সংকলক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
মহান রাব্বুল আলামিনের বন্ধু হক্কানী রব্বানী বুজুর্গ আউলিয়া গণের নামের পাশে যেমনি রহমাতুল্লাহ আলায়হি লিখা জায়েজ তেমনি রাদ্বি আল্লাহু আনহু লিখাও জায়েজ ইহা হক্ক পন্থি ফকিহ মুজতাহিদ মোজাদ্দেদ ইমাম ও উলামায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও অভিমত । এক শ্রেণী লোকদের মতে যারা রাসুলে পাক (সঃ) কে দেখেছেন অর্থাৎ শুধু সাহাবীগণের নামের সাথেই (রাঃ) লিখা যাবে অন্য কারোও নামের পাশে নয়।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহাবীগণ অবশ্যই সম্মানীয় এতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু ইসলামী সংবিধানে কোথাও এরূপ বলা হয়নি যে, সাহাবীগণ ব্যতীত অন্য কারোও নামের পাশে (রাঃ) লিখা বা বলা যাবে না । বরং পবিত্র কোরআন হাদিস এবং সকল ফকিহ গণের মতে সাহাবীগণ ব্যতীত অন্যান্য হক্কানী পীর মুর্শিদ ওলী আউলিয়া গণের নামের সাথেও রাদ্বি আল্লাহ্ সংক্ষেপে (রাঃ) লিখা ও বলা যাবে । স্বপক্ষে দলিল দেওয়া হলো।
পবিত্র কোরআন –
দলিল-১ : রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া রাদুআনুহ জালিকা লিমান খাশিয়া রাব্বাহু) অর্থাৎ আল্লাহ তা’লা তাদের উপর রাজি এবং তারাও আল্লাহর উপর রাজি । এজন্যে যে তারা আল্লাহকে ভয় করেন । (সুরা বায়্যেনাত ৮নং আয়াত) ।
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে দেখা যায় যারা আল্লাহকে ভয় করেন তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক “রাদ্বি আল্লাহু আনহুম” বাক্য ব্যবহার করেছেন । এখানে কাউকে খাছ করা হয়নি । কেননা (লি’মান) অর্থ যে বা যারা শব্দটি দ্বারা খাছ বা নির্দিষ্ট বোঝায় না, সুতরাং যারা আল্লাহকে ভয় করেন তাদের নামের পাশে (রাঃ) লিখা বা বলা যাবে ।
দলিল-২ : ইন্নামা ইয়াখ সাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা- অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে (হক্কানী ওলামা গণই আল্লাহ কে ভয় করেন। (সুরা ফাতির ২৮ আঃ) প্রমাণ হলো আউলিয়া কেরামগণই আল্লাহকে অধিক ভয় করেন । (সুরা ইউনুছ ৬৩ আঃ)
দলিল-৩ : ইয়া আয়্যাতুহান্নাফছুল মৎ মাইন্না তুরজীই ইলা রাব্বিকী রাদ্বিয়াতাম মারদিয়া ফাদখুলি ফি ইবাদি ওয়াদ খুলি জান্নাতী) অর্থাৎ হে প্রসান্ত আত্মা তোমার রবের প্রতি ধাববান হও । তিনি তোমার প্রতি রাজী আছেন, তুমি আমার বিশিষ্ট বান্দাগণের মধ্যে শামিল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর । (সুরা ফজর ২৭-৩০ নং আঃ) এখানে ‘রাদ্বিয়াতান’ শব্দটি নফছে মতমাইন্নাহ অর্থাৎ পরিশুদ্ধ ও শান্তি প্রাপ্ত আত্মার অন্তর্ভূক্ত লোকদের ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আল্লাহ ঐ সকল লোকদের উপর রাজি আছেন বিধায় প্রতীয়মান হলো নফছে মতমাইন্নাহ্ স্তরে উত্তীর্ণ ওলীগণের নামের সাথে (রাঃ) ব্যবহার কোরআন সম্মত ।
ফকিহ মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদগণের মতামত :
মতামত-১ : সাহাবায়ে কেরাম তাবেঈন তাবে তাবেঈন হক্কানী ওলামাগণ ও আল্লাহর নেক বান্দাগণের নাম উচ্চারণ কালে (রাঃ) অথবা (রঃ) এই দুইয়ের যেকোন একটি বলা মুস্তাহাব সুতরাং হযরত আবু বকর ছিদ্দিক ও হযরত আবু হানিফা উভয়ের বেলায় (রাঃ) অথবা (রঃ) বা অনুরূপ শব্দাবলীর যে কোন একটি বলা যাবে । অতএব (রাঃ) শুধু সাহাবীগণের জন্যে খাছ নয় বরং তাঁদের নাম উচ্চারণ কালে (রঃ) ও বলা যাবে । (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খন্ড ২৬১ পৃ.)
মতামত-২ : বিশিষ্ট তাবেঈ হযরত দ্বাহহাক (রাঃ) ও সাঈদ ইবনে যোবায়ের (রাঃ) বলেন, তোমরা আবু বকর ও উমর রহমাতুল্লাহি আলায়হুম্মা এর সঙ্গী হয়ে যাও (তাফসীরে তাবারী শরীফ ১১ জি ৭৩ পৃ.) প্রমাণ হয়ে গেল তাবেয়ীগণ সাহাবীদের নামের সাথে (রহঃ) ও ব্যবহার করতেন ।
মতামত-৩ : বিশুদ্ধ মাজহাব মোতাবেক সালাত বা আলায়হিছ ছালাতু ওয়াছ ছালাম পাঠ করা হবে আম্বিয়া (আঃ) ও ফেরেস্তাদের নামের সাথে। “রাদ্বি আল্লাহু আনহু” খাছ হলো সাহাবী আউলিয়া এবং উলামাগণের নামের জন্যে । এ ছাড়া বাকী মুসল্লীগণের জন্য (রহঃ) পাঠ করা হবে । (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খন্ড ২৬২ পৃ.)
মতামত- ৪ : আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রাঃ) ইমাম বুখারীর নাম উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি তা’লাওয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলেছেন (ফাতহুল বারী শরহে বুখারী- ১ম খন্ড ৩ পৃ.) লক্ষ্য করুন ইমাম বুখারী সাহাবী নন অথচ আল্লামা ইবনে হাজর আসকালীন (রাঃ) তার নামের সাথে (রহঃ) এবং (রাঃ) উভয় ব্যবহার করেছেন । এমন কি সহি বুখারী শরীফের ভিতরের কভার পৃষ্ঠায় ইমাম বুখারী (রাঃ) এর অনেক গুলো লকব উল্লেখ করার পর এভাবে লিখা আছে “ফা রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু”
মতামত-৫ : সহি মুসলীম শরীফের লেখকের নামের সাথে এরূপ লিখা আছে ক্বালা ইমাম আবুল হুছাইন মুসলীম ইবনে হাজ্জাজ রাদ্বি আল্লাহু আনহু (মুসলীম শরীফ ১ম খন্ড ২৬ পৃ.)
মতামত- ৬ : নিশ্চয় ইমাম আবু হানিফা রাদ্বি আল্লাহু আনহু বলেছেন আমি আমার রবকে স্বপ্ন যোগে ৯৯ বার দেখেছি (ফাতুয়ায়ে শামী ১ম খন্ড ১৪৪ পৃ.)
মতামত- ৭ : আল ইমামুশ শাফেয়ী রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু ফাতুয়ায়ে শামী কিতাবের লেখক আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রাঃ) ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ী উভয়ের নামের সাথে (রাঃ) ব্যবহার করেছেন অথচ উনারা সাহাবী ছিলেন না ।
মতামত-৮ : আল্লামা ইমাম জালালুদ্দিন ছিয়তী (রাঃ) তদীয় কিতাবে উল্লেখ করেন, ইমাম নব্বী (রাঃ) তার শরহে মাজহাব এ বলেন ইমাম শাফেয়ী ‘রাদ্বি আল্লাহু আনহু’ বলেছেন (আল হাবীলিল ফাতুয়া ১ম খন্ড ৫ পৃ.)
মতামত- ৯ : হেদায়ার লেখক ইমাম কুদুরী (রাঃ) এর নাম উল্লেখ করেছেন এভাবে ইমাম কুদুরী রাদ্বি আল্লাহু আনহু বলেছেন ( হেদায়া ১ম খন্ড ৪৫২ পৃ.)
মতামত-১০ : ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি ওয়া রাদ্বি আল্লাহু আনহু মদীনার রাস্তায় কোন সময় বাহনে চড়তেন না( ফাতহুল কাদির ৩য় খন্ড ১৬৮ পৃ.)
মতামত-১১ : আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানি পথী (রাঃ) তার তাফছির কিতাবে উল্লেখ করেন গাউছে ছাকালাইন মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু (তাফসীরে মজহারী ২য় খন্ড ১০৬ পৃ.)
মতামত- ১২ : আল্লামা আব্দুল হক মোহাদ্দেছ দেহলভী (রহঃ) তার কিতাবে লিখেছেন শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রাদ্ধি আল্লাহ আনহু (মাদারেজুন্নবুয়াত ১ম খন্ড ১৬০ পৃ.)
মতামত- ১৩ : শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেছ দেহলভী (রঃ) উল্লেখ করেন মাশাযেখে জিলানীরা তারা হচ্ছে ইমামুত তরীকত শায়খ আবী মুহম্মদ মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আনহুম আজমাইন এর অনুসারী । (আল্ কাওলুল জামিল ৪র্থ পরিচ্ছেদ)। সুতরাং প্রমাণ হয়ে গেল আল্লাহর ওলীগণের নামের সাথে রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু ব্যবহার করা জায়েজ ।
মতামত- ১৪ : ইসমাইল ইবনে খাতিব আবী হাফ্ছ উমর ইবনে কাছির আশ শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি তা’লা ওয়া রাদ্বি আল্লাহু আনহু (তাফসীরে ইবনে কাছির ১ম খন্ড ৭ পৃ.)
মতামত-১৫ : আল্লাতি সালাকুহা শায়খু রাদ্বি আল্লাহু আনহু (মিসকাত শরীফ ১১ পৃ. উনওয়ানুল কিতাব)
এরূপ অসংখ্য দলিল দেওয়া যেতে পারে ইনশাল্লাহ্ । সর্বোপরি প্রতীয়মান হলো যে, ‘রাদ্বি আল্লাহু আনহু’ শব্দটি শুধু সাহাবীগণের জন্যে খাছ বা নির্ধারিত নয় । বরং হক্কানী রব্বানী ফোকাহা ইমাম মুহাদ্দিছ উলামা ও পীর মাশাইখ গণের নামের সাথে লিখা ও বলা নিঃসন্দেহে জায়েজ । আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ফকিহ্ মুজতাহিদ গণ এই ব্যাপারে একমত প্রদান করেছেন ।
সংকলক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী