আল্লাহর সঙ্গে মিলন মানবাত্মার এক চিরন্তন আকাঙ্খা এবং এ জন্যই মানুষের যাবতীয় সাধনা। ইসলামের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয় সুফিবাদের মাধ্যমে, যেখানে আত্মা এক প্রেমিক, আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপ্রেম। মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি রহ. বলেন: এই প্রেম কোনো ধর্ম চেনে না, কোনো দেশ জানে না, শুধু জানে বিলীন হওয়া—প্রভুর মাঝে। সুফিরা বিশ্বাস করেন মানুষের অস্তিত্ব তথা রূহ হল আল্লাহর এক ‘আমানত’, যাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে এক নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে—প্রভুর নিকট ফিরে যাওয়ার জন্য।
কুরআন বলে: ওয়া নাফাখতু ফিহি মির রূহি। আমি আমার রূহ থেকে তার মধ্যে ফুঁক দিলাম। — [সূরা হিজর, ১৫:২৯]
এশক : সুফি পথের পাথেয়
এশক শব্দটি এসেছে আরবি ‘আশাক্বা’ থেকে, যার অর্থ এমন এক অনুরাগ/আবেগ বা ভালোবাসা যা প্রেমিককে গিলে ফেলে। এই প্রেম আত্ম-কে নিঃস্ব করে, অহং-কে দগ্ধ করে, এবং অস্তিত্বকে পুড়িয়ে ছাই করে মাশুকের পথে উড়িয়ে দেয়। শায়খ আহমদ রিফাই (রহ.) বলেন: যে প্রেম আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, সে প্রেমই আসল। বাকি সব প্রেম আত্মাকে কেবল দুনিয়াতে আবদ্ধ করে। সুফিদের মতে ইশক দুই প্রকার:
ইশকে-মাজাযি (প্রতীকী প্রেম): বাহ্যিক প্রেম।
ইশকে-হাকিকি (আসল প্রেম): আত্মা ও আল্লাহর মাঝে অনন্ত আকর্ষণ।
আত্মশুদ্ধি: প্রভুপথের প্রথম শর্ত
সুফির প্রভুপ্রাপ্তির পথ তথা আল্লাহ প্রাপ্তির পথ কেবল প্রেমে আবিষ্ট হওয়ার নাম নয়; এটি এক ধারাবাহিক আত্মশুদ্ধির জার্নি—যেখানে ‘নফস’ কে (আত্মকেন্দ্রিকতা) দমন করতে হয়। বলা হয়েছে – যে নিজের নফসকে চিনলো, সে তার প্রভুকে চিনলো। এই আত্মশুদ্ধির ধাপগুলো হল –
নফসে আম্মারা: কুপ্রবৃত্তিপূর্ণ আত্মা
নফসে লাওয়ামা: আত্ম-উপলব্ধিতে লজ্জিত আত্মা
নফসে মুত্মাইন্না: শান্ত আত্মা, আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম আত্মা।
তরিকা: সুফিবাদের পথ পরিক্রমা
সুফি তরিকাসমূহ যেমন—
চিশতিয়া: হৃদয়ের প্রেম, দরবেশি, সংগীত।।
কাদেরিয়া: একনিষ্ঠতা, তাকওয়া, ওলিদের ধারা।
নকশবন্দিয়া: নীরব যিকর, হুসনে-সুখন।
মৌলভি/মেভলভি: রুমি-প্রবাহিত ঘূর্ণায়মান ধ্যান।
মুর্শিদ – এশকের বাতিঘর
সুফিরা বলেন, একমাত্র মুর্শিদ-ই পারেন আত্মাকে আল্লাহর প্রেমের মহাসমুদ্রে নিয়ে যেতে। মুর্শিদ না থাকলে এই প্রেম কল্পনা, আত্মপ্রতারণা হতে পারে। বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) বলেন: আমি দশ বছর আল্লাহর খোঁজে ছিলাম। শেষে মুর্শিদের সান্নিধ্যে বুঝলাম—আল্লাহ আমারই ভিতরে ছিলেন।
ফানা ও “আনাল হক”: আশেক ও মাশুকের একত্ব
প্রেমের চূড়ান্ত পর্যায়ে আত্মা বলে ওঠে—আনাল হক—আমিই সত্য। এই উচ্চারণ আল্লাহ হওয়া নয়, বরং ‘আমি’ সত্তার বিলুপ্তি। মনসুর হাল্লাজ (রহ.) বলেন: আমি কোথাও নেই—সবকিছুতে তুমি। আমি আর আমি নই। এটা হল ফানাফিল্লাহ—প্রেমিকের বিলয় এবং বাকাবিল্লাহ—প্রভুর সঙ্গে চিরস্থায়িত্ব।
মাওলানা রুমি ও আত্মার প্রেমগাঁথা
জালালুদ্দিন রুমি হলেন সুফি ইশকের কবি, যিনি বলেন: তুমি প্রেমিক নও, যদি প্রেমে ভয় পাও। প্রেম এক আগুন—এতে জ্বলে যেতে হয়। রুমির মতে, ইশক এমন এক ধ্বংস—যেখানে আত্মা জ্বলে, নিজেকে পুড়ে নিঃশেষ করে, এবং প্রভুর আলোতে গলে যায়। প্রেম মানে আত্মার মৃত্যু। সেই মৃত্যুই সত্য জীবনের সূচনা।
আত্মত্যাগ ও দরবেশি
সুফিদের প্রেম বা আল্লাহ প্রাপ্তির পথ কেবল আবেগ নয়, এটি আত্মত্যাগ। তারা ত্যাগ করেন—সম্পদ, খ্যাতি, অহং এমনকি নিজের সত্ত্বাও। আতাউল্লাহ আল-ইস্কান্দারি (রহ.) বলেন: যে প্রেম পেতে চায়, তাকে নিঃস্ব হতে হয়। কারণ পূর্ণ হৃদয় প্রেম ধারণ করতে পারে না। এই আত্মত্যাগের চূড়ান্তরূপ হল দরবেশি—অহংহীন এক অস্তিত্ব।
ইশকের ফল: ইলম, নূর ও করমাত
সুফিদের প্রেম তাদের হৃদয়কে আলোকিত করে। তারা লাভ করেন ইলমে-লাদুন্নি: প্রভুপ্রাপ্ত জ্ঞান, নূর: আত্মিক দীপ্তি, করামাত: অলৌকিক সাধনফল। তবে ওলিরা এসব প্রকাশে সংযত, কারণ — যারা প্রভুর প্রেমে লীন, তারা প্রেমের কথা চিৎকার করে না—তারা নিশব্দে জ্বলতে জানে।
আজকের দুনিয়ায় এশকের প্রয়োজনীয়তা
আজকের দুনিয়ায় মানুষ হৃদয়ের শান্তি, অন্তরের আলো, আত্মার প্রেরণা – সব হারিয়েছে। সুফিবাদের ইশক-ভিত্তিক আত্মিক দর্শন মানুষের মধ্যে আল্লাহর প্রেম জাগিয়ে তোলে, অহংকে বিনাশ করে, মানুষকে ফেরায় তার মূল উৎসের দিকে।
প্রেমই একমাত্র পথ
সুফির প্রেম একটি নিরব যাত্রা। এই প্রেম মানুষকে ভেতর থেকে রূপান্তরিত করে। এতে নেই জোর, নেই উপদেশ—আছে শুধুই হৃদয়ের আলো, আত্মার আকুতি। যখন হৃদয় প্রেমে জ্বলে, তখন আত্মা আল্লাহর দিকে উড়ে যায়। এই এশকই আমাদের বাঁচায়, রক্ষা করে এবং নিয়ে যায় সেই একাকী চিরপ্রেমিকের দিকে, যিনি সৃষ্টি করেছেন প্রেমের জন্যই। সুফির পথ কোনও ‘মতবাদ’ নয়, এটি আত্মা আলোর পথ। এই পথ চলতে হয় প্রেমে, কাঁদতে হয় এশকে, এবং মরতে হয় নিজের মধ্যেই—যাতে আত্মা ফিরে পায় তার পরম প্রভুকে।

