“সামা” শব্দটির আভিধানিক অর্থ “শ্রবণ” বা “শোনা।” সুফিবাদের পরিভাষায়, সামা হলো এমন এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন যেখানে কণ্ঠ সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, কাব্য ও কখনো নৃত্যের মাধ্যমে আত্মা আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। এটি কোনো নিছক সংগীতচর্চা নয়, বরং এক গভীর রূহানী ধ্যান ও প্রেমভিত্তিক অভিপ্রায়।
কুরআন শরীফ থেকে দলিল :
১. সূরা আয-যুমার, 39:23
“আল্লাহ নাযিল করেছেন সবচেয়ে উত্তম বাণী—একটি কিতাব, যার আয়াতসমূহ পরস্পর সদৃশ এবং বারবার আবৃত্তিযোগ্য; যার দ্বারা তাদের লোম খাড়া হয়ে যায়, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের চামড়া ও হৃদয় নম্র হয়ে পড়ে আল্লাহর স্মরণে।”
তাফসিরে ইবনে কাসির ও অন্যান্য তাফসির মতে, এ আয়াতে কুরআনের শব্দশৈলী ও প্রভাবিত শ্রবণ অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা সামার একটি মৌলিক নীতি।
২. সূরা লুকমান, 31:19
“তুমি তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে অপ্রীতিকর শব্দ হচ্ছে গাধার স্বর।”
এই আয়াত প্রমাণ করে যে শ্রবণের ক্ষেত্রেও শালীনতা ও রূহানীতা গুরুত্বপূর্ণ — যা সামার সারকথা।
হাদীস শরীফ থেকে দলিল :
১. সহীহ আল-বুখারী (হাদীস: 3527)
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ঈদে বসে ছিলেন, তখন দুই তরুণী যুদ্ধসংগীত গাইছিল। নবীজি (সা.) তা উপভোগ করছিলেন।”
এটি প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ও সীমারেখায় সংগীত হারাম নয়।
২. সহীহ মুসলিম (হাদীস: 892)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু মূসা আশআরির কণ্ঠে কুরআন শুনে বলেন,
“তুমি দাউদের কণ্ঠের মতো কুরআন পড়েছো।”
রূহানীভাবে প্রভাবিত কণ্ঠস্বর প্রশংসিত।
৩. ইবনে মাজাহ (হাদীস: 1896)
“কিছু সুমধুর কণ্ঠ এমন আছে, যা দাফ ও সংগীত সহ হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণে অধিক প্রভাবিত করে।”
ইসলামী পণ্ডিত ও ফুকাহাগণের মত :
◼️ ইমাম আল-গাযযালী (রহ.) — “ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন”
“সামা এমন একটি আত্মিক চিকিৎসা, যা কারো হৃদয়ে প্রেম, তাওবা, খোদাভীতি কিংবা ওয়াজদ সৃষ্টি করে। যদি তা অন্তরকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, তবে তা ইবাদতের সমতুল্য।”
◼️ ইমাম নববী (রহ.)
“গান ও বাদ্যযন্ত্র যদি হারাম কিছুর দিকে আহ্বান না করে এবং শ্রোতা যদি আল্লাহর স্মরণে অনুপ্রাণিত হয়, তবে তা জায়েয।”
◼️ ইবন হাযম (রহ.) — আল-মুহাল্লা
“গান নিজে হারাম নয়, হারাম হলো তার অপব্যবহার।”
আউলিয়ায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি :
◼️ হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশ্তী (রহ.)
“সামা যদি হৃদয়কে আল্লাহর প্রেমে উন্মত্ত করে, তবে তা নামাজের চেয়েও বেশি ফযীলতপূর্ণ।”
◼️ হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)
“সামা হৃদয়ের আয়না, যেখানে প্রেমিক তার প্রিয়তমের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়।”
◼️ সুলতানুল আশেকীন বায়াজিদ বিস্তামি (রহ.)
“আমি এমন সামা চাই যা আত্মাকে জাগিয়ে তোলে ও ‘আহ’ ধ্বনিতে পরিণত করে।”
সুফিবাদের মূলনীতি অনুযায়ী সামা :
✅ সামার মূল উদ্দেশ্য:
যিকর ও তাওবা বৃদ্ধি
আল্লাহর প্রেমে উদ্বেল হওয়া
নফসের মৃত্যু ও আত্মার জাগরণ
✅ সুফি তরিকাগুলোর মধ্যে সামা প্রচলিত:
চিশ্তিয়া
মাওলভিয়া (মওলানা রুমীর তরিকায় ধ্বনিনৃত্য — “সেমা”)
কাদেরিয়া ও রিফাইয়া (নামাযের পর গানের মাধ্যমে ওয়াজদ সৃষ্টি)
সামার আদব (আখলাক) :
1. নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর প্রেমে ডুব দেওয়া
2. নিয়তের বিশুদ্ধতা
3. গানের ভাষা ও ভাবার্থের পবিত্রতা
4. ওয়াজদে সীমা লঙ্ঘন না করা
5. শ্রোতা, কণ্ঠ ও পরিবেশ—সবকিছু পবিত্র হওয়া
উপসংহার :
সামা বা রূহানী সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি এক রূহানী পথচলা, এক প্রেমিক আত্মার প্রভুর সন্ধানে ছুটে চলা। ইসলামী শরিয়তের পরিসীমায় থেকে, যথাযথ নিয়ত ও শুদ্ধ পরিবেশে সামা শ্রবণ আত্মার তাযকিয়া ও আল্লাহর কুরবত অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
গুরুত্বপূর্ণ উৎসসমূহ :
কুরআন মাজিদ (সূরা আয-যুমার, সূরা লুকমান)
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, ইবনে মাজাহ
ইমাম গাযযালী – ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন (كتاب السماع والوجد)
ইমাম নববী, ইবন হাযম – আল-মুহাল্লা
সিয়ারুল আউলিয়া — হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার জীবনী
তাজকিরাতুল আউলিয়া — ফরিদউদ্দীন আত্তার