহেশত হতে মতান্তরে আরশ মোয়াল্লার নিকট হতে ঐ ফুলটি নিযে আসো। জিবরাঈল একে এক দু’বারই চেষ্টা করে ফুলের নিকট যেতে পারলেন না। জিবরাঈল এ অবস্থা আল্লাহপাককে জানালেন। আল্লাহপাক বললেন, তুমি এবার “বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে ফুলে হাত দিবে। জিবরাঈল তা-ই করলো এবং ফুল নিয়ে এলো। আল্লাহপাক জিবরাঈলকে বললেন এ ফুল নিয়ে শাম শহরে এক খেজুর বাগানে চলে যাও। সে বাগানে হযরত আবু তালিব ও আব্দুল্লাহ শুয়েছিলেন। তারা বাণিজ্য উপলক্ষে এখানে এসেছেন। জিবরাঈল ফুলটি নিয়ে আব্দুল্লাহর নাকে ধরলেন। সে ফুলের ঘ্রাণ দু’ভাগ হয়ে গেল আব্দুল্লাহ ও আবু তালিবের মধ্যে।
মোহাম্মদী ভাগ পেল হযরত আব্দুল্লাহ এবং বাকী অংশ পেল হযরত আবু তালিব। সুতরাং বলা হলো ‘আনা ওয়া আলীউন্ নূরীন্ মিন ওয়হিদ।’ অর্থাৎ আমি এবং আলী একই নূরের দুই খন্ড। তাই হযরত আবদুল্লাহ (আঃ) এর মাধ্যমে দুনিয়াতে এলো হাবিবে খোদা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এবং হাবিবে খোদা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এর মাধ্যমে এলো ফাতেমা আলাইহিস্ সালাম। আর হযরত আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মাধ্যমে এলো মাওলা আলী এবং মাওলা আলী ও ফাতেমা আলাইহিস্ সালামের মাধ্যমে পৃথিবীতে এলো ইমাম হাসান ও হুসাইন আলাইহিস্ সালাম। ইনারাই হলেন আহলে বাইয়্যেত বা নবী বংশ। নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলেছেন, “সবার বংশ আরম্ভ হয় নিজ ঔরশ থেকে আমার বংশ আলী হতে।”
সুরা ফোরকানের ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ওয়া হুওয়াল্লিজি খালাকা মিনাল্ মা-ই বাশারান্ ফাজ্বা’আলাহু নাসারাও ওয়া সিহরা, ওয়া কানা রব্বুকা ক্বাদীর।” এবং তিনি যিনি পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন মানুষ (বাশার)। অতঃপর তার বংশগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন। এ আয়াত সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, ইহা পাক পাঞ্জাতন সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। যা হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের সৃষ্টির পূর্বে বিদ্যমান ছিল।
কবিতা – নবীন হও আগুয়ান
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান
ওহে নবীন, এসো চির উন্মুক্ত যৌবন দ্বারে
তুমি সামান্য নও, সৃষ্টি সকল তোমারেই খুঁজে,
চেয়ে দেখো, তুমিই ব্রহ্মা – ব্রহ্ম তব করতলে।
যাহাকে দিখেতে জগত উতলা
সে তো তুমি, খুঁজিতেছো কারে?
গ্রন্থ চুষে খায় ভন্ডের দল! যেওনা তাদের কাছে
তুমি চাষার ছেলে, তুমি চষো জমি, দেহজমি।
যাহার বেদ পুরান, কুরানের বাঁধন নাই, তুমিই মহাগ্রন্থ
ঈসা, মুসা, ইব্রাহিম খলিল, মুহাম্মদ-
তাঁরা পড়েছে কি গ্রন্থ? গড়েছে কিতাব।
তুমি আনো নবীনগ্রন্থ, বিশ্ব আজো দেখেনি যাহারে!
ধর্মের যাতাকলে পিষিবে ওরা,
মানবতা খাবে ভর্তা করিয়া
তুমি তো চক্ষুষ্মান! চক্ষু পেয়েছো, দেখোনা চাহিয়া।
গাধার বোঝা কেনো বইবে? আনো নতুন প্রাণ
পৃথিবীকে নিয়ে ভাবো?
সে তো ধুলিকণাসম এ মহাধরিত্রীতলে,
এখানে বন্দী হয়ো না
স্বর্গের লোভ, নরকের ভয়, তিলে তিলে খাবে তোমারে।
ঐ যে গায়ে পড়া জিঞ্জির!
মারিবে তোমায় নাস্তিকতার তীর
মহাপ্রভূ সে তো ধর্মহীন! তুমি তাতে ভিন্ন নও-
সে মহাপ্রলয় আনে, ভেঙ্গে গড়ে নতুন পৃথিবী
ছড়িয়ে দাও নতুন প্রাণ নব নব গ্রহে মহাবিশ্বে।
তুমি আগুনে পুড়েছো, শুলে চড়েছো, তুমি তো নির্ভয়
এখানে চিরযৌবন! নাহি জন্ম-মৃত্যু-জরা
বিশ্ব ছাড়ায়ে নিয়ে চলো আতিক ফকিরে।
কবিতা – নূরী কোরান
লেখক – নাসরিন সুলতানা চিশতী
সাত হরফে নূরী কোরান জীবচনাদর্শন
লৌহ মাহফুজে তা আছে সংরক্ষণ।
সাতটি ফলকে কোরান রয়েছে স্থিত
রাসুলুল্লাহর দীলে তাহা হলো উদিত।
মতলেক কোরান নাতেক হলো রাসুলের জবানে
সেই কালামে কোরানই পথ দেখায় যতো মানবগণে।
ঈমানদারগণ বুঝেছেন তাহা আল্লাহরই কালাম
কোরান কভূ অতীত নয় চির বর্তমান।
শ্রবনযোগ্য কোরান যাহা তাই কাগজে লিখা হয়
মূলের কথা না বুঝিলে পুস্তক হয়ে রয়।
নূরের কালি ঝরে পড়ে পাক মানুষের দীলে
সেই কালিতে আজও তারা আধাঁর কেটে চলে।
পাতার কোরানে আছে প্রথম সূরা ফাতেহা
সাত আয়াতে এই সূরাটি ভেদের মূল যাহা।
সাতের মাঝে আছে গোপন সৃষ্টির মাধুরী
ফাতেহা কোরানের মূল ভেদ বুঝ তাহারি।
পঞ্চ আলমে আল্লাহর কালাম জবরুতে আসে
মাটির স্পর্শে এই ধরাতে তা প্রকাশ হয়েছে।
কোরান পড়া কোরান বুঝা সহজ কথা নয়
পাক পবিত্র হয়ে তাকে ধারন করতে হয়।
আল্লাহর কালাম শিক্ষা দিচ্ছে নিজেই রহমান
“আল্লামাল কোরান“ দেখ কোরানে প্রমাণ।
সংগীত – মানুষ খোদার খোদ কাচারি
লেখক – মোতালেব হোসেন চিশতী
মানুষ খোদার খোদ কাঁচারী, যেজন তাঁরে চিনতে পায়,
আল্লাহ ছাড়া সেজদা হারাম, ভেদ জানিয়া পড়তে হয়।
আহাম্মদি নামাজ পড়া, মুহাম্মদি সেজদা হয়
মুহাম্মদ হয় আদম অজুদ, ওজুদে সাঁই দয়াময়।
চার হরফের হরণ-পূরণ, জানিলে হয় জিন্দা মরণ
না জানিয়া করলে স্মরণ, মিলবেনা আর দীন দয়াময়।
ইনছান হইলো খোদারই ভেদ, খোদার ভেদে ইনছান হয়
ভেদ না জেনে আজাজিলে, খোদা হইতে জুদা রয়।
মুহাম্মদ নাম খোদার তারিফ, সেই নামের যে করছে জরিপ
ভেদ না জেনে হয়না জরিপ, বিফল সেজদা তাহার হয়।
আদম খোদা হয়না জুদা, একই ভান্ডে দুজন রয়
কামেলিন মুর্শিদ বিনে, তারে কি আর চেনা যায়?
খাজা মোতালেব কয় চিনছে যেজন, আরেফ আউলিয়া সেজন
করো আগে সাধন ভজন, সেজদায় পাবে দয়াময়।
সংগীত – রূপের তরী রূপের মাঝি
লেখক – হান্নান শাহ চিশতী
রূপের তরী, রূপের মাঝি
রূপ নিহারে রয়,
রূপ সাধনায় স্বরূপ সাধন
নৌকা কিনারায় ভিড়ায়।
যে রূপে রয় মাবুদ মাওলায়, সে রূপে রাসূল রূপ পায়
মুর্শিদ রূপে জাহির হলেন, তিনিই এ ধরায়।
পাক পাঞ্জাতন করো ছাবেত, মুর্শিদ রূপে আছে মজুদ
মোহাম্মদ রাছুল আল্লা, মুর্শিদেই রয়।
ধর মুর্শিদ চেনো তারে, সেই তো আছে সকল ঘিরে
অজুদে তার রূপ নিশানা, চিনলে সাধন হয়।
মুর্শিদ রূপে দেখো যারে, হৃদ মাঝারে রাখো তারে
আপনারে ফানা করে, থাকো সে রূপ নিহারায়।
সংগীত – আয়না বিবির আয়না খেলা
লেখক – বাউল উজ্জল শাহ
আয়না বিবির আয়না খেলা
খেলছে বইয়া ঘরে, চুপিসারে রে –
খেলছে খেলা বইয়া ভাবনগরে।
ও সখিরে,
জল তরঙ্গে পদ্মাবতী
পদ্ম আসন লয়ে
প্রেম তরঙ্গে ভাসাইছে নাও
রূপালী গঞ্জ হয়ে।
রূপ নগরে ভিড়াইছে নাও রে সখি
বাইন্ধা প্রেমোডোরে, চুপিসারে রে-
খেলছে খেলা বইয়া ভাবনগরে।
ও সখিরে,
তোমারই ফুল তোমার মালা
পড়ছো তোমার গলে
ভেদ না বুঝে দিলে মালা
প্রেম যায়গো বিফলে।
বাউল উজ্জলের-ই প্রেমের মালা রে সখি
মা বাচাতনে গড়ে, চুপিসারে রে-
খেলছে খেলা বইয়া ভাবনগরে।
সংগীত – সুরে সুরে ডাকি দয়াল
লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েছী
সুরে সুরে ডাকি দয়াল
গানে গানে ডাকি দয়াল-
করুণা করো গো আমায়
এ অধমে ডাকে যে তোমায়।।
তুমি সর্বশক্তিমান
গাই তেমার গুণগান
তোমার প্রেমের দাসী হইয়া-
আমি ডাকি গো তোমায়।।
তুমি অনাদী অনন্ত
থাকো সদা জাগ্রত
ডাকি তোমায় হইয়া নত-
করুণা দাও, তব মহিমায়।।
তুমি আকার সাকার হইয়া
মানুষেতে থাকো বইয়া
আমি তোমার শ্রীচরণে ভক্তি করি
অধম মোবারককে পাড় করিও –
অন্তিম বেলায়।।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১১তম ও ১২তম পর্ব
মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ১১
সন্ধানকারী হও প্রেমের। সে প্রেম তোমাকে সর্বান্তকরনে বদলে দেবে। প্রেমের মাহাত্ম্য এমনই যে, সে প্রেমিকের মধ্যে প্রেমাস্পদের জন্য এমন আকুলতা তৈরি করে, প্রেমিক মুহুর্তে হয়ে ওঠে উন্মাদ। ভুলে যায় একমাত্র মাশুক ব্যতিত সকল কিছু। পতঙ্গ সম আকুল হয়ে ওঠে প্রেমানলে আত্মহুতি দিতে। অনুসরণকারী হও সে প্রেমের, যে প্রেমই পারে তোমাকে তোমার অভীষ্ট পানে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে।
যারা প্রেম বাদে জগতে অন্য কিছু খুঁজে বেড়ায়, জেনে রেখো, তারা শেষ অব্দি কিছুই পাবে না। জগত নামক মায়া মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবন প্রদীপ স্তিমিত হয়ে আসবে, তবু প্রেমরুপ দর্শন হবে না। না হবে পরমতমস্তের সাথে মধুর মিলন।
হে অন্বেষী! সন্ধান করো একমাত্র প্রেমের। যখনি তুমি প্রেমের সন্ধান শুরু করবে, দেখতে পাবে তোমার ভিতরে এবং বাইরে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তোমার সকল কিছু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে ও উত্তমরুপে সজ্জিত হচ্ছে মাশুক আগমনের প্রতীক্ষায়। স্বাগত জানাও সে সুন্দরকে। প্রেমের প্রাপ্তিতেই যাকে আপনায় লাভ করবে তুমি।
প্রেমান্বষন-ই প্রেমময়ের সাথে মিলিত হওয়ার একমাত্র উপায়।
পর্ব ১২
আলোর পাশেই অন্ধকারের অবস্থান। ভালোর সাথেই থাকে মন্দ। সৃষ্টির চিরাচরিত এ নিয়মেই আধ্যাত্মিক গুরুকেন্দ্রিক সাধন জগতে উদ্ভুত হয়েছে ভন্ড ও স্বার্থলোভী পন্ডিত শ্রেণির। যারা গুরু বা মুর্শিদের লেবাস গায়ে জড়িয়ে ভক্ত বানিয়ে করে চলেছে রমরমা ব্যবসা ও স্বার্থ হাসিল। এসব ভূয়া গুরুদের চিনে নিতে হবে যাতে সাধন মার্গে কোনো প্রতারণার স্পর্শ না থাকে।
পারমার্থিক পথ পরিক্রমায় একমাত্র পথপ্রদর্শক ও সহায় হলো দয়াময় মুর্শিদ বা গুরু। যদি আত্মিক পথ পরিক্রমণে গুরু বা মুর্শিদ-ই হয় ভন্ড ও প্রতারক, সেক্ষেত্রে ভক্তের ধ্বংস বা অবনতি তো হবেই। তাই সাধনপথে আগে গুরু নির্ধারণ আবশ্যক এবং কামেল বা সত্য গুরু লাভ-ও একটি বড় সাধনা বৈ কি!
প্রকৃত হেদায়েতকারী তো সেই মহাত্মা যিনি স্বয়ং রব কর্তৃক নিযুক্ত এবং তিনি হবেন রবের পূর্ণ শক্তির যথাযথ প্রকাশ ও প্রভুর সকল গুণসমূহের সংরক্ষণকারী। যার থাকবে না কোনো স্বার্থ, ভক্তের প্রভুপ্রাপ্তি ব্যতিত। যিনি জাগিয়ে তুলবেন ভক্তের সুপ্ত পরমাত্মিক সত্যকে। মুর্শিদ তো খোদার স্বচ্ছ আর্শী যার ভেতর দিয়েই প্রভুর নূর বর্ষিত হয় ভক্তের উপরে।
ভক্তের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মুর্শিদ প্রাপ্তি। কারন মুর্শিদ প্রাপ্তিতেই সে প্রাপ্ত হবে হেদায়াত ও প্রভুকে।
খোদার বর্তমান রূপটিই মুর্শিদ বা গুরু।
সম্পাদকীয় – পথ পরিচয়
লাবিব মাহফুজ চিশতী
সমগ্র জগৎ- বিশ্ব সংসার তো একটা পথ।
এখানে যারা আছে তারা সবাই পথিক। এ পথ মাঝে চলছে তাদের নিরুদ্দেশ যাত্রা। যাত্রাটা অবশ্য সকলের জন্য নিরুদ্দেশ যাত্রা নয়। কিছু কিছু প্রকৃত জ্ঞানী বুঝে যান যে, সংসারটা আসলে পথ। তাই তারা পথকে সাজানো বাদ দিয়ে পথ চলতে শুরু করেন।
একটা গল্প শুনেছিলাম- এক পথিক একদিন এক সাধকের বাড়িতে আসলেন। সাধকের ঘরে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পেলেন, ঘরে আসবাবপত্র বলতে আছে শুধু একটি মাদুর ও একটি পানির পাত্র। আর কিছু নাই ঘরে। পথিক সাধককে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার আসবাবপত্র কোথায়? সাধক পথিক কে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনার আসবাবপত্র কোথায়? পথিক বললো, আমি তো মুসাফির। আমার সাথে আসবাবপত্র থাকবে কেনো? সাধক মুচকি হেসে বললেন, আমিও তো তাই!
আসলে আমরা সবাই মুসাফির। চলেছি মরুভূমির দিগন্তহীন বালুকারাশি পায়ে দলে, প্রতিনিয়ত মৃত্যু-জরা-ব্যধি-ভয়-হতাশাসহ নানা প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে সাইমুম ঝড়ের ভয়াল রাতে। সামনে গন্তব্য বহুদূর। পথ দীর্ঘ। পথের শামান শুধু প্রাণের অদম্য তৃষ্ণা আর হৃদয়ে জ্বলতে থাকা সত্যের আলো যা জ্বালিয়ে রাখে পথিকের প্রাণ মরুঝড়ের দুরন্ত রাতে। সে হৃদয়ের আলোতে পথিক খুঁজে পায় তার পথ। শুরু করে তার যাত্রা নব উদ্যমে। পথের প্রতি পথে পথে…
তার হৃদয়, মন, প্রাণ মুখিয়ে থাকে কিসের যেনো কামনায়… কি ধন যেনো তাকে পেতে হবে।
এ পথ পরমার্থ চেতনার পথ। জাগতিক মোহমুক্ত তথা কামনা বাসনা বিবর্জিত পথিক এ চিরন্তন পথ চলতে চলতে একসময় পৌঁছে যান তাঁর গন্তব্যে। প্রাপ্ত হন আপনার পরিচয় জ্ঞান তথা আপন খবর। লাভ করেন আপন আলয় তথা চিরপ্রশান্তির মানবীয় জান্নাত। থেমে থাকে না পথিকের প্রাণ ! সে আবার ফিরে আসে ধারণ করে যুগপৎ টিকে থাকে ব্রহ্মান্ড। তাঁদের চরণ আলোতেই উন্মোচিত হয় পথের দুরূহ রহস্যের মায়াজাল।
এই পথিককে নিয়েই আমাদের পূজাঞ্জলি। মাটির দেউলে রূপের দেয়ালী সাজিয়ে সে পথিকের চরণে অর্ঘ্য দেয়ার আশায় তাঁরই পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সে এলো বলে!
জগতের নিত্য কল্যাণ, পরম শুভ কে জাগাতে আসেন সে। সে যুগে যুগে আসে। আপন খবর এর মশাল হাতে নিয়ে ডেকে ফিরে তাদের, যারা হারিয়েছে আপন খবর। ভালোবাসার বেসাতি নিয়ে আসেন তাঁরা। তৃষিতদের হৃদয়-প্রাণে প্রেমের জোয়ার বইয়ে দিয়ে উন্মোচিত করেন আপন পরিচয়ের দ্বার। সবাইকে দিয়ে বেড়ান ঐশী অমরত্বের পরশ পাথরের ছোঁয়া। সকলের ভিতরে বাহিরে জাগিয়ে তোলেন মহাপ্রেমভাব। ধরার ধূলায় প্রতিষ্ঠিত করেন শাশ্বত স্বর্গ। তাঁর তরেই আমাদের সকল পূজাঞ্জলি। তাঁর কৃপাই আমাদের পরম অভীষ্ট। যুগ যুগ চলুক সে পরম পথের পথিকদের কল্যাণযাত্রা। ঐশী প্রেমের পথে…
ওলীয়ে কেরামগণের বাণী সমূহ সংকলন
1.
আত্মপরিচয় লাভ করতে পারলে বা মান আরাফার তালিম জানলে সেই অখন্ড আমিকে এই আমিতে দর্শন করা যায়।
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
2.
মুর্শিদই তোমার সকল পথের শুরু এবং শেষ। অতএব নিজেকে সদা তাঁর পানে ধাবিত করো।
হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
3. আমি মত্ত ও পাগল হয়ে পতঙ্গের মতো তোমার চারদিকে ঘুরছি। হে জ্ঞানের প্রদীপ, আমাকে ধরো এবং তোমার মধ্যে টেনে নাও।
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.
4. আমি রব কে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রভু – তোমার পথ কোনটি? উত্তরে তিনি বললেন, আমিত্ব ভাব ছেড়ে দাও। তবেই আমার দীদার লাভ করতে পারবে।
হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহ.
5. গুরু প্রেমের রসিক ছাড়া প্রেমের আলাপ করিও না। কারণ, এমন অনেকেই আছে তোমাকে অপমান অপদস্থ করতে দ্বিধা করবে না।
গাওসে পাক আব্দুল কাদির জিলানী রহ.
6. যখন তোমার দর্শনে রব স্থিত হবে তখন তুমি নিজেকে আর কিছুই দেখতে পাবে না।
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহ.
7. যে তার জ্ঞান দিয়ে মনের খারাপ ইচ্ছাগুলো জয় করতে পারে, সে স্বর্গের ফেরেস্তাদের চেয়ে বেশি সম্মানিত বিবেচিত হয়।
হযতর জালালউদ্দিন রুমী রহ.
8. পৃথীবির যত আয়োজন, সবি প্রেমের জন্য। প্রেমের আকর্ষণেই জগত চক্রাকারে ঘুরছে।
মির্জা গালিব রহ.
9. মজনুর পায়ের জিঞ্জিরের শব্দ প্রেমের। শুধু জ্ঞানীর শ্রবণ এই সঙ্গীতের মর্ম বুঝতে পারে না।
হযরত খাজা আমীর খসরু রহ.
10. মোহের শিকলে বন্দী যে হৃদয়, কীভাবে সে স্রষ্টার নিকট পৌঁছাবে?
11. যে বীজ তার খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে আগ্রহী নয়, সে কখনো ফলদায়ী বৃক্ষ হতে পারে না।
12. শূন্য থেকে এসেছি, শূন্যেই ফিরে যাবো। চোখ কান সব সময় খোলা রেখো, কুয়াশায় পথ হারিও না, বন্য প্রানীদের খাবার হইও না।
13. দুনিয়ার মোহ সাগরের লোনা জর। যতই পান করো না কেনো, কখনো এর তৃষ্ণা মিটবে না।
14. ঈশ্বরের জন্য খুশির গান গাও, প্রভুর নামের সেবা করো এবং তাঁর সেবকের সেবক হয়ে যাও। গুরু নানক
15. যে মানুষগুলোর মধ্যে ভালোবাসা আছে, তারা সেই সব সৌভাগ্যবান মানুষ, যারা ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছে। গুরু নানক
16. সত্য পালনই প্রকৃত ধর্ম। যারা সত্য রক্ষা করে না, তারা বিধর্মী, তারা অপরাধী। তাদের গতি নরকে। তারা শাস্তি পাবার যোগ্য। বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী
17. আত্মনিষ্ঠ যোগ’ই তোদের মুক্তির পথ। ভক্তিই সারবস্তু। মন্ত্রাদি হয় সহায় মাত্র। ভক্তিকে সম্বল করে এগিয়ে চল, তোদেরকে রুখবে কে- রে! তোরা যে আমারই সন্তান। বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, জুন ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত


