ছালমা আক্তার চিশতী
যারা দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান ত্যাগ করে তাদের ঈমানের মূল্য হলো পাঁচ টাকা, যে কেউ তা কিনতে পারে। দুনিয়ার স্বার্থে যারা ঈমান ত্যাগ করে হাশরের দিন আল্লাহপাক তাদের দিকে তাকাবেন না (বোখারী)। বায়াত ভঙ্গকারী অপবিত্র-জাহান্নামী (বোখারী-৫খন্ড)। আবার তারা টাকা-পয়সা, দালান-কোঠা কিংবা দুনিয়ার স্বার্থ পূরণ হয় এই রূপ বস্তু দ্বারা ঈমান ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে থাকে। বলতে বাধ্য হলাম, আমাদের উপরও আবু লাহাব বা ফেরাউনদের (স্বঘোষিত ধার্মিক, গুরুকে অস্বীকারকারী, গুরু ত্যাগীদের) দ্বারা এ ধরণের ঘটনা বর্তমান। আল্লাহপাক আমাদের প্রতি দয়া করেছে, ঈমানকে হেফাজত করার শক্তি দান করেছেন, নয়তো ঈমান রক্ষা করা একটু কঠিন হতো। শুধু এই প্রার্থনা, আল্লাহ যেন প্রকাশ্য শত্রু মানবরূপী শয়তানদের (ইন্নাহু লাকুম্ আদুউ্যুমমুবীন) থেকে আমাদের ঈমানকে হেফাজত করার তওফিক দান করেন।
শয়তান কি ? কোথা হতে এবং কোন দিক দিয়ে ঈমানের উপর আক্রমণ করে তা গুরুর দয়ায় আমরা চিনতে পেরেছি। যারা গুরুকে চিনতে পেরেছে তাদের ঈমান এই সমস্ত ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেলরা কখনোই ভাঙ্গতে পারবে না। বায়াত ভঙ্গ করা মানে নিজেই নিজের ক্ষতি করা/জাহান্নামী করা (সুরা ফাত্তাহ-১০)। যার গুরু নেই তার গুরু হলো শয়তান এবং সে শয়তানেরই বান্দা বলে অভিহিত হবে। ঈমানদার আর কাফের-মুনাফেকের মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব হয় না, আত্মীয়তা হয় না-ইহা কোরানেরই কথা। মানব গুরুকে যারা অস্বীকার করলো তারা আল্লাহকেই অস্বীকার করলো। কারণ, বায়াত আল্লাহর নিকটই হতে হয়, মানবগুরু তার উছিলা (সুরা ফাত্তাহ-১০, সুরা মায়েদা-৩৫)।
যারা মানব গুরুকে অস্বীকার করে তারা ফেরাউন। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাব তারা হলো স্বঘোষিত ধার্মিক-পিতৃধর্মের অনুসারী। তাদের মতবাদ যারা গ্রহণ করবে তাদের অবস্থান হবে নিকৃষ্ট পশুর মতো, জাহান্নামী হবে তারা। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবরা কখনো গুরুকে স্বীকার করেনি, এখনো করে না। ইমাম জয়নাল আবেদীন বলছেন – ‘দুনিয়ার সন্ধানীগণ কুকুর সদৃশ্য।’ তারা এই জগতেই নিজ ছিরাত অনুসারে সুরত নির্ধারণ করে যাচ্ছে, দোযখের আমলনামায় জাহান্নামী অজুদ তৈরী করে যাচ্ছে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলছেন – “পার্থিব স্বার্থ পূরণ না হলে যারা বায়াত ভঙ্গ করে হাশরের দিন আল্লাহপাক তাদের প্রতি তাকাবেন না (বুখারী ৫ম খন্ড)।” একথাটি নবুয়ত এবং বেলায়েত উভয় যুগেই চিরসত্য।
যারা আখেরাতকে ভুলে, জাগতিক জগতের স্বার্থের মোহে পড়ে গুরুকে ত্যাগ করে দুনিয়ার সুখ সন্ধানে মগ্ন, তারাই জাহান্নামের কুকুর। তাদের খোদার ভয় নেই, খোদার প্রতি তাদের মাত্রই ঈমান নেই। সে পীর-মাওলানা যে-ই হোক। কারণ, যাদের খোদার ভয় থাকে তারা এইরূপ বেলেহাজ কর্ম করতে পারবে না। যারা মুরিদ হয় নাই তাদের থেকে আরো অধিক ঘৃনিত যারা মুরিদ হয়েও মানব গুরুকে দুনিয়ার স্বার্থে ত্যাগ করে অর্থাৎ সে ঈমানকেই ত্যাগ করলো। ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) বলছেন, “আমি যদি ইমাম জাফর আস সাদেক (আঃ)-এর নিকট বায়াত না হতাম, তবে আমি নোমান ধ্বংস হয়ে যেতাম।” সমস্ত আল্লাহর ওলীদের মূল বক্তব্যও ইহাই-যা কোরান সম্মত। যারা গুরুকে দুনিয়ার স্বাথের্র জন্য ত্যাগ করছে তারা জাহান্নামী।
কারণ, যারা গুরুর আনুগত্যে আসেনি বা বায়াত গ্রহণ করেনি তারা আল্লাহ কর্তৃক পথভ্রষ্ট (সুরা কাহাফ-১৭)। তারা ঈমানদার নয় ; আর যারা গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেছে তারাই ঈমানদার-আল্লাহরই হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে-ইহাই আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনা হলো (সুরা ফাত্তাহ-১০, ইউনুছ-১০০)। সুতরাং যারা বায়াত ভঙ্গ করেছে তাদের কোনো বন্দেগীই আল্লাহপাক কবুল করবে না। কোরান বলছে, “আল্লাহপাক হাশরের দিন প্রত্যেককে তার ইমামের সাথে ডাকবেন।” সেদিন যার মুর্শিদ বা গুরু নেই তাকে শয়তানের দল বলে ডাকা হবে এবং শয়তানের কাতারে শামিল হওয়ার জন্য নিদের্শ দেওয়া হবে (জা’আল হক)। মানব গুরুর থেকে ঈমান ত্যাগ করা মানেই আল্লাহর থেকে ঈমান ত্যাগ করা।
ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেলরা তা কোনো কালেই স্বীকার করেনি। যারা দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান ত্যাগ করেছে তারা ঈমানদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র, অত্যাচার-নির্যাতন বা মানসিক নির্যাতন করে থাকে যুগে যুগে তাই দেখা যায়। ওরা জুলুমবাজ জালেম, আর জালেমদের স্থান জাহান্নামের সর্বনি¤œ স্তরে (কোরান দ্রঃ)। ঈমান দেখার জিনিস, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনা যায় না এবং না দেখেও ঈমান আনা যায় না। ঈমান আল্লাহর জাত নূর হতে প্রকাশ, মানব জাতির জন্য এক বিশেষ রহমত। আল্লাহপাক যাকে ঈমান দান করেন তিনিই একজন গুরুর সান্নিধ্যে অবস্থান করতে পারেন। আর যে নিজ প্রবৃত্তির পূজক হয় আল্লাহপাক তার ঈমান কেড়ে নিয়ে ঈমান শূন্য করে জাহান্নামী করে দেন। সুতরাং ঈমান রক্ষা করাই হলো দ্বীনে মুহাম্মদীর মূল বিষয় এবং আল্লাহপাকের দয়া ছাড়া ঈমান রক্ষা করা যায় না। যে স্বীয় প্রবৃত্তিকে গুরুর মর্জির উপর ছেড়ে দিয়েছে আল্লাহপাক তার উপরই রহিম নামের দয়া বর্ষণ করে জান্নাতি করে দেন।
যারা গুরুর নিকট হতে ঈমান ত্যাগ করেছে বা গুরুকে অস্বীকার করছে তারা গুরুকে নিজের মতোই সাধারণ মানুষ মনে করে এবং অন্যের ঈমান নষ্ট করার জন্য নমরুদ, ফেরাউন, আবু জাহেল, আবু লাহাবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এরা শয়তানের ধর্মের অনুসারী-প্রকাশ্য শয়তান (কোরান), তাদের অনুসরণ করতে বা তাদের পথে না চলার জন্য কোরানে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এরা যুগে যুগেই গুরুর বিরোধীতায় বর্তমান। তাদেরকে চিনতে না পারাটাই হলো পথভ্রষ্টতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ, আর চিনতে পারাই হলো দ্বীনের পথে থাকার প্রমাণ। কারণ, তাদেরকে না চিনতে পারলে তাদের ধোকা-প্রবঞ্চনা হতে ঈমান রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ধরনের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান (যার মধ্যে শয়তানের/নফস আম্মারা গুণ-খাছিয়ত আছে) বাবা-মা, ভাই-বোন বা আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবও হতে পারে। যারা নিজেরা ঈমান শূণ্য হয়ে গেছে মানে বে-ঈমান তারাই শয়তানের/ফেরাউন, নমরুদের, আবু জাহেলের ভূমিকা নিয়ে অন্যের ঈমান নষ্ট করার চেষ্টায় রত থাকে। তাদেরকে যদিও দেখতে মানুষের মতো মূলতঃ ওরাই হলো মানবরূপী শয়তান।
বিষয়টি এমন যেমন, ‘এক শিয়াল মুরগি চুরি করার জন্য এক বাড়িতে গেল, শিয়াল মুরগি চুরি করতে গিয়ে বাড়ির মালিকের হাতে ধরা পরে গেল। তখন বাড়ির মালিক শাস্তিস্ব^রূপ শিয়ালের লেজটি কেটে দিল। লেজ কেটে দেওয়ার পর শিয়াল লজ্জায় গর্তে গিয়ে লুকিয়ে রইল। এভাবে আর কতো দিন থাকবে, বের হতে পারছে না লজ্জা, তাই এক দিন সে জঙ্গলের সব শিয়ালদের খবর দিল। সব শিয়াল আসার পর সে গর্ত থেকে পুরোপুরি না বের হয়ে সব শিয়ালদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, দেখ, আমাদের এ লেজটিতো কোন কাজে লাগে না, বরং মুরগী চুরি করতে গিয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, তাই এসো আমরা সবাই লেজটি কেটে ফেলি। তখন বৃদ্ধ এক শিয়াল বললো, এমন কথা তো জীবনেও শুনি নি! চল সবাই মিলে গর্ত হতে তাকে বের করে দেখি বিষয়টি আসলে কি? গর্তের ভিতর থেকে বের করে আনার পর সবাই দেখতে পেল শিয়ালটির লেজ কাটা!’ যেহেতু নিজের লেজ নেই, তাই সে অন্যের লেজ কাটার পরামর্শ দিচ্ছে। ঠিক তেমনি দশা হয় প্রকাশ্য শত্রু শয়তান-বেঈমান লোকদের। সে তার নিজের ঈমান ধরে রাখতে পারেনি, এখন উদ্দেশ্য হলো অন্যের ঈমানও সে নষ্ট করবে। এরা সর্বযুগেই বাস করছে, ঈমান রক্ষার জন্যই তাদেরকে চিনতে হবে। ওরা পারিবারিক ও সামাজিক দুই দিক থেকে ঈমান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে থাকে। যুগে যুগে মাÑবাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, দাদা-দাদী, চাচা-চাচী এই রূপ নিজ রক্তের সম্পর্কের লোক শয়তানের অনুসারী-ভক্ত সেজে ঈমান ভাঙ্গার চেষ্টা করে যাচ্ছে। হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রাঃ) বলছেনÑ ‘ভ্রাতৃত্ব দু’ প্রকারের। এক ভাই হচ্ছে রক্তের সম্পর্কের। দ্বিতীয় ভাই হচ্ছে দ্বীনি বা ধর্মের। উভয়ের মধ্যে দ্বীনি ভাইয়ের মর্যাদা অধিক। কেননা রক্তের বন্ধন যার সাথে তার সঙ্গে ঝগড়া, বিবাদ ও বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। কিন্তু দ্বীনি ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার যা কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না।’ দ্বীনি ভাই-বোন সম্পর্কটি চিরস্থায়ী আর রক্ত সম্পর্কটি ক্ষণস্থায়ী। যারা গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেনি বা তাঁর নীতি-আদর্শের উপর নেই তারা দ্বীন ইসলামের মধ্যে নেই, তাদের সম্পর্কটি ইহজগতেই শেষ হয়ে যাবে। নবী-রাছুল বা ওলীর দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাহান্নামী হয়ে যাবে।
এ সম্বন্ধে হযরত খাজা একটি ঘটনা বললেন, আপন দুই ভাই ছিলো। তাদের মধ্যে একজন মুমিন ও অন্যজন কাফের ছিলো। সত্তাগত দিক থেকে মুসলমান ভাইয়ের সত্তা কাফের ভাইয়ের সত্তাকে অস্বীকার করবে সুতরাং এ বন্ধন দূর্বল বলে বিবেচিত হবে। দ্বীনি ভাইয়ের বন্ধন মজবুত হওয়ার কারণ হচ্ছে পরকালে এরা একে অপরের সন্নিকটে থাকবে। (ফাওয়াদুল ফাওয়াদ ১০৮পৃঃ) বেখেয়ালি লোক দ্বারা তরিকতের কর্ম একেবারেই করা সম্ভব না কারণ, যারা তরিকতের কর্ম সাধনা করবে তারা চেতন মানুষ। ঈমান দ্বারাই তরিকতের মূল গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। ঈমানদারের ঈমানের ছুরত মাটিতে এবং আসমানে উভয় স্থানেই থাকে। আসমান ছাড়ে আর জমিন ধারণ করে, আসমানী ছুরত ঈমানদারগণ জমিনেই প্রত্যক্ষ করে। যারা উম্মতে মুহাম্মদী নয় তারা ঈমানকে চিনবে না, দেখবে না বিধায় তারা ঈমানের নূর হতে বহু দূরে সরে যাবে এব খোদাকে চিনবে না, দেখবে না- এরাই হলো পথভ্রষ্ট (কোরান)। যেমনÑ একটি ঘর সেই ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে কোন মানুষ সেই ঘরে পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি সেই ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হয় তবে সেই ঘরের মাঝে সব মানুষই প্রবেশ করতে পারবে। একজন মুর্শিদের দরবার ঠিক তেমনি ঘরের খোলা দরজার নেয় ঈমানদারদের জন্য আর যারা ঈমান শূন্য তাদের অবস্থান হবে বন্ধ দরজার মতো। কারণ, তারা ঘর এবং দরজা কোনটাই দেখবে না, ঈমানের বলেই খোদাকে পাওয়া য়ায়। মুর্শিদের প্রতিটা পদক্ষেপের দিকে, নির্দেশের দিকে খেয়াল রাখতে হবে । কারণ, গুরু ভক্তের ঈমান পরীক্ষা হয় প্রতি মুহুর্তে। তাই প্রতি মুহুর্তে এই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই প্রস্তুত থাকা মানেই চেতন থাকা। ঈমানকে হেফাজত করতে পারাটাই হলো সর্ব সাধনায় সিদ্ধি অর্জন করা।