আপন ফাউন্ডেশন

রওযা মাজার ও কবর প্রসঙ্গ

Date:

Share post:

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন পাঁচ জাত ও সাত সিফাতের সমন্বয়ে বিশ্বের সকল মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টির উপাদান সমান সমান হলেও আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞান ও গুণ ক্ষমতায় সকল মানুষ সমান নয় ।

সঙ্গত কারণে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে মানব সমাজ তিন ভাগে বিভক্ত যথা-

(১) আল্লাহর প্রেরিত নবী, রাসুলগণ
(২) আল্লাহ পাকের মনোনিত অলি আউলিয়াগণ এবং
(৩) সর্ব সাধারণ মুসলমানগণ ।

কোরআন হাদিস গবেষক ইমাম মুজতাহিদগণ উপরোক্ত তিন শ্রেণীর মানুষের ইন্তেকালের পর তাঁদের দেহ সমাধিস্থলের তিন প্রকার নামে নাম করণ করেছেন যেমন

(১) রওয়া শরীফ । হযরত আদম (আঃ) হতে ছাইয়েদেনা ওয়া মাওলানা মোহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত সকল নবী রাসুলগণের পবিত্র দেহ মোবারক সমাধিস্থান কে রওযা শরীফ বলা হয় । যার অর্থ বেহেস্তের বাগান

(২) অলি আউলিয়া গাউস কুতুব পীর মুর্শিদ গণের দেহ সমাধি স্থানকে বলা হয় মাজার শরীফ, মাজার অর্থ চলমান গমনাগমন ইত্যাদি । ধাতুগত অর্থ দর্শনার্থে গমন করা ।

(৩) কবর : সাধারণ মানুষের মৃত দেহের অবস্থান স্থল কে কবর বলা হয় । ব্যক্তির অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও গুণ ক্ষমতার কারণে তার যোগ্যতা ও মান মর্যাদা আল্লাহ পাকই বৃদ্ধি করে থাকেন ।

সে মোতাবেক নবী রাসুল, ও অলি আউলিয়াগণের শান মান ও মর্যাদার সাথে অন্যান্য সাধারণ মানুষের সমতা ও তুলনা ইহকালেও হতে পারে না, পরকালেও হবে না । সুতরাং রওযা মাজার এর মর্যাদার সাথে কবরের বা কবর বাসীর তুলনা করা মারাত্মক ভুল । মাজার ও কবরের মধ্যে যে প্রার্থক্য রয়েছে সেটা না বুঝার কারণে মাজার পাকা করা, ঘর তোলা, গিলাফ চড়ানো, ফুল চন্দন সুগন্ধি দেওয়া, বাতী জালান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে উলামায়ে কেরামদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে । কেউ বলে জায়েজ, কেউ বলে ইহা হারাম, মাঝখানে সাধারণ মানুষ পড়েছে বিপাকে যে আসলে কোনটা সঠিক ? আসুন আমরা নিরপেক্ষ ভাবে দেখি কোরআন হাদিস ও ফিকাহ কিতাব সমুহে এই ব্যাপারে কি ফায়সালাহ্ দিয়েছে ।

একটি কথা মনে রাখতে হবে যে সমস্ত নবী রাসুলগণ জন্মগত ভাবেই চীর মাসুম (নিষ্পাপ) এবং সকল প্রকার শিরক বিদয়াত ও যাবতীয় হারাম কার্য হতে মুক্ত । যদি রওযা ও মাজার পাকা করা, ঘর তোলা, গম্বুজ তৈরী করা গিলাফ চড়ানো ইত্যাদি অবৈধ বা হারাম হতো তাহলে বিশ্বের কোন নবী রাসুলগণের রওয়া শরীফ ঐ রকম পাকা করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হইত না । প্রমাণ স্বরূপ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ এরশাদুস সারীর মধ্যে উল্লেখ আছে যে, আমাদের শেষ নবী রাসুলে পাক (সঃ) এর পূর্বে যতো নবী রাসুল ছিলেন তাদের রওযা সমূহ পাকা করে তার উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দিতেন যাহা দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরও পূর্ব স্মৃতিগুলো ঝকঝক করতো । যাহা অদ্যাবধি বিদ্যমান ।

যেমন- বাগদাদ শরীফ হতে ৪৩০ কিঃমিঃ উত্তরে মওসুল শহরের দজলা নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে এক পাহাড়ের চূড়ায় হযরত ইউনুছ (আঃ) এর রওযা শরীফ, তার ২ কিঃ মিঃ উত্তরে হযরত শীষ (আঃ) এর রওযা, তার দেড় কিঃ মিঃ উত্তর পশ্চিমে হযরত জারজীজ (আঃ) এর রওযা এবং তার ৪/৫ গজ উত্তর পশ্চিমে হযরত নবী দানিয়েল (আঃ) এর রওযা রয়েছে । বাগদাদে হযরত ইউশা ইবনে নুন (আঃ) রওযা, জর্ডানে আম্মান শহরের অনতিদূরে পাহাড়ের চূড়ায় নবী হযরত শোয়াইব (আঃ) এর রওয়া রয়েছে । সিরিয়ার দামেস্কে হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) এর রওযা, বিদ্যমান। বায়তুল মোকাদ্দাসের সীমানার বাইরে কিছুটা পূর্ব দক্ষিণে পাহাড়ের উপর হযরত দাউদ (আঃ) এর বারো হাত লম্বা রওযা শরীফ রয়েছে। বায়তুল মোকাদ্দাস হতে দক্ষিণে গিয়ে প্রধান সড়কের প্রায় ২/৩ কিঃ মিঃ পশ্চিমে হযরত মুসা (আঃ) এর এগারো হাত লম্বা রওযা শরীফ বিদ্যমান ।

বায়তুল মোকাদ্দাস হতে ৫০ কিঃ মিঃ দক্ষিণে হেবরণ শহরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) হযরত ইউসুফ (আঃ) সহ কয়েকশ নবীর রওযা শরীফ রয়েছে । ফিলিস্তিনের আল খলীল শহর থেকে ৬ কিঃ মিঃ দূরবর্তী লুত উপসাগরের কুলে হযরত লুত (আঃ) এর রওযা রয়েছে । ইরাকের নজফ শহরে হযরত নূহ (আঃ) হযরত ছালেহ (আঃ) হযরত হুদ (আঃ) ও হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর রওযা শরীফ অদ্যাবধি বিদ্যমান আছে । খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) যখন বায়তুল মোকাদ্দাস বিজয় করেন তখন খলিল শহরের মধ্যে উক্ত স্মৃতিগুলো দেখে বড় আবেগের সাথে রওযাগুলো জিয়ারত করেন । সেখান থেকে মদীনায় ফিরে এসে মহানবী হুজুর (সঃ) এর রওযা মোবারক, আলে রাসুল ও সাহবাগনের মাজারগুলো পাকা করে ছিলেন ।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) পশ্চিম দিকে মাথা মোবারক ও পূর্ব দিকে পা মোবারক দিয়ে শায়িত আছেন । কারন সেখান থেকে কাবা শরিফ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত । তখন থেকে ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের রাজত্বকাল পর্যন্ত রাসুল (সঃ) এর রওজা শরীফ ঐ ভাবেই বিদ্যমান ছিল । এরপর খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ একে ভেঙ্গে চিত্রাঙ্কিত পাথর দ্বারা পুনঃনির্মান করেন । আর এর বাহিরে অপর একটি দালান তৈরি করেন । ৫৫০ হিজরীতে জামাল উদ্দিন ইস্পাহানী নামক এক মহান ব্যক্তি হুজুর (সঃ) এর রওজা শরীফের চারিপাশে চন্দন কাঠের একখানা জালি তৈরী করেছিলেন । এসময় মিশরের উজির ইবনে আবিল হাইজার শরীফ“সাদা দীবা” বা এক প্রকার সুক্ষ রেশমী কাপড়ের তৈরী গিলাফ পাঠান । যার মধ্যে লাল রেশমী ফুল অঙ্কিত ছিলো এবং তার উপর সুরা ইয়াছীন লেখা ছিলো ।

খলিফা মুস্তাজী বিল্লাহর নির্দেশে তিনি এই গিলাফ দয়াল নবীজি (সঃ) এর রওযা শরীফের উপর পড়িয়ে দিয়েছিলেন । ৬৭৮ হিজরীতে “কলাউল ছালেহী” রওযা শরীফের উপর সবুজ গম্বুজ যা মসজিদের ছাদ থেকেও বেশি উচু তামার জালিসহ নির্মাণ করেন । এর পরে শাহ ফয়সল এবং বাদশা ফাহাদের আমলে এক বিরাট কর্মসূচীর মাধ্যমে হেরামাইন শরীফাইন সংস্কার করা হয় । যা বর্তমানে বিদ্যমান আছে । (জজবুল কুলুব ইলাদিয়ারিল মাহবুব) অতএব প্রমাণ হলো বিশ্ব নবী (সঃ) সহ সকল নবী রাসুলগণের রওযাসমূহ পাকা করা গম্বুজ বিশিষ্ট ঘর ও পাশে মসজিদ নির্মিত ও রওযা শরীফে গিলাফ চড়ানো রয়েছে।

অলি আউলিয়াগণের মাজার শরীফ

আল্লাহ তা’য়ালার বন্ধু তথা লামউতের অধিকারী অলিআউলিয়া কেরামগণের দেহ সমাধি স্থানকে মাজার শরীফ বলা হয় । কারণ তারা সাধারণ মানুষের ন্যায় মৃত্যু বরণ করেন না । এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন, “ওয়ালা তাকুলু লিমাই ইউকতালু ফি ছাবিলিল্লাহে আমওয়াতান বাল আহ ইয়াউন ওয়ালাকিন লা তাসউরুন” অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় (সাধনায় প্রবৃত্তি নিবৃত্তির কর্মে) মধ্যে যিনি কতল (আল্লাহতে ফানা) হয়েছেন তাঁকে মৃত বলো না বরং তারা জীবিত এবং তোমরা তা জানতে পারো না। বা অনেকেই তাহার খবর রাখো না (সুরা বাকারা ১৫৪ আয়াত) ধর্ম যুদ্ধে (জিহাদ) যারা শহীদ হয়ে যায় । আল্লাহ পাক তাদের কে জীবিত বলে ঘোষনা করেছেন ।

মহানবী (সঃ) জেহাদকে দুই প্রকার বলেছেন (এক) অস্ত্রের জেহাদ ইহা জেহাদে আসগর বা ছোট জেহাদ (দুই) স্বীয় নফস আম্মারার সাথে জেহাদ-ই জেহাদে আকবর বা বড় জেহাদ । এখন লামউত বা মৃত্যুহীন তথা চিরঞ্জীব জগতে অরুজ করার উত্তম পথই হলো জেহাদে আকবর । আর এ জেহাদে যারা জয় লাভ করেছেন অর্থাৎ স্বীয় প্রবৃত্তি দমন করে আল্লাহ্ ইস্কের খঞ্জরে কতল হয়ে আল্লাহতে ফানা বা লীন হয়েছেন, তাঁরাই হলেন অলি আউলিয়া, পীর মুর্শিদ ।

তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন : “আলা ইন্না আউলিয়া আল্লাহে লাখাওফুন আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহ জানন” অর্থাৎ সাবধান নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুগনের কোন ভয় নেই এবং ইহকাল ও পরকালে তারা কখনো চিন্তিত ও হবে না (সুরা ইউনুছ- ৬২ আয়াত) । কোরআনে আরো বর্ণিত আছে : “ওয়ালা তাাবান্নাল্লাজিনা কুতিলু ফী সাবালিল্লাহে আমওয়াতান বাল্ আহইয়াউন এনদা রাব্বিহীম ইউর জাকুন” অর্থাৎ যারা আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তোমরা তাদেরকে মৃত বলে ধারণাও করোনা বরং তারা জীবিত । তাদের রবের নিকট হতে রেজেক প্রাপ্ত । (সুরা আল্ ইমরান-১৬৯ আয়াত)

“রবের নিকট হতে রেজেক প্রাপ্ত” এই কথাটি গভীর ভাবে চিন্তা করা উচিৎ সত্য উৎঘাটন হলে নিশ্চিত বুঝা যাবে যে কোন অবস্থাতেই অলিগণ মৃত নন । নবী রাসুল এবং অলি আউলিয়াগণ অবশ্যই জীবিত আছেন একথার বিরোধীতা করা মানেই পবিত্র কোরআনকেই অস্বীকার করা, যা মহাপাপ ও কুফরী । হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেন : “আউলিয়া আল্লাহে লাইয়ামুতুন বাল ইয়ান তাকিলুমিন দারুল ফানা ইলা দারুল বাকা” অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের মৃত্যু নেই বরং তারা স্থানান্তরিত হয় ধ্বংশশীল ইহলোক হতে স্থায়ী পরলোকে ।

হুজুর (সঃ) আরো বলেন : “ইন্নাল্লাহা তা’লা কালামান আদালী ওয়ালিয়া ফাকাদ আজানতাহু বিল হারবে” অর্থাৎ আল্লাহ বলেন যে আমার অলি বা বন্ধুর সাথে শত্রুতা করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করি (হাদিস, কুদসী, বুখারী ও মেশকাত শরীফ) । সুতরাং প্রতীয়মান হলো সাধারণ মানুষের তুলনা অলি আউলিয়ার সাথে চলে না । হাদিস কুদসীতে আল্লাহ পাক বলেন নিশ্চয়ই আমার আউলিয়া (বন্ধু) গণ আমার সম্মানের চাঁদরের নিচে অবস্থান করেন । বা জুব্বার অন্তরালে লুকায়িত ।

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles